২ হাজার বছরের পুরোনো ইতিহাস বুকে নিয়ে সহ্যাদ্রি পর্বতমালার কোলে দাঁড়িয়ে আছে লোহাগড় বা লোহার দুর্গ। ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনে থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে লোনাভানায় অবস্থিত দুর্গটি ভারতের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।
ইতিহাসবিদদের মতে, সাতবাহন রাজবংশের আমলেই এর প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল। পরে এটি চালুক্য, রাষ্ট্রকূট, যাদব এবং বাহমানি রাজবংশের অধীনেও ছিল। ১৬৪৮ খ্রিস্টাব্দে ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ এই দুর্গটি দখল করেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১ হাজার ৩৩ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত দুর্গটি তার চমৎকার সামরিক স্থাপত্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। এটি বর্তমানে ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের সম্ভাব্য তালিকায় থাকা মারাঠা মিলিটারি ল্যান্ডস্কেপস-এর অন্তর্ভুক্ত। লোহাগড়ে ২ থেকে ৩ ঘণ্টার একটি ট্রেইল আছে, যা এটিকে ট্র্যাকিং প্রিয়দেরও প্রিয় গন্তব্যে পরিণত করেছে।
কিন্তু ইতিহাস, ঐতিহ্য ছাপিয়ে লোহাগড় এখন আলোচনায় একটি হত্যার ঘটনায়। গত ১৮ জুন পুনের ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালকে লোহাগড় দুর্গে ধাক্কা দিয়ে ৪০০ ফুট গভীর খাদে ফেলে হত্যা করা হয়। কেতনের বাগদত্তা সিয়া গোয়েল এবং তার প্রেমিক চেতন চৌধুরী মিলে সুপরিকল্পিতভাবে কেতনকে হত্যা করেন। এরপর থেকে লোহাগড়ে বাড়ছে পর্যটকদের ভিড়। লোহাগড়ের সবচেয়ে আকষণীয় স্পট এখন ‘সিয়া পয়েন্ট’। ঠিক যে জায়গা থেকে কেতনকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছিল, সেটি এখন সিয়া পয়েন্ট হিসেবে পরিচিত। পর্যটকরা এসে প্রথমেই নিরাপত্তা রক্ষীদের কাছে জানতে চান, কোথায় সিয়া পয়েন্ট?
কেতন হত্যার পর থেকে লোহাগড়ে পর্যটকদের ভিড় অন্তত ২৫ শতাংশ বেড়ে গেছে। ভারতের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ লোহাগড়ে আসছেন, সিয়া পয়েন্টে একটি সেলফি তুলতে। আগে থেকেই প্রতি বছর লাখো পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন। সরকারি ছুটির দিনে ৪ থেকে ৫ হাজার পর্যটক এখানে আসেন। ১৮ জুনের পর থেকে সাধারণ কর্মদিবসেও সমপরিমাণ পর্যটক আসছেন। ছুটির দিনে এ সংখ্যা আরো অনেক বেড়ে যায়। পর্যটকের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় লোহাগড়ের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে।
পুলিশ তদন্তের স্বার্থে মঙ্গলবার লোহাগড় দুর্গ সাময়িকভাবে বন্ধ রেখেছিল। তারপরও দুর্গের সামনে ছিল শত শত উৎসুক মানুষের ভিড়। একজন পর্যটক সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা ছিল ভিসাপুর দুর্গে যাওয়ার। কিন্তু কেতন হত্যার খবর শোনার পর আমরা এখানে এসেছি; ঠিক কোথায়, কিভাবে কেতনকে ফেলে দেওয়া হয়েছিল তা দেখতে।’ ভারতের অন্য একটি রাজ্য থেকে পুনেতে বন্ধুর বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন এক ব্যক্তি। এই সুযোগে লোহাগড় যাওয়ার কৌতূহলও মিটিয়ে নিয়েছেন তিনি।
মহারাষ্ট্রের আরেক পর্যটক বলেন, ‘ঘটনাস্থলে গিয়ে আমার খুব খারাপ লেগেছে। ধাক্কা দেওয়ার সময় কেতন কী ভাবছিল, এটা ভেবেই আমার খুব কষ্ট হয়েছে। যার সঙ্গে জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখছিলেন কেতন, বিশ্বাস করে তার সঙ্গে ঘুরতে এসে তার এ পরিণতি আমাদের সবার জন্যই বার্তা দেয়।’ পর্যটক মুকেশ মালি বলেন, ‘কাউকে ভালোবাসলেও আমাদের অন্ধ হয়ে যাওয়া উচিত নয়। সবারই সব সময় সতর্ক থাকা উচিত।
তবে লোহাগড়ের এই হঠাৎ জনপ্রিয়তায় বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন ঐতিহ্য সংরক্ষণবিদরা। লোহাগড়-ভিসাপুর বিকাশ মঞ্চ-এর সদস্য সচিন তেকাওয়াড়ে ঐতিহাসিক এই দুর্গের সঙ্গে হত্যা মামলার নাম জড়িয়ে যাওয়ার তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি এই ঘটনাকে অত্যন্ত মর্মান্তিক ও দুর্ভাগ্যজনক বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিক থেকে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থানে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক।’ পাশাপাশি লোহাগড় দুর্গকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রমশ বাড়তে থাকা মিম ও রসিকতা নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার মতে, এগুলো দুর্গটির ভাবমূর্তি আরো ক্ষতিগ্রস্ত করছে।




