‘আমরা রাস্তা যত বড় করব, তত গাড়ি নামবে এবং ট্রাফিক বাড়বে। তাই রেলকে আমরা উন্নত করতে চাই। রেলযোগাযোগ উন্নত হলে যাতায়াত খরচ কমবে, ব্যাবসায়িক খরচও কমবে। এ জন্য সরকার সারা দেশে রেলযোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।’ গত ২ মে সিলেটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এমন উদ্যোগের কথা জানিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্য রেলপ্রিয় সাধারণ মানুষকে আশাবাদী করে তুলেছে। কারণ সড়কে প্রতিদিন বাড়ছে যানবাহন, বাড়ছে দুর্ঘটনাও। এতে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। সে তুলনায় রেল বহুগুণে নিরাপদ, সাশ্রয়ী এবং পরিবেশবান্ধব। রেলযোগাযোগ উন্নত করা খুবই জরুরি। একই সঙ্গে রেলের যাত্রীসেবাও উন্নত করা দরকার। রেলসেবা উন্নত হলে ইনল্যান্ড ট্যুরিজম বা দেশের অভ্যন্তরীণ পর্যটন সম্প্রসারিত হবে। অন্যান্য পরিবহনের মধ্যে রেলপথ নিরাপদ ও সাশ্রয়ী। দেশের সাধারণ মানুষ দূরযাত্রায় সর্বপ্রথম ট্রেনের কথা চিন্তা করে। বিশেষ করে পরিবার-পরিজন নিয়ে দূরযাত্রায় ট্রেনকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। বর্তমানে উল্লেখযোগ্য প্রায় সব জেলা থেকে আন্ত নগর ট্রেন সার্ভিস রয়েছে ঢাকার সঙ্গে। এসব আন্ত নগর ট্রেনের টিকিট পেতে হিমশিম খেতে হয়। এতে সহজেই বোঝা যায় আন্ত নগর ট্রেনের প্রতি যাত্রীসাধারণের আগ্রহ। কয়েক বছর আগে রেলযোগাযোগে সংযুক্ত হয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার। ভ্রমণপিয়াসি নাগরিক সুদূর ঢাকা থেকে সাগর দর্শনে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য ট্রেনযাত্রাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আসছে। রেলওয়ের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে গড়ে প্রতিদিন প্রায় এক লাখ ৫০ হাজার যাত্রী নিয়মিত যাতায়াত করে। এর বার্ষিক হিসাব করলে সংখ্যাটি দাঁড়ায় প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি যাত্রী।
রেল পরিবহন এখন সারা দেশে বিস্তৃত। বাংলাদেশ রেলওয়ে দুটি ডিভিশনে বিভক্ত—রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল। বাংলাদেশ রেলযোগাযোগ ব্যবস্থার দৈর্ঘ্য তিন হাজার ৬০০ কিলোমিটার। এর মধ্যে মিটার গেজ দুই হাজার ২৫ কিলোমিটার, ব্রড গেজ এক হাজার ৫৭৫ কিলোমিটার। এই তিন হাজার ৬০০ কিলোমিটারের মধ্যে আবার ডুয়াল গেজের পরিমাণ হচ্ছে এক হাজার ৬০০ কিলোমিটার। সারা দেশে রেলস্টেশনের সংখ্যা হচ্ছে ৪৯৮। গড়ে প্রতিবছর প্রায় পাঁচ-ছয় কোটি লোক ট্রেনে যাতায়াত করে। সারা দেশে এর মালিকানায় প্রায় ৬০ হাজার একর জমি আছে। রেলযোগাযোগ উন্নত করার পাশাপাশি যাত্রীসেবাও উন্নত করা যেমন দরকার, ঠিক তেমনি রেলওয়ের যে বিপুল পরিমাণ সম্পদ অবৈধ দখলে চলে গেছে, তা-ও উদ্ধার করা জরুরি।
বাংলাদেশে এখন মূলত দুই ধরনের ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। ইএমডি লোকোমোটিভ—পুরো নাম ইলেকট্রোমোটিভ ডিজেল। এই ধরনের ডিজেল ইঞ্জিন টু স্ট্রোকের হয়। দি আমেরিকান লোকোমোটিভ কম্পানির তৈরি আলকো লোকোমোটিভস ধরনের ইঞ্জিন ফোর স্ট্রোক। এই দুটি ইঞ্জিন মূলত মার্কিন কম্পানির। উন্নত দেশগুলোতে ডিজেল ইঞ্জিন অনেকটা বাতিলের খাতায় থাকলেও বাংলাদেশে এখনো বেশ চলছে। ব্যয়বহুল ডিজেল ইঞ্জিনের পরিবর্তে ইলেকট্রিক ইঞ্জিনের বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, এই মুহূর্তে জানা নেই।
ডিজেল ইঞ্জিন ব্যয়বহুল বললাম এই কারণে যে টু স্ট্রোকের ইএমডি লোকোমোটিভের ক্ষমতা চার হাজার ৫০০ জিএইচপি (গ্রস হর্সপাওয়ার)। এই ইঞ্জিন দাঁড়ানো (রেলওয়ের ভাষায় নিষ্ক্রিয়) অবস্থায় প্রতি ঘণ্টায় ১১ লিটার ডিজেল পোড়ায়। আর ‘এইট নচ’-এর ডিজেল লাগে প্রতি মিনিটে ১০ লিটার। ‘নচ’ হলো ট্রেনের গতি পরিমাপক। ‘এইট নচ’ হলো ট্রেনের জন্য সর্বোচ্চ গতি। বাংলাদেশে এই ইএমডি লোকোমোটিভ ইঞ্জিনটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই ইঞ্জিনের গতি ও ভর যত বেশি, জ্বালানির ব্যবহার তত বেশি হবে। তবে ট্রেনের বগিসংখ্যার ওপর নির্ভর করে ট্রেনের গতি।
একইভাবে দি আমেরিকান লোকোমোটিভ কম্পানির তৈরি আলকো লোকোমোটিভস ধরনের ইঞ্জিন ফোর স্ট্রোক। আর এর ক্ষমতা তিন হাজার ৩০০ জিএইচপি। এই ধরনের ইঞ্জিন কোনো স্থানে চালু অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকলে প্রতি ঘণ্টায় ২২ লিটার ডিজেল পোড়ায়। আর চললে সর্বোচ্চ ‘এইট নচ’ গতিতে প্রতি মিনিটে ৯ লিটার ডিজেল পোড়ায়। বাংলাদেশে এই ইঞ্জিনগুলো প্রায় অনেক জায়গায় চলে বলে জানান রেল কর্মকর্তারা।
চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে (যেমন—ঢাকা বা কমলাপুর আইসিডি) রেলপথে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিটি পণ্যবাহী ওয়াগন বা কনটেইনারের ওজনের ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হয়। সাধারণত একটি ট্রেনে ৩০ থেকে ৪০টি ওয়াগন বা বগি যুক্ত থাকে। ওজনসীমা (অ্যাক্সেল লোড) বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্রড গেজ ও মিটার গেজ লাইনে অ্যাক্সেল লোড বা প্রতিটি বগির সর্বোচ্চ অনুমোদিত ওজনসীমা সাধারণত ২২.৫০ টন।
চট্টগ্রাম ও ঢাকার মধ্যে চলাচলকারী প্রতিটি আন্ত নগর ট্রেনের যাত্রী ধারণক্ষমতা বা আসনসংখ্যা গড়ে ৭০০ থেকে ৯০০ জনের মধ্যে হয়ে থাকে। ট্রেনের বগি (কোচ) বা লোড সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে এই সংখ্যাটি নির্ধারিত হয়। চট্টগ্রাম-ঢাকা চলাচলকারী প্রধান আন্ত নগর ট্রেনগুলোর সাধারণ আসনসংখ্যা হচ্ছে ৮৯০। এর মধ্যে বিরতিহীন সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনটির আসনসংখ্যা ৮৯০ হলেও সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনটির আসনসংখ্যা ৭৪৩। তবে যাত্রী চাহিদা বৃদ্ধি পেলে (যেমন—ঈদের সময়) কোচ বাড়িয়ে ধারণক্ষমতা আরো বাড়ানো হয়। তূর্ণা এক্সপ্রেস, মহানগর প্রভাতি ও গোধূলি এবং মহানগর এক্সপ্রেসসহ ট্রেনগুলোর স্বাভাবিক আসনসংখ্যাও ৭০০ থেকে ৮০০-র মধ্যে হয়ে থাকে।
ঢাকা থেকে পঞ্চগড় রুটে চলাচলকারী প্রধান আন্ত নগর ট্রেন পঞ্চগড় এক্সপ্রেসের মোট আসন প্রায় ৯০০-র মতো, যা একবারের যাত্রায় প্রায় ৮০০ থেকে এক হাজার জন যাত্রী পরিবহন করতে পারে। ট্রেনবিন্যাস : এতে ১২টি আধুনিক কোচ রয়েছে, যার মধ্যে এসি চেয়ার, শোভন চেয়ার, কেবিন এবং খাবার ও নামাজের কোচ অন্তর্ভুক্ত। এই রুটের অন্য ট্রেন দ্রুতযান এক্সপ্রেসও প্রায় একইসংখ্যক যাত্রী বহন করে। এই পরিমাণ যাত্রী পরিবহনে কতসংখ্যক বাস প্রয়োজন, তা সহজেই অনুমান করা যায়। একইভাবে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকা-খুলনা রুটে চলাচলকারী আন্ত নগর ট্রেনগুলো জাহানাবাদ এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস, রূপসী বাংলা এক্সপ্রেস ও নকশিকাঁথা এক্সপ্রেসের মতো ট্রেনে আসনসংখ্যা প্রায় ৮৬০ থেকে ৯০৮ পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই রুটে অন্যান্য ট্রেন : জাহানাবাদ এক্সপ্রেস ও সুন্দরবন এক্সপ্রেস। এই ধরনের একেকটি ট্রেনের যাত্রী পরিবহন করতে কমপক্ষে ৩৫ থেকে ৪০টি বাসের প্রয়োজন হবে। রেলপথ যত বাড়বে, চলাচলের জন্য ট্রেন সার্ভিস যত সম্প্রসারিত হবে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা হ্রাস হওয়ার সম্ভাবনা ততই বাড়বে। রক্ষা পাবে সাধারণ নাগরিকের জীবন ও দেশের সহায়-সম্পদ।
লেখক : সাংবাদিক





গত বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫.৫ শতাংশ। প্রাথমিক হিসাবে অর্জনের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম, ৪.১৪ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.৪৯ শতাংশ। এর আগের বছরে ছিল ৪.২২ শতাংশ। এবারের লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ। আগামী বাজেট বাস্তবায়নের হার ও গুণগত মান সন্তোষজনক না হলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৭.৫ শতাংশ। বাস্তবে এটা হয়তো আরো বেশি হবে। বর্তমানে গড় মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। গত মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.০৬ শতাংশ। সম্প্রতি দেশে কৃষির উৎপাদন বিশেষ করে বোরো ধানের উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার অনমনীয় থাকবে বলে ধারণা করা যায়।