বিদেশি পর্যটকদের কাছে কিউবার আকর্ষণ দ্রুত কমে যাচ্ছে। চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশটিতে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা অর্ধেকেরও বেশি কমেছে ।এর পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নিষেধাজ্ঞাকে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিউবার জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার প্রকাশিত তথ্য থেকে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা এবং অর্থনৈতিক চাপের কারণেই পর্যটন খাত বড় ধরনের সংকটে পড়েছে। এর প্রভাব এখন কিউবার সামগ্রিক অর্থনীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।কিউবার জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ওনেইর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দেশটিতে ৩ লাখ ৬০ হাজারেরও কম বিদেশি পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ কম।
পর্যটন খাত কিউবার অন্যতম প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উৎস। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক সংকটে থাকা দেশটির জন্য এই খাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপে খাতটি নতুন করে চাপে পড়েছে। বিশেষ করে, ট্রাম্প প্রশাসন কিউবার সরকারের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবে দেশটির পর্যটন খাত ও এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে বলে মনে করা হয়। এর ফলে কয়েকটি বিদেশি বিমান সংস্থা ও আন্তর্জাতিক হোটেল প্রতিষ্ঠান কিউবায় তাদের কার্যক্রম কমিয়ে দিয়েছে বা বন্ধ করেছে। এতে পর্যটকের সংখ্যা আরো কমে গেছে।
চলতি মাসের শুরুতে কানাডার বিমান সংস্থা এয়ার কানাডা ঘোষণা দেয়, তারা অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য কিউবায় ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রাখবে। প্রতিষ্ঠানটি এই সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে দেশটির চলমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছে। এর আগেও ফেব্রুয়ারি মাসে কিউবায় বিমান জ্বালানির সংকট দেখা দেওয়ায় সাময়িকভাবে ফ্লাইট বন্ধ করেছিল এয়ার কানাডা। এই সিদ্ধান্ত কিউবার পর্যটন খাতের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ চলতি বছর কিউবায় আসা বিদেশি পর্যটকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ছিল কানাডার নাগরিক।
শুধু বিমান সংস্থাই নয়, আন্তর্জাতিক হোটেল ব্যবসাও কিউবায় সংকুচিত হচ্ছে। স্পেনের বড় দুটি হোটেল চেইন মেলিয়া ও ইবেরোস্টার দেশটির বেশ কয়েকটি হোটেলে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র কিউবার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গায়েসার সঙ্গে ব্যবসা বন্ধ করার জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকে পাঁচ জুন পর্যন্ত সময় দিয়েছিল। সেই সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই স্প্যানিশ প্রতিষ্ঠান দুটি কিউবায় তাদের কার্যক্রম সীমিত করার সিদ্ধান্ত নেয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অভিযোগ করেছেন, গায়েসা কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয় এবং এটি 'রাষ্ট্রের ভেতরে আরেকটি রাষ্ট্র' হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি দেওয়া এক ভাষণে তিনি বলেন, গায়েসা তাদের ব্যবসা থেকে পাওয়া অর্থ দেশের সাধারণ মানুষের পরিবর্তে একটি ছোট প্রভাবশালী গোষ্ঠীর স্বার্থে ব্যবহার করে। তার অভিযোগ, যারা এর বিরুদ্ধে কথা বলে, তাদেরও দমন করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা এবং তেল সরবরাহে বাধা তৈরি হওয়ায় কিউবার অর্থনৈতিক সংকট আরো গভীর হয়েছে। দেশটিতে জ্বালানি, খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি আগের চেয়ে বেড়েছে। অনেক খাতে উৎপাদন ও সেবা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, কিউবাকে তেল সরবরাহ করে এমন যেকোনো দেশ বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর পর থেকেই পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে বলে কিউবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে।
কিউবার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কিউবাডিবাতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটের কারণে ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের বেঁচে থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগে যেখানে এই হার ছিল ৮৫ শতাংশ, এখন তা কমে ৬৫ শতাংশে নেমে এসেছে। স্বাস্থ্য খাতের এই অবনতিকে দেশটির চলমান অর্থনৈতিক সংকটের অন্যতম বড় প্রভাব হিসেবে দেখা হচ্ছে।
জ্বালানির ঘাটতির কারণে কিউবার অর্থনীতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাত প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থাও রয়েছে। পর্যাপ্ত জ্বালানি না থাকায় নিয়মিত ময়লা অপসারণ করা যাচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন শহরের রাস্তায় আবর্জনার স্তূপ জমে যাচ্ছে।
দেশজুড়ে দীর্ঘ সময়ের বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন কিউবার মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক এলাকায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। কোথাও কোথাও পরিস্থিতি আরো খারাপ। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে দেশটিতে কিছু বিক্ষোভও দেখা গেছে।
তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, কিউবায় সরকারবিরোধী প্রতিবাদ প্রায়ই কঠোরভাবে দমন করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
অর্থনৈতিক সংকটের প্রভাব এখন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতেও পড়ছে। বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্যাথলিক ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত কমিউনিয়ন ওয়েফারেরও সংকট দেখা দিয়েছে। কয়েকজন ক্যাথলিক পুরোহিত জানিয়েছেন, তাদের ওয়েফার ব্যবহার সীমিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাধারণত ধর্মীয় উপাসনার সময় বিশ্বাসীদের মধ্যে এই বিশেষ ধরনের রুটি বিতরণ করা হয়। ওয়েফারগুলো রাজধানী হাভানার একটি মঠে তৈরি করা হয়। সেখানে থাকা সন্ন্যাসিনীরা জানিয়েছেন, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক দিন তারা মাত্র দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ পান। ফলে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ওয়েফার তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।
পর্যটকের সংখ্যা কমে যাওয়া, বিদেশি বিনিয়োগ হ্রাস, জ্বালানি সংকট, খাদ্য ও ওষুধের ঘাটতি এবং দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাট- সব মিলিয়ে কিউবার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরো কঠিন হয়ে উঠছে। পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি না হলে দেশটির পর্যটন শিল্পের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।




