• ই-পেপার

সাত শ্রেণির মানুষের জন্য ধ্বংসের সতর্কবার্তা

বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর কুফু তথা সমতাবিধানের গুরুত্ব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র-পাত্রীর কুফু তথা সমতাবিধানের গুরুত্ব
সংগৃহীত ছবি

বিয়েতে সমতাবিধানকে আরবিতে ‘কুফু’ বলা হয়। ‘কুফু’ মানে ‘সমতা ও সাদৃশ্য’। অন্য কথায়, পাত্র-পাত্রীর ‘সমান-সমান হওয়া’, একের সঙ্গে অন্যজনের সামঞ্জস্য হওয়া। বিয়ের উদ্দেশ্য যখন স্বামী-স্ত্রীর মনের প্রশান্তি লাভ, উভয়ের মিলমিশ লাভের পথে বাধা বা অসুবিধা সৃষ্টির সামান্যতম কারণও যাতে না ঘটতে পারে, তার ব্যবস্থা করা একান্তই কর্তব্য। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই (আল্লাহ) মানুষকে সৃষ্টি করেছেন পানি থেকে। অতঃপর তিনি তার বংশগত ও বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তোমার রব সর্বশক্তিমান।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৫৪)

ইমাম বুখারি (রহ.) বুখারি শরিফে এই আয়াতকে ‘কুফু’ অধ্যায়ের সূচনায় উল্লেখ করেছেন। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) তার কারণ উল্লেখ করে লিখেছেন, এই আয়াতকে এখানে উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হচ্ছে এ কথা জানিয়ে দেওয়া যে বংশ ও শ্বশুর-জামাতার সম্পর্ক এমন জিনিস, যার সঙ্গে কুফুর ব্যাপারটি সম্পর্কিত। বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপনে যাতে ভবিষ্যৎ বংশ রক্ষার ব্যবস্থা হয়, সেই দৃষ্টিতে কুফু রক্ষা করা একটা জরুরি বিষয়।

কুফুর মানে যদিও সমান বা সদৃশ, তবু বিয়ের ব্যাপারে কোন কোন দিক দিয়ে এর বিচার করা আবশ্যক, তা বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন। আল্লামা বদরুদ্দিন আইনি (রহ.) লিখেছেন, ‘কুফু’ ইসলামী বিশেষজ্ঞদের কাছে সর্বসম্মত ও গৃহীত। তবে সেটি প্রধানত গণ্য হবে দ্বিন পালনের ব্যাপারে। কাজেই মুসলিম মেয়েকে কাফিরের কাছে বিয়ে দেওয়া যেতে পারে না। এবং ব্যভিচারী পুরুষ ঈমানদার মেয়ের জন্য এবং ব্যভিচারী নারী ঈমানদার পুরুষের জন্য কুফু নয়।  কোরআনের এক আয়াতে বলা হয়েছে, ‘তবে যে ব্যক্তি মুমিন, সে কি পাপাচারীর মতো? তারা সমান নয়।’ (সুরা : সাজদা, আয়াত : ১৮)

অর্থাৎ মুমিন ও ফাসিক এক নয়। তাদের মধ্যে কোনো রকমের সমতা ও সাদৃশ্য নেই।

ইমাম শাওকানি (রহ.) লিখেছেন, দ্বিনদারি ও চরিত্রের দিক দিয়ে কুফু আছে কি না—বিয়ের সময়ে তা অবশ্যই লক্ষ করতে হবে।

ইমাম শাফিঈ (রহ) ধন-সম্পত্তির দৃষ্টিতেও ‘কুফু’র গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা এ কথা প্রমাণ করে না যে ধনী ও গরিবের সন্তানের মধ্যে পারস্পরিক বিয়ে হলে দাম্পত্যজীবনে তাদের সুখময় ভালোবাসার সৃষ্টি হতে পারে না। তবে এক তরফের ধন-ঐশ্বর্য ও বিত্ত-সম্পদের প্রাচুর্য অনেক সময় দাম্পত্যজীবনে তিক্ততারও সৃষ্টি করতে পারে—তা অস্বীকার করা যায় না।

ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম শাফিঈ (রহ.) একটি হাদিসের ভিত্তিতে বংশীয় ‘কুফু’র গুরুত্ব স্বীকার করেছেন।

ইমাম খাত্তাবি (রহ.) লিখেছেন, বহুসংখ্যক মনীষীর মতে, চারটি কুফুর বিচার গণ্য হবে : দ্বিনদারি, স্বাধীনতা (আজাদি), বংশ ও শিল্প-জীবিকা। তাঁদের অনেকে আবার দোষত্রুটিমুক্ত ও আর্থিক সচ্ছলতার দিক দিয়েও কুফুর বিচার গণ্য করেছেন। ফলে কুফু বিচারের জন্য মোট দাঁড়াল ছয়টি গুণ।

হানাফি মাজহাবে ‘কুফু’র বিচারে বংশমর্যাদা ও আর্থিক অবস্থাও বিশেষভাবে গণ্য। এর কারণ এই যে বংশমর্যাদার দিক দিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পার্থক্য হলে যদিও একজন অন্যকে ন্যায়সংগতভাবে ঘৃণা করতে পারে না, কিন্তু একজন অন্যজনকে অন্তর দিয়ে গ্রহণ করতে অসমর্থ হতে পারে—তা অস্বীকার করা যায় না। অনুরূপভাবে একজন যদি হয় ধনীর দুলাল আর একজন গরিবের সন্তান, তাহলে যদিও সেখানে ঘৃণার কোনো কারণ থাকে না, কিন্তু একজন যে অন্যজনের কাছে যথেষ্ট আদরণীয় নাও হতে পারে। এসব বাস্তবতা সামনে রেখে দ্বিনদারি ও নৈতিক চরিত্রের পাশাপাশি বংশমর্যাদা, জীবিকার উপায় ও আর্থিক অবস্থার বিচার হওয়াও অন্যায় কিছু নয়।

টেরোট কার্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানা কি জায়েজ, ইসলাম কী বলে?

মুফতি ওমর বিন নাছির
টেরোট কার্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানা কি জায়েজ, ইসলাম কী বলে?
সংগৃহীত ছবি

মানুষ স্বভাবতই নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে জানতে আগ্রহী। আগামী দিনে কী ঘটবে, জীবনে সুখ-দুঃখ, সফলতা-ব্যর্থতা, বিয়ে, সন্তান, অর্থ-সম্পদ কিংবা মৃত্যু—এসব বিষয় জানার কৌতূহল মানুষের চিরন্তন প্রবৃত্তি। এই কৌতূহলকে পুঁজি করেই যুগে যুগে জ্যোতিষী, গণক, ভাগ্যবিচারক ও বিভিন্ন অলৌকিক দাবিদার মানুষের ঈমান ও বিশ্বাস নিয়ে খেলেছে। আধুনিক সময়ে এই ধারারই একটি মাধ্যম হলো টেরোট কার্ড। অনেকে দাবি করে, এই বিশেষ ধরনের কার্ড দেখে মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নির্ভুল তথ্য বলা যায়। কিন্তু একজন মুসলিমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—টেরোট কার্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানার দাবি ইসলামের দৃষ্টিতে কি বৈধ? এটি কি শুধু হারাম, নাকি শিরক ও কুফরির অন্তর্ভুক্ত? বর্তমানে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে এর উত্তর জানা অত্যন্ত জরুরী।

আল্লাহই একমাত্র অদৃশ্য সব বিষয় জানেন 

ইসলামের মৌলিক আকিদা হলো—গায়েব তথা অদৃশ্য জগতের পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার। তিনি যাকে যতটুকু ইচ্ছা ওহির মাধ্যমে জানান, সে শুধু ততটুকুই জানতে পারে। এর বাইরে কোনো মানুষ, ফেরেশতা, জিন, গণক কিংবা কোনো বস্তু নিজস্ব ক্ষমতায় ভবিষ্যৎ জানে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘অদৃশ্য জগতের চাবিকাঠি তাঁর কাছেই রয়েছে। তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৫৯)
অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাঁর প্রিয় নবী (সা.) ঘোষণা করতে নির্দেশ দিয়ে বলেন, ‘বলুন, আমি তোমাদের বলি না যে, আমার কাছে আল্লাহর ভাণ্ডার রয়েছে এবং আমি গায়েব জানি না।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৫০)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, মহানবী (সা.)ও নিজ থেকে গায়েব জানতেন না; আল্লাহ ওহির মাধ্যমে যতটুকু জানিয়েছেন, শুধুমাত্র ততটুকুই জানতেন।

টেরোট কার্ডে বিশ্বাস কেন হারাম?
টেরোট কার্ডের মূল ভিত্তিই হলো ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ধারণা দেওয়া। অথচ ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিত জ্ঞান শুধুমাত্র আল্লাহ তাআলারই রয়েছে। তাই কেউ যদি বিশ্বাস করে যে টেরোট কার্ড বা কার্ড পাঠকারী ব্যক্তি প্রকৃত অর্থে ভবিষ্যৎ জানে, তাহলে সে আল্লাহর একচেটিয়া গুণে অন্যকে অংশীদার বানাচ্ছে। এটা শিরক এবং অত্যন্ত ভয়াবহ আকিদাগত বিচ্যুতি। কেননা টেরোট কার্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানার দাবি মিথ্যা। এতে বিশ্বাস করা হারাম। এমনকি কৌতূহলবশত এসব চর্চায় অংশ নেওয়াও মারাত্মক গুনাহ এবং ঈমানের জন্য বিপজ্জনক।

হাদিসে কঠোর নিষেধাজ্ঞা
রাসুলুল্লাহ (সা.) গণক ও ভাগ্যবিচারকদের কাছে যাওয়া থেকে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে তার কথাকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, সে যেন মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর অবতীর্ণ বিধানের সঙ্গে কুফরি করল।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস: ১৩৫, সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৬৩৯)

আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো গণকের কাছে গিয়ে কোনো বিষয় জিজ্ঞাসা করবে, তার চল্লিশ রাতের সালাত কবুল করা হবে না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২২৩০)
এই হাদিসগুলো থেকে বোঝা যায়, শুধু বিশ্বাস করাই নয়; নিছক কৌতূহলবশত এসব গণক বা ভবিষ্যৎবক্তার কাছে যাওয়াও মারাত্মক অপরাধ।

একজন মুসলিমের করণীয়
১. একমাত্র আল্লাহর ওপর ভরসা করা।
২. ভবিষ্যৎ জানার চেষ্টা না করে আল্লাহর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা।
৩. কোরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী দোয়া, ইস্তিখারা ও তাওয়াক্কুলের মাধ্যমে জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা।
৪. টেরোট কার্ড, রাশিফল, জ্যোতিষ, হাত দেখা, সংখ্যা বা নক্ষত্রের মাধ্যমে ভাগ্য গণনা—এসব থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।
৫. নিজের পরিবার ও সন্তানদেরও এসব ভ্রান্ত বিশ্বাস থেকে রক্ষা করা।

অতএব, টেরোট কার্ডের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ জানা যায়—এমন বিশ্বাস করা কুফরি, এবং এটা ইসলামে সুস্পষ্ট হারাম । তাই কৌতূহলবশতও এসব চর্চায় অংশ নেওয়া জায়েজ নেই। কেননা এটা ঈমানের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। একজন মুমিনের প্রকৃত পথ হলো—আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল করা, তাঁর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকা এবং কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে শিরক, কুফরি, কুসংস্কার ও ভ্রান্ত আকিদা থেকে হেফাজত করুন এবং বিশুদ্ধ ঈমানের ওপর অটল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।

স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মনোমালিন্য এড়াতে নববী নির্দেশনা

মুফতি ওমর বিন নাছির
স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক মনোমালিন্য এড়াতে নববী নির্দেশনা
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে এমন কোনো সম্পর্ক নেই যেখানে কখনো মতভেদ, অভিমান বা ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয় না। বন্ধুত্ব, আত্মীয়তা কিংবা দাম্পত্য—প্রত্যেক সম্পর্কেই কখনো না কখনো পরীক্ষার মুহূর্ত আসে। তবে একটি সম্পর্কের সফলতা নির্ভর করে মতভেদ না হওয়ার ওপর নয়; বরং মতভেদকে কীভাবে প্রজ্ঞা, ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা ও ভালোবাসার মাধ্যমে সমাধান করা হয়, তার ওপর।

ইসলাম দাম্পত্য জীবনকে শুধু একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে নয়, বরং পারস্পরিক ভালোবাসা, দয়া, সম্মান ও দায়িত্বের এক পবিত্র বন্ধন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

 وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِّتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً 

অর্থ : ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে একটি হলো, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই তোমাদের সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে সৃষ্টি করেছেন ভালোবাসা ও দয়া।’ ‍(সুরা : রূম, আয়াত : ২১)

এই আয়াত আমাদের শেখায়, দাম্পত্য জীবনের ভিত্তি হলো সাকিনা (প্রশান্তি), মাওয়াদ্দাহ (ভালোবাসা) এবং রহমাহ (দয়া)। তাই টানাপোড়েন দেখা দিলেও সম্পর্ক রক্ষা করার মানসিকতাই একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য।

অনেকেই মনে করেন, পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ, মহানবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর সংসারে কখনো কোনো মতভেদ বা অভিমান ছিল না। বাস্তবতা কিন্তু ভিন্ন। ইসলাম মানুষকে কল্পনার জগৎ নয়, বাস্তব জীবনের শিক্ষা দেয়। নবীজির সম্মানিত স্ত্রীগণেরও স্বাভাবিক আবেগ, অনুভূতি, অভিমান ও চাওয়া-পাওয়া ছিল। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) অসীম ধৈর্য, প্রজ্ঞা ও ন্যায়পরায়ণতার মাধ্যমে সেসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। এ কারণেই তাঁর সংসার প্রতিটি মুসলিম পরিবারের জন্য আদর্শ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপন করতেন। এমনও মাস কেটে যেত যখন তাঁর ঘরে রান্নার জন্য চুলা জ্বলত না। তিনি ও তাঁর পরিবার খেজুর ও পানি খেয়ে দিন অতিবাহিত করতেন। অথচ আল্লাহ চাইলে পৃথিবীর সমস্ত সম্পদ তাঁর সামনে এনে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি দুনিয়ার চাকচিক্যের পরিবর্তে আখেরাতের স্থায়ী সফলতাকেই বেছে নিয়েছিলেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪৫৯)

দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ দেখা দিলে কীভাবে সংযমী আচরণ করতে হয়, তার একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় হাফসা (রা.)-এর একটি ঘটনায়। একবার কথোপকথনের সময় ওমর (রা.) তাঁর কন্যা হাফসা (রা.)-এর একটি আবেগপূর্ণ কথায় অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে শান্ত করেন এবং পরিস্থিতিকে উত্তপ্ত হতে দেননি। এ ঘটনা আমাদের শেখায়, রাগের মুহূর্তে উচ্চারিত প্রতিটি কথাকে বড় করে দেখা কিংবা সম্পর্ক নষ্ট করার কারণ বানানো উচিত নয়। বরং সংযম ও সহনশীলতাই প্রকৃত প্রজ্ঞার পরিচয়। (সিরাতে হালাবিয়্যা, ৩/২১৭)

এক সময় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানিত স্ত্রীরা সংসারের ভরণপোষণে কিছুটা স্বাচ্ছন্দ্য কামনা করেছিলেন। বিষয়টি জানার পর আবু বকর (রা.) ও ওমর (রা.) নিজেদের কন্যাদের শাসন করতে চাইলেও রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁদের সে সুযোগ দেননি। কারণ, স্বামীর কাছে প্রয়োজন বা সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু চাওয়া কোনো অপরাধ বা অবাধ্যতা নয়। তিনি বিষয়টিকে পারিবারিক বাস্তবতার অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। (হায়াতুস সাহাবা, ২/৬৮৪)

তবে যখন দুনিয়াবি চাহিদার বিষয়টি বারবার সামনে আসে, তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) মানসিকভাবে কষ্ট পান। সেই কষ্টে তিনি প্রায় এক মাস স্ত্রীদের থেকে আলাদা অবস্থান করেন। এ সময় সমাজে গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে, তিনি নাকি তাঁদের তালাক দিয়েছেন। পরে ওমর (রা.) এসে সত্যতা যাচাই করেন এবং জানতে পারেন, তালাকের ঘটনা ঘটেনি। তারপর তিনি পরিবেশকে স্বাভাবিক করতে হাস্যরসের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মন প্রফুল্ল করার চেষ্টা করেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫১৯১, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৪৭৯)

এরপর আল্লাহ তাআলা একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা অবতীর্ণ করেন। তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নির্দেশ দেন, তাঁর স্ত্রীদের সামনে দুটি পথ উপস্থাপন করতে—একদিকে দুনিয়ার আরাম-আয়েশ, অন্যদিকে আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও আখেরাতের সফলতা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ إِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ الْحَيَاةَ الدُّنْيَا وَزِينَتَهَا فَتَعَالَيْنَ أُمَتِّعْكُنَّ وَأُسَرِّحْكُنَّ سَرَاحًا جَمِيلًا ۝ وَإِن كُنتُنَّ تُرِدْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَالدَّارَ الْآخِرَةَ فَإِنَّ اللَّهَ أَعَدَّ لِلْمُحْسِنَاتِ مِنكُنَّ أَجْرًا عَظِيمًا

অর্থ : ‘হে নবী! আপনি আপনার স্ত্রীদের বলুন, যদি তোমরা পার্থিব জীবন ও তার সৌন্দর্য কামনা কর, তবে এসো, আমি তোমাদের কিছু ভোগ-সামগ্রী দিয়ে সুন্দরভাবে বিদায় করে দেব। আর যদি তোমরা আল্লাহ, তাঁর রাসুল ও আখেরাত কামনা কর, তবে জেনে রাখো, আল্লাহ তোমাদের মধ্যে সৎকর্মশীলদের জন্য মহাপুরস্কার প্রস্তুত করে রেখেছেন। (সুরা : আহজাব, আয়াত : ২৮–২৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সকল স্ত্রী আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং আখেরাতকেই বেছে নিয়েছিলেন। এ সিদ্ধান্ত তাঁদের ঈমান, ত্যাগ ও আল্লাহভীতির অনন্য দৃষ্টান্ত। এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বামীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,

خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ، وَأَنَا خَيْرُكُمْ لِأَهْلِي

অর্থ : ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করে। আর আমি আমার পরিবারের সঙ্গে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম আচরণ করি।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)
আবার আল্লাহ তাআলা স্বামীদের নির্দেশ দিয়ে বলেন,

وَعَاشِرُوهُنَّ بِالْمَعْرُوفِ

অর্থ : ‘তোমরা তাদের সঙ্গে উত্তম ও সদাচরণে জীবনযাপন কর।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৯)
এসব শিক্ষা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, একটি সুখী সংসারের জন্য ধৈর্য, ক্ষমাশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সংযম, ন্যায়বিচার এবং আন্তরিক যোগাযোগ কতটা অপরিহার্য। রাগের মুহূর্তে কঠোর সিদ্ধান্ত না নেওয়া, অভিমানকে দীর্ঘস্থায়ী না করা এবং একে অপরের অনুভূতির মূল্য দেওয়াই নববি আদর্শ।

নবী করিম (সা.)-এর দাম্পত্য জীবন ছিল বাস্তব জীবনের একটি পরিপূর্ণ আদর্শ। সেখানে মতভেদ ছিল, অভিমান ছিল, পারিবারিক চাহিদা ছিল; কিন্তু ছিল না অবিচার, প্রতিশোধ, অপমান কিংবা সম্পর্ক ভেঙে দেওয়ার তাড়াহুড়ো। বরং ছিল ধৈর্য, ন্যায়, প্রজ্ঞা, ভালোবাসা, ক্ষমা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে সর্বাগ্রে রাখার মানসিকতা।

আজ আমাদের অনেক সংসার ভেঙে যায় সামান্য ভুল বোঝাবুঝি, অহংকার, রাগ বা যোগাযোগের অভাবে। অথচ যদি আমরা মহানবী (সা.) শিক্ষা অনুসরণ করি—রাগের সময় সংযম অবলম্বন করি, একে অপরকে ক্ষমা করি, পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখি এবং আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে সংসার পরিচালনা করি—তবে ইনশাআল্লাহ আমাদের পরিবার হবে শান্তিময়, ভালোবাসায় পরিপূর্ণ এবং আখেরাতের সফলতার একটি মাধ্যম। সত্যিই, নববি আদর্শ অনুসরণই একটি সুখী, স্থিতিশীল ও বরকতময় দাম্পত্য জীবনের সর্বোত্তম পথ।

হাদিসের বাণী

কেয়ামতের দিন আল্লাহ যেভাবে গুনাহগার বান্দার প্রতি রহম করবেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কেয়ামতের দিন আল্লাহ যেভাবে গুনাহগার বান্দার প্রতি রহম করবেন
সংগৃহীত ছবি

বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু জর (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয় আমি সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী ব্যক্তিকে ভালোভাবে জানি। আর যে ব্যক্তি সর্বশেষ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে, তাকেও জানি। কিয়ামতের দিন এক ব্যক্তিকে (আল্লাহর নিকট উপস্থিত করে) বলা হবে, এর সগিরা গুনাহগুলো উপস্থিত করো এবং কবিরা গুনাহগুলো গোপন করে রাখো। তারপর তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তুমি অমুক অমুক দিনে এই এই গুনাহ করেছ। তখন সে ব্যক্তি সবগুলো গোনাহের কথা স্বীকার করবে। একটিও অস্বীকার করবে না। তখন সে তার কবীরা গুনাহসমূহ সম্পর্কে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়বে। তার এই অবস্থা দেখে ঘোষণা দেয়া হবে যে, তার প্রতিটি মন্দ কাজের বিনিময়ে একটি করে নেকী লিপিবদ্ধ করো। তখন বান্দা খুশিতে বলে উঠবে যে, নিশ্চয় এখনো আমার অনেক গুনাহ বাকী আছে, যা আমি দেখতে পাচ্ছি না। এই হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবি আবু জর (রা.) বলেন, তখন আমি দেখলাম, রাসুলুল্লাহ (সা.) মুচকি হাসছেন; এমনকি তাঁর সাদা দাতগুলো দেখা যাচ্ছিল। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ২১৪৩০, সিলসিলায়ে সহিহাহ, হাদিস : ৩০৫২)

শিক্ষা ও বিধান 
১. আল্লাহর রহমত অত্যন্ত ব্যাপক। তাই আল্লাহ তাআলা চাইলে বান্দার গুনাহ ক্ষমা করে সেগুলোর পরিবর্তে নেকি দান করতে পারেন। তাই কখনোই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া উচিত নয়।
২. সগিরা ও কবিরা গুনাহের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ইসলামে গুনাহ দুই প্রকার—সগিরা (ছোট) ও কবিরা (বড়)। উভয় থেকেই বেঁচে থাকার চেষ্টা করা প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য।
৩. কিয়ামতের দিন প্রত্যেক মানুষকে নিজের আমলের হিসাব দিতে হবে। দুনিয়ার কোনো কাজই আল্লাহর কাছে গোপন নয়। সবকিছুর হিসাব নেওয়া হবে।
৪. সত্য গোপন করার সুযোগ থাকবে না। আল্লাহর সামনে মানুষ নিজের গুনাহ স্বীকার করতে বাধ্য হবে। সেখানে মিথ্যা বলা বা অস্বীকার করার কোনো উপায় থাকবে না।
৫. আল্লাহ বান্দার সম্মান রক্ষা করেন। এই হাদিসে কবিরা গুনাহ গোপন রাখার কথা এসেছে, যা আল্লাহর অসীম দয়া ও বান্দার প্রতি তাঁর পর্দা রাখার গুণের পরিচয় বহন করে।
৬. তাওবা ও ঈমানের মূল্য অপরিসীম। যিনি শেষ পর্যন্ত জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবেন, তিনি ঈমানদার ছিলেন। এতে বোঝা যায়, ঈমান ও আন্তরিক তাওবার গুরুত্ব অনেক।
৭. মুমিনের মধ্যে আশা ও ভয়—দুটিই থাকা উচিত। গুনাহের জন্য ভয় থাকবে, আবার আল্লাহর ক্ষমার প্রতি দৃঢ় আশাও থাকবে। এটাই ভারসাম্যপূর্ণ ঈমানের পরিচয়।

সারকথা, এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, আল্লাহ তাআলার রহমত সীমাহীন। তাই গুনাহ হয়ে গেলে দ্রুত আন্তরিক তাওবা করতে হবে, নেক আমলে অটল থাকতে হবে এবং কখনোই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া যাবে না। একই সঙ্গে গুনাহকে হালকা মনে না করে সর্বদা হিসাবের দিনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের তাওফিক দান করুক। আমিন।