বর্তমান বিশ্বে দক্ষতা (স্কিল) একটি বড় সম্পদ। শুধু ডিগ্রি নয়, বরং কর্মদক্ষতাও মানুষকে সামাজিক ও আর্থিকভাবে শক্তিশালী করে। ইসলামের দৃষ্টিতে উপকারী জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন শুধু দুনিয়াবি সফলতার উপায় নয়; বরং তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত থাকলে, তা ইবাদতেও পরিণত হতে পারে। বুখারি শরিফের প্রথম হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমল (এর প্রাপ্য হবে) নিয়ত অনুযায়ী। আর মানুষ তার নিয়ত অনুযায়ী প্রতিফল পাবে। তাই যার হিজরত হবে দুনিয়া লাভের অথবা কোনো মহিলাকে বিবাহ করার উদ্দেশ্যে, তবে তার হিজরত সে উদ্দেশ্যেই হবে, যে জন্য সে হিজরত করেছে।’ (বুখারি, হাদিস : ১)
পবিত্র কোরআন মানুষকে ঈমান-তাকওয়ার পাশাপাশি কর্মদক্ষতা, দায়িত্বশীলতা ও উৎপাদনশীলতার শিক্ষা দেয়। মানুষ যে বিষয়ে সাধনা করে, চেষ্টা করে, মহান আল্লাহ তাকে সে বিষয়ে এগিয়ে যাওয়ার পথ সহজ করে দেন। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর এই যে মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়।’ (সুরা : নাজম, আয়াত : ৩৯)
মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের একেকজনকে একেক জগতে দক্ষতা দেন। একেকজনের মধ্যে একেক গুণ দিয়ে দেন, যা পৃথিবীর ভারসাম্য রক্ষায় অতি জরুরি। তাই তো রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের ব্যক্তিগত যোগ্যতা চিহ্নিত করে সে অনুযায়ী তাঁদের গড়ে তুলতেন। যেমন—তিনি যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)-এর প্রখর মেধা ও আমানতদারি দেখে তাঁকে ওহি লেখার দায়িত্ব দেন এবং বিদেশি ভাষা শেখার নির্দেশ দেন। পরবর্তীকালে তিনি কোরআন সংকলনের মতো ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেন। এটি প্রমাণ করে, ভাষা ও প্রশাসনিক দক্ষতাও ইসলামে গুরুত্বপূর্ণ। (সিয়ারু আ’লামিন নুবালা : ২/৪২৮-৪২৯, তাহযীবুল আসমা ওয়াল-লুগাত : ১/২০০—২০১; আসহাবে রাসুলের জীবনকথা : ৪/৭৭)
এমনিভাবে মুআজ ইবনে জাবাল (রা.)ও মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে বিভিন্ন দক্ষতা অর্জন করেন। ফলে মহান আল্লাহ তাঁকে বহু গুণে গুণান্বিত করেন। তিনি ছিলেন একাধারে একজন মুফতি, প্রাদেশিক গভর্নর, দূত, সাহসী সেনাপতি, বিজয়ী যোদ্ধা, জাকাত উসুলকারী, মজলিসে শুরার সদস্য ও কোরআন-হাদিসের শিক্ষক। তাঁর ব্যাপারেই রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে শরিয়তের হালাল-হারাম সম্বন্ধে অধিক বিজ্ঞ মুআজ ইবনে জাবাল।’ (আত-ত্বাবাক্বাতুল কুবরা : ৭/২৭১—২৭২, আল-ইসতিআব : ৩/১৪০২—১৪০৩, আল-আ’লাম [জিরিকলী] : ৭/২৫৮)
মহানবী (সা.)-এর আরেক সাহাবি আবু মাহযুরাহ (রা.)। তিনি ছিলেন, মহানবী (সা.)-এর মনোনীত চার মুয়াজ্জিনের একজন। তাঁর অসাধারণ কণ্ঠ ও মেধা দেখে মহানবী (সা.) তাঁকে প্রথমে ইসলামের দাওয়াত দেন এবং পরবর্তী সময়ে আজান শিক্ষা দেন। ঐতিহাসিকদের মতে, তিনি আজীবন মসজিদে হারামের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন। (সিয়ারু আলামিন নুবালা : ৩/১১৭, সাহাবায়ে কেরামের আলোকিত জীবন, পৃষ্ঠা : ৩৫০)
এতে বোঝা যায়, ইবাদতের ক্ষেত্রেও প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার গুরুত্ব রয়েছে। পাশাপাশি যাকে দিয়ে ইসলামের যে কাজটা সহজ ও সুন্দর হবে, তাকে সে প্রশিক্ষণ দিয়ে সে দায়িত্বে রাখা উত্তম।
দক্ষতা উন্নয়নের সবচেয়ে অনন্য দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় এক অভাবী ব্যক্তির ঘটনায়। সাহায্য চাইতে এলে রাসুল (সা.) তাকে ভিক্ষা দিয়ে বিদায় করেননি; বরং তার ঘরের কিছু জিনিস বিক্রি করিয়ে একটি কুঠার কিনে নিজ হাতে তাতে হাতল লাগিয়ে দেন এবং কাঠ কেটে বিক্রি করে জীবিকা অর্জনের পরামর্শ দেন। অল্প কিছুদিন পর লোকটি স্বাবলম্বী হয়ে ফিরে আসে, তখন তার কাছে ১০ দিরহাম ছিল। সে তার নিজের উপার্জিত অর্থের বিনিময়ে কাপড় ও খাবার কিনেছিল।
(আবু দাউদ, হাদিস : ১৬৪১ অবলম্বনে)
এ ঘটনার মাধ্যমে নবীজি (সা.) শিখিয়েছেন, সাময়িক সাহায্যের চেয়ে মানুষের স্কিল ডেভেলপমেন্টের ব্যবস্থা করে তাদের আত্মনির্ভর করে তোলা অধিক কল্যাণকর।
বর্তমান যুগের মুসলমানদের জন্য ইসলামের ফরজ জ্ঞানের পাশাপাশি প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ভাষা শিক্ষা, ব্যবসা, কৃষি—সব খাতের জ্ঞান অর্জন করাই গুরুত্বপূর্ণ। হ্যাঁ একজন ব্যক্তির জন্য সব বিষয়ে পারদর্শী হওয়া সম্ভব নয়। তবে যার যে বিষয়ে সম্ভাবনা আছে, তাকে ইসলামের মৌলিক জ্ঞানের পাশাপাশি সে বিষয়ে এগিয়ে দেওয়া সবার দায়িত্ব। প্রত্যেক মুসলমানের ওপর যেমন ইসলামের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করা ফরজ, তেমনি দুনিয়ায় ইসলামের গৌরব সমুন্নত রাখতে জাগতিক জ্ঞানেও স্বনির্ভর হতে হবে। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইসলামকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্যে সঠিক পদ্ধতিতে জ্ঞান অর্জন করাও ইবাদত হিসেবে পরিগণিত হতে পারে। মহান আল্লাহ সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমিন।