তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো নেতারা শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হচ্ছেন আগামী সপ্তাহে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ এবং ওয়াশিংটনের সামরিক জোটটির প্রতি প্রতিশ্রুতি কমানোর পদক্ষেপ সম্মেলনকে ঘিরে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
ন্যাটোর কর্মকর্তাদের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধকে ইউরোপের অনেক দেশ সমর্থন করেনি। একই সঙ্গে এই যুদ্ধ ইউরোপজুড়ে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায়ও ন্যাটোর অধিকাংশ সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে তাদের আকাশসীমা এবং সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
জোটে টানাপোড়েন
এই যুদ্ধের কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এবং বিদায়ি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের মতো ইউরোপীয় নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্কেও টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। ফলে আঙ্কারা সম্মেলনে সেই উত্তেজনা আবারও সামনে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
তবে ন্যাটোর এক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক বলেন, ‘আমি আশাবাদী, কারণ নেতারা জানেন এখানে কী ঝুঁকি রয়েছে।’
তিনি রয়টার্সকে বলেন, যদি এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে আমাদের কাছে আছেন সর্বশেষ ‘বিবাহ-পরামর্শদাতা’ মার্ক রুটে, যিনি পরিস্থিতি শান্ত করতে পারবেন।
যুদ্ধের সক্ষমতায় জোর
নেদারল্যান্ডসের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্ক রুটে বর্তমানে ন্যাটোর মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি বলেছেন, আগামী সপ্তাহের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য হবে অতিরিক্ত প্রতিরক্ষা ব্যয়কে যুদ্ধ-প্রস্তুত সক্ষমতায় রূপান্তর করা এবং জোটের প্রতিরক্ষা শিল্পকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণ করা।
বার্লিনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগামী সপ্তাহের সম্মেলনে অতিরিক্ত ব্যয়কে যুদ্ধ-প্রস্তুত সামরিক সক্ষমতায় পরিণত করা এবং আমাদের প্রতিরক্ষা শিল্পকে উল্লেখযোগ্যভাবে সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারণ ন্যাটো একটি আন্তঃআটলান্টিক জোট এবং ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। তবে এটিকে আরো ভারসাম্যপূর্ণ করতে হবে।
রুটে আরো বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে ইউরোপীয় মিত্র দেশগুলো এবং কানাডা ইউরোপের প্রচলিত প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে আরো বড় দায়িত্ব গ্রহণ করছে।
বাড়তি প্রতিরক্ষা ব্যয়
এর আগে গত মাসে রুটে জানিয়েছিলেন, ২০২৫ সালে ন্যাটোর ইউরোপীয় সদস্য দেশগুলো এবং কানাডা প্রতিরক্ষা খাতে আগের বছরের তুলনায় ৯০ বিলিয়ন ডলার বেশি ব্যয় করেছে। এর ফলে তাদের মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় ৫৭০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হয়েছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, গত বছর নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অনুষ্ঠিত ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনে জোটের নেতারা ২০৩৫ সালের মধ্যে সদস্য দেশগুলোর মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৫ শতাংশ মূল প্রতিরক্ষা খাতে (অস্ত্র ও সেনা সক্ষমতা) ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। এর আগে এই লক্ষ্য ছিল জিডিপির ২ শতাংশ।
সম্মেলনের অনিশ্চয়তা
তবে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক যুদ্ধ আগামী সপ্তাহের ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলনকে ছাপিয়ে যেতে পারে। বর্তমানে সংঘাতটি একটি নাজুক যুদ্ধবিরতির মধ্যে থাকলেও পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠতে পারে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ইউরোপীয় দেশগুলো যথেষ্ট সহায়তা করেনি বলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্মেলনে ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারেন বলেও তাদের উদ্বেগ রয়েছে।
ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার (কোনো সদস্য দেশ হামলার শিকার হলে তাকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি) পালনের বাধ্যবাধকতা নাও থাকতে পারে।
তবে ন্যাটোর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইউরোপে যুদ্ধটি ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় হওয়া এবং অনেক ইউরোপীয় নেতা এর সমর্থন না করলেও, জোটের অধিকাংশ সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের আকাশসীমা ও সামরিক ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে নিজেদের অঙ্গীকার রক্ষা করেছে।