ইরান এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য একটি সমঝোতা স্মারককে সরাসরি 'পিছু হটা' হিসেবে না দেখিয়ে বরং 'রাজনৈতিক প্রতিরোধ ও কৌশলগত বিজয়' হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। ইরানের সরকারি অবস্থান এমনভাবে সাজানো হচ্ছে যাতে বোঝানো যায়- চাপের মুখে নয়, বরং নিজেদের শর্তেই এই পর্যায়ে এসেছে দেশটি। কিন্তু বাস্তবতা ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি এই ব্যাখ্যাকে জটিল করে তুলছে।
যুদ্ধ-পরবর্তী এক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে ইরান। সাম্প্রতিক সংঘাতে দেশটির বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে এবং মুদ্রাস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে দেশটির ভেতরে রাজনৈতিক বিভাজনও তীব্র। ক্ষমতাসীন ইসলামি ব্যবস্থার ভেতরের একটি অংশ কয়েক মাস ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো ধরনের সমঝোতার বিরোধিতা করে আসছে।
এই বিভক্ত বাস্তবতার মধ্যেই তেহরান চুক্তিটিকে 'গ্রহণযোগ্য সাফল্য' হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছে। ইরানের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব ইতোমধ্যে চুক্তির পক্ষে ইতিবাচক বার্তা দিতে শুরু করেছে। পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাগের গালিবাফ এই সমঝোতাকে চূড়ান্ত বিজয়ের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এই চুক্তিকে 'সম্ভাব্য রূপান্তরকারী' হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এটি পুরোপুরি কার্যকর হলে ইরানের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের বড় অংশই কমে যেতে পারে এবং মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও পরিবর্তন আসতে পারে।
সরকারের এই অবস্থানের পেছনে আরেকটি বড় যুক্তি হলো- যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের ঘোষিত সব লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। ইরানের দাবি অনুযায়ী, ইরানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যায়নি, দেশে সরকার পরিবর্তন ঘটানো যায়নি, এবং দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করাও সম্ভব হয়নি।
তবে এই 'সাফল্যের বর্ণনা' ইরানের ভেতরেই সমালোচনার মুখে পড়ছে। কট্টরপন্থি রাজনৈতিক শিবিরের কিছু সদস্য এমনকি চুক্তির খসড়াকে 'মার্কিন প্রভাবাধীন কাঠামো' বলেও আখ্যা দিচ্ছেন। জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির এক ডেপুটি চেয়ারম্যানের মন্তব্য অনুযায়ী, এটি ইরানকে কার্যত ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল অবস্থায় নিয়ে যেতে পারে।
গত কয়েক মাস ধরেই পার্লামেন্টের কট্টরপন্থি অংশ, রাষ্ট্রসমর্থিত গণমাধ্যম এবং কিছু রাজনৈতিক সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী অবস্থান আরো জোরালো হয়েছে। তাদের প্রধান যুক্তি হলো ওয়াশিংটনকে বিশ্বাস করা যায় না, এবং অতীতের আলোচনাও কৌশলগত প্রতারণার অংশ ছিল।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই কট্টর বিরোধিতা কিছুটা কমে এসেছে, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে ইঙ্গিত দেয় যে চুক্তিটি শীর্ষ পর্যায়ের অনুমোদন পেয়েছে। তবে এর মানে এই নয় যে দেশটির ভেতরে পূর্ণ ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ইরানকে আলোচনার পথে ঠেলে দিচ্ছে। দীর্ঘ যুদ্ধ, কঠোর নিষেধাজ্ঞা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট দেশটিকে চাপের মধ্যে ফেলেছে। সাধারণ মানুষের প্রধান উদ্বেগ এখন আর রাজনৈতিক স্লোগান নয়, বরং দ্রব্যমূল্য, আয় এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স বলেছেন, ইরান সরাসরি অর্থ না পেলেও নিষেধাজ্ঞা শিথিল হলে তারা বিপুল অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার পেতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে তেহরান চুক্তিটিকে 'নির্ভরতা' নয়, বরং পুনর্গঠন ও বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে।
তবে আলোচনার সবচেয়ে জটিল বিষয়গুলো এখনো রয়েই গেছে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সীমা, যাচাই প্রক্রিয়া, নিষেধাজ্ঞা শিথিলের শর্ত, এবং আঞ্চলিক ইস্যু- এসব কিছুই এখনো চূড়ান্ত হয়নি। আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে নতুন দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনাও পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে রেখেছে। ইসরায়েল ও লেবাননের পরিস্থিতি, গাজা-সংক্রান্ত উত্তেজনা এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান- সব মিলিয়ে এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ এখনো ঝুঁকির মধ্যে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন একটাই- এই সমঝোতা কি সত্যিই একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হয়ে উঠবে, নাকি এটি কেবল আরেকটি সাময়িক বিরতি হিসেবে ইতিহাসে জায়গা নেবে।




