১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ। ব্রাজিলের অনুকূলে ফ্রি-কিক, গোলপোস্ট থেকে প্রায় ২৫ গজ দূরে। রেফারি নিকোলাই রাইনিয়া বাঁশি বাজিয়েছেন। ব্রাজিলের খেলোয়াড়েরা তখনও শট নেওয়ার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নন। রিভেলিনো বলের পাশে দাঁড়িয়ে নিজের বাকি দুই সতীর্থের সাথে কথা বলছেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে, তৎকালীন জায়ারের (বর্তমান নাম, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো) তৈরি করা রক্ষণ দেয়ালের একদম ডানপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা এক খেলোয়াড় হুট করে লাইন ভেঙে বেরিয়ে এলেন। তিনি বুলেটের গতিতে দৌড়ে গিয়ে ব্রাজিলের ফ্রি-কিক নেওয়ার আগেই বলটাকে লাথি মেরে মাঠের অন্য প্রান্তে পাঠিয়ে দিলেন!
মাঠে উপস্থিত প্রত্যেকে, এমনকি তার নিজের সতীর্থরাও এই কাণ্ড দেখে চরম হতবাক হয়ে গেলেন। রেফারি নিজেকে সামলে নিয়ে পকেট থেকে হলুদ কার্ড বের করলেন। ইলুঙ্গা মৃদু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করলেও, ওটা ছিল ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম এক অর্থহীন যুক্তি।
টেলিভিশনে ইংরেজিতে ধারাভাষ্য দেওয়া জন মটসন তখন নিজের বিস্ময় চেপে রাখতে পারছিলেন না। পরবর্তীতে মটসন এই ঘটনাকে ‘আফ্রিকান অজ্ঞতার এক অদ্ভুত মুহূর্ত’ বলে অভিহিত করেন। আর যুগের পর যুগ ধরে বিশ্বমিডিয়া এটিকে এভাবেই চিত্রায়িত করে এসেছে। কখনো একে বলা হয়েছে ‘আফ্রিকান অপেশাদারিত্ব’, কখনো বা তাদের ডাকা হয়েছে ‘ফুটবলের জোকার’।
এই হাসাহাসির আড়ালে যে প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত বা সরাসরি দাবিটি ছিল, তা অত্যন্ত বর্ণবাদী এবং ঔপনিবেশিক মানসিকতায় ভরা। ভাবটা এমন যেন ইলুঙ্গা ফুটবলের নিয়মকানুনই জানতেন না; তিনি মাঠে একটা ফুটবল পড়ে থাকতে দেখেছেন আর লাথি মেরে দূরে পাঠিয়ে দিয়েছেন!
কিন্তু আসল সত্যটা এর চেয়ে হাজার গুণ আলাদা ছিল। ইলুঙ্গা কোনো আনাড়ি খেলোয়াড় ছিলেন না। তিনি ছিলেন ঘরোয়া, মহাদেশীয় এবং আন্তর্জাতিক স্তরের একাধিক শিরোপাজয়ী এক অত্যন্ত অভিজ্ঞ ফুটবলার, যিনি জায়ারের হয়ে ১৯৭৪ সালের আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জিতেছিলেন। ১৯৭১ সাল থেকে তিনি জাতীয় দলের নিয়মিত ডিফেন্ডার। এমন একজন মানুষ ফুটবলের সাধারণ নিয়ম জানেন না, এই দাবিটিই ছিল চরম হাস্যকর।
২০১০ সালে বিবিসির কাছে ইলুঙ্গা নিজেই সেই সত্যের মুখোশ উন্মোচন করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি ফুটবলের নিয়মকানুন খুব ভালো করেই জানতাম। আমি ওটা ইচ্ছে করেই করেছিলাম।’
দীর্ঘ ৫২ বছর পর চলতি বিশ্বকাপে ডিআর কঙ্গো আবারও বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করার আগে পর্যন্ত, বিশ্বমঞ্চে তাদের শেষ স্মৃতি বলতে মানুষ এই ঘটনাটিকেই মনে রেখেছিল। কিন্তু এই তথাকথিত ‘কমেডি’র আড়ালে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার ট্র্যাজেডি এবং অত্যন্ত জটিল সত্য।
জায়ারের তৎকালীন স্বৈরশাসক মোবুতু সেসে সেকো খুব ভালো করেই বুঝতেন খেলার আন্তর্জাতিক মূল্য কতখানি। ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে দেশ শাসন করা এই একনায়ক ১৯৭১ সালে কঙ্গোর নাম বদলে রাখেন জায়ার। তার কাছে খেলাধুলা ছিল আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের ও দেশের প্রচারণার এক মোক্ষম হাতিয়ার।
জায়ার যখন প্রথম ব্ল্যাক আফ্রিকান দেশ হিসেবে শতভাগ জয়ের রেকর্ড নিয়ে এবং আফ্রিকান কাপ অব নেশনস জিতে ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করল, মোবুতু খুশিতে আত্মহারা হয়ে গেলেন। পুরো স্কোয়াডকে ডেকে পাঠানো হলো রাষ্ট্রপতির বিলাসবহুল প্রাসাদে। আততায়ীর হাতে খুন হওয়ার ভয়ে মোবুতু তখন প্রাসাদ থেকে খুব একটা বের হতেন না।
ফুটবলাররা সেই জাঁকজমক দেখে যেমন মুগ্ধ হয়েছিলেন, তেমনি ভেতরে ভেতরে এক ধরণের অস্বস্তিও কাজ করছিল। জন স্পার্লিং-এর লেখা ‘ডেথ অর গ্লোরি: দ্য ডার্ক হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড কাপ’ বইয়ে ইলুঙ্গা বলেছিলেন, ‘আমাদের মনে রাখতে হবে যে, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বড় হওয়া আমাদের অনেকের কাছে মোবুতুর সাথে দেখা করা মানে ঈশ্বরের সঙ্গে দেখা করার মতো ছিল।’
সেই বৈঠকে মোবুতু বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেন। বিশ্বমঞ্চে দেশের গর্ব তুলে ধরার পুরস্কার হিসেবে প্রত্যেক খেলোয়াড়কে দেওয়া হবে ব্র্যান্ড নিউ গাড়ি, বিলাসবহুল বাড়ি এবং নগদ ২০ হাজার ডলার। একই সঙ্গে পশ্চিম জার্মানির মূল আসরে তাদের জন্য অঢেল সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হলো। তারা চার্টার্ড বিমানে করে জার্মানিতে নামলেন, বিমানবন্দর থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া হলো ব্র্যান্ড নিউ মার্সিডিজ বাসে করে এক বিলাসবহুল হোটেলে।
কিন্তু আসল সমস্যা শুরু হলো যখন সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং ফুটবল ফেডারেশনের কর্তারা স্রেফ ‘সরকারি খরচে প্রমোদভ্রমণ’ করতে দলের সঙ্গে বিশাল বহর নিয়ে জার্মানি গিয়ে হাজির হলেন। এই চাটুকার, নিরাপত্তা কর্মী আর স্যুট-টাই পরা আমলাদের ভিড়ে খেলোয়াড়দের জন্য বরাদ্দকৃত পকেটের টাকা বা দৈনিক ভাতা হঠাৎ গায়েব হয়ে গেল!
অবস্থা এতটাই বেগতিক ছিল যে, খেলোয়াড়েরা যখন জার্মানি ঘুরে দেখার জন্য নিজেদের ভাতা চাইলেন, দলের যুগোস্লাভিয়ান কোচ ব্লাগোজে ভিদিনিচ তাদের হোটেলের বাইরে বের হতেই নিষেধ করে দিলেন। ডিফেন্ডার শিমেন বোয়াঙ্গা পরবর্তীতে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের মনোবল একদম ভেঙে পড়েছিল। আমাদের যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার কিছুই পূরণ হচ্ছিল না।’
টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচেই তারা স্কটল্যান্ডের কাছে ২-০ গোলে হেরে যায়। কেনি ডালগ্লিশ, ডেনিস ল-দের সেই শক্তিশালী স্কটিশ দলের বিরুদ্ধে এই হারটি যথেষ্ট সম্মানজনকই ছিল।
কিন্তু দ্বিতীয় ম্যাচের আগে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বিষাক্ত হয়ে ওঠে। যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের আগে জায়ারের সরকারি কর্মকর্তারা এক নজিরবিহীন সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, তাদের দেশের কোচ ভিদিনিচ আসলে নিজের মাতৃভূমির (যুগোস্লাভিয়ার) কাছে জায়ারের সব গেম-প্ল্যান এবং গোপন কৌশল পাচার করে দিয়েছেন! তারা ঠাণ্ডা মাথায় ঘোষণা করলেন, ‘আমাদের কাছে বিশ্বাস করার মতো যথেষ্ট কারণ আছে যে কোচ বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। আমরা ওনাকে আইসোলেশনে (বন্দি) রেখেছি এবং দলে কিছু বড় পরিবর্তন আনছি।’
টাকা চুরি এবং কোচের ওপর এমন মানসিক নির্যাতনের প্রতিবাদে খেলোয়াড়েরা ম্যাচের আগের রাতে ধর্মঘটের ডাক দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। অন্তত ৮ জন খেলোয়াড় ম্যাচ বয়কট করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেন—যা পরবর্তীতে তাদের জন্য আরো বড় বিপর্যয় ডেকে আনে।
ম্যাচের প্রস্তুতি তো নষ্ট হয়েছিলই, মাঠের পারফরম্যান্স ছিল আরও ভয়াবহ। মাত্র ১৮ মিনিটের মধ্যে জায়ার ৩-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে। ঠিক সেই মুহূর্তে আইসোলেশন থেকে মুক্ত হয়ে ডাগআউটে ফেরা কোচ ভিদিনিচ এক অদ্ভুত সিদ্ধান্ত নিলেন, তিনি এক নম্বর গোলরক্ষক কাজাদি মুয়াম্বাকে তুলে নিলেন, অথচ গোলগুলোর পেছনে তার কোনো ভুলই ছিল না।
এই অদ্ভুত ট্যাকটিক্স কোনো কাজে আসেনি। প্রথমার্ধেই স্কোরলাইন দাঁড়ায় ৬-০! এরই মধ্যে জায়ার ১০ জনের দলে পরিণত হয়, তবে সেই লাল কার্ডের পেছনেও ছিল এক চরম প্রহসন। চতুর্থ গোলটি হজম করার পর প্রচণ্ড ক্ষোভে ডিফেন্ডার ইলুঙ্গা কলম্বিয়ান রেফারি ওমর দেলগাদোর পেছনে গিয়ে কষিয়ে এক লাথি মারেন! লাথি মেরেই ইলুঙ্গা ভিড়ের মধ্যে পালিয়ে যান। রেফারি যখন ঘুরে তাকালেন, তিনি আসল অপরাধীকে দেখতে পাননি।
ফলে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ ফরোয়ার্ড এনদায়ে মুলাম্বাকে লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেন! যুগোস্লাভিয়ার দুজন খেলোয়াড় রেফারিকে আসল অপরাধী (ইলুঙ্গা)-কে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেও রেফারি নিজের ভুল সিদ্ধান্তেই অনড় থাকেন।
দ্বিতীয়ার্ধে তারা আরও ৩টি গোল খেয়ে ম্যাচটি ৯-০ ব্যবধানে হারে। এই লজ্জাজনক পরাজয়ের পর জায়ারের সরকারি কর্মকর্তারা ড্রেসিংরুমে ঢুকে খেলোয়াড়দের সরাসরি মৃত্যুর হুমকি দেন। ইলুঙ্গার ভাষ্যমতে, তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, ‘তোমরা জায়ারের বুকে চুনকালি মেখেছ। মোবুতু বলেছেন, ব্রাজিলের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে যদি তোমরা ৩টির বেশি গোল খাও, তবে তোমরা আর কোনোদিন নিজেদের পরিবার বা জায়ারের মুখ দেখতে পাবে না। তোমাদের সেখানেই শেষ করে দেওয়া হবে।’
এরপরই আসে সেই বিখ্যাত ফ্রি-কিক, যেখানে ব্রাজিলের অনুকূলে থাকা বল দূরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ইলুঙ্গা। ২০১৫ সালে মারা যাওয়ার আগে বিভিন্ন সময়ে তিনি এই ঘটনার ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। হয়তো সবগুলো কারণই কোনো না কোনোভাবে সত্য ছিল।
বিবিসির কাছে ২০১০ সালে তিনি দাবি করেছিলেন, ফেডারেশনের কর্তারা যারা তাদের টাকা চুরি করে গ্যালারিতে বসে আরাম করছেন, তাদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ থেকে তিনি ইচ্ছে করে লাল কার্ড পেয়ে মাঠ ছাড়তে চেয়েছিলেন।
তবে ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘ডেথ অর গ্লোরি’র জন্য স্পার্লিংকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছিল সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাখ্যা। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে ম্যাচ চলাকালীন তখন স্কোর ২-০। ঠিক তখনই ব্রাজিল এক বিপজ্জনক ফ্রি-কিক পায়। ইলুঙ্গা বলেন, ‘আমি প্যানিক করে ফেলেছিলাম। রিভেলিনো ওই দূরত্ব থেকে কী করতে পারে তা সবাই জানত। আমি ভাবলাম, স্কোর যদি ৩-০ হয়ে যায়, তবে আমরা আর বাড়ি ফিরতে পারব না, আমাদের মেরে ফেলা হবে! তাই ব্রাজিলের শট নেওয়ার আগে সময় নষ্ট করার জন্য আমি দৌড়ে গিয়ে বলটা লাথি মেরে উড়িয়ে দিই।’
অবশ্য ইলুঙ্গার সর্তীর্থদের অনেকে এই মৃত্যুর হুমকির বিষয়টি মানতে চাননি। দলের গোলরক্ষক মোহামেদ কালাম্বে বলেছিলেন, ‘ইলুঙ্গা একটু রাগী আর নার্ভাস স্বভাবের মানুষ ছিল। ওটা একটা আবনরমাল রিঅ্যাকশন ছিল। মোবুতু আমাদের শাস্তি দিতে পারতেন, কিন্তু হেরে যাওয়ার জন্য মেরে ফেলবেন—তা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’
বিশ্বকাপ শেষে জায়ার দল যখন দেশে ফিরল, তাদের কোনো বীরোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়নি। সেই প্রতিশ্রুতি দেওয়া গাড়ি, বাড়ি বা ২০,০০০ ডলারের এক সেন্টও কেউ পায়নি। খেলোয়াড়দের একটা বড় অংশ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পতিত হন। অনেকে দেশ ছেড়ে ইউরোপে পালিয়ে যান। দলের স্ট্রাইকার কাকোকো স্টুটগার্টের মার্সিডিজ ফ্যাক্টরিতে কাজ নেন, বোয়াঙ্গা ফ্রান্সে আর ইলুঙ্গার সন্তানেরা যুক্তরাজ্যে স্থায়ী হন।
কিন্তু জায়ার ফুটবলের এই সোনালী প্রজন্মের অনেকেই শেষ জীবনে চরম অভাবের মধ্যে, রাষ্ট্রের অবহেলায় মারা যান। মৃত্যুর আগে ইলুঙ্গা আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘আমাদের অনেকে আজ যাযাবরের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। আমি যদি আবার জীবনটা শুরু করতে পারতাম, তবে ফুটবলার না হয়ে কঠোর পরিশ্রমী একজন কৃষক হতাম।’