• ই-পেপার

মনের ভিতর বনের কুহু

  • আবু তাহের

তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য

সিরাজুল ইসলাম
তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের উন্নয়ন ভাবনায় পানি সবসময়ই একটি কেন্দ্রীয় বা মৌলিক উপাদান। বিশেষ করে নদীমাতৃক এই দেশে নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। সেই বাস্তবতায় তিস্তা নদী একদিকে যেমন উত্তরাঞ্চলের জীবনরেখা, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘদিনের একটি অমীমাংসিত সংকটের প্রতীক।

সাম্প্রতিক সময়ে বেইজিংয়ে বাংলাদেশ ও চীনের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে তিস্তা এবং অন্যান্য নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতার যে ঐকমত্য তৈরি হয়েছে, তা এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধানের নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের পানিসম্পদমন্ত্রী লি কোয়াইংয়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত বৈঠকে তিস্তা মহাপরিকল্পনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন রোধ, সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং নৌ-নেভিগেশন উন্নয়নের বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়।

এই আলোচনাকে কেবল একটি উন্নয়ন সহযোগিতা হিসেবে দেখা হলে বিষয়টির গভীরতা অনেকাংশেই কমে যাবে। কারণ এটি একই সঙ্গে একটি প্রযুক্তিগত প্রকল্প, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং কৌশলগত ভূরাজনৈতিক সমীকরণের অংশ।

তিস্তা : এক নদী, বহু সংকট

তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই নদী বছরে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ ধারণ করে। বর্ষাকালে অতিরিক্ত পানির কারণে ভয়াবহ বন্যা সৃষ্টি হয় যা ফসল, ঘরবাড়ি এবং অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি করে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষিকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

এই দ্বৈত সংকটের কারণে তিস্তা অঞ্চলে দারিদ্র্য, অভিবাসন এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দীর্ঘদিন ধরে চলমান। ফলে তিস্তা সমস্যা কেবল পানি বণ্টনের বিষয় নয়, বরং এটি একটি সামাজিক-অর্থনৈতিক সংকট।

দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি ঝুলে থাকায় এই সমস্যা সমাধানের বিকল্প পথ অনুসন্ধানও জরুরি হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে চীনের সঙ্গে সহযোগিতার উদ্যোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

চীনের সম্পৃক্ততা : প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও কৌশল

চীন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির অধিকারী দেশ। বড় নদী নিয়ন্ত্রণ, বন্যা প্রতিরোধ, বাঁধ নির্মাণ এবং সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে তাদের অভিজ্ঞতা বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত।

বৈঠকে চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনায় কারিগরি সহায়তা, প্রশিক্ষণ এবং যৌথ গবেষণার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে যৌথ ফিজিবিলিটি স্টাডি পরিচালনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্প সফলভাবে বাস্তবায়নের আগে বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং বাস্তবভিত্তিক মূল্যায়ন অপরিহার্য।

এছাড়া, চীনের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো এবং টোটাল ওয়াটার রিসোর্স ম্যানেজমেন্টে সহযোগিতার আগ্রহ প্রকাশ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে প্রযুক্তি বিনিময় এবং দক্ষতা উন্নয়নের একটি নতুন প্ল্যাটফর্ম তৈরি হতে পার

উন্নয়ন সহযোগিতা থেকে কৌশলগত অংশীদারিত্ব

বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ এবং শিল্পখাতে চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তবে তিস্তা প্রকল্পের মাধ্যমে এই সম্পর্ক আরো একটি নতুন স্তরে প্রবেশ করছে-যেখানে পানি ব্যবস্থাপনা এখন কেবল উন্নয়ন ইস্যু নয়, বরং কৌশলগত অংশীদারিত্বের অংশ।

কারণ পানি সম্পদ দক্ষিণ এশিয়ায় একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ভূ-রাজনৈতিক ইস্যু। আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর নিয়ন্ত্রণ, প্রবাহ এবং ব্যবহার শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক প্রভাবও তৈরি করে।

আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ

তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। এই অঞ্চলে ভারত দীর্ঘদিন ধরে নদী ব্যবস্থাপনা ও পানি কূটনীতিতে প্রধান ভূমিকা পালন করে আসছে।

এখন চীনের সক্রিয় উপস্থিতি একটি নতুন ভারসাম্যের প্রশ্ন তৈরি করছে। তবে এটিকে সরাসরি প্রতিযোগিতা হিসেবে না দেখে বরং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা হলে বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত সুবিধা তৈরি হতে পারে।

বাংলাদেশের অবস্থান এখানে অত্যন্ত সূক্ষ্ম। একদিকে বৃহৎ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা, অন্যদিকে জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণ- এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা : সম্ভাবনা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে। কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদীভাঙন হ্রাস এবং সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন- সবই এই প্রকল্পের সম্ভাব্য ফলাফল।

তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জও কম নয়। বড় অবকাঠামো প্রকল্পে অর্থনৈতিক স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অতীত অভিজ্ঞতা বলে, অনেক বড় প্রকল্প যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিকল্পনার অভাবে প্রত্যাশিত ফল দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এছাড়া, প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ অর্থের সদ্ব্যবহার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অতীত সরকারের সময় বহু বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছিল কিন্তু অর্থ লুটপাটের ঘটনাও ঘটেছে হরহামেশা।

এছাড়া, পরিবেশগত ভারসাম্য, নদীর প্রাকৃতিক প্রবাহ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা- এই বিষয়গুলোও পরিকল্পনায় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিস্তার

এই বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা। চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার। তবে দুই দেশের বাণিজ্য ভারসাম্য এখনো চীনের পক্ষে বেশি ঝুঁকে আছে।

বৈঠকে বাংলাদেশ চীনে রপ্তানি বৃদ্ধির সুযোগ এবং বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টি তুলে ধরেছে। একই সঙ্গে চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

এই অর্থনৈতিক সহযোগিতা যদি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়, তাহলে তা শুধু নদী ব্যবস্থাপনায় নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তাৎপর্য

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক এবং শি জিনপিংয়ের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাৎ এই সফরকে কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। দুটি চুক্তি ও ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর দুই দেশের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

এই ধরনের সমঝোতা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি করে, যা ভবিষ্যতে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার সুযোগ সৃষ্টি করে।

সম্ভাবনা ও সতর্কতার ভারসাম্য

সব মিলিয়ে বলা যায়, তিস্তা ও নদী ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ-চীন ঐকমত্য কেবল একটি অবকাঠামোগত প্রকল্প নয়; এটি একই সঙ্গে উন্নয়ন, প্রযুক্তি, অর্থনীতি এবং ভূ-রাজনীতির সমন্বিত একটি প্রক্রিয়া।

এই উদ্যোগ সফল হলে এটি বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার স্বচ্ছতা, বাস্তবায়নের দক্ষতা এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার ওপর।

কারণ বড় প্রকল্প যতটা সম্ভাবনা তৈরি করে, ততটাই ঝুঁকিও বহন করে। তাই এই নতুন সমীকরণকে শুধু আশাবাদের চোখে নয়, বরং বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিশ্লেষণ করাই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

উদ্ভাবনের আনন্দ : শ্রেণিকক্ষ থেকে জাতীয় মঞ্চে

অনলাইন ডেস্ক
উদ্ভাবনের আনন্দ : শ্রেণিকক্ষ থেকে জাতীয় মঞ্চে
এম. আরিফুজ্জামান। ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষক হিসেবে দীর্ঘ কর্মজীবনে অনেক অনুষ্ঠানের সাক্ষী হয়েছি। তবে গত ২৯ জুন বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলনকেন্দ্রে অনুষ্ঠিত ‘Startup, Science Project and Innovation Idea Showcasing’ প্রোগ্রামটি আমার হৃদয় ছুঁয়ে গেছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের আয়োজনে দেশব্যাপী যে সৃজনশীলতার স্ফুরণ ঘটেছে, তা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে।

একজন শিক্ষক হিসেবে জানি, শ্রেণিকক্ষে যখন কোনো শিক্ষার্থী পাঠ্যবইয়ের বাইরে গিয়ে কোনো প্রশ্ন করে বা নতুন কোনো আইডিয়া দেয়, তখনই তার ভেতরে সুপ্ত থাকা প্রতিভা জাগতে শুরু করে। এই প্রদর্শনীতে সারা দেশ থেকে নির্বাচিত সেরা ১০১টি প্রকল্পের উদ্ভাবনী দক্ষতা দেখে আমি অভিভূত। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার সহধর্মিণী, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস চেয়ারম্যান ডা. জুবাইদা রহমান। যখন প্রতিটি প্রজেক্ট ঘুরে দেখছিলেন এবং শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সরাসরি মতবিনিময় করছিলেন, তখন সেই দৃশ্যটি উপস্থিত প্রতিটি শিক্ষকের জন্য ছিল এক বিশাল অনুপ্রেরণার উৎস।

রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশিষ্টজনদের এই সরাসরি সম্পৃক্ততা শিক্ষার্থীদের মনে গেঁথে দিয়েছে এক অনন্য আত্মবিশ্বাস—তাদের উদ্ভাবন দেশ গড়ার কাজে গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে মেধাবী শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের পৃষ্ঠপোষকতার যে প্রতিশ্রুতি ছিল, তা আজ বাস্তবে রূপ নিতে দেখছি। বিশেষ করে ‘সুশিক্ষায় মেধাবী শিক্ষক’ পুরস্কার প্রবর্তনের বিষয়টি আমাকে অত্যন্ত আশান্বিত করেছে। একজন শিক্ষক হিসেবে মনে করি, শিক্ষার্থীর উদ্ভাবনী মেধা বিকাশের নেপথ্যে একজন অনুপ্রেরণাদায়ী শিক্ষকের ভূমিকা অপরিসীম। এই স্বীকৃতি আমাদের মতো শিক্ষকদের আরো নিবেদিতপ্রাণ হয়ে কাজ করতে উৎসাহিত করবে।

তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা এই খুদে উদ্ভাবকরা আমাদের দেশের সম্পদ। উপজেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতার মাধ্যমে গ্রাম ও শহরের মেধার যে সমন্বয় ঘটেছে, তা ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের মূল চালিকাশক্তি হতে পারে। এই আইডিয়াগুলোকে যদি আমরা সঠিক মেন্টরশিপ ও গবেষণার সুযোগ দিয়ে এগিয়ে নিতে পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে এই শিক্ষার্থীরাই দেশের অর্থনীতিতে বড় পরিবর্তন আনবে।

এই আয়োজনের সবচেয়ে প্রাণবন্ত দিকটি ছিল শিক্ষার্থীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। সারা দেশ থেকে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বাছাই পর্ব পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসা ১০১টি প্রকল্পের উদ্ভাবনী শৈলী দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি।

তবে আমাদের লক্ষ্য এখানেই শেষ হওয়া উচিত নয়। এই উদ্ভাবনগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী মেন্টরশিপ ও গবেষণার পরিবেশ। বিদ্যালয়গুলো যেন কেবল সার্টিফিকেট অর্জনের জায়গা না হয়ে ওঠে, বরং গবেষণার ক্ষুদ্র গবেষণাগারে পরিণত হয়—সেটিই আমাদের প্রত্যাশা। প্রধানমন্ত্রীর এই সময়োপযোগী উদ্যোগকে আমরা শিক্ষকসমাজ স্বাগত জানাই। আজকের খুদে উদ্ভাবকদের অদম্য শক্তিই হোক আমাদের আগামীর প্রেরণা।

লেখক : এম. আরিফুজ্জামান, সিনিয়র শিক্ষক,
মেহেউদ্দিন মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়,
জিয়ানগর, পিরোজপুর।

তারেক রহমান সরকারের জনকল্যাণমুখী বাজেট

সিরাজুল ইসলাম
তারেক রহমান সরকারের জনকল্যাণমুখী বাজেট
সংগৃহীত ছবি

একটি বাজেট শুধু আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়। একটি বাজেট আসলে একটি সরকারের রাজনৈতিক দর্শন, অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। সে কারণেই নতুন সরকারের প্রথম বাজেট সব সময়ই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ জনগণ তখন শুধু বরাদ্দের অঙ্ক দেখে না; তারা খুঁজে দেখে সরকার কোন দিকে দেশকে নিয়ে যেতে চায়।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটও সেই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরতির পর ক্ষমতায় আসা সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট হিসেবে এটি দেশের অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনা সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে। বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার কেবল প্রবৃদ্ধির কথা বলেনি বরং মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা এবং জাতীয় নিরাপত্তার মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছে। অনেক সময় আমরা উন্নয়ন বলতে শুধু বড় বড় সেতু, মহাসড়ক কিংবা অবকাঠামো প্রকল্পকে বুঝি। কিন্তু বাস্তবতা হলো উন্নয়নের প্রকৃত ভিত্তি মানুষ। দক্ষ, শিক্ষিত, সুস্থ এবং উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী ছাড়া কোনো দেশ দীর্ঘ মেয়াদে এগিয়ে যেতে পারে না। এবারের বাজেটে সেই বাস্তবতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই এটি অনেকের কাছে জনবান্ধব বাজেট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

শিক্ষা খাতের দিকে তাকালে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়। বিশ্বের যে দেশগুলো দ্রুত উন্নতি করেছে, তাদের প্রায় সবকটিই শিক্ষাকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করেছিল। দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর কিংবা মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখলে বোঝা যায়, মানবসম্পদে বিনিয়োগের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু এই জনসংখ্যাকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে সেটিই আবার বোঝায় পরিণত হতে পারে। সেই কারণে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; এটি ভবিষ্যৎ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কেবল সনদ নয়, প্রয়োজন দক্ষতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্য-প্রযুক্তি, কারিগরি শিক্ষা এবং গবেষণার ওপর জোর না দিলে ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই শিক্ষা খাতে বাড়তি মনোযোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ।

একইভাবে স্বাস্থ্য খাতের গুরুত্বও নতুন করে ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। করোনা মহামারির পর পুরো বিশ্ব বুঝেছে, স্বাস্থ্য খাতকে অবহেলা করলে তার মূল্য অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র—সবাইকে দিতে হয়। একজন অসুস্থ নাগরিক যেমন উৎপাদনশীল হতে পারেন না, তেমনি একটি দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা জাতীয় উন্নয়নের গতি কমিয়ে দেয়।
বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে এখনো অনেক মানুষ মানসম্মত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, চিকিৎসক সংকট দূর করা, আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের নাগালের মধ্যে আনা সময়ের দাবি। বাজেটে এই খাতকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলেই সাধারণ মানুষ আশাবাদী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।

তবে আমার দৃষ্টিতে এবারের বাজেটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হলো রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্ন। একটি রাষ্ট্র কেবল অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হলেই চলে না; তাকে নিরাপদও হতে হয়। বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। সাইবার হামলা, প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধ, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।

এ অবস্থায় প্রতিরক্ষা খাতে বিনিয়োগকে শুধু ব্যয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। এটি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষার একটি অপরিহার্য উপাদান। একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং দক্ষ সশস্ত্র বাহিনী শুধু যুদ্ধের জন্য নয়; দুর্যোগ মোকাবেলা, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন এবং জাতীয় সংকট মোকাবেলাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই সামরিক খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

এবারের বাজেটের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুত্বারোপ। একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, ততটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছে দেওয়া। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে না নিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। দরিদ্র, প্রবীণ, বিধবা, প্রতিবন্ধী এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি তাই রাষ্ট্রের মানবিক দায়িত্বের অংশ।

এ ছাড়া কৃষি খাতের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশের অর্থনীতি যতই শিল্প ও সেবাখাতনির্ভর হোক, কৃষির গুরুত্ব কখনো কমবে না। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখতে কৃষির বিকল্প নেই। কৃষক যদি ন্যায্য মূল্য না পান, তাহলে পুরো অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই কৃষি উৎপাদন, সংরক্ষণ এবং বাজার ব্যবস্থাপনার উন্নয়নও বাজেট বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের প্রশ্নটিও এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। তাদের জন্য যথেষ্ট কর্মসংস্থান তৈরি না হলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়বে। ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিবেশ সৃষ্টি, ব্যবসা সহজীকরণ এবং উদ্যোক্তাদের জন্য সহায়ক নীতি গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া, যথেষ্ট পরিমাণে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা না হলে এই শিক্ষিত তরুণ সমাজ সমাজের বোঝা হয়ে উঠবে। তাতে সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে, নানা রকম অপরাধমুলক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিরও আশঙ্কা থাকে।

বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। সাধারণ মানুষের কাছে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বৃদ্ধি মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তখনই অর্থবহ হবে, যখন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ন্ত্রণে থাকবে। তাই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হয়, সেটিই হবে এই বাজেটের অন্যতম বড় পরীক্ষার ক্ষেত্র।

তবে বাজেট যত ভালোই হোক, বাস্তবায়নই শেষ কথা। বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেক সময় দেখা গেছে, উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা কাগজে থাকলেও মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন ঘটেনি। এখানেই সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রথমত, রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। উন্নয়ন ব্যয় পরিচালনার জন্য সরকারের আয় বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি ও অপচয় কমাতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্পে অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধি এবং সময়ক্ষেপণ দীর্ঘদিনের সমস্যা। তৃতীয়ত, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে হবে। বরাদ্দ ঘোষণা করলেই হবে না; তা সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো, জনগণ এখন শুধু প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না; তারা ফলাফল দেখতে চায়। তারা জানতে চায়- শিক্ষা খাতে বরাদ্দের ফলে বিদ্যালয়ের মান কতটা বাড়ল, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের ফলে চিকিৎসাসেবা কতটা উন্নত হলো, আর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল তাদের জীবনে কতটা পৌঁছালো।

সুতরাং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু একটি অর্থনৈতিক দলিল হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার, একটি উন্নয়ন দর্শন এবং একটি ভবিষ্যৎ রূপরেখা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ওপর জোর দিয়ে সরকার যে বার্তা দিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।

এখন অপেক্ষা একটাই—ঘোষণার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধান কতটা কমানো যায়। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত বাজেটের অঙ্ককে নয় বরং তার ফলাফলকেই মনে রাখে। যদি এই বাজেটের লক্ষ্যসমূহ সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তাহলে এটি শুধু একটি অর্থবছরের পরিকল্পনা হয়ে থাকবে না; বরং বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

জামায়াতের পরিকল্পিত রাজনৈতিক আন্দোলনের নেপথ্যের আসল কারণ কী

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
জামায়াতের পরিকল্পিত রাজনৈতিক আন্দোলনের নেপথ্যের আসল কারণ কী
সংগৃহীত ছবি

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছে। দেশের প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ই বিভিন্ন ধরনের বয়ান সামনে এসেছে। কখনো গণতন্ত্র ও সংস্কারের দাবি হিসেবে তা এসেছে। আবার কখনো তা এসেছে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আবার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। জামায়াতে ইসলামীর পরিকল্পিত এক মাসব্যাপী আন্দোলন কি সত্যিই রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে? নাকি তা নির্বাচনী হতাশার পর হারানো রাজনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের একটি কৌশল? জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের দাবি, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য হলো সংবিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থায় অর্থবহ সংস্কার আনা, যাতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরো শক্তিশালী হয়। 

তবে সমালোচকেরা এটাকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। তাদের মতে, সংস্কারের ভাষা এখন এমন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে দলটি নিজেদের প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়া নির্বাচনী ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করছে। 

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা ব্যাপক আশাবাদ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। অনেকের ধারণা ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের সুযোগ করে দেবে। কিন্তু যদি ধরে নেওয়া হয় যে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল জামায়াত এবং তাদের মিত্রদের জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। বেশ কয়েকজন পর্যবেক্ষকের মতে এই প্রত্যাখ্যান সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। যার মধ্যে তরুণ ভোটার, নারী, পেশাজীবী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও ছিল। তাদের দৃষ্টিতে আধুনিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন এবং একই সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধের প্রধান রক্ষক হিসেবে পরিচিতি গড়ে তোলার জন্য জামায়াতের প্রচেষ্টা অনেক ভোটারের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। 

সমালোচকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে দলটির ঐতিহাসিক ভূমিকার যে স্মৃতি বিদ্যমান মানুষের কাছে, সেখানে এটি তাদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জনমনে তাদের সম্পর্কে ধারণাকে এখনো প্রভাবিত করে চলেছে। 

জামায়াতের রাজনৈতিক মিত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জোটটির জনসমর্থন দুর্বল করে দিয়েছে। তাদের দাবি সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, জোটের একটি অংশ রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এসব অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হোক বা না হোক, সমালোচকদের মতে, এর রাজনৈতিক প্রভাব জনগণের আস্থা কমিয়ে দিতে ভূমিকা রাখতে পারে। 

যদি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল সত্যিই ভোটারদের রায়ের প্রতিফলন হয়ে থাকে তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই রায় সব রাজনৈতিক পক্ষের মেনে নেওয়া উচিত। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের ফলাফলে হতাশ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রত্যাশা থাকে যে তারা নিজেদের পুনর্গঠন করবে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেবে। রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য নির্বাচনের বাইরের কোনো পথ অনুসরণ না করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়াই তাদের দায়িত্ব। এই প্রেক্ষাপটেই জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে, গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনার প্রসঙ্গ টেনে এনে তাঁদের দেওয়া মন্তব্য দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। 

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য গণতান্ত্রিক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় না, বিশেষত যখন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানানো বা রাজনৈতিক প্রতিকার চাওয়ার জন্য আইনসম্মত ও সাংবিধানিক পথ খোলা রয়েছে। 

এটি স্বাভাবিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই মতপার্থক্য প্রকাশ ও সমাধানের সুযোগ বিদ্যমান থাকে, তবে গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততার পরিবর্তে কেন সংঘাতমুখী ভাষা বেছে নেওয়া হচ্ছে? রাজনৈতিক মতভেদ গণতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এটাই দাবি করে যে, বিরোধ ও মতপার্থক্যের সমাধান সাংবিধানিক পথেই খোঁজা উচিত। আর, এমন বক্তব্য বা ভাষা ব্যবহার না করা উচিত, যা সামাজিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলার ঝুঁকি সৃষ্টি করে।

কিছু বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে গণ-আন্দোলন বা ব্যাপক জনসমাবেশ গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের প্রশ্ন, অত্যন্ত আবেগঘন ও উত্তেজনাপূর্ণ জনমুখী প্রচারণা কি অনিচ্ছাকৃতভাবে—অথবা ইচ্ছাকৃতভাবেই দেশকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে পারে? অতীতে বাংলাদেশ রাজপথের সংঘাতের ক্ষতিকর পরিণতি প্রত্যক্ষ করেছে। তাই, যেসব রাজনৈতিক কৌশল দেশকে আবারও অস্থিরতা ও সংঘাতের পুনরাবৃত্ত চক্রে ফিরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, সেই বিষয়ে অনেক নাগরিকই সতর্ক ও শঙ্কিত।

জামায়াতকে ঘিরে চলমান বিতর্ককে তাদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের কারণে তারা এখনো জনপরিসরে নিবিড় পর্যালোচনা ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশের অনেকের কাছেই এই ইতিহাস জাতীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার কিংবা এর তাৎপর্যকে খাটো করে দেখানোর, তা বাস্তব হোক বা কেবল এমন ধারণা সৃষ্টির প্রচেষ্টা হোক, এমন যে কোনো প্রচেষ্টাই অনিবার্যভাবে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

সমালোচকদের মতে, অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক সময়ে দেশের ইতিহাসের বয়ান নতুনভাবে নির্মাণের যে প্রচেষ্টা হাতে নেওয়া হয়েছিল, তা নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম এবং তাদের পাশাপাশি, দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অটুট রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সাধারণ মানুষের দৃঢ় প্রতিরোধের মুখে পড়ে। তাঁদের মূল্যায়ন হচ্ছে, বৃহত্তর বাঙালি জাতীয় পরিচয় এখনো স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে উৎসারিত আদর্শের ওপরই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাই সেই ঐকমত্য থেকে সরে আসার যে কোনো প্রচেষ্টাই নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে বেশ কঠিন।

এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘোষণাটি আরো গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। শান্তিপূর্ণভাবে এবং আইনের সীমার মধ্যে থেকে জনসমাবেশ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পরিচালনা করা সবারই গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে দেশব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের সময়কাল এবং উদ্দেশ্য স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নের জন্ম দেয় যে এর প্রকৃত লক্ষ্য কী?

একটি ব্যাখ্যা হলো, এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রতিশ্রুত সংস্কার ও অঙ্গীকার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, খানিকটা সন্দেহ মনে ধরে রেখে আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা যেতে পারে, সংস্কারের এজেন্ডাকে আসলে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সরকারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করা এবং দেশে এক ধরনের অনিশ্চয়তার পরিবেশ বজায় রাখাই এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের কৌশলের পেছনে আরো বিস্তৃত একটি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করছে। যদি একটি নির্বাচিত সরকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করতে পারে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি অর্জন করে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সুসংহত করতে সক্ষম হয়, তাহলে আগামী বহু বছর ধরে জামায়াতের শাসনক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে অনেকটাই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কেবল একটি দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি হিসেবে নয়, বরং এমন এক পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হতে পারে, যা এককভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় পৌঁছাতে অক্ষম রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নতুন বা বিকল্প সুযোগ এনে দেয়।

অবশ্য এই ব্যাখ্যাটি কতটা সঠিক, তা এখনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। তবে শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভিত্তি হলো নির্বাচনের ফলাফলকে সম্মান করা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং মতপার্থক্যের সমাধান শান্তিপূর্ণ উপায়ে খুঁজে নেওয়া। সংস্কারের দাবি তোলা, সরকারের সমালোচনা করা এবং জনমত সংগঠিত করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর। একই সঙ্গে তাদের ওপর এই দায়িত্বও বর্তায় যে, এমন কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড থেকে তারা বিরত থাকবে যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল করতে পারে অথবা সংঘাতকে উৎসাহিত করতে পারে।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শুধু ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডের ওপর নয়, সমানভাবে নির্ভর করে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর আচরণ ও ভূমিকার ওপরও। স্থায়ী রাজনৈতিক সংকটের আবহে প্রকৃত সংস্কার কখনো বিকশিত হতে পারে না। একইভাবে, নির্বাচনের ফলাফল কেবল নিজের পক্ষে এলে তা মেনে নেওয়ার প্রবণতা থাকলে গণতন্ত্রও কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।

তাই, মূল প্রশ্নটি এখনো একই রয়ে গেছে-বর্তমান আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য কি সত্যিই আরো শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, নাকি নির্বাচনী হতাশার পর নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য? তবে শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবেন বাংলাদেশের জনগণই, তাঁদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং সাংবিধানিক রাজনীতির প্রতি অব্যাহত অঙ্গীকারের মাধ্যমে।