ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার মতো গুরুতর অপরাধের বিচার নিশ্চিত, অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেপ্তার, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশ এবং সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবিতে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল শিক্ষার্থী।
সোমবার বিকেল পৌনে ৪টার দিকে ‘নারী নিরাপত্তা মঞ্চ’-এর ব্যানারে মুরাদ চত্বর থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে শেষ হয়।
মিছিলে শিক্ষার্থীরা ‘ক্যাম্পাসে ধর্ষক ঘুরে, প্রক্টর কী করে?’, ‘হয়রানির গদিতে, আগুন জ্বালো একসাথে’, ১নারীবান্ধব ক্যাম্পাস চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। পরে সেখানে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেন তারা।
মানববন্ধনে নারী নিরাপত্তা মঞ্চের সংগঠক ও নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগের শিক্ষার্থী সোহাগী সামিয়া বলেন, গত ১২ মে সংঘটিত ধর্ষণচেষ্টা ও হত্যাচেষ্টার ঘটনার অভিযুক্ত এখনো আইনের আওতায় আসেনি। এমনকি ৪০ দিনের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তের পরিচয় শনাক্ত বা তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।
তিনি বলেন, আন্দোলনের মুখে প্রশাসন ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দিয়েছিল। সেনাবাহিনী, র্যাব ও পুলিশসহ সংশ্লিষ্ট বাহিনীগুলো বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে বলেও জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তার কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
সোহাগীর ভাষ্য, এ ঘটনায় যেমন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ব্যর্থতা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। শুধু ১২ মের ঘটনাই নয়, পরবর্তী সময়েও ক্যাম্পাসে একাধিক নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, আমরা প্রশাসনকে বারবার বলেছি, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়তো তাদের দায়িত্ব নয়, কিন্তু ক্যাম্পাসের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব অবশ্যই তাদের। সে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
গত আড়াই বছরে ক্যাম্পাসে নারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন নিপীড়নের ঘটনা ঘটলেও অধিকাংশ অভিযোগের কার্যকর সমাধান হয়নি বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সোহাগী বলেন, আজকের নিরাপত্তাহীন পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। প্রশাসনের দীর্ঘদিনের অবহেলা ও নিষ্ক্রিয়তার ফলেই এই বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশে প্রশাসনের বিলম্বের সমালোচনা করে তিনি বলেন, প্রশাসন সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
তিনি বলেন, নারী নিরাপত্তা মঞ্চের পক্ষ থেকে আমরা তদন্ত প্রতিবেদন অবিলম্বে প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে নারী নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটলে আন্দোলন আরো জোরদার করা হবে।
মানববন্ধনে আরেক সংগঠক ও ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী লামিসা জামান বলেন, পরিবারগুলো নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশের প্রত্যাশায় তাদের সন্তানদের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠায়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সেই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, আমরা এমনও দেখেছি, দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রকাশ্যে বলছেন নিরাপত্তার দায়িত্ব তাদের নয়। তাহলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব কার—সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমালোচনা করে লামিসা বলেন, ৪০ দিনের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও অভিযুক্তকে শনাক্ত বা গ্রেপ্তার করা যায়নি। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের সন্তুষ্ট করতে পারে এমন কোনো তথ্যও দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, ঘটনার পর প্রায় আড়াই হাজার নারী শিক্ষার্থী ছয় দফা দাবি উত্থাপন করেছিলেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত দাবিগুলোর কোনোটি পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি।
লামিসার অভিযোগ, প্রশাসন পাঁচ দিনের মধ্যে তদন্তের তথ্য প্রকাশের কথা বললেও সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি। ছুটির মধ্যেও নারী নিরাপত্তা মঞ্চের পক্ষ থেকে প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি।
ছুটিকালেও ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায় নারী হয়রানির ঘটনার উল্লেখ করে তিনি বলেন, একজন নারী শিক্ষার্থী প্রতিদিন নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি নিয়ে ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলে সেই ক্যাম্পাসকে নিরাপদ বলা যায় না।
শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার জবাবদিহি সংশ্লিষ্টদেরই করতে হবে।







