• ই-পেপার

মেসির হ্যাটট্রিকে আলজেরিয়াকে বিধ্বস্ত করল আর্জেন্টিনা

লিওনেল মেসি : ফুটবলের সিংহাসনে একচ্ছত্র সম্রাট

হারুনুর রশিদ
লিওনেল মেসি : ফুটবলের সিংহাসনে একচ্ছত্র সম্রাট
লিওনেল মেসি। ছবি : রয়টার্স

ফুটবল অসংখ্য কিংবদন্তির জন্ম দিয়েছে। কেউ শাসন করেছেন একটি যুগ, কেউবা জিতেছেন কেটি মানুষের ভালোবাসা। কিন্তু খুব কম খেলোয়াড়ই আছেন, যাদের নাম সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মের হৃদয়ে একইভাবে বেঁচে থাকে। সেই বিরল তালিকার শীর্ষে থাকা নামটি নিঃসন্দেহে লিওনেল মেসি। 

গত কয়েক দশক ধরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে একইসঙ্গে রাজত্ব করে যাওয়া খেলোয়াড়টার নামও মেসি। তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, কোটি মানুষের আবেগ, অনুপ্রেরণা আর স্বপ্নের আরেক নাম।

৩৮ বছর বয়সেও যেন সময়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে খেলছেন আর্জেন্টাইন এই জাদুকর। অনেকেই ভেবেছিলেন তার সেরা সময় হয়তো ফুরিয়ে গেছে। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক করে তিনি আবারও মনে করিয়ে দিলেন, কিংবদন্তিরা কখনো হারিয়ে যান না, তারা বারবার নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করেন।

বিশ্বকাপে নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক মেসি স্পর্শ করেছেন জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় এখন যৌথভাবে শীর্ষে অবস্থান করছেন দুজন।

কিন্তু মেসির মহত্ত্বকে শুধু গোল কিংবা পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। কারণ মেসি এমন এক ফুটবলার, যিনি একটি পুরো প্রজন্মকে ফুটবলের প্রেমে পড়িয়েছেন।

বার্সেলোনার নীল-লাল জার্সিতে তার পায়ের জাদু দেখে বড় হয়েছে লাখো শিশু। অসংখ্য ট্রফি, রেকর্ড আর আটটি ব্যালন ডি'অর জিতে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন এমন এক উচ্চতায়, যেখানে অন্য কারো পৌঁছানো প্রায় ‘অসম্ভব’।

তবে মেসির গল্প শুধু সাফল্যের নয়, সংগ্রামেরও।

একসময় জাতীয় দলের হয়ে বড় শিরোপা জিততে না পারায় তাকে শুনতে হয়েছে অসংখ্য সমালোচনা। বলা হতো, ক্লাবের মেসি আর দেশের মেসি এক নন। কিন্তু মহান খেলোয়াড়রা সমালোচনার জবাব দেন মাঠে। ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালে আবারও কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতে সেই বিতর্ক চিরতরে শেষ করে দিয়েছেন তিনি।  

আর্জেন্টিনাকে দীর্ঘ ৩৬ বছরের বিশ্বকাপ শিরোপা খরা কাটিয়ে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। কোটি-কোটি আর্জেন্টাইন সমর্থকদের অপেক্ষা শেষ করার নায়কও ছিলেন এই মেসিই।

বিশ্বকাপের ইতিহাসেও মেসির নাম এখন সোনালি অক্ষরে লেখা। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে খেলা প্রথম ফুটবলার হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েছেন তিনি। ২০০৬ সালে কিশোর মেসির বিশ্বকাপ যাত্রা শুরু হয়েছিল, আর ২০ বছর পর ২০২৬ সালে এসেও তিনি আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় ভরসার নাম।

মজার ব্যাপার হলো, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেন আরো পরিণত হয়েছেন মেসি। গতি কিছুটা কমেছে, কিন্তু খেলা পড়ার ক্ষমতা, পাস, ফিনিশিং আর ম্যাচ নিয়ন্ত্রণ করার দক্ষতা এখনো আগের মতোই অসাধারণ। আলজেরিয়ার বিপক্ষে তার হ্যাটট্রিক ছিল সেই সামর্থ্যেরই আরেকটি প্রদর্শনী।

ফুটবলের সিংহাসনে বসার দাবিদার অনেকেই ছিলেন, কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে সেই আসন একাই ধরে রেখেছেন মেসি। নতুন প্রজন্মের তারকারা আসছেন, রেকর্ড ভাঙছেন, আলো ছড়াচ্ছেন। তবু যখন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের সেরাদের আলোচনা হয়, তখন সবার আগে উচ্চারিত হয় একটি নাম।

লিওনেল মেসি।

কারণ তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন, তিনি একটি যুগের নাম। তিনি এমন এক সম্রাট, যার রাজত্বের গল্প প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বলা হবে।

বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিকে মেসি ছুঁলেন ক্লোসার বিশ্বরেকর্ড

ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপের প্রথম হ্যাটট্রিকে মেসি ছুঁলেন ক্লোসার বিশ্বরেকর্ড
প্রথম হ্যাটট্রিকে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকের্ডে ভাগ বসালেন মেসি। ছবি : রয়টার্স

বিশ্বকাপ মানেই নতুন গল্প, নতুন নায়ক। কিন্তু কিছু নাম আছে, যারা প্রতিবারই নিজেদের গল্পকে আরো মহাকাব্যিক করে তোলেন। লিওনেল মেসি সেই বিরলদের একজন।

২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চে আলজেরিয়ার বিপক্ষে যখন মাঠে নামেন, তখন তার বয়স ৩৮। অনেকেই ভেবেছিলেন, হয়তো এটি তার শেষ বিশ্বকাপের আরেকটি অধ্যায়। কিন্তু প্রথম  ম্যাচে নেমেই মেসি যেন মনে করিয়ে দিলেন, বয়স কেবল একটি সংখ্যা, প্রতিভা আর ক্ষুধাই একজন কিংবদন্তিকে আলাদা করে।

আলজেরিয়ার বিপক্ষে দুর্দান্ত এক হ্যাটট্রিক করে আর্জেন্টিনাকে সহজ জয় এনে দেন তিনি। তবে এটি শুধুই তিন গোলের গল্প নয়; এটি ইতিহাস স্পর্শ করার গল্পও বটে।

এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা ১৬-তে নিয়ে যান মেসি। ফলে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসার পাশে বসে গেলেন তিনি। এতদিন ১৬ গোল নিয়ে এককভাবে শীর্ষে ছিলেন ক্লোসা, এখন সেই রেকর্ডে ভাগ বসালেন আর্জেন্টাইন জাদুকর।

বিশেষ ব্যাপার হলো, বিশ্বকাপে এটি মেসির ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক। ছয়টি বিশ্বকাপ খেলা, অসংখ্য রেকর্ড গড়া এবং ২০২২ সালে শিরোপা জয়ের পরও এই অর্জনটি তার ঝুলিতে ছিল না। সেই অপূর্ণতাও এবার পূরণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে।

ম্যাচজুড়ে আলজেরিয়ার রক্ষণকে বারবার বিভ্রান্ত করেছেন মেসি। কখনো নিখুঁত ফিনিশিং, কখনো অসাধারণ পজিশনিং, আবার কখনো তার চিরচেনা ড্রিবলিং। সব মিলিয়ে যেন পুরোনো দিনের মেসিকেই ফিরে পেয়েছে ফুটবল বিশ্ব।

এই হ্যাটট্রিকের পর চলতি বিশ্বকাপের গোলদাতাদের তালিকাতেও শীর্ষে উঠে এসেছেন তিনি। পেছনে ফেলেছেন ফ্রান্সের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং নরওয়ের গোলমেশিন আর্লিং হালান্ডকে।

সবচেয়ে বড় কথা, এখন মেসি দাঁড়িয়ে আছেন আরেকটি ইতিহাসের দরজায়। বিশ্বকাপে একক সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়ার জন্য তার প্রয়োজন আর মাত্র একটি গোল। সেই গোলটি এলেই ক্লোসাকে ছাড়িয়ে নতুন এক অধ্যায়ের জন্ম দেবেন ফুটবলের অন্যতম সেরা এই শিল্পী।

কাতারে বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা ঘুচিয়েছিলেন মেসি। আর ২০২৬ বিশ্বকাপে এসে তিনি যেন একে একে ছুঁয়ে দেখছেন ফুটবলের সবচেয়ে দুর্লভ রেকর্ডগুলো। তাই প্রশ্নটা এখন আর মেসি কত দূর যাবেন, সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, আর কত ইতিহাস লিখবেন তিনি?

অবশেষে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের দেখা পেলেন মেসি

ক্রীড়া ডেস্ক
অবশেষে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিকের দেখা পেলেন মেসি
হ্যাটট্রিক করার পর মেসির উদযাপন। ছবি : রয়টার্স

ক্যারিয়ারের শেষে এসে আজন্ম স্বপ্ন পূরণ করেছিলেন লিওনেল মেসি। কাতার বিশ্বকাপে ট্রফি জিতে। এবার না পাওয়া আরেকটি আক্ষেপও পূরণ করলেন তিনি।

নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসে হ্যাটট্রিকের দেখা পেলেন মেসি। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিকটি তার বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম। তার হ্যাটট্রিকে ৩-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়েছে আর্জেন্টিনা। হ্যাটট্রিক করার পর ৮০ মিনিটে মাঠ ছাড়েন তিনি।

শুরুটা করেন ১৭ মিনিটে ডি বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক শটে। ৬০ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটি।গোলটি করতে কোনো পরিশ্রম করতে হয়নি মেসিকে। শুধু ঠান্ডা মাথায় জালের পথ দেখিয়ে দিতে হয়েছে আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ীকে। ডি বক্সের অনেক বাইরে থেকে জোরালো শট নিয়েছিলেন ম্যাক অ্যালেক্সিস ম্যাক- অ্যালিস্টার। সেটা ধরতে গিয়ে কিছুটা খেই হারিয়ে ফেলেন লুকা জিদান, সামনেই থাকা মেসি বাঁ পায়ে শুধু আলতো টোকা দেন।

৬৬ মিনিটে বিশ্বকাপে প্রথম হ্যাটট্রিকও পেতে পারতেন তিনি। তবে তার হ্যাটট্রিকে বাধা হন আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা। কর্নারের বিনিময়ে আলজেরিয়াকে তৃতীয় গোল হজম করা থেকে বাঁচান। সে যাত্রায় মেসিকে হ্যাটট্রিক করতে না দিলেও, ৭৬ মিনিটে ঠিকই আদায় করে নিলেন মেসি। ডি বক্সের কাছাকাছি থেকে আরেকটি দুর্দান্ত শটে।
 

বিশ্বকাপে যেন পাগলা ঘোড়া হয়ে ওঠেন এমবাপ্পে

ক্রীড়া ডেস্ক
বিশ্বকাপে যেন পাগলা ঘোড়া হয়ে ওঠেন এমবাপ্পে
কিলিয়ান এমবাপ্পে। ছবি : রয়টার্স

বিশ্ব ফুটবলের ইতিহাসে এমন অনেক কিংবদন্তি আছেন, যারা ক্লাব ফুটবলে রাজত্ব করলেও জাতীয় দলের জার্সিতে বিশ্বকাপের মঞ্চে সেই সাফল্য পাননি। লিওনেল মেসি এবং ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোর মতো দুই মহাতারকার ক্ষেত্রেও ক্যারিয়ারের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ছিল একই গল্প।

মেসি ২০০৬, ২০১০, ২০১৪ ও ২০১৮—প্রথম চার বিশ্বকাপে শিরোপা জিততে পারেননি। ২০১৪ সালে তিনি আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে তুলেছিলেন ঠিকই, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জার্মানির কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়। অন্যদিকে রোনালদো ২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২—কোনো বিশ্বকাপেই পর্তুগালকে ফাইনালে তো দূরের কথা, সেমিফাইনালের পরও নিতে পারেননি। অথচ এই সময় দুজনই ক্লাব ফুটবলে বিশ্বকে শাসন করছিলেন, জিতছিলেন ব্যালন ডি'অর, চ্যাম্পিয়নস লিগ ও অসংখ্য শিরোপা।

সেখানেই ব্যতিক্রম কিলিয়ান এমবাপ্পে। ক্লাব ফুটবলে যেমন দুর্দান্ত, জাতীয় দলের জার্সিতেও ঠিক ততটাই ভয়ংকর তিনি। বিশ্বকাপ এলেই যেন আরো এক ধাপ এগিয়ে যান ফরাসি এই তারকা।

২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে মাত্র ১৯ বছর বয়সে চার গোল করে ফ্রান্সকে শিরোপা জেতাতে বড় ভূমিকা রাখেন এমবাপ্পে। ফাইনালেও গোল করেছিলেন তিনি। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে তো একাই ইতিহাস লিখেছেন। পুরো টুর্নামেন্টে করেন ৮ গোল, জেতেন গোল্ডেন বুট। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ফাইনালে করেন অবিশ্বাস্য হ্যাটট্রিক, যা বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় পারফরম্যান্স।

এবার ২০২৬ বিশ্বকাপেও শুরুটা করেছেন দারুণভাবে। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে তিনি শুধু ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডই স্পর্শ করেননি, বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যাও নিয়ে গেছেন নতুন উচ্চতায়।

মাত্র তিনটি বিশ্বকাপ খেলেই এমবাপ্পের গোলসংখ্যা পৌঁছে গেছে কিংবদন্তিদের কাতারে। যেখানে মেসি ও রোনালদোকে বিশ্বকাপে নিজেদের সেরাটা দেখাতে অপেক্ষা করতে হয়েছে বহু বছর, সেখানে এমবাপ্পে শুরু থেকেই হয়ে উঠেছেন টুর্নামেন্টের সবচেয়ে বড় তারকা।

তাই অনেক ফুটবল বিশ্লেষকের মতে, ক্লাব ও জাতীয় দল—দুই মঞ্চেই সমান আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রজন্মে এমবাপ্পের তুলনা খুঁজে পাওয়া কঠিন। বিশ্বকাপের আলো জ্বললেই যেন তিনি আরো দ্রুতগতির, আরো ক্ষুধার্ত এক ফুটবলার হয়ে ওঠেন। আর সে কারণেই বলা হচ্ছে, বিশ্বকাপ আসলেই যেন পাগলা ঘোড়া হয়ে যান এমবাপ্পে।