দিনকয়েক আগেও ফুটবল দুনিয়ায় তার নামটা কজনই বা জানত! অথচ আজ একবিংশ শতাব্দীর ফুটবল বিশ্বমঞ্চে তিনি এক জীবন্ত রূপকথার নায়ক। মাঠের পারফরম্যান্সে যেমন কেড়েছেন আলো, তেমনি নেটদুনিয়ায় তার ইনস্টাগ্রাম হ্যান্ডেলে এখন অনুসারীর সংখ্যা ছাড়িয়েছে ১০ লাখের ঘর। তিনি আর কেউ নন, পশ্চিম আফ্রিকার ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র কেপ ভার্দের গোলপোস্টের নিচে অতন্দ্র প্রহরী ভোজিনহা। তার অতিমানবীয় বিশ্বস্ত গ্লাভসে ভর করে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে এসেই শেষ ৩২-এর টিকিট কেটেছে কেপ ভার্দে।
বিশ্বমঞ্চের গ্রুপ পর্বে স্পেন, উরুগুয়ে আর সৌদি আরবের মতো পরাশক্তিদের রুখে দিয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিয়েছে তারা। আর সেখানে শেষ ৩২-এর মঞ্চে এই পুঁচকে দলটির প্রতিপক্ষ খোদ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা! কয়েক সপ্তাহ আগেও যে সমীকরণ ছিল অলীক কল্পনা, আজ তা এক রূঢ় বাস্তব। এই পুরো পরাবাস্তব জার্নিটা খোদ ভোজিনহার কাছেও এক অন্তহীন স্বপ্নের মতো।
সৌদি আরবের বিপক্ষে মহানাটকীয় ম্যাচের পর উচ্ছ্বসিত ভোজিনহা বলেন, ‘আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলাটা আমাদের ফুটবল ইতিহাসেরই অন্যতম দারুণ একটা ঘটনা হতে যাচ্ছে। আর্জেন্টিনা এবং লিওনেল মেসির বিপক্ষে মাঠে নামাটা দুনিয়ার যেকোনো ফুটবলারের জন্যই এক পরম স্বপ্ন।’
বিশ্বকাপে নিজেদের প্রথম ম্যাচেই বিশ্বসেরা স্পেনের সাথে গোলশূন্য ড্র করে ফুটবল দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল কেপ ভার্দে, আর সেই ম্যাচের নায়ক ছিলেন এই ভোজিনহাই। এরপরই আলোর গতিতে ছড়িয়ে পড়ে তার জীবনের এক আবেগঘন গল্প। ঠিক সময়ে পর্যাপ্ত অর্থের সংস্থান করতে না পারায় ভোজিনহার মায়ের যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া আটকে গিয়েছিল। অথচ ভাগ্যের কী অদ্ভুত খেলা, সেই মা-ই এবার গ্যালারিতে বসে চোখের সামনে ছেলেকে বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে দেখছেন।
সৌদি আরবকে রুখে দিয়ে শেষ ৩২ নিশ্চিত করার পর আবেগ ধরে রাখতে পারেননি ভোজিনহা। তিনি বলেন, ‘আমরা কেউই সম্ভবত কখনো এমন অবিশ্বাস্য কিছু কল্পনা করিনি। তবে আমরা মনেপ্রাণে জানতাম, দল হিসেবে আমরা কতটা শক্তিশালী। বিশ্বকাপে আসার সময় হয়তো অনেকেই ভেবেছিল আমরা একটা ম্যাচও জিততে পারব না। কিন্তু আমাদের এই স্কোয়াডটা দুর্দান্ত, এখানে সর্বোচ্চ পর্যায়ে খেলার মতো সামর্থ্যবান ফুটবলাররা আছেন।’
মাত্র ৫ লাখ ৩০ হাজার মানুষের দেশ কেপ ভার্দে। বাছাইপর্বে পরাক্রমশালী ক্যামেরুনকে বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে তারা টিকিট পেয়েছিল বিশ্বকাপের। আর আজ সেই পুঁচকে দেশটিই বিশ্বের সেরা ৩২টি দলের একটি!
ভোজিনহা বলেন, ‘আমরা বিশ্বকে দেখাতে পেরেছি, দেশের প্রতি আমাদের ভালোবাসা কতটা গভীর। আমরা মাঠে শুধু কজন খেলোয়াড়কে রিপ্রেজেন্ট করছি না, দুনিয়াজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি কেপ ভার্দিয়ান মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছি। আয়তনে বা জনসংখ্যায় আমরা হয়তো ছোট একটা দেশ হতে পারি, কিন্তু আমাদের বুকভরা সাহস আর একটা বড় হৃদয় আছে। আর দিনশেষে আমরা লড়াই করতে জানি।’