চার মাস বয়সি সরকারের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে বিরোধী দল। জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, সরকারকে বেশি দিন সময় দেওয়া হবে না। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি এ কথা বললেও এটাই তাঁদের মনের কথা। সেভাবেই তাঁরা অগ্রসর হচ্ছেন। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশবাসীকে তাঁদের ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। অবশ্য দেশের জনগণ তাঁদের প্রতি ১৯৭১ সাল থেকেই সতর্ক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর দল বিএনপি নেতা-কর্মীরা কতটুকু সতর্ক সেটাই দেখার। সরকার পরিচালনার জন্য ইতোমধ্যে দুই স্তরবিশিষ্ট দেয়াল তৈরি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। কাউকে মন্ত্রী করেছেন আবার কাউকে উপদেষ্টাও নিয়োগ দিয়েছেন। সেই দুই স্তরের দেয়াল ভেদ করেও অনেক ভুলত্রুটি ইতোমধ্যে দেশবাসীর দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। অপ্রিয় সত্য এখনো অনেকে সাহস করে বলতে পারছেন না। কারণ সত্যকথনে শত্রু বাড়ে। রাজনৈতিক নেতারা যখন ক্ষমতার বাইরে থাকেন তখন তাঁদের সামনে অপ্রিয় হলেও সত্য কথা বলা যায়। তাঁরাও হাসিমুখে সেই সত্য কথাটি শুনতে বাধ্য হন। কিন্তু তাঁরাই যখন ক্ষমতাবান হন তখন সত্য কথা হজম করার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। চারপাশে চাটুকারবেষ্টিত হয়ে থাকার কারণে সত্য হজম করতে পারেন না। পরিবারের সদস্য ও রাজনৈতিক এপিএস নামক সত্যবাদী যুধিষ্ঠিরদের কারণে তাঁরা অন্য কারও কথাকে গুরুত্ব দেন না। শেষ পর্যন্ত এদের কারণেই ভয়াবহ ভরাডুবি হয়। সে কারণে সরকারকে শুধু মন্ত্রী, উপদেষ্টাবেষ্টিত থাকলেই হবে না। সত্য কথা বলতে পারে, কোনটা ভুল, কোনটা সঠিক সেটা যারা বুঝতে এবং সাহস করে বলতে পারে এমন একটি সেলও গঠন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। কারণ ইতোমধ্যে সারা দেশে মন্ত্রী-এমপিদের স্বজন ও এপিএসের সুকর্ম-কুকর্ম জনগণকে ভাবিয়ে তুলছে। তাই বিরোধী দলের হুঁশিয়ারির আগে নিজেদের হুঁশ হতে হবে।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু ক্ষমতা নয়, আত্মসমালোচনার সক্ষমতা। যে সরকার নিজের ভুল দেখতে পারে, সমালোচনা গ্রহণ করতে পারে এবং সময়মতো সংশোধনের উদ্যোগ নেয় সেই সরকারই দীর্ঘমেয়াদে জনগণের আস্থা অর্জন করে। অন্যদিকে ক্ষমতার চারপাশে যখন চাটুকারের বৃত্ত তৈরি হয়, তখন ভুলগুলো ধীরে ধীরে বড় বিপদে পরিণত হয়। দেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এ বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গনে সরকারকে ঘিরে নানান ধরনের আলোচনা দেখা যাচ্ছে। একদিকে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর পক্ষ থেকে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীর আমিরও বলেছেন, সরকারকে বেশি সময় দেওয়া যাবে না। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী জনগণকে সতর্ক করে বলেছেন, যারা বলে সরকারকে সময় দেওয়া যাবে না, তাদের ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। এ দুই বক্তব্য দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার দুটি দিক সামনে নিয়ে আসে। একদিকে রয়েছে সরকারের প্রতি চাপ সৃষ্টির চেষ্টা, অন্যদিকে সরকারকে স্থিতিশীলভাবে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার অপরিহার্যতা। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, সরকারকে সময় দেওয়া হোক বা না হোক, সরকারের ভিতরে ভুলত্রুটি থাকলে সেগুলো চিহ্নিত ও সংশোধন করা জরুরি। কারণ সরকারের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ সব সময় বিরোধী দল নয়; অনেক সময় সরকারের ভিতরের দুর্বলতা, অদক্ষতা, দুর্নীতি এবং সুবিধাভোগী চক্রই সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে, জনপ্রিয় সরকারও শেষ পর্যন্ত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে মূলত নিজেদের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার কারণে। ক্ষমতার আশপাশে এক ধরনের সুবিধাভোগী শ্রেণি গড়ে ওঠে, যারা নিজেদের স্বার্থে সরকারের ভাবমূর্তি ব্যবহার করে। মন্ত্রী, এমপি, উপদেষ্টা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠজনেরা কখনো কখনো এমন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন, যার দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ওপরই বর্তায়। বর্তমান সময়েও বিভিন্ন পর্যায়ে কোনো কোনো মন্ত্রী, এমপি ও তাঁদের স্বজন কিংবা ব্যক্তিগত সহকারীর (এপিএস) বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসছে। এসব অভিযোগ সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আবশ্যকতা থাকলেও একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই যে এ ধরনের ঘটনা জনগণের মধ্যে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাধারণ মানুষ সরকারের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে শুধু প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য বা মন্ত্রিপরিষদের সিদ্ধান্ত দিয়ে নয়। তারা বিচার করে মাঠপর্যায়ে কী ঘটছে, ক্ষমতার আশপাশে থাকা ব্যক্তিরা কী করছেন। এ কারণেই সরকারের ভিতরে একটি কার্যকর ‘ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল’ গঠন করা সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে। এ সেলের কাজ হবে সরকারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, সমালোচনা ও জনগণের অসন্তোষের কারণগুলো নিরপেক্ষভাবে বিশ্লেষণ করা। এটি কোনো গোয়েন্দা সংস্থা হবে না, কোনো রাজনৈতিক প্রচার ইউনিটও হবে না। বরং এটি হবে সত্য অনুসন্ধানী একটি স্বাধীন পর্যবেক্ষণ কাঠামো, যার প্রধান কাজ হবে সরকারের দুর্বলতা চিহ্নিত করে সংশোধনের পথ দেখানো।
সাধারণত সরকারপ্রধানকে খুশি করতে তাঁর কাছে ইতিবাচক তথ্যই বেশি পৌঁছে। মাঠপর্যায়ের প্রশাসন থেকে শুরু করে রাজনৈতিক কর্মীরা প্রায়ই সাফল্যের খবর তুলে ধরতে আগ্রহী থাকেন। কিন্তু ব্যর্থতা, অসন্তোষ বা দুর্নীতির তথ্য অনেক সময় গোপন থেকে যায়। ফলে নীতিনির্ধারকদের সামনে বাস্তব চিত্রের পরিবর্তে একটি সাজানো চিত্র উপস্থিত হয়। এতে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভুল হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে। একটি ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল এ সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এ সেলে প্রশাসন, অর্থনীতি, গণমাধ্যম, সমাজবিজ্ঞান ও সুশীল সমাজের অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। তাঁরা নিয়মিতভাবে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রকল্পের কার্যক্রম মূল্যায়ন করবেন। কোথায় দুর্নীতি হচ্ছে, কোথায় জনভোগান্তি বাড়ছে, কোথায় নীতিগত দুর্বলতা রয়েছে এসব বিষয়ে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বা সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে প্রতিবেদন জমা দেবেন। বিশেষ করে মন্ত্রী, এমপি, তাঁদের পরিবারের সদস্য ও এপিএসদের কার্যক্রমের ওপর নজরদারি অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের বাস্তবতায় বহু সময় দেখা যায়, কোনো মন্ত্রী বা এমপি ব্যক্তিগতভাবে সৎ হলেও তাঁর আশপাশের লোকজন প্রভাব খাটিয়ে অনৈতিক সুবিধা আদায় করেন। ব্যবসায়িক প্রভাব বিস্তার, নিয়োগবাণিজ্য, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রশাসনিক কাজে হস্তক্ষেপের অভিযোগ সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি করে। বিশেষ করে এপিএস হয়ে ওঠেন মন্ত্রী-এমপির চেয়ে ক্ষমতাবান। এসব কর্মকাণ্ডের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারের ঘাড়েই বর্তায়।
বিশ্বের অনেক দেশেই ক্ষমতাসীনদের স্বজন ও ঘনিষ্ঠদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষ নৈতিকতা কমিশন বা অভ্যন্তরীণ তদারকি কাঠামো রয়েছে। কারণ অতীতে দেখা গেছে, সরকারের ভাবমূর্তি ধ্বংস করতে অনেক সময় বিরোধীদের চেয়ে ক্ষমতার আশপাশে থাকা অসাধু ব্যক্তিরাই বেশি ভূমিকা রাখেন।
বাংলাদেশে বর্তমানে সরকার পরিচালনার কাজে বহু উপদেষ্টা ও বিশেষজ্ঞ সম্পৃক্ত করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন খাতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনাকে আরও কার্যকর করা। এটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে শুধু পরামর্শ দেওয়ার জন্য উপদেষ্টা থাকলেই হবে না; সরকারের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার জন্যও কিছু মানুষের প্রয়োজন। এমন মানুষ দরকার, যারা কোনো ভয় বা সংকোচ ছাড়াই সত্য কথা বলতে পারবেন। যারা শুধু সরকারের প্রশংসা করবেন না, বরং প্রয়োজনে সরকারের সিদ্ধান্তের দুর্বলতাও তুলে ধরবেন। রাজনীতিতে একটি প্রচলিত কথা আছে-ক্ষমতার সবচেয়ে বড় বিপদ হলো মানুষ সত্য বলা বন্ধ করে দেয়। শাসকের চারপাশে তখন এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়, যেখানে সবাই সন্তুষ্টির খবর শোনাতে চায়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রকৃত উপকার করেন সেই ব্যক্তি, যিনি সাহসের সঙ্গে ভুলগুলো চিহ্নিত করেন। কারণ ভুল জানা গেলে তা সংশোধনের সুযোগ থাকে; কিন্তু ভুল আড়াল করা হলে তা একসময় সংকটে পরিণত হয়।
বর্তমান বৈশ্বিক ও জাতীয় বাস্তবতায় বাংলাদেশ নানান ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। অর্থনীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, মূল্যস্ফীতি, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা সব ক্ষেত্রেই সরকারকে কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি হলো জনগণের আস্থা ধরে রাখা। আর জনগণের আস্থা ধরে রাখার অন্যতম উপায় হচ্ছে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সরকারের ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল সেই জবাবদিহিতার একটি কার্যকর মাধ্যম হতে পারে। এটি সরকারের সমালোচকদের মুখ বন্ধ করার জন্য নয়; বরং সমালোচনার ভিতরে থাকা সত্য খুঁজে বের করার জন্য। এতে সরকার যেমন নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন হবে, তেমন অপপ্রচার ও ভিত্তিহীন অভিযোগ থেকেও নিজেদের রক্ষা করতে পারবে। আজকের বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সত্য বলার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা। সরকারের জন্যও সেটি প্রযোজ্য। যে সরকার নিজের ভুল শুনতে রাজি থাকে, সেই সরকারই শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী হয়। তাই সরকারের চারপাশে শুধু প্রশংসাকারী নয়, সত্য বলার সাহসী মানুষও থাকা দরকার। একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল গঠন সেই লক্ষ্য অর্জনের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
রাষ্ট্র পরিচালনায় সতর্কতা, আত্মসমালোচনা ও জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই। মন্ত্রী, এমপি, তাঁদের পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারের নীতিগত ও প্রশাসনিক দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করার জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। কারণ একটি সরকারের প্রকৃত শক্তি তার ভুল না হওয়ায় নয়; বরং ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দ্রুত সংশোধন করার সক্ষমতায়। সেই সক্ষমতা অর্জনের জন্যই সরকারের ভুলত্রুটি নিরূপণ সেল প্রয়োজন।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন




