• ই-পেপার

তারেক রহমান সরকারের জনকল্যাণমুখী বাজেট

জামায়াতের পরিকল্পিত রাজনৈতিক আন্দোলনের নেপথ্যের আসল কারণ কী

রাজনৈতিক বিশ্লেষক
জামায়াতের পরিকল্পিত রাজনৈতিক আন্দোলনের নেপথ্যের আসল কারণ কী
সংগৃহীত ছবি

স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ বারবার রাজনৈতিক অস্থিরতার মুখোমুখি হয়েছে। দেশের প্রতিটি বড় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময়ই বিভিন্ন ধরনের বয়ান সামনে এসেছে। কখনো গণতন্ত্র ও সংস্কারের দাবি হিসেবে তা এসেছে। আবার কখনো তা এসেছে রাজনৈতিক ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে।

সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিও আবার একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে এনেছে। জামায়াতে ইসলামীর পরিকল্পিত এক মাসব্যাপী আন্দোলন কি সত্যিই রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের উদ্দেশ্যে? নাকি তা নির্বাচনী হতাশার পর হারানো রাজনৈতিক প্রভাব পুনরুদ্ধারের একটি কৌশল? জামায়াতে ইসলামীর সমর্থকদের দাবি, তাদের আন্দোলনের লক্ষ্য হলো সংবিধান ও রাষ্ট্র পরিচালনা ব্যবস্থায় অর্থবহ সংস্কার আনা, যাতে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরো শক্তিশালী হয়। 

তবে সমালোচকেরা এটাকে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখেন। তাদের মতে, সংস্কারের ভাষা এখন এমন একটি রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে, যার মাধ্যমে দলটি নিজেদের প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়া নির্বাচনী ফলাফলকে চ্যালেঞ্জ করার চেষ্টা করছে। 

এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা ব্যাপক আশাবাদ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। অনেকের ধারণা ছিল তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাদের জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ের সুযোগ করে দেবে। কিন্তু যদি ধরে নেওয়া হয় যে ভোটাররা শেষ পর্যন্ত তাদের রাজনৈতিক অবস্থান প্রত্যাখ্যান করেছেন, তাহলে নির্বাচনের ফলাফল জামায়াত এবং তাদের মিত্রদের জন্য একটি বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। বেশ কয়েকজন পর্যবেক্ষকের মতে এই প্রত্যাখ্যান সমাজের বিভিন্ন স্তরে ছড়িয়ে পড়েছিল। যার মধ্যে তরুণ ভোটার, নারী, পেশাজীবী এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীও ছিল। তাদের দৃষ্টিতে আধুনিক রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন এবং একই সঙ্গে ইসলামী মূল্যবোধের প্রধান রক্ষক হিসেবে পরিচিতি গড়ে তোলার জন্য জামায়াতের প্রচেষ্টা অনেক ভোটারের কাছেই গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। 

সমালোচকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর সহযোগী হিসেবে দলটির ঐতিহাসিক ভূমিকার যে স্মৃতি বিদ্যমান মানুষের কাছে, সেখানে এটি তাদের ভাবমূর্তি পরিবর্তনের নানা প্রচেষ্টা সত্ত্বেও জনমনে তাদের সম্পর্কে ধারণাকে এখনো প্রভাবিত করে চলেছে। 

জামায়াতের রাজনৈতিক মিত্রদের ভবিষ্যৎ নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে। কয়েকজন বিশ্লেষকের মতে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ জোটটির জনসমর্থন দুর্বল করে দিয়েছে। তাদের দাবি সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, জোটের একটি অংশ রাজনৈতিক সুবিধাবাদের অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ায় সেই প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। এসব অভিযোগ শেষ পর্যন্ত প্রমাণিত হোক বা না হোক, সমালোচকদের মতে, এর রাজনৈতিক প্রভাব জনগণের আস্থা কমিয়ে দিতে ভূমিকা রাখতে পারে। 

যদি ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের ফলাফল সত্যিই ভোটারদের রায়ের প্রতিফলন হয়ে থাকে তবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সেই রায় সব রাজনৈতিক পক্ষের মেনে নেওয়া উচিত। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচনের ফলাফলে হতাশ রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রত্যাশা থাকে যে তারা নিজেদের পুনর্গঠন করবে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেবে। রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তনের জন্য নির্বাচনের বাইরের কোনো পথ অনুসরণ না করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্যেই প্রতিযোগিতা চালিয়ে যাওয়াই তাদের দায়িত্ব। এই প্রেক্ষাপটেই জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বক্তব্যগুলো ব্যাপক মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। বিশেষ করে, গৃহযুদ্ধের সম্ভাবনার প্রসঙ্গ টেনে এনে তাঁদের দেওয়া মন্তব্য দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। 

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য গণতান্ত্রিক নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে মনে হয় না, বিশেষত যখন নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে আপত্তি জানানো বা রাজনৈতিক প্রতিকার চাওয়ার জন্য আইনসম্মত ও সাংবিধানিক পথ খোলা রয়েছে। 

এটি স্বাভাবিকভাবেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের জন্ম দেয়। যদি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই মতপার্থক্য প্রকাশ ও সমাধানের সুযোগ বিদ্যমান থাকে, তবে গণতান্ত্রিক সম্পৃক্ততার পরিবর্তে কেন সংঘাতমুখী ভাষা বেছে নেওয়া হচ্ছে? রাজনৈতিক মতভেদ গণতন্ত্রের একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। তবে দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এটাই দাবি করে যে, বিরোধ ও মতপার্থক্যের সমাধান সাংবিধানিক পথেই খোঁজা উচিত। আর, এমন বক্তব্য বা ভাষা ব্যবহার না করা উচিত, যা সামাজিক উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে তোলার ঝুঁকি সৃষ্টি করে।

কিছু বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বাইরে গণ-আন্দোলন বা ব্যাপক জনসমাবেশ গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের প্রশ্ন, অত্যন্ত আবেগঘন ও উত্তেজনাপূর্ণ জনমুখী প্রচারণা কি অনিচ্ছাকৃতভাবে—অথবা ইচ্ছাকৃতভাবেই দেশকে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে পারে? অতীতে বাংলাদেশ রাজপথের সংঘাতের ক্ষতিকর পরিণতি প্রত্যক্ষ করেছে। তাই, যেসব রাজনৈতিক কৌশল দেশকে আবারও অস্থিরতা ও সংঘাতের পুনরাবৃত্ত চক্রে ফিরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, সেই বিষয়ে অনেক নাগরিকই সতর্ক ও শঙ্কিত।

জামায়াতকে ঘিরে চলমান বিতর্ককে তাদের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের কারণে তারা এখনো জনপরিসরে নিবিড় পর্যালোচনা ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়। বাংলাদেশের অনেকের কাছেই এই ইতিহাস জাতীয় পরিচয় এবং রাজনৈতিক চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার কিংবা এর তাৎপর্যকে খাটো করে দেখানোর, তা বাস্তব হোক বা কেবল এমন ধারণা সৃষ্টির প্রচেষ্টা হোক, এমন যে কোনো প্রচেষ্টাই অনিবার্যভাবে জনমনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয়।

সমালোচকদের মতে, অন্তর্বর্তী রাজনৈতিক সময়ে দেশের ইতিহাসের বয়ান নতুনভাবে নির্মাণের যে প্রচেষ্টা হাতে নেওয়া হয়েছিল, তা নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ, গণমাধ্যম এবং তাদের পাশাপাশি, দেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অটুট রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ সাধারণ মানুষের দৃঢ় প্রতিরোধের মুখে পড়ে। তাঁদের মূল্যায়ন হচ্ছে, বৃহত্তর বাঙালি জাতীয় পরিচয় এখনো স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে উৎসারিত আদর্শের ওপরই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত। তাই সেই ঐকমত্য থেকে সরে আসার যে কোনো প্রচেষ্টাই নিঃসন্দেহে রাজনৈতিকভাবে বেশ কঠিন।

এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক আন্দোলনের ঘোষণাটি আরো গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে। শান্তিপূর্ণভাবে এবং আইনের সীমার মধ্যে থেকে জনসমাবেশ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পরিচালনা করা সবারই গণতান্ত্রিক অধিকার। তবে দেশব্যাপী দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনের সময়কাল এবং উদ্দেশ্য স্বাভাবিকভাবেই এই প্রশ্নের জন্ম দেয় যে এর প্রকৃত লক্ষ্য কী?

একটি ব্যাখ্যা হলো, এই আন্দোলনের উদ্দেশ্য জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত প্রতিশ্রুত সংস্কার ও অঙ্গীকার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, খানিকটা সন্দেহ মনে ধরে রেখে আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা যেতে পারে, সংস্কারের এজেন্ডাকে আসলে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে সরকারের ওপর দীর্ঘস্থায়ী চাপ সৃষ্টি করা এবং দেশে এক ধরনের অনিশ্চয়তার পরিবেশ বজায় রাখাই এই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য।

সমালোচকদের মতে, এ ধরনের কৌশলের পেছনে আরো বিস্তৃত একটি রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করছে। যদি একটি নির্বাচিত সরকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করতে পারে, সুশাসন প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতি অর্জন করে এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সুসংহত করতে সক্ষম হয়, তাহলে আগামী বহু বছর ধরে জামায়াতের শাসনক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা কমে যেতে পারে অনেকটাই। এই দৃষ্টিকোণ থেকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে কেবল একটি দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি হিসেবে নয়, বরং এমন এক পরিস্থিতি হিসেবে দেখা হতে পারে, যা এককভাবে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় পৌঁছাতে অক্ষম রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নতুন বা বিকল্প সুযোগ এনে দেয়।

অবশ্য এই ব্যাখ্যাটি কতটা সঠিক, তা এখনো রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়। তবে শেষ পর্যন্ত গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভিত্তি হলো নির্বাচনের ফলাফলকে সম্মান করা, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা এবং মতপার্থক্যের সমাধান শান্তিপূর্ণ উপায়ে খুঁজে নেওয়া। সংস্কারের দাবি তোলা, সরকারের সমালোচনা করা এবং জনমত সংগঠিত করার পূর্ণ অধিকার রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর। একই সঙ্গে তাদের ওপর এই দায়িত্বও বর্তায় যে, এমন কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড থেকে তারা বিরত থাকবে যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের আস্থা দুর্বল করতে পারে অথবা সংঘাতকে উৎসাহিত করতে পারে।

বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করে শুধু ক্ষমতাসীনদের কর্মকাণ্ডের ওপর নয়, সমানভাবে নির্ভর করে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর আচরণ ও ভূমিকার ওপরও। স্থায়ী রাজনৈতিক সংকটের আবহে প্রকৃত সংস্কার কখনো বিকশিত হতে পারে না। একইভাবে, নির্বাচনের ফলাফল কেবল নিজের পক্ষে এলে তা মেনে নেওয়ার প্রবণতা থাকলে গণতন্ত্রও কখনো শক্তিশালী হতে পারে না।

তাই, মূল প্রশ্নটি এখনো একই রয়ে গেছে-বর্তমান আন্দোলনের প্রধান লক্ষ্য কি সত্যিই আরো শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, নাকি নির্বাচনী হতাশার পর নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখাই এর মূল উদ্দেশ্য? তবে শেষ পর্যন্ত এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারণ করবেন বাংলাদেশের জনগণই, তাঁদের গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং সাংবিধানিক রাজনীতির প্রতি অব্যাহত অঙ্গীকারের মাধ্যমে।

রাষ্ট্রেরও চরিত্র থাকে

জিল্লুর রহমান
রাষ্ট্রেরও চরিত্র থাকে

রাষ্ট্রেরও চরিত্র থাকে

কোনো কোনো সপ্তাহে চারটি আলাদা ঘটনা যেন একটি বড় গল্পের চারটি অধ্যায় হয়ে ওঠে। প্রথমে মনে হয়, এদের মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। একটি কূটনীতি, একটি বাণিজ্য, একটি যুদ্ধ, আরেকটি নিছক জীবনদর্শন। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, চারটির কেন্দ্রেই রয়েছে একটি শব্দ-বিচক্ষণতা। রাষ্ট্রের যেমন চরিত্র থাকে, মানুষেরও থাকে। রাষ্ট্র যেমন প্রতিটি প্রস্তাব গ্রহণ করে না, মানুষও তেমনি প্রতিটি শব্দের উত্তর দেয় না। রাষ্ট্র যেমন সব শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখে, কিন্তু কারও অধীন হয় না; মানুষও তেমনি সবার সঙ্গে সৌজন্য বজায় রাখে, কিন্তু সবার জন্য নিজের ভিতরের দরজা খুলে দেয় না। এই সপ্তাহের ঘটনাগুলো যেন সেই পুরোনো সত্যটিকেই নতুন করে মনে করিয়ে দিল।

১. চীন, মালয়েশিয়া এবং সুযোগের রাজনীতি

প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া ও চীন সফর নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা যতটা হয়েছে, অর্থনৈতিক আলোচনা ততটা হয়নি। অথচ আধুনিক কূটনীতির সাফল্য আর করমর্দনের ছবিতে মাপা হয় না; মাপা হয় বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান, বাজার এবং আস্থার অঙ্কে। মালয়েশিয়া শুধু শ্রমবাজার নয়; দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত কেন্দ্র। অন্যদিকে চীন অবকাঠামো, শিল্প, উৎপাদন এবং বিনিয়োগে বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার। কিন্তু এই দুটি সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা অন্যত্র। 

বাংলাদেশের সামনে এখন ‘কার সঙ্গে যাব’, এই প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, কীভাবে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ করা যায়। একসময় বিশ্বায়ন আমাদের শিখিয়েছিল দক্ষতার ভাষা। এখন ভূরাজনীতি শেখাচ্ছে স্থিতিস্থাপকতার ভাষা। সরবরাহ শৃঙ্খল বদলাচ্ছে, নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠছে, উৎপাদনের মানচিত্র পুনর্লিখিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের ভিতরেই বাংলাদেশের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। কূটনীতি কখনো পক্ষ বেছে নেওয়ার শিল্প নয়; কূটনীতি হলো বিকল্প তৈরি করার শিল্প।

২. আমেরিকার জন্মদিন, ট্রাম্প এবং বাংলাদেশের পরীক্ষা

যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতা দিবস সামনে। ১৭৭৬ সালের সেই ঘোষণাপত্র শুধু একটি দেশের জন্ম দেয়নি; রাষ্ট্র, স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার একটি নতুন রাজনৈতিক ধারণারও জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু আজকের আমেরিকা আর ১৭৭৬ সালের আমেরিকা এক নয়। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের পর আবারও ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি বৈশ্বিক বাণিজ্যকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। শুল্ক, প্রযুক্তি, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং নিরাপত্তা এখন একই আলোচনার অংশ।

বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ কী? অর্থ হলো, আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি কারও ঘনিষ্ঠ হওয়া নয়; বিশ্বাসযোগ্য হওয়া। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি বাজার। ইউরোপ প্রধান ক্রেতা। চীন বড় বিনিয়োগকারী। ভারত অপরিহার্য প্রতিবেশী। জাপান উন্নয়নের দীর্ঘমেয়াদি সহযোগী। এদের কাউকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ লেখা সম্ভব নয়। ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভারসাম্য। একজন দক্ষ মাঝি বাতাসের সঙ্গে যুদ্ধ করেন না; তিনি শুধু পাল বদলে দেন। রাষ্ট্র পরিচালনাও তেমনি। সময়ের পরিবর্তনকে অস্বীকার করে নয়, বুঝে এগোতে হয়। যে রাষ্ট্র নিজের কম্পাস নিজে ধরে রাখতে পারে, শেষ পর্যন্ত তারাই অন্যদের কাছে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হয়ে ওঠে।

তবে একটি বিষয় আমাদের কখনো ভুলে গেলে চলবে না। ভূরাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বলে কিছু নেই, যেমন স্থায়ী শত্রুও নেই। স্থায়ী থাকে কেবল জাতীয় স্বার্থ। আজ যে দেশ আমাদের সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী, কাল সে-ই কোনো বাণিজ্যিক ইস্যুতে কঠোর অবস্থান নিতে পারে। আবার যে দেশ আজ শুল্ক আরোপ করছে, আগামীকাল সে-ই নতুন বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসতে পারে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এই বাস্তবতাকে আবেগ দিয়ে নয়, প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝতে হয়।

বাংলাদেশের সামনে আজ একটি বিরল সুযোগ রয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আমরা দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করছি। বঙ্গোপসাগর আজ আর শুধু সমুদ্র নয়; এটি জ্বালানি, বাণিজ্য, নৌ-নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। যে রাষ্ট্র এই পরিবর্তন বুঝতে পারবে, ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক মানচিত্রে তার অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে।

কিন্তু একটি বন্দর নির্মাণের চেয়েও কঠিন কাজ হলো আস্থা নির্মাণ। বিদেশি বিনিয়োগ আসে শুধু কর-সুবিধা দেখে নয়; আসে নীতির ধারাবাহিকতা, আইনের শাসন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর ভর করে। তাই কূটনীতির সাফল্য শেষ পর্যন্ত দেশের ভিতরের সুশাসনের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা বলেন, ছোট রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সামরিক শক্তি নয়; তার বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি নির্ভরযোগ্য রাষ্ট্রের সঙ্গে সবাই কাজ করতে চায়। কারণ সেখানে সিদ্ধান্ত হঠাৎ বদলে যায় না, নীতির ধারাবাহিকতা থাকে, আর প্রতিশ্রুতির মূল্য থাকে।

৩. যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার

আজকের পৃথিবীতে যুদ্ধ শুধু সীমান্তে হয় না; মানুষের মনেও হয়। একসময় যুদ্ধ শুরু হতো কামানের গর্জনে। এখন শুরু হয় একটি ভিডিও, একটি পোস্ট, একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্মিত ছবি কিংবা একটি বিভ্রান্তিকর শিরোনাম দিয়ে। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাত আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, তথ্য এখন শুধু সংবাদ নয়; এটি একটি কৌশলগত অস্ত্র।

আমরা এমন এক যুগে বাস করছি, যেখানে তথ্যের অভাব নেই; বরং তথ্যের অতিরিক্ততাই মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। সত্যকে গোপন করার চেয়ে তাকে অসংখ্য শব্দের ভিড়ে হারিয়ে দেওয়া এখন অনেক সহজ। রাষ্ট্রের জন্য এটি একটি বড় শিক্ষা। বিনিয়োগ আস্থার ওপর দাঁড়ায়, আস্থা দাঁড়ায় বিশ্বাসযোগ্য তথ্যের ওপর। তাই সাইবার নিরাপত্তা, তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং কৌশলগত যোগাযোগ আজ আর বিলাসিতা নয়; জাতীয় সক্ষমতার অংশ।

জর্জ অরওয়েল একসময় লিখেছিলেন, ক্ষমতা শুধু মানুষের ওপর নয়, সত্যের ওপরও প্রতিষ্ঠিত হতে চায়। ডিজিটাল যুগে সেই কথার নতুন অর্থ তৈরি হয়েছে। এখন যে বয়ান তৈরি করতে পারে, সে-ই অনেক সময় বাস্তবতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। বাংলাদেশেরও তাই নিজের গল্প নিজেকেই বলতে হবে। অন্যের ভাষায় নিজের পরিচয় লিখতে গেলে, একসময় নিজের পরিচয়ই অস্পষ্ট হয়ে যায়।

৪. সব আলো পথ দেখায় না

জীবনের একটি বড় শিক্ষা হলো, সব আলো পথ দেখায় না। কিছু আলো শুধু চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। সব শব্দের উত্তর শব্দ দিয়ে দিতে হয় না। কিছু ঝড়ের সবচেয়ে ভালো উত্তর জানালা বন্ধ করে দেওয়া। কিছু দূরত্ব সম্পর্ককে রক্ষা করে। কিছু নীরবতা মর্যাদাকে বাঁচিয়ে রাখে। আজ ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র, সবাই যেন প্রতিনিয়ত প্রতিক্রিয়া জানানোর চাপে আছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের এমন এক সংস্কৃতি তৈরি করেছে, যেখানে নীরবতাকে দুর্বলতা মনে করা হয়। অথচ ইতিহাস বলে, সবচেয়ে পরিণত সিদ্ধান্তগুলো প্রায়ই সবচেয়ে শান্ত পরিবেশেই নেওয়া হয়। বুদ্ধ নীরবতার শক্তি জানতেন। রবীন্দ্রনাথ নিঃসঙ্গতার শক্তি জানতেন। জীবনানন্দ জানতেন, মানুষের সবচেয়ে গভীর সংলাপ অনেক সময় নিজের সঙ্গেই হয়।

রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। যে রাষ্ট্র প্রতিটি উত্তেজনায় প্রতিক্রিয়া দেখায়, সে একসময় নিজের অগ্রাধিকার হারিয়ে ফেলে। কিন্তু যে রাষ্ট্র জানে কখন কথা বলতে হয়, কখন অপেক্ষা করতে হয়, আর কখন কেবল পর্যবেক্ষণ করতে হয়-দীর্ঘ মেয়াদে তারাই স্থিতিশীল থাকে। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে তথ্যের গতি আলোর গতির মতো, কিন্তু প্রজ্ঞার গতি এখনো মানুষের বিবেকের ওপর নির্ভরশীল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের যুক্ত করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে বিভক্তও করেছে। অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দকে এমনভাবে পরিচালিত করে যে আমরা ধীরে ধীরে শুধু নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। ভিন্নমত তখন আর যুক্তি নয়, শত্রু বলে মনে হয়।

এই প্রবণতা শুধু সমাজের জন্য নয়, গণতন্ত্রের জন্যও একটি নীরব ঝুঁকি। কারণ গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি মতের মিল নয়; মতের ভিন্নতাকে ধারণ করার ক্ষমতা। বাংলাদেশের মতো একটি বহুমাত্রিক সমাজে তাই সহনশীলতা শুধু নৈতিক গুণ নয়; এটি রাষ্ট্র পরিচালনারও অপরিহার্য শর্ত। আমরা যদি প্রতিটি মতপার্থক্যকে সংঘাতে পরিণত করি, তাহলে উন্নয়নের গতি থেমে যাবে। আর যদি ভিন্নমতকে আলোচনায় রূপ দিতে পারি, তাহলে সেটিই হবে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

শেষ কথা

একজন প্রবীণ কূটনীতিক একবার বলেছিলেন, ‘রাষ্ট্রের পরিপক্বতা বোঝা যায় সে কত জোরে কথা বলে তা দিয়ে নয়; সে কত মনোযোগ দিয়ে শোনে তা দিয়ে।’ এই কথাটির ভিতরে আজকের বাংলাদেশের জন্য একটি বড় শিক্ষা লুকিয়ে আছে। আমাদের এখন শুধু বিশ্বকে বোঝানোর প্রয়োজন নেই; বিশ্ব কীভাবে বদলাচ্ছে, সেটিও মনোযোগ দিয়ে শোনার প্রয়োজন আছে। কারণ ইতিহাস কখনো স্থির থাকে না। যে রাষ্ট্র পরিবর্তনের ভাষা বুঝতে পারে, ভবিষ্যৎও অনেক সময় তার পক্ষেই কথা বলে। চারটি প্রসঙ্গ-চীন ও মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্ব সংঘাত এবং নীরবতার দর্শন। আপাতদৃষ্টিতে ভিন্ন, কিন্তু মূল শিক্ষা একটিই। রাষ্ট্র পরিচালনা শেষ পর্যন্ত শক্তির নয়, চরিত্রের পরীক্ষা।

আমরা এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছি, যখন বিশ্বের বড় শক্তিগুলো নিজেদের অবস্থান পুনর্নির্ধারণ করছে। এই পরিবর্তনের ভিতরে বাংলাদেশের সামনে যেমন ঝুঁকি রয়েছে, তেমনি বিরল সুযোগও রয়েছে। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে আমাদের প্রয়োজন আত্মবিশ্বাসী, ভারসাম্যপূর্ণ এবং দূরদর্শী রাষ্ট্রচিন্তা। সব দরজা খুলে রাখতে হয়, কিন্তু নিজের ঘরের চাবি কখনো অন্যের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। মানুষের ক্ষেত্রেও তাই, রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও তাই। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তাদেরই মনে রাখে, যারা সবচেয়ে বেশি আওয়াজ করেনি; বরং সবচেয়ে স্পষ্টভাবে নিজেদের চিনেছিল।

লেখক : প্রেসিডেন্ট, সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : ভূ-রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক তাৎপর্য

ড. মো. মিজানুর রহমান
প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর : ভূ-রাজনৈতিক, কৌশলগত এবং অর্থনৈতিক তাৎপর্য
চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও উন্নয়ন কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হয়, যা দীর্ঘদিনের বাস্তববাদী ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিক সম্প্রসারণ। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতা এবং ভারত–চীন আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অবস্থান এখন আরও জটিল ও কৌশলগত হয়ে উঠেছে। ফলে এই সফর কেবল দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের সীমায় সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য ও উন্নয়ন কৌশলের অংশ হিসেবেও গুরুত্ব বহন করে। সফরকে ঘিরে প্রধান প্রত্যাশা ছিল বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্পায়নে চীনা অংশীদারি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ, যা বাংলাদেশের দ্রুত অবকাঠামোগত অগ্রগতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং রপ্তানি বৈচিত্র্যকরণের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

বাস্তব ফলাফলের দিক থেকে সফরটি কোনো একক বড় চুক্তির পরিবর্তে ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একটি কৌশলগত ভিত্তি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংলাপ কাঠামো তৈরি করেছে। অবকাঠামো, বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও শিল্পায়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার ক্ষেত্র পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে এবং পূর্ববর্তী চ্যালেঞ্জ—যেমন প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি, আর্থিক জটিলতা ও প্রশাসনিক সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা—কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার ভারত–চীন প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে চীনের সঙ্গে উন্নয়ন ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারণের ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। এই সূক্ষ্ম ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানই বাংলাদেশের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, উন্নয়ন অগ্রযাত্রা এবং স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের বাণিজ্য কাঠামোতে ভারত ও চীন উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ, তবে ভিন্ন ভূমিকায়। ভারত প্রায় ১৫-১৬ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য অংশীদার, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বৃহত্তর বাণিজ্য ও অবকাঠামো সহযোগিতা থাকলেও প্রায় ২৫-৩০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। এ দুই সম্পর্ক পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতিতে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ভিত্তি। গত এক দশকে চীনা অর্থায়ন ও প্রযুক্তিগত সহায়তায় অবকাঠামো, জ্বালানি ও শিল্প খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৪,৯০০ মেগাওয়াট থেকে ২৫,০০০ মেগাওয়াটের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং সড়ক, সেতু, বন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর উন্নয়ন শিল্পায়ন ও রপ্তানিমুখী অর্থনীতির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের অর্থনৈতিক গুরুত্ব নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, বিদ্যমান সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন কৌশলকে আরও সুসংহত করার মধ্যে নিহিত। বিশেষ করে অবকাঠামো, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে সহযোগিতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, উৎপাদন বৈচিত্র্য এবং বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল বাংলাদেশের শিল্পায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সংযোজন। চট্টগ্রাম বন্দরকেন্দ্রিক অবস্থানের কারণে এটি ভবিষ্যতে রপ্তানি, লজিস্টিক ও শিল্প উৎপাদনের অন্যতম কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে চীনা বিনিয়োগের মাধ্যমে টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিক্স, অটোমোবাইল যন্ত্রাংশ এবং হালকা প্রকৌশল শিল্পের বিকাশের সম্ভাবনা রয়েছে, যা উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের বহুমুখীকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে আনোয়ারা অর্থনৈতিক অঞ্চল চট্টগ্রামকে একটি আঞ্চলিক শিল্প ও রপ্তানি হাবে পরিণত করার সক্ষমতা রাখে।
এছাড়াও বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে মংলায় একটি বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে, যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শিল্পায়ন ও বন্দরভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে আরও গতিশীল করবে। একই সঙ্গে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও উন্নয়নের লক্ষ্যে উভয় দেশের মধ্যে সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, আধুনিক শিল্প স্থাপন, রপ্তানিমুখী উৎপাদন বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশের শিল্পভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। ফলে চট্টগ্রাম, মংলা এবং অন্যান্য সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত শিল্প ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠবে, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

তবে এই সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রায় ১৮–২০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ভারসাম্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে ঋণ ব্যবস্থাপনা, সুদের শর্ত, দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায়বদ্ধতা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের ধীরগতি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রকল্পের সময় ও ব্যয় উভয়ই বৃদ্ধি পায়। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায় যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে অবকাঠামো প্রকল্পে গড়ে ২০–৩০ শতাংশ সময় ও ব্যয় বৃদ্ধি একটি সাধারণ প্রবণতা। তাই এসব সম্ভাবনাকে টেকসই অর্থনৈতিক সাফল্যে রূপ দিতে দক্ষ প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, ঋণ টেকসইতা এবং কার্যকর প্রশাসনিক সক্ষমতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো বিনিয়োগকে শুধু অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ না রেখে উৎপাদনমুখী শিল্পে সম্প্রসারণ করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ বৃদ্ধি করা এবং আনোয়ারার মতো অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার করা। পাশাপাশি ঋণ টেকসইতা নিশ্চিত করা এবং প্রকল্প ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানো অপরিহার্য। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা গেলে চীনের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থানে রয়েছে, যেখানে ভারত ও চীন উভয়ই প্রভাবশালী শক্তি। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর শুধু একটি দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক উদ্যোগ নয়, বরং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সফরটি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে এবং বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের “সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারও সাথে বৈরিতা নয়” পররাষ্ট্রনীতির বাস্তব প্রয়োগকে আরও দৃঢ় করেছে।

বাংলাদেশের জন্য ভারত ও চীন—উভয়ই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, তবে ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে। ভারত প্রধান প্রতিবেশী ও অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার, আর চীন বৃহত্তম আমদানি উৎস, অবকাঠামো বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন সহযোগী। ফলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক কূটনীতি দুই দেশের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল। চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি ভারতের কৌশলগত দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিযোগিতার পাশাপাশি সীমিত সহযোগিতার পরিবেশ বিদ্যমান। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশ একটি ভারসাম্যকারী রাষ্ট্র হিসেবে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

অবশ্যই। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়—আপনার দেওয়া লেখায় কিছু দাবি (যেমন নির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা চুক্তি "হতে যাচ্ছে" বা "সিদ্ধান্ত নিয়েছে") ভবিষ্যতমুখী ও বিতর্কিত। তাই গবেষণাধর্মী লেখার জন্য এগুলোকে সম্ভাবনা বা আলোচনাধীন উদ্যোগ হিসেবে উপস্থাপন করলে তা আরও নিরপেক্ষ হবে। নিচে মূল তথ্য ও বার্তা অক্ষুণ্ন রেখে বাংলাদেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাবের আলোকে দুইটি অনুচ্ছেদ দেওয়া হলো।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্ভাব্য তিনটি মেগা সহযোগিতা—জে-১০সি (J-10C) যুদ্ধবিমান ক্রয়, চীনের সহায়তায় একটি আধুনিক সামরিক শিল্প কারখানা স্থাপন এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের সম্পৃক্ততা—বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ও অবকাঠামোগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে। প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলারের সম্ভাব্য জে-১০সি ফাইটার জেট চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আধুনিকায়ন ত্বরান্বিত হবে এবং দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা নতুন মাত্রা পাবে। একই সঙ্গে নিজস্ব সামরিক উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে উঠলে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে বিদেশি নির্ভরতা কমে আসবে এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বনির্ভরতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

অন্যদিকে তিস্তা মহাপরিকল্পনায় চীনের অংশগ্রহণ বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, কৃষি, সেচ ও আঞ্চলিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। তবে এই তিনটি উদ্যোগই দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে, কারণ এগুলো ভারতের জন্য কৌশলগত উদ্বেগের বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিশেষ করে তিস্তা প্রকল্পের ভৌগোলিক অবস্থান এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ভারত-চীন প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। ফলে এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য উন্নয়ন ও জাতীয় স্বার্থের পাশাপাশি আঞ্চলিক কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

এছাড়াও বাংলাদেশ বহুমাত্রিক কূটনৈতিক ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করছে। এর মাধ্যমে একদিকে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক সংযোগ জোরদার করা হচ্ছে, অন্যদিকে চীনের সঙ্গে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বিনিয়োগ সহযোগিতা সম্প্রসারিত হচ্ছে। এই দুই সম্পর্ক পরস্পরের বিকল্প নয়; বরং বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের দুটি পৃথক কিন্তু পরিপূরক ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে এই ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ প্রতিটি কূটনৈতিক সিদ্ধান্তেরই আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক পর্যায়ে বহুমাত্রিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

চীন–পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি)-এর প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর অবকাঠামো, বাণিজ্য ও যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে, যা মূলত উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাভিত্তিক একটি বাস্তববাদী উদ্যোগ, কোনো রাজনৈতিক জোট নয়। তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, পাকিস্তান সিপিইসি-এর মাধ্যমে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করলেও অতিরিক্ত ঋণনির্ভরতার কারণে অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে এবং শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের অভিজ্ঞতা দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি তুলে ধরেছে। বিপরীতে ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়া চীনা বিনিয়োগ গ্রহণের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে বহুমুখী অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখে কৌশলগত স্বাধীনতা ও স্থিতিশীল প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশও একই ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে, তবে এর সফল বাস্তবায়নের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষ নীতিনির্ধারণ এবং দূরদর্শী কূটনৈতিক ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চীনের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক বাংলাদেশের জন্য নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি এবং শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এই সুযোগগুলো কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে হলে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শক্তিশালী প্রকল্প বাস্তবায়ন কাঠামো, স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা। প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত মনিটরিং, ঋণ টেকসইতা বিশ্লেষণ এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, বিশেষ করে চীনা বাজারে প্রবেশ বাড়ানো, বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরের ফলে বাংলাদেশের জন্য ব্রিকস (BRICS) এবং অন্যান্য উদীয়মান বহুপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। চীন যেহেতু ব্রিকসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য, তাই বাংলাদেশের সঙ্গে তার বর্ধিত কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভবিষ্যতে ব্রিকস প্লাস কাঠামো, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এনডিবি) এবং এমনকি সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও)-এর মতো প্ল্যাটফর্মে সীমিত অংশগ্রহণ বা পর্যবেক্ষক অবস্থানের সুযোগকে আরও বাস্তবসম্মত করতে পারে। একই সঙ্গে চীন মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে আঞ্চলিক সংযোগ, বাণিজ্য ও লজিস্টিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হতে পারে। এসব প্ল্যাটফর্ম ও সংযোগ উদ্যোগ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বিকল্প অর্থায়ন, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণের নতুন সুযোগ সৃষ্টি করে। তবে এসব সম্ভাবনার বাস্তবায়ন নির্ভর করবে বাংলাদেশের ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি, অর্থনৈতিক প্রস্তুতি এবং জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় রেখে বহুপাক্ষিক কূটনীতি পরিচালনার সক্ষমতার ওপর।

সবশেষে বলা যায়, চীনের সাথে সম্পর্ক বাংলাদেশের জন্য একদিকে বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে, অন্যদিকে এটি একটি জটিল ভূ-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্বও তৈরি করেছে। এই অংশীদারিত্বের সফলতা নির্ভর করবে বাংলাদেশের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণের ওপর। বাংলাদেশ যদি এই ভারসাম্য সঠিকভাবে বজায় রাখতে পারে, তাহলে ভারত ও চীনের সাথে সমান্তরাল সম্পর্ক বজায় রেখেই টেকসই উন্নয়ন ও আঞ্চলিক প্রভাব বৃদ্ধি সম্ভব হবে।

লেখক : অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট
[email protected]

রোমের রক্তাক্ত রাত

কেন বাড়ছে বাংলাদেশি বনাম বাংলাদেশি সংঘাত?

নিয়াজ মাহমুদ
কেন বাড়ছে বাংলাদেশি বনাম বাংলাদেশি সংঘাত?
সংগৃহীত ছবি

রোমে একটি বাংলাদেশি পরিবারের তিন সদস্যকে নির্মমভাবে হত্যা করার ঘটনা শুধু ইতালিকে নয়, গোটা ইউরোপের বাংলাদেশি কমিউনিটিকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। নিহত বাবা-মা ও আট বছরের শিশুকন্যার রক্তাক্ত লাশ, অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া বড় ছেলে আমিরের হৃদয় বিদারক বর্ণনা এবং অভিযুক্ত হিসেবে আরেক বাংলাদেশি নাগরিকের নাম সামনে আসা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি কেবল একটি ফৌজদারি অপরাধ নয়; এটি প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের সামনে এক কঠিন আত্মসমালোচনার প্রশ্নও তুলে ধরেছে।

প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। অভিযুক্ত আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আইনের দৃষ্টিতে সন্দেহভাজন। তাই কোনো একটি ঘটনার আবেগে পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজকে অপরাধপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করার সুযোগ নেই। ইউরোপে লক্ষাধিক বাংলাদেশি সৎভাবে কাজ করছেন, কর দিচ্ছেন, পরিবার চালাচ্ছেন এবং দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইতালি, ফ্রান্স, পর্তুগাল, স্পেন, গ্রিসসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের মধ্যে সংঘাত, হামলা, এমনকি হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও উদ্বেগজনকভাবে সামনে এসেছে।

রোমের এই ট্রিপল মার্ডারের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি বাক্য ঘুরে বেড়াচ্ছে ‘ইউরোপে বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় শত্রু এখন বাংলাদেশিরাই।’ বাক্যটি আবেগপ্রসূত হলেও এর পেছনে যে হতাশা রয়েছে, তা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ, যখন একজন বাংলাদেশির হাতে আরেক বাংলাদেশির জীবন যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু একটি পরিবার নয়; ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো কমিউনিটির ভাবমূর্তি।

প্রবাসে জীবন সহজ নয়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অনিশ্চিত বৈধতা, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক দূরত্ব, মানসিক একাকীত্ব এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—এসব অনেকের জীবনে স্থায়ী চাপ তৈরি করে। কিন্তু এসব চাপ কখনোই সহিংসতার বৈধতা দিতে পারে না। বরং প্রশ্ন হলো, কেন একই কমিউনিটির মানুষ এত সহজে একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠছে?

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের সঙ্গে কথা বললে কয়েকটি সাধারণ সমস্যা সামনে আসে। প্রথমত, ব্যাবসায়িক অংশীদারি নিয়ে বিরোধ। দ্বিতীয়ত, অর্থ লেনদেন ও ধারদেনা। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক বিভাজনের প্রভাব। চতুর্থত, কমিউনিটির নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা। আর পঞ্চমত, ব্যক্তিগত বিরোধকে প্রতিহিংসায় রূপ দেওয়ার প্রবণতা। অনেক ক্ষেত্রে এসব বিরোধ বছরের পর বছর জমে থেকে একসময় বিস্ফোরিত হয়।

উদ্বেগের বিষয় হলো, বিরোধ এখন শুধু ব্যবসা বা ব্যক্তিগত সম্পর্কেই সীমাবদ্ধ নেই। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মসজিদ পরিচালনা কমিটি, নতুন মসজিদ নির্মাণ, সামাজিক সংগঠনের নেতৃত্ব কিংবা সাংস্কৃতিক সংগঠনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েও বাংলাদেশিদের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব দেখা যাচ্ছে। যে প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার কথা, সেখানেও বিভক্তি ও ক্ষমতার লড়াই কমিউনিটিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

আরেকটি বাস্তবতা হলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এই বিভাজনকে আরও তীব্র করছে। সামান্য মতবিরোধ মুহূর্তেই ব্যক্তিগত আক্রমণ, চরিত্রহনন কিংবা প্রকাশ্য হুমকিতে রূপ নিচ্ছে। অনেক সময় ভার্চুয়াল দ্বন্দ্ব বাস্তব সংঘর্ষে পরিণত হচ্ছে। ফলে কমিউনির ভেতরে পারস্পরিক বিশ্বাস কমছে, বাড়ছে সন্দেহ ও বৈরিতা।

প্রবাসে অপরাধের আরেকটি বড় কারণ হলো নীরবতা। অনেকেই জানেন, কোনো ব্যক্তি হুমকি দিচ্ছে, চাঁদাবাজি করছে বা সহিংস আচরণ করছে। কিন্তু ‘কমিউনিটির মান-সম্মান’ বা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কথা ভেবে কেউ মুখ খোলেন না। পরে যখন বড় ধরনের অপরাধ ঘটে, তখন সবাই বিস্মিত হন। অথচ অনেক ক্ষেত্রেই আগাম সতর্কতার সুযোগ ছিল।

রোমের ঘটনায় জীবিত থাকা তরুণ আমিরের জবানবন্দি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা নয়; এটি আমাদের সামনে একটি নির্মম বাস্তবতাও তুলে ধরে। একজন তরুণ নিজের চোখের সামনে বাবা-মা ও ছোট বোনকে হারিয়েছেন। এমন ট্র্যাজেডি থেকে তিনি হয়তো শারীরিকভাবে সুস্থ হয়ে উঠবেন, কিন্তু মানসিক ক্ষত বহন করবেন সারা জীবন। এই দিকটি নিয়েও কমিউনিটিকে ভাবতে হবে। প্রবাসে সহিংসতার শিকার পরিবারগুলোর জন্য মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, আইনি সহায়তা এবং সামাজিক সহযোগিতার কাঠামো প্রায় নেই বললেই চলে।

এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো অপরাধকে ব্যক্তিগত ঘটনা হিসেবে দেখলেও স্থানীয় সমাজ প্রায়ই অপরাধীর জাতীয় পরিচয় মনে রাখে। ফলে একজন বাংলাদেশির অপরাধের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে হাজারো নিরীহ বাংলাদেশির ওপর। চাকরি, ব্যবসা, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা—সব ক্ষেত্রেই এর প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। তাই অপরাধের দায় ব্যক্তিগত হলেও সামাজিক মূল্য অনেক বড়।

অবশ্যই এটাও মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশিরা একা নন; বিশ্বের প্রায় সব অভিবাসী কমিউনিটিতেই অপরাধ ঘটে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমরা কি প্রতিটি ঘটনার পর শুধুই শোক প্রকাশ করব, নাকি আত্মসমালোচনাও করব? কমিউনিটির নেতারা কি শুধু অনুষ্ঠান আয়োজনেই ব্যস্ত থাকবেন, নাকি বিরোধ নিরসন, মধ্যস্থতা ও সচেতনতা তৈরিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবেন? ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও প্রবাসী সংগঠনগুলো কি সংঘাত প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নেবে?

বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট দূতাবাসগুলোরও এখানে ভূমিকা রয়েছে। শুধু কনস্যুলার সেবা নয়, কমিউনিটির মধ্যে বিরোধ নিরসন, আইনি সচেতনতা বৃদ্ধি, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পরামর্শ এবং জরুরি সহায়তার ব্যবস্থা তৈরিতেও দূতাবাসগুলো উদ্যোগী হতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানোও জরুরি।

এমন এক সময়ে ইতালির মূল ধারার রাজনীতিতে সক্রিয় এবং ভেনিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্থাপত্যে ডক্টরেট ডিগ্রিধারী বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত রাজনীতিক ডক্টর ঋতু মিয়াও রোমের এই ত্রিপল হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এই নৃশংস ঘটনার দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর ভাষায়, অভিযুক্ত ব্যক্তি কোন দেশের নাগরিক, বিচারের ক্ষেত্রে সেটি বিবেচ্য হওয়া উচিত নয়; আইনের দৃষ্টিতে অপরাধের বিচারই একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

ডক্টর ঋতু আরো বলেন, ‘আমরা এই নৃশংস ঘটনার ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি এবং একটি কথা পরিষ্কার করে বলতে চাই, নাগরিক পরিচয় বা ধর্মীয় পরিচয় কোনো অপরাধীর পরিচয় হতে পারে না। অপরাধ ব্যক্তির, কোনো জাতি, ধর্ম বা পুরো কমিউনিটির নয়।’

ভেনিসের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ইতালির প্রধান বিরোধী দল পিডি (পার্তিতো দেমোক্রাতিকো)-এর প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ডক্টর ঋতু মিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিদের প্রতিও গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেন। তিনি বলেন, প্রবাসে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা নিজের দেশ বা বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য কলঙ্ক বয়ে আনে। স্থানীয় আইন মেনে চলা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং সুশৃঙ্খল জীবনযাপনই একজন সচেতন অভিবাসীর পরিচয়। তাঁর কথায়, ‘মনে রাখবেন, বিদেশে আপনারা প্রত্যেকেই বাংলাদেশের আয়না। আপনাদের আচরণেই একটি দেশের ভাবমূর্তি প্রতিফলিত হয়।’

রোমের ট্রিপল মার্ডার হয়তো একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে বিচার হবে। আদালতই ঠিক করবেন কে দোষী, কে নির্দোষ। কিন্তু এই ঘটনার সামাজিক অভিঘাত বিচ্ছিন্ন নয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রবাসে সবচেয়ে বড় শক্তি হওয়ার কথা ছিল যে কমিউনিটির, সেই কমিউনিটির ভেতরেই যদি অবিশ্বাস, বিভাজন ও সহিংসতা বাড়তে থাকে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে সবাই।

তাই ‘ইউরোপে বাংলাদেশিদের শত্রু এখন বাংলাদেশিরাই’ এই বাক্যটি যেন বাস্তব সত্যে পরিণত না হয়, সেটিই হওয়া উচিত আমাদের সম্মিলিত লক্ষ্য। শত্রু মানুষ নয়; শত্রু হলো ঘৃণা, প্রতিহিংসা, অসহিষ্ণুতা এবং আইনের প্রতি অবজ্ঞা। এগুলোকে পরাজিত করতে পারলেই প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজ আবারও তার পরিশ্রম, সততা ও সাফল্যের পরিচয়ে বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।

রোমের সেই রক্তাক্ত রাত আমাদের শুধু শোকের সংবাদ দেয়নি; দিয়েছে একটি সতর্কবার্তাও। প্রশ্ন এখন একটাই আমরা কি সেই সতর্কবার্তা থেকে শিক্ষা নেব, নাকি আরেকটি ট্র্যাজেডির অপেক্ষায় থাকব?

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
email: [email protected]