সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নামের ওই চুক্তির ৬০ দিনের মধ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্যে ইতিমধ্যে কাজ করছে দুই দেশ। এতে দফায় দফায় ভেস্তে যাওয়া যুদ্ধবিরতির মতো এবার কি চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে? এই প্রশ্ন নিয়েই এখন দেখার বিষয়—সমঝোতা স্মারকে দেওয়া দু’দেশের প্রতিশ্রুতি এখন কোন পথে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) নিয়ে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিস্তারিত কথা বলেছেন দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
যুদ্ধ শুরুর পর পারস্য উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিকে ‘সবচেয়ে বড় হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করেছে ইরান। সমঝোতা স্মারকে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালির বিষয়ে তিনি বলেছেন, এ প্রণালির ওপর ইরানের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ অব্যাহত থাকবে এবং কোনো পরিস্থিতিতেই এ অবস্থান থেকে সরে আসবে না তেহরান।
তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান তার সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখবে। এ ছাড়া সমঝোতা স্মারকে শুধু ৬০ দিনের জন্য ওই সমুদ্রপথে সামুদ্রিক সেবার ফি থেকে সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়েছে।
প্রেস টিভির বরাতে গালিবাফ বলেন, ‘এগুলো আমাদের আঞ্চলিক সমুদ্রসীমা। ইরান হরমুজ প্রণালিকে সামরিকীকরণ করেছে—এমন দাবি করে যুক্তরাষ্ট্রকে কোনো বিতর্ক বা বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ আমরা দেব না। কোনো পরিস্থিতিতেই ইরান এ অবস্থান থেকে সরে আসবে না।’
গালিবাফ হরমুজ প্রণালিকে ‘যুদ্ধের সময় আল্লাহর দেওয়া উপহার’ এবং ‘ইরানের সবচেয়ে বড় শক্তিশালী হাতিয়ার’ বলেও উল্লেখ করেন। তার দাবি, নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার পর দুই সপ্তাহেরও কম সময়ে ইরান ৪ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল রপ্তানি করেছে।
সাক্ষাৎকারে গালিবাফ আরো বলেন, ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া প্রমাণ করে যে, সামরিক সক্ষমতার সমর্থন থাকলে কূটনীতির মাধ্যমেও বাস্তব ফল অর্জন করা সম্ভব।
তবে তিনি বলেন, ইরানের একমাত্র প্রকৃত নিরাপত্তার নিশ্চয়তা তার সামরিক শক্তি। তাই ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও সামরিক সক্ষমতা কোনও অবস্থাতেই আলোচনার বিষয় হবে না।
একই সঙ্গে ইরান তার পরমাণু অধিকার থেকেও সরে আসবে না। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ আমাদের বৈধ এবং অখণ্ডনীয় অধিকার।’
গালিবাফ আরো বলেন, চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য সমঝোতা স্মারকে নির্ধারিত ৬০ দিনের সময়সীমা প্রয়োজনে বাড়ানো যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের আরোপিত সব প্রাথমিক ও গৌণ নিষেধাজ্ঞা তুলে না নেওয়া পর্যন্ত আলোচনা চলবে।
হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক সেবা পরিচালনা সংক্রান্ত সব আইনি ও সেবা বিষয়ে ইরান ও ওমান ইতোমধ্যে একমত হয়েছে জানিয়ে গালিবাফ বলেন, সমঝোতা স্মারকের পাঁচটি ধারা বাস্তবায়নের আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা এগোবে না। এসব ধারার মধ্যে লেবাননে যুদ্ধবিরতি, ইরানের তেল রপ্তানি নিশ্চিত করা এবং ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করার মতো বিষয়ও রয়েছে।
এদিকে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও লেবানন একটি ‘ডি-কনফ্লিকশন সেল’ গঠনে সম্মত হয়েছে। তেহরান ও ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে নিজেদের প্রতিনিধি নিয়োগ করেছে। সেলটি কার্যকর হওয়ার আগে বৈরুতও প্রতিনিধি নিয়োগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
লেবাননের উদ্দেশ্যে গালিবাফ বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সমঝোতা স্মারকের উদ্দেশ্য লেবাননের স্বাধীনতা রক্ষা করা। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় লেবানন-ইসরায়েলের পৃথক কাঠামোগত চুক্তির লক্ষ্য ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী ইরানের জব্দ করা সম্পদ ছাড়ের ক্ষেত্রে কোনো শর্ত থাকার কথা নয় বলে দাবি করেছেন তেহরানের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক আলী আকবর দারেইনি।
আলজাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দায়িত্ব রয়েছে কোনো শর্ত ছাড়াই দ্রুত ইরানের জব্দ সম্পদ মুক্ত করার। কিন্তু ওয়াশিংটন সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করেনি।
দারেইনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র কোনো শর্ত ছাড়াই ইরানের জব্দ করা সম্পদ অবিলম্বে ছাড়তে বাধ্য। কিন্তু তারা তাদের অঙ্গীকার রক্ষা করেনি।’
তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকটি দুটি ধাপে বিভক্ত। প্রথম ধাপে রয়েছে পারস্পরিক আস্থা তৈরির পদক্ষেপ এবং দ্বিতীয় ধাপে রয়েছে একটি চূড়ান্ত চুক্তির বিষয়ে আলোচনা।