• ই-পেপার

সাফল্য লাভে গোপন ইবাদতের গুরুত্ব

গ্রাফিকস ডিজাইনকে পেশা বানিয়ে উপার্জনের বিধান

মুফতি ওমর বিন নাছির
গ্রাফিকস ডিজাইনকে পেশা বানিয়ে উপার্জনের বিধান
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগ তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। ডিজিটাল মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন ব্যবসা এবং বিজ্ঞাপনের প্রসারের ফলে গ্রাফিকস ডিজাইন একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় পেশায় পরিণত হয়েছে। অসংখ্য তরুণ-তরুণী এ পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করছেন। লোগো, ব্যানার, পোস্টার, বইয়ের প্রচ্ছদ, বিজ্ঞাপনচিত্র, সোশ্যাল মিডিয়া পোস্ট এবং বিভিন্ন ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরিতে গ্রাফিকস ডিজাইনের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।

তবে একজন সচেতন মুসলমানের জন্য শুধু আয়ের উৎস হওয়াই যথেষ্ট নয়; বরং সেই আয় হালাল কি না, কাজটি শরিয়তসম্মত কি না এবং তা আল্লাহর সন্তুষ্টির অনুকূল কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনা করা অপরিহার্য। বিশেষ করে প্রাণীর ছবি, মানুষের ছবি কিংবা নারীদের ছবি ব্যবহার করে ডিজাইন তৈরি ও বিক্রির বিধান সম্পর্কে অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে। তাই এর বিধান জানা অত্যন্ত জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা থেকে আহার কর।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৭২)

অন্যত্র আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কর না।’(সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ২)
এ দুটি আয়াত থেকে বোঝা যায়, মুসলমানের উপার্জন যেমন হালাল হতে হবে, তেমনি তার কাজও গুনাহ ও হারামের সহযোগী হওয়া যাবে না।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামতের দিন সবচেয়ে কঠিন শাস্তি ভোগ করবে ছবি নির্মাতারা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২১০৯)
আরেক হাদিসে এসেছে, ‘যে ঘরে ছবি থাকে, সেখানে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৪০৪)

এসব হাদিসের ভিত্তিতে অধিকাংশ ফকিহ ও মুহাদ্দিস প্রাণীর চিত্র অঙ্কনের ব্যাপারে কঠোর সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। একদল আলেমের মতে, ডিজিটাল ছবি কাগজে আঁকা স্থায়ী চিত্রের মতো নয়; বরং এটি আলো ও পিক্সেলের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্রতিচ্ছবি। তাই প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ডিজিটাল ছবি ব্যবহারের অবকাশ রয়েছে।
অন্যদিকে আরেকদল আলেম মনে করেন, ডিজিটাল হোক বা অঙ্কিত হোক—সজীব প্রাণীর ছবি তৈরির মধ্যে চিত্র নির্মাণের অর্থ বিদ্যমান থাকে। তাই তারা এ ক্ষেত্রেও সতর্কতা অবলম্বনের পক্ষে মত দেন। তাই ফটোগ্রাফিকে নিরঙ্কুশ বৈধ বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়; বরং প্রয়োজনের সীমার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত। (তাফসিরে আয়াতিল আহকাম, ২/৩০০)

গ্রাফিকস ডিজাইন পেশার বিধান
গ্রাফিকস ডিজাইন একটি মাধ্যম। এর বিধান নির্ভর করবে এর বিষয়বস্তু ও ব্যবহারের ওপর।

যেসব ডিজাইন বৈধ
১. ইসলামী পোস্টার ও দাওয়াহমূলক ডিজাইন
২. ক্যালিগ্রাফি ও আরবি নকশা
৩. প্রকৃতি, পাহাড়, নদী, ফুল ইত্যাদির ডিজাইন
৪. ব্যাবসায়িক লোগো ও ব্যানার
৫. বইয়ের প্রচ্ছদ ও শিক্ষামূলক কনটেন্ট
৬. অনুমোদিত ডিজিটাল আইকন ও গ্রাফিক উপাদান
এসব ক্ষেত্রে গ্রাফিকস ডিজাইন করা এবং এর মাধ্যমে উপার্জন করা বৈধ বলে গণ্য হবে।

যেসব ডিজাইন থেকে বিরত থাকা আবশ্যক

১. নারীদের ছবি ব্যবহার করে বিজ্ঞাপন তৈরি
২. অশ্লীল বা অনৈতিক কনটেন্ট ডিজাইন
৩. হারাম পণ্য বা কার্যক্রমের প্রচারণা
৪. ধর্মবিরোধী বা শিরকপূর্ণ প্রতীক প্রচার
৫. গুনাহের কাজে সহায়ক ডিজাইন

এসব কাজ গুনাহের সহযোগিতা হিসেবে গণ্য হতে পারে। তাই এসব ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান অত্যন্ত সতর্কতাপূর্ণ। তাই তাকওয়ার দাবি হলো অপ্রয়োজনীয় প্রাণীর ছবিনির্ভর ডিজাইন থেকে দূরে থাকা এবং বিকল্প ক্ষেত্র বেছে নেওয়া। বিশেষত ইসলামী ক্যালিগ্রাফি, টাইপোগ্রাফি, ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইন, ইনফোগ্রাফিক, শিক্ষামূলক কনটেন্ট ও ব্যাবসায়িক ডিজাইনের ক্ষেত্রগুলো একজন মুসলিম ডিজাইনারের জন্য অধিক নিরাপদ ও প্রশংসনীয়। (ফাতাওয়ায়ে শায়েখ আব্দুর রাজ্জাক আকিফি, ১/৩০৫)

একজন মুসলিম গ্রাফিকস ডিজাইনারের করণীয়
১. কাজের বিষয়বস্তু শরিয়তসম্মত কি না তা যাচাই করা।
২. অশ্লীলতা ও হারাম বিষয়বস্তু থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।
৩. নারীদের ছবিনির্ভর ডিজাইন এড়িয়ে চলা।
৪. ইসলামী ও কল্যাণকর কনটেন্ট তৈরিতে দক্ষতা ব্যবহার করা।
৫. সন্দেহপূর্ণ আয়ের ক্ষেত্র থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা।
৬. আল্লাহভীতি ও তাকওয়াকে পেশাগত জীবনের মূলনীতি বানানো।

গ্রাফিকস ডিজাইন বর্তমান যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও সম্ভাবনাময় পেশা। মূলত এটি একটি মাধ্যম, যার বিধান নির্ভর করে এর ব্যবহার ও বিষয়বস্তুর ওপর। শরিয়তসম্মত বিষয় নিয়ে ডিজাইন করা এবং তার মাধ্যমে উপার্জন করা বৈধ। তবে প্রাণীর ছবি ও ডিজিটাল চিত্রের ব্যাপারে সমকালীন আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ জন্য যে বিষয়গুলো নিয়ে মতভেদ ও সন্দেহ রয়েছে, সেগুলো থেকে যথাসম্ভব দূরে থাকা একজন মুমিনের তাকওয়ার পরিচয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বিন ও সম্মানকে নিরাপদ রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ৫২)

অতএব, একজন মুসলিম ডিজাইনারের উচিত এমন ক্ষেত্র বেছে নেওয়া, যেখানে তার দক্ষতা মানবকল্যাণে ব্যবহৃত হবে, উপার্জন হবে হালাল এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টিও অর্জিত হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক অর্জন, সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকা এবং তাকওয়ার সঙ্গে জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।

হাদিসের বাণী

আখিরাতে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট যেভাবে ভুলিয়ে দেয়া হবে

ইসলামী জীবন ডেস্ক
আখিরাতে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট যেভাবে ভুলিয়ে দেয়া হবে
সংগৃহীত ছবি

আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের দিন জাহান্নামিদের থেকে একজনকে উপস্থিত করা হবে, যে দুনিয়াতে সবচেয়ে সুখী ছিল। তখন তাকে জাহান্নামের মধ্যে ঢুকানো হবে, এরপর বলা হবে, হে বনি আদম, তুমি কি কখনো কল্যাণকর জিনিস দেখেছ? তোমার কাছে কখনো কি সুখের আসবাবপত্র এসেছে? সে বলবে, হে আমার রব, ওয়াল্লাহি! না। আর জান্নাতিদের থেকে এমন এক ব্যক্তিকে নিয়ে আসা হবে, যে জগতে সবচেয়ে দুঃখী ছিল। তাকে জান্নাতে একবার প্রবেশ করানোর পর বলা হবে, হে বনি আদম, তুমি কি দুনিয়াতে কখনো দুঃখ পেয়েছ? তোমার ওপর কি কোনো বিপদাপদ এসেছিল? সে বলবে, না, ওয়াল্লাহি! আমি দুনিয়াতে কোনো দুঃখ ও মুসিবতে পড়িনি এবং কোনো দুঃখ দেখিনি। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭০৮৮, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস : ১৩১১২)

শিক্ষা ও বিধান

১. দুনিয়ার সুখ-দুঃখ ক্ষণস্থায়ী। মানুষ দুনিয়াতে যত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যই ভোগ করুক, যদি তার শেষ পরিণতি জাহান্নাম হয়, তবে জাহান্নামের সামান্য শাস্তিও তার সমস্ত সুখকে ভুলিয়ে দেবে। অন্যদিকে, একজন মুমিন দুনিয়াতে যত কষ্টই ভোগ করুক, যদি তার গন্তব্য জান্নাত হয়, তবে জান্নাতের সামান্য নেয়ামতই তার সব দুঃখ-কষ্ট মুছে দেবে।

২. আখিরাতই প্রকৃত জীবন। তাই আসল সফলতা বা ব্যর্থতা দুনিয়ার অবস্থার ওপর নির্ভর করে না; বরং আখিরাতের পরিণতির ওপর নির্ভর করে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আখিরাতের জীবনই হলো প্রকৃত জীবন।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৬৪)

৩. আজ যারা দারিদ্র্য, রোগব্যাধি, অপমান, নির্যাতন বা নানা বিপদে আক্রান্ত, তাদের জন্য এই হাদিস বিশাল সান্ত্বনার উৎস। কেননা একজন মুমিন যদি ঈমান ও তাকওয়ার ওপর অবিচল থাকে, তবে জান্নাতের এক মুহূর্তের সুখই তার জীবনের সব কষ্টকে তুচ্ছ করে দেবে।

৪. দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে প্রতারিত হওয়া উচিত নয়। অনেক সময় দেখা যায়, কিছু মানুষ দুনিয়াতে অত্যন্ত সুখী, ধনী ও ক্ষমতাবান। কিন্তু বাহ্যিক সফলতা আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়। যদি তারা ঈমান ও নেক আমল ছাড়া মৃত্যুবরণ করে, তবে তাদের দুনিয়ার সমস্ত সুখ কোনো উপকারে আসবে না।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, দুনিয়া চূড়ান্ত গন্তব্য নয়; বরং এটি আখিরাতের শস্যক্ষেত্র। দুনিয়ার সুখ দেখে অহংকার করা এবং দুঃখ দেখে হতাশ হওয়া কোনোটিই মুমিনের কাজ নয়। কারণ জান্নাতের এক মুহূর্তের নেয়ামত পৃথিবীর সব কষ্টকে মুছে দেয়, আর জাহান্নামের এক মুহূর্তের শাস্তি পৃথিবীর সব সুখকে বিস্মৃত করে দেয়। তাই একজন বুদ্ধিমান মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং জান্নাত লাভের জন্য আমল করা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে দুনিয়ার মোহে বিভ্রান্ত না হয়ে আখিরাতমুখী জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

জুমার দিন যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
জুমার দিন যে তিন দোয়া বেশি বেশি পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

মুসলমানদের জন্য জুমার দিন হচ্ছে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন। হাদিসে জুমার দিনে করণীয় বেশকিছু আমলের কথা রয়েছে। এর মধ্যে একটি বিশেষ আমল হলো আল্লাহ তাআলার কাছে একাগ্রচিত্তে দোয়া করা। কারণ এটি দোয়া কবুলের দিন। এই দিনের দোয়া বিশেষভাবে কবুল করা হয়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘জুমার দিনে এমন একটি সময় আছে, সেই সময়টায় যদি কোনো মুসলিম নামাজ আদায় করে এবং আল্লাহর কাছে কিছু চায়, আল্লাহ অবশ্যই তার সে চাহিদা বা দোয়া কবুল করবেন এবং এরপর রাসুল (সা.) হাত দিয়ে ইশারা করে সময়টির সংক্ষিপ্ততার ইঙ্গিত দেন’। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৪০০) 

তবে কোনো হাদিসে এসেছে, ‘সেই সময়টি তোমরা আসরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান কর।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ১০৪৮) 
বিখ্যাত সিরাত গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, জুমার দিন আসরের নামাজ আদায়ের পর দোয়া কবুল হয়। (জাদুল মাআদ, ২/৩৯৪)

তাই জুমার দিন বিশেষ করে আসর নামাজের পর দোয়া করা উচিত। যেকোনো দোয়াই করা যায়। এখানে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দোয়া তুলে ধরা হলো।

১. দুনিয়া-আখেরাতে কল্যাণ লাভের দোয়া

رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ

উচ্চারণ : ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্ দুনইয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতি হাসানাহ, ওয়াকিনা আজাবান্নার।’ 
অর্থ : ‘হে আমার রব! আপনি আমাকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন, আখেরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচান।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২০১‍)


২. উত্তম জীবন যাপনের দোয়া

اَللَّهُمَّ اِنِّى أَسْألُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى 

উচ্চারণ : ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকাল হুদা ওয়াত তুক্বা ওয়াল আফাফা ওয়াল গেনা।’ 
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে হেদায়াত কামনা করি এবং আপনার ভয় তথা তাকওয়া কামনা করি এবং আপনার কাছে নৈতিক পবিত্রতা কামনা করি এবং সম্পদ তথা সামর্থ্য ও সচ্ছলতা কামনা করি।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৭২১, তিরমিজি, হাদিস : ৩৪৮৯) 

৩. মা-বাবাসহ সকল মুমিনের জন্য দোয়া

رَبَّنَا اغْفِرْ لِي وَلِوَالِدَيَّ وَلِلْمُؤْمِنِينَ يَوْمَ يَقُومُ الْحِسَابُ 

উচ্চারণ : ‘রব্বানাগ-ফিরলি ওয়ালি ওয়ালিদাইয়্যা ওয়ালিল মুমিনিনা ইয়াওমা ইয়াকুমুল হিসাব।’ 

অর্থ : ‘হে আমাদের রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে এবং সব মুমিনকে আপনি সেই দিন ক্ষমা করে দিবেন; যেই দিন হিসাব কায়েম করা হবে।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৪১)

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উল্লেখিত দোয়াগুলো নিয়মিত পাঠ করার তাওফিক দান করুন। বিশেষ করে দোয়া কবুলের সময়গুলোতে বেশি বেশি পাঠ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

যেভাবে জুমার নামাজের সূচনা হয়েছিল

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যেভাবে জুমার নামাজের সূচনা হয়েছিল
সংগৃহীত ছবি

ইসলামের একটি মহান বিধান হলো জুমার নামাজ। এটি মুসলমানদের সাপ্তাহিক ঈদ, সাপ্তাহিক মহাসমাবেশ এবং ঈমানি চেতনা নবায়নের এক অনন্য উপলক্ষ। প্রতি সপ্তাহে একদিন মুসলমানরা সব ব্যস্ততা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দুনিয়াবি কাজকর্ম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে আল্লাহর ঘরে সমবেত হয়। খুতবা শ্রবণ করে, নামাজ আদায় করে এবং ইসলামী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে সুদৃঢ় করে। কিন্তু এই মহিমান্বিত ইবাদতের সূচনা কীভাবে হয়েছিল? ইতিহাসের পাতা খুললে আমরা এক চমৎকার ও শিক্ষণীয় অধ্যায় দেখতে পাই।

‘জুমা’ শব্দের অর্থ ও তাৎপর্য
আরবি ‘জুমুআহ’ (الجمعة) শব্দের অর্থ হলো—একত্র হওয়া, সমবেত হওয়া বা সংঘবদ্ধ হওয়া। যেহেতু এ দিনে মুসলমানরা আল্লাহর ইবাদতের জন্য একত্রিত হয়, তাই দিনটির নাম রাখা হয়েছে ‘ইয়াওমুল জুমুআহ’ বা জুমার দিন। জমহুর উলামায়ে কেরামের মতে এর শুদ্ধ উচ্চারণ ‘জুমুআহ’, যদিও ইমাম আ‘মাশ (রহ.) ‘জুমআহ’ উচ্চারণকেও গ্রহণ করেছেন। বাংলা ভাষায় প্রচলিত রূপ হলো ‘জুমা’। তবে নামের পার্থক্য থাকলেও এর মর্যাদা ও তাৎপর্য একই। (তাফসিরে রুহুল মাআনি : ১৪/৯৯, দরসে তিরমিজি : ২/১৯২)

জাহেলি যুগে শুক্রবারের নাম
ইসলামের আগমনের পূর্বে আরবরা শুক্রবারকে ‘ইয়াওমুল আরুবা’ নামে চিনত। ইতিহাসবিদদের বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী (সা.)-এর অন্যতম পূর্বপুরুষ কাব ইবনে লুয়াই সর্বপ্রথম এ দিনের নাম পরিবর্তন করে ‘ইয়াওমুল জুমুআহ’ রাখেন। তিনি প্রতি শুক্রবার কুরাইশদের সমবেত করতেন এবং তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিতেন। এ ঘটনা ঘটেছিল মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাবের প্রায় পাঁচ শত ষাট বছর পূর্বে। সেই সময় থেকেই দিনটি সমাবেশ ও সম্মিলনের দিনের পরিচয় লাভ করে। আর কাআব ইবনে লুয়াই ছিলেন মহানবী (সা.)-এর পূর্বপুরুষদের অন্যতম। (তাফসিরে মারেফুল কোরআন, পৃ : ১৩৭১)

জুমার গুরুত্ব
ইসলামে জুমার মর্যাদা এতই মহান যে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে একটি পূর্ণাঙ্গ সূরার নামই রেখেছেন ‘সুরা জুমুআহ’। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং বেচাকেনা বন্ধ করে দাও। এটাই তোমাদের জন্য উত্তম, যদি তোমরা জানতে।’(সুরা : জুমুআহ, আয়াত : ৯)
এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে, জুমা শুধু একটি নামাজ নয়; বরং এটি আল্লাহর বিশেষ নির্দেশে প্রতিষ্ঠিত একটি মহান ইবাদত।

ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা
হিজরতের পর মহানবী (সা.) প্রথমে কুবা এলাকায় কয়েক দিন অবস্থান করেন। এরপর তিনি মদিনার উদ্দেশে রওনা হন। পথিমধ্যে বনি সালেম ইবনে আউফ গোত্রের উপত্যকায় পৌঁছলে জোহরের সময় হয়ে যায়। সেদিন ছিল শুক্রবার। মহানবী (সা.) সেখানে উপস্থিত সাহাবায়ে কেরামকে সঙ্গে নিয়ে জুমার খুতবা প্রদান করেন এবং জুমার নামাজ আদায় করেন। ইতিহাসে এটিই মহানবী (সা.)-এর নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমা হিসেবে স্বীকৃত। আর এই ঘটনাই ইসলামী ইতিহাসে জুমার নামাজের বাস্তব ও প্রাতিষ্ঠানিক সূচনা হিসেবে গণ্য হয়। এরপর থেকে মুসলমানদের জন্য জুমার নামাজ একটি ফরজ ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে মুসলিম সমাজের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় সমাবেশে পরিণত হয়। (দরসে তিরমিজি : ২/১৯২, মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক, হাদিস : ৫১৪৪)

মদিনায় জুমার প্রাথমিক চর্চা
মহানবী (সা.) মদিনায় হিজরত করার পূর্বেই সেখানে বসবাসকারী আনসার সাহাবিরা সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট দিনে একত্রিত হয়ে আল্লাহর ইবাদত করার প্রয়োজনিয়তা অনুভব করেন। মুহাম্মদ ইবনে সিরিন (রহ.) বর্ণনা করেন, আনসারগণ আলোচনা করলেন—ইহুদিদের জন্য শনিবার এবং খ্রিস্টানদের জন্য রবিবার নির্ধারিত রয়েছে, যেদিন তারা সমবেত হয়। অতএব মুসলমানদেরও একটি নির্দিষ্ট দিন থাকা উচিত, যেদিন সবাই একত্র হয়ে আল্লাহর ইবাদত করবে।

এভাবে জুমার নামাজ ইসলামের অন্যতম মহান নিদর্শন এবং মুসলিম উম্মাহর সাপ্তাহিক সমাবেশ হয়ে উঠে। এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ইসলামের প্রারম্ভিক ইতিহাসে। আনসার সাহাবিদের আগ্রহ, তাদের ঐক্যবদ্ধ চিন্তা এবং সর্বোপরি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর নেতৃত্বে বনি সালেম গোত্রের উপত্যকায় অনুষ্ঠিত প্রথম আনুষ্ঠানিক জুমার মাধ্যমে এ মহান ইবাদতের যাত্রা শুরু হয়। সেই থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রতিটি অঞ্চলে কোটি কোটি মুসলমান প্রতি শুক্রবার আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে মসজিদে সমবেত হচ্ছেন।

জুমা আমাদের শেখায়—ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব, আল্লাহর স্মরণ এবং ইসলামের প্রতি অবিচল আনুগত্য। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত জুমার মর্যাদা উপলব্ধি করা, এর আদব ও সুন্নতসমূহ যথাযথভাবে পালন করা এবং এই বরকতময় দিনকে আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে জুমার মর্যাদা উপলব্ধি করে যথাযথভাবে তা আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।