দীর্ঘদিন ধরে ঘুষ, দুর্নীতি, দালালচক্র ও প্রশাসনিক জটিলতায় জর্জরিত দেশের ভূমি সেবাখাত। ফলে সেবা পেতে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে জনগণকে। এমন পরিস্থিতিতে ভূমি সেবাখাতে সবধরনের অনিয়ম রুখতে উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তি, ‘ভূমি অ্যাপ’, অনলাইন সেবা এবং কর্মকর্তাদের উপস্থিতি পর্যবেক্ষণের মতো প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমে এ খাতে অনিয়ম-দুর্নীতি কমানো ও ভোগান্তি হ্রাস করা সরকারের লক্ষ্য।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক জরিপের তথ্য তুলে ধরে টিবিএসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ভূমি খাতে দুর্নীতি আগের তুলনায় বেড়েছে। ফলে প্রযুক্তি সেবা দ্রুততর করলেও বহু বছরের ঘুষ ও অনিয়মের সংস্কৃতি ভাঙা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে ভূমি সেবাকে আরো সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করা। তিনি বলেন, যত বেশি মানুষ ডিজিটাল মাধ্যমে সেবা নেবেন, দুর্নীতি ও হয়রানির সুযোগ তত কমবে।
সরকারের চালু করা ‘ভূমি অ্যাপ’-এ এরই মধ্যে এক লাখের বেশি ব্যবহারকারী যুক্ত হয়েছেন। অ্যাপটির মাধ্যমে ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধ, ই-মিউটেশনের আবেদন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, জমির রেকর্ড যাচাই, খতিয়ান ও মৌজা মানচিত্র সংগ্রহ, অনলাইনে অভিযোগ দাখিল এবং উত্তরাধিকার হিসাব নির্ধারণসহ বিভিন্ন সেবা পাওয়া যাচ্ছে।
ডিজিটাল সেবা সাধারণ মানুষের কাছে সহজলভ্য করতে দেশজুড়ে ৮৯৩টি সেবা কেন্দ্র অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এছাড়া গ্রামীণ এলাকায় সচেতনতা বাড়াতে স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে এবং অনলাইন সেবা ব্যবহারে উৎসাহ দিতে তথ্যপত্র ও ভিডিও টিউটোরিয়াল সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে এসব উদ্যোগের পরও গ্রামীণ এলাকায় অনেক মানুষ এখনও দালালের ওপর নির্ভরশীল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রযুক্তির পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত না হলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।
এদিকে কর্মকর্তাদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ‘ভূমি দৃষ্টি’ নামে নতুন একটি জিও-ফেন্সিংভিত্তিক প্ল্যাটফর্ম চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে অফিস চলাকালে কোনো কর্মকর্তা নির্ধারিত সীমানার বাইরে গেলে তা তাৎক্ষণিকভাবে কেন্দ্রীয় ড্যাশবোর্ডে দেখা যাবে।
সরকার একই সঙ্গে ডিজিটাল ক্যাডাস্ট্রাল জরিপ, কেন্দ্রীয় ভূমি তথ্যভাণ্ডার তৈরি এবং ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাকে ভূমি তথ্যব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। পাশাপাশি ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষতিপূরণ সরাসরি উপকারভোগীর ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে দিতে আইবিএএস++ প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে সংযুক্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে টিআইবির সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, ভূমি সেবা গ্রহণকারী ৬৬ দশমিক ২ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো ধরনের দুর্নীতির শিকার হয়েছেন, যা ২০২৩ সালে ছিল ৫১ শতাংশ। ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ সেবাগ্রহীতা ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন। এতে প্রতি পরিবারে গড়ে অবৈধ অর্থ পরিশোধের পরিমাণ ১১ হাজার ৩১০ টাকা।
জরিপে উঠে এসেছে, ভূমি খাতে ঘুষের মাধ্যমে সারা দেশে প্রায় ৩ হাজার ৮১ কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন হয়েছে, যা সরকারি সেবা খাতগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।
এছাড়া দেশে বিচারাধীন ৪৭ লাখের বেশি মামলার বড় একটি অংশই ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে জড়িত বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই ভূমি খাতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন সম্ভব।











