‘আমার মনে হয়, কেপ ভার্দে আর্জেন্টিনাকে হারাবে ১-০ গোলে’—এই মুহূর্তে এমন মন্তব্য করে কেউ হয়তো আলোচনায় থাকতে চান, নয়তো বাড়াবাড়ি রকমের আবেগতাড়িত তিনি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে গোটা কেপ ভার্দে এমন আবেগে ভাসলে অবশ্য তা বাড়াবাড়ি নয় মোটেও।
সে রকম কিছু ঘটিয়েই তো তারা এখন মায়ামিতে মুখোমুখি আর্জেন্টিনার। খোদ দলটির ফুটবলাররা বলেছেন, তাঁরা এর আগে লিওনেল মেসিকে খেলতে দেখেছেন শুধু টিভিতে, আগামীকাল ভোরে মাঠে সেই মেসিকে ট্যাকল করতে হবে তাঁদের, চোখে চোখ রেখে বলতে হবে, ‘তুমি সেরা হতে পারো, তবে আমরাও কম নই।’ দেশটির প্রেসিডেন্ট জোসে মারিয়া নেভেসও তাই আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারানোর অমন আগাম ঘোষণা দিয়ে দেন।
কেপ ভার্দের রূপকথা কি থামাতে পারবে আর্জেন্টিনা? মেসিদের জন্য একেবারে ভিন্ন চ্যালেঞ্জ হয়ে এসেছে এই ম্যাচ। নিশ্চিতভাবেই লিওনেল স্কালোনির টুর্নামেন্টপূর্ব হিসাব-নিকাশ ও গবেষণায় ছিল না এই কেপ ভার্দে। তারা নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে হাজির হয়েছে আলবিসেলেস্তেদের সামনে। স্পেন, উরুগুয়েকে আটকে দিয়ে তারা এমন একটা বাতাবরণ তৈরি করেছে যে বাজিকররাও হয়তো দ্বিধায়। তাদের এই রূপকথার শেষ কোথায়!
কেপ ভার্দে যে এসেছে হিসাবের বাইরে থেকে। তাই হিসাব-নিকাশে তাদের মেলানোটা সহজ হবে না। তবে এবার ভাবুন আর্জেন্টিনা বা মেসির কথা। এই বিশ্বকাপেই যিনি খেলতে পারবেন কি না নিশ্চয়তা ছিল না, তিনি প্রথম তিন ম্যাচেই ছয় গোল করে ফেলবেন, ভাবতে পেরেছিল কেউ?
বিশ্বকাপে অবশ্য অনেক হিসাবই মেলে না। গতবার সৌদি আরবের কাছে প্রথম ম্যাচে হারের পর কে-ই বা ভাবতে পেরেছিল যে সেই আর্জেন্টিনাই ট্রফি নিয়ে বাড়ি যাবে! মায়ামিতে আর্জেন্টিনা-কেপ ভার্দে লড়াইয়ে তাই রোমাঞ্চের ডাক আছে ষোলো আনাই। সেটি ডেভিড আর গোলিয়াথের লড়াই হলেও।
বিশ্বকাপের এই মাঝপথেও সত্যিকার অর্থে জমে উঠতে চলেছে শিরোপার লড়াই। ফ্রান্স আছে আগুনে ফর্মে, তারাই চ্যাম্পিয়ন হলে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের কী হবে? ব্রাজিল যে গতবারের আর্জেন্টিনার মতোই এগোচ্ছে নানা চ্যালেঞ্জ সামলে। আর্জেন্টিনা বড় সমস্যায় পড়েনি এখনো, মেসি যেভাবে চাইছেন সবই হচ্ছে। তো এই যাত্রা কি থেমে যাবে! কেপ ভার্দে চমকেরও তাই হয়তো আজই শেষ, না হলেই বরং সেটি হবে আরো বড় চমক। বিশ্বকাপ কোন পথে যাচ্ছে, পথের বাঁকে বাঁকে রোমাঞ্চটা এখানেই।
কেপ ভার্দে কোচ মেসিকে থামানোরও পরিকল্পনা এঁটেছেন। মেসি কিভাবে কী করেন, সেটি অবশ্য কারোরই অজানা নয়। তবু ম্যাচ পরিস্থিতিতে তিনি ঠিকই পথ খুঁজে নেন, হয়তো অপ্রত্যাশিতভাবে গতি বাড়ান, চেনা মুভমেন্টেও যোগ করেন নতুন সৃষ্টিশীলতা, পার্থক্য গড়া হয়ে যায় সেভাবেই।
আলোচিত পারফর্মার ভোজিনিয়াও এই ম্যাচে আর্জেন্টাইন তারকাকে কেমন সামলান, সেটিও দেখার। জর্দানের বিপক্ষে গ্রুপের শেষ ম্যাচে স্কালোনি সবাইকে খেলার সুযোগ দিয়েছেন। নক আউট পর্বের শুরু থেকে মেসিসহ মূল একাদশটাই তাঁর ফিরিয়ে আনার কথা। জর্ডান ম্যাচের পর সেই চেনা একাদশের কোনো পরিবর্তন আসে কি না, সেটিই দেখার।
ফিট নিকোলাস তালিয়াফিকো জর্ডান ম্যাচে একাদশে ফিরেছেন। কেপ ভার্দের বিপক্ষে তিনি লেফট ব্যাকের জায়গাটা ধরে রাখতে পারেন। আবার একই পজিশনে ফাকুন্দো মেদিনাও তাঁর সামর্থ্য প্রমাণ করেছেন। অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে মেসি গোল করেছেন তাঁর ক্রস থেকে। সেন্ট্রাল ডিফেন্সে কে খেলবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন আছে। ক্রিস্তিয়ান রোমেরো ফিট হয়ে উঠেছেন বলেই খবর। সে ক্ষেত্রে নিকোলাস ওতামেন্দিই কি শুরু করবেন, নাকি রোমেরো, সেই সিদ্ধান্ত নেবেন স্কালোনি।
একই রকম কৌতূহল মেসির সঙ্গী কে হবেন, সেটি নিয়ে। লাউতারো মার্তিনেজ নাকি হুলিয়ান আলভারেস শুরু করবেন? যদিও শক্তিমত্তার হিসাব বলে কেপ ভার্দের জন্য আর্জেন্টিনার যেকোনো একাদশই যথেষ্ট। তবে স্কালোনিকেও এর রহস্যভেদ করতে হবে যে স্পেনের মতো দল কেন কেপ ভার্দের বিপক্ষে গোল পেল না কিংবা কোন লড়াইয়ে উরুগুয়েকে তারা রুখে দিতে পারল?
গোলের জন্য হয়তো বা মেসিই যথেষ্ট, কিন্তু উরুগুয়ের বিপক্ষে কেপ ভার্দে দেখিয়েছে তারা পাল্টা গোল করে ম্যাচে ফিরতেও পারে। কেপ ভার্দে ছোট দল বা চমক—যেটিই হোক, নক আউটের ম্যাচের সব রকম চ্যালেঞ্জই এই ম্যাচে আছে স্কালোনির সামনে। সেই চ্যালেঞ্জ জিতে শিরোপার পথে তাদের আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার পক্ষে বাজি ধরার লোকই এই মুহূর্তে বেশি!