• ই-পেপার

কোরআন থেকে শিক্ষা

  • পর্ব-১১৭০

মনীষীর কথা

মনীষীর কথা

তোমরা আল্লাহর ভালোবাসা ও দাসত্বে অবিচল থাকো। ডানে-বাঁয়ে ভ্রুক্ষেপ কোরো না।

ইবনে তাইমিয়া (রহ.)

প্রশ্ন-উত্তর

সমাধান : ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার বাংলাদেশ, বসুন্ধরা, ঢাকা

প্রশ্ন-উত্তর

বাজারের প্রচলিত মেহেদি লাগানোর বিধান

প্রশ্ন : বর্তমান বাজারে যে ধরনের মেহেদি পাওয়া যায়, তা হাতে লাগানোর কিছুদিন পর দেখা যায় যে মেহেদির রঙের সঙ্গে হাতে একটি পাতলা পর্দা বা আবরণের মতো স্তর তৈরি হয়, যা পরে উঠে আসে। আমার জানার বিষয় হলো, এ ধরনের মেহেদি ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত কিনা? যদি মেহেদি হাতে কোনো আবরণ বা পর্দা সৃষ্টি করে, তাহলে তা থাকা অবস্থায় অজু ও ফরজ গোসল শুদ্ধ হবে কি? এ অবস্থায় আদায়কৃত নামাজ ও অন্যান্য ইবাদতের হুকুম কী? কোরআন-সুন্নাহ ও ফিকহের আলোকে বিষয়টি জানালে উপকৃত হবো।

জুবায়ের আহমাদ, কেরানীগঞ্জ

উত্তর : বাজারে প্রচলিত কিছু টিউব মেহেদি ব্যবহারের কিছুদিন পর রঙের সঙ্গে পাতলা যে আবরণ উঠতে দেখা যায় তা মূলত শরীরের চামড়ার অংশ। মেহেদিতে ব্যবহৃত বিভিন্ন কেমিক্যালের কারণে চামড়ার পর্দা উঠে যায়। এটা মেহেদির কোনো আবরণ নয়, যা শরীরে পানি পৌঁছাতে বাধা তৈরি করে। অতএব, এ ধরনের মেহেদির রং অজু-গোসলের জন্য প্রতিবন্ধক নয়। (গুনিয়াতুল মুতামাল্লা : ৪৯, আদ্দুররুল মুখতার : ১/২৮৮, রাদ্দুল মুহতার : ১/২৮৮, আফ কে মাসায়েল আওর উনকা হল : ২/৪৩)

আইসিটি উন্নয়নে মুসলিম বিশ্বে এগিয়ে সৌদি আরব

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আইসিটি উন্নয়নে মুসলিম বিশ্বে এগিয়ে সৌদি আরব

ডিজিটাল রূপান্তর ও তথ্য-প্রযুক্তি উন্নয়নে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে সৌদি আরব। আইটিইউ প্রকাশিত ২০২৬ সালের আইসিটি উন্নয়নসূচক বিশ্বের ১৫৯টি দেশের মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করেছে দেশটি।

আইটিইউর এই সূচকে বিভিন্ন দেশের ডিজিটাল অগ্রগতি, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) ব্যবহার এবং সেবার মান মূল্যায়ন করা হয়। মূল্যায়নের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক সংযোগ ও কার্যকর সংযোগএ দুটি প্রধান সূচককে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে সৌদি যোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি কমিশন (সিআইটিসি) জানিয়েছে, এই অসাধারণ অর্জন দেশের প্রযুক্তি খাতের ধারাবাহিক আধুনিকায়ন, দূরদর্শী নেতৃত্বের নীতিগত সহায়তা এবং শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামোরই বাস্তব প্রতিফলন। একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক প্রযুক্তি খাতে সৌদি আরবের নেতৃত্বের অবস্থানকে আরো সুসংহত করেছে।

সিআইটিসির মতে, উন্নত নিয়ন্ত্রক কাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো ও ডিজিটাল অর্থনীতিকে কেন্দ্র করে নেওয়া কার্যকর উদ্যোগগুলো সৌদি আরবকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো প্রতিযোগিতামূলক করে তুলেছে।

সংস্থাটির প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ সৌদি আরবের যোগাযোগ ও প্রযুক্তি বাজারের আকার বেড়ে ১৯৯ বিলিয়ন সৌদি রিয়ালে পৌঁছেছে। গত পাঁচ বছরে এই খাতের চক্রবৃদ্ধি বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ শতাংশ, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা (মেনা) অঞ্চলের সবচেয়ে বড় এবং দ্রুত বর্ধনশীল প্রযুক্তি বাজার হিসেবে নিজেদের অবস্থান আরো শক্তিশালী করেছে দেশটি।

ডিজিটাল সংযোগের ক্ষেত্রেও ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে সৌদি আরব। সিআইটিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে ইন্টারনেট ব্যবহারের হার ১০০ শতাংশ, একই সঙ্গে মোবাইল ফোনের মালিকানার হারও ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। এ ছাড়া ফিক্সড ব্রডব্যান্ডের গড় গতি ১৫১ এমবিপিএস এবং মোবাইল ব্রডব্যান্ডের গড় গতি ২১৬ এমবিপিএস, যা বিশ্বের অন্যতম উন্নত ডিজিটাল অবকাঠামোর পরিচয় বহন করে। সৌদি আরবের এই অর্জন দীর্ঘমেয়াদি ডিজিটাল

রূপান্তর কর্মসূচি ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার কৌশলের সফল বাস্তবায়নের প্রতিফলন।

মেঠো বাংলার সাধককবি আব্দুল হালিম

মো. আলী এরশাদ হোসেন আজাদ
মেঠো বাংলার সাধককবি আব্দুল হালিম

ইসলাম ও মুসলমানের চিরায়ত বাংলায় আশ্চর্যজনকভাবে বিকশিত হয়েছে মরমিধারা। ফলে বাঙালি চেতনায় জেগে ওঠে মারফতি মুর্শিদি অনুরাগ।

বাঙালির লোকসংস্কৃতি ধারার আধ্যাত্মিক নিবেদন মারফতি মুর্শিদি সুফিবাদে পরিপুষ্ট; মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু অর্থাৎ নিজেকে চেনার মাধ্যমে স্রষ্টাকে চেনা যায়। আরবি আরাফা থেকে মারফত অর্থ সৃষ্টিকর্তাকে চেনার রহস্যজ্ঞান। মারফতিতে স্রষ্টার প্রশংসা, তাঁকে পাওয়ার আকুলতা এবং পার্থিব জীবনের অনিত্যতা প্রকাশ পায়।

মুর্শিদি হলো আধ্যাত্মিক ভাবধারাসমৃদ্ধ বন্দনা। মুর্শিদ অর্থ আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক। মুর্শিদি নিবেদনে গুরুভক্তি এবং স্রষ্টার প্রতি গভীর ভালোবাসা লক্ষণীয়।

মুর্শিদি ধারা মানুষের মনকে পরিশুদ্ধ করে এবং মানবপ্রেমের শিক্ষা দেয়। মুর্শিদি ভবনায় সুফি তরিকায় আধ্যাত্মিক গুরু বা মুর্শিদকে পরম প্রভুর সান্নিধ্য লাভের মাধ্যম মনে করা হয়। এতে প্রায়ই গুরুর কৃপা প্রার্থনা ও তাঁর প্রতি আত্মসমর্পণের বিষয়ে : নৌকা, নদী, মাঝি এবং মানবদেহকে রূপক হিসেবে ব্যবহার করে সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক তুলে ধরা হয়। আমাদের বনজঙ্গল, নদীরপার, ভাঙাঘাট, দরগা-মাজার, পোড়োবাড়ি, গাছতলায় আর হাটুরে, মাঠুরে, কোদালি, দোকানি ও মাঝির বৈঠায় মারফতি মুর্শিদি ভাবনা ধ্বনিত হয় একতারার সুরে সুরে।

এমনই মারফতি মুর্শিদি ধারার প্রতিনিধি মেঠো বাংলার সাধককবি আব্দুল হালিম জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৯ সালে মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার বড়দোয়ালি গ্রামে। সাধনার সূচনা মাত্র সাত বছর বয়সে। তিনি ১৯৫৭ সাল থেকে বেতারে সরাসরি জড়িত। তিনিই লোকবাদ্যযন্ত্র সারিন্দাকে জনপ্রিয় হিসেবে পরিচিত করেন।

অজ্ঞাত অধ্যাত্ম ক্ষমতায় ওস্তাদ ছাড়াই তিনি সুর-সাধনায় পরিপক্বতা অর্জন করেন। তাৎক্ষণিকভাবেই তিনি সংগীত রচনা করতেন। আব্দুল হালিমের সৃষ্টিসম্ভার বেশ সম্মৃদ্ধ, সংখ্যায় তা পাঁচ-ছয় হাজারের মতো। পবিত্র কোরআনের সুরা বিশ্লেষণ করেও তিনি নিবেদন করেছেন আধ্যাত্মভাবনা। দেহতত্ত্ব, দেশাত্মবোধক, শরিয়ত, মারেফত, হকিকত, তরিকত ভবনাভরা তাঁর নিবেদন। মহান আল্লাহ, মুহাম্মদ (সা.), বড় পীর আবদুল কাদের জিলানি, খাজা মঈনুদ্দিন চিশতি (রহ.)-কে নিয়েও রয়েছে তাঁর রচনা। তাঁরই অনন্য মূর্ছনা :

সে যে গভীর জলে যায়গো চলে

কিনার দিয়ে আর চলে না।

ঝিনুকে মুক্তো হলে চুপ হয়ে যায়

মুখ খোলে না।

সাপের মাথায় হইলে মণি

থাকে না তার উলটা ফণি।

সেই মণিকে রক্ষা করা তার সাধনা...

...হরিণের নাভিমূলে মেশক্ হলে হালিম কয় সে ধরা দেয় না...

...প্রেমে আল্লাহ প্রাপ্ত হলে মানুষ কারো সাথে মিশতে চায় না...।

সাধক আব্দুল হালিমের উল্লেখযোগ্য সৃষ্টিকর্ম :

এশকেতে এলাহি পাবি/প্রেমরসে থাক ডুবি...

অমূল্য ধন বিক্রি করে/বিনামূল্যে পাবিরে/মারেফতের দেশে যদি যাবি।

জ্ঞানের আয়না ভক্তির পায়রা/মুর্শিদ রূপে ছুরাত দেখো/স্বরূপে রূপ দেখতে চাইলে/ধ্যানের ঘর কর লক্ষ্য।

উজান আর ভাটির লহর/দেখিলাম কতই মকর/পাইলাম না তাহার খবর/তবু কেন তাহারে খুঁজি।

ধ্যান করিলে জ্ঞান বাড়িবে ঘুচিবে মনের অন্ধকার/স্বরূপে রূপের খেলা দেখবি যদি মন আমার।

মানুষ অনন্ত সম্ভাবনার অপূর্ব সৃষ্টি। মানুষের মধ্যেই ঘরবসতি অধ্যাত্মবোধ ও মানবপ্রেম এবং দুর্ভেদ্য অদেখা সত্ত্বা। দূর অজানা সবকিছু আঁচ করতে পারে এ সত্ত্বা। কথিত আছেসাধক হালিমের তখন গগনচুম্বী খ্যাতি। ঘরে তাঁর অসুস্থ পিতা। একদিন ঘর থেকে বের হওয়ার আগে গেলেন পিতা আব্দুল জব্বার মোড়লের কাছে। তিনি বললেন আমার শরীর ভালো না। আজ না গেলে হয় না।

কবি হালিম বললেন, আব্বা না গেলে আয়োজকের বাড়িতে হামলা হয় যদি... তখন তাঁর পিতা তাঁকে বিদায় জানালেন। এটাই পিতা-পুত্রের শেষ কথা। গান পরিবেশন করছেন তিনি। হঠাৎ সারিন্দার তার ছিঁড়ে গেল। তাঁর আর বুঝতে বাকি রইল না তাঁর আব্বা আর নেই। বাড়ি ফিরলেন তিনি। কাছেই নজরে এলো নতুন কবর। তখনই তাঁর উচ্চারণ

এই দেখিলাম সোনার ছবি

আবার যাইয়া দেখি নাই,

তুমি এমন করে ছেড়ে যাইবারে দয়াল

আগে জানি নাই...!

সাধককবি আব্দুল হালিমের অবদানের জন্য তাঁকে ২০০১ সালে বাংলা একাডেমি সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে। পেয়েছেন কবি জসীমউদ্দীন গবেষক স্বর্ণপদক। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০০৭ সালে মেঠো বাংলার সাধককবি আব্দুল হালিম নশ্বর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পাড়ি জমান না ফেরার দেশে।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান

ইসলামিক স্টাডিজ কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ

কাপাসিয়া, গাজীপুর