কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে (ডিআরসি) ইবোলা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। রোগীদের চিকিৎসা করতে গিয়ে অনেক স্বাস্থ্যকর্মীও সংক্রমিত হচ্ছেন। এতে রোগটি নিয়ন্ত্রণে আনার প্রচেষ্টা আরো কঠিন হয়ে পড়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশে মোট ইবোলা আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়েছে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে অন্তত ৭৮ জন সংক্রমিত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ১৮ জন মারা গেছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বেশিরভাগ স্বাস্থ্যকর্মী 'বিশেষ' ইবোলা চিকিৎসাকেন্দ্রে নয়, বরং সাধারণ হাসপাতাল ও ক্লিনিকে কাজ করার সময় সংক্রমিত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মেডিকেল সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেডিক্যাল কর্পসের কঙ্গো শাখার চিকিৎসা প্রধান আবদু সেবুশিশে জানান, আক্রান্ত সব স্বাস্থ্যকর্মীর সংক্রমণ ঘটেছে চিকিৎসাকেন্দ্রের বাইরে। তার মতে, রোগটি শুরুতে সাধারণ অসুখের মতো মনে হওয়ায় অনেক সময় ইবোলা শনাক্ত হতে দেরি হয়।
ইবোলার বান্ডিবুগিও ধরন শুরুতে ম্যালেরিয়া বা সাধারণ জ্বরের মতো উপসর্গ দেখায়। ফলে রোগী ও চিকিৎসক- উভয় পক্ষই শুরুতে বুঝতে পারে না এটি ইবোলা। এই সময়েই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে দুর্বল ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাব, প্রশিক্ষণের ঘাটতি এবং হাসপাতালগুলোর দুর্বল নজরদারি পরিস্থিতি আরো খারাপ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, স্বাস্থ্যসেবাকেন্দ্রে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ঠিকমতো না থাকলে ইবোলা আরো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি হালনাগাদ প্রতিবেদনে সংস্থাটি জানিয়েছে, রোগটির প্রাথমিক লক্ষণ অস্পষ্ট হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
কঙ্গো সরকারের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত দেশে ১ হাজার ৩ জন নিশ্চিত ইবোলা রোগী পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ২৫৪ জন মারা গেছেন। অন্যদিকে ১০০ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ইতুরি প্রদেশে। মোট আক্রান্তের ৯০ শতাংশের বেশি এই অঞ্চলেই পাওয়া গেছে। এই এলাকায় হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ দ্রুত বাড়ছে। অনেক চিকিৎসাকেন্দ্র ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি রোগী নিয়ে কাজ করছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ইতুরি অঞ্চলে সরকার বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা চালু করেছে। পাশাপাশি পরীক্ষাগারের সক্ষমতা বাড়ানো হয়েছে এবং নতুন করে স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি এখনো জটিল। সংক্রমিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে আসা মানুষের মধ্যে নজরদারিতে রাখা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৫৮ শতাংশকে। কয়েকদিন আগেও এই হার ৭০ শতাংশের বেশি ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাতপ্রবণ এলাকায় রোগীর গতিবিধি চিহ্নিত করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার আফ্রিকা অঞ্চলের জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের প্রধান মারি রোজেলিন বেলিজেয়ার বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি এখনো পূর্ণ প্রস্তুতির পর্যায়ে পৌঁছায়নি। তিনি পরিস্থিতির অগ্রগতিকে ১০-এর মধ্যে তিন বা চার হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি আরো জানান, সামগ্রিকভাবে প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা করার জন্য রোগী, তাদের পরিবার এবং নজরদারিতে থাকা ব্যক্তিদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। সব বাধা সত্ত্বেও কর্মকর্তারা বলছেন, আগের তুলনায় এখন বেশি রোগী সুস্থ হয়ে ফিরছেন। একই সঙ্গে জনসচেতনতা কার্যক্রমও বাড়ানো হয়েছে।
জুন মাসে আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা ও আফ্রিকান দেশগুলোর পক্ষ থেকে প্রায় ৯১ কোটি মার্কিন ডলারের সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আসতে আরো কয়েক মাস সময় লাগতে পারে।




