কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) চলমান ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষের ভর্তি কার্যক্রম প্রায় শেষের পথে। এরমধ্যে কোন আবেদন আসেনি বিদেশি শিক্ষার্থীদের থেকে। সর্বশেষ ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের পর থেকে যাবৎ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগ্রহ দেখায়নি কোন শিক্ষার্থী। দীর্ঘদিনে এ সংক্রান্ত কোন উদ্যোগও নিতে দেখা যায়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার দপ্তরের অ্যাকাডেমিক শাখা থেকে জানা যায়, ২০০৬-০৭ শিক্ষাবর্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরুর চার বছর পর ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে আইসিটি বিভাগে মো. জাহাঙ্গীর, মাধব কাহার গৌদ ও সিএসই বিভাগে মিথালেশ কুমার মুখিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এরপর সর্বশেষ ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে সিএসই বিভাগে ভর্তি হন সাজিদ ইকবাল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ বছরে ভর্তি হয়েছেন কেবল এই চারজন বিদেশি শিক্ষার্থী। তারপর আর কেউ ভর্তি হননি, কুবিতে ভর্তি হওয়ার আগ্রহও দেখায়নি কেউ।
আরো পড়ুন
পাশের বাড়ির হাঁস 'খাবার চোর', প্রতিবেশীদের মারামারি গড়াল থানায়
এর আগে ২০২০-২১, ২০২১-২২, ২০২২-২৩ এবং ২০২৩-২৪ এই চার শিক্ষাবর্ষে গুচ্ছ ভর্তি পদ্ধতিতে বিশ্ববিদ্যালয় অন্তর্ভুক্ত থাকায় বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে আলাদা কোনো উদ্যোগ নিতে পারেনি বলে জানিয়েছিল তৎকালীন প্রশাসন। তবে গত ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে স্বতন্ত্র পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নিলেও নেওয়া হয়নি কোনো উদ্যোগ। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির সংখ্যাটা সম্প্রতি শূন্যের বৃত্তেই প্রতিবছর আবর্তিত হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দীর্ঘদিন ক্যাম্পাসে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ার পেছনে রয়েছে অসংখ্য কারণ। এরমধ্যে, পরীক্ষার ফলাফল তৈরিতে দীর্ঘসূত্রিতা, বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভর্তি প্রক্রিয়া নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা না থাকা, বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে না থাকা, গবেষণায় পিছিয়ে থাকা, বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের আলাদা কোন নীতিমালা না থাকা, শ্রেণিকক্ষে বাংলায় পাঠদান, আবাসিকতার সংকট, স্কলারশিপ ব্যবস্থা না থাকা, প্রতিকূল পরিবেশ, পর্যাপ্ত নিরাপত্তার অভাব, আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকা ইত্যাদি।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেগা প্রজেক্ট নির্মাণাধীন নতুন ক্যাম্পাস নিয়ে সকলে আশার বাণী শোনালেও, সেখানের পরিকল্পনায়ও রাখা হয়নি বিদেশি শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোন ভাবনা। তাদের ভবিষ্যৎ আবাসনের জন্য রাখা হয়নি আন্তর্জাতিক কোন হল কিংবা ডর্ম। ফলে বিদেশি শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতেও কুবিতে আগ্রহ দেখাবে কিনা, সেটা নিয়েও দেখা দিয়েছে আশঙ্কা।
আরো পড়ুন
মালয়েশিয়া সফর শেষে চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী
বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সরকারি বা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তিসংক্রান্ত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বিদেশি শিক্ষার্থীদের যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে প্রাপ্ত আবেদন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে প্রেরণ করা হয়। পরবর্তীকালে, উক্ত আবেদনকারী শিক্ষার্থীদের তাদের দাখিলকৃত পাসপোর্টসহ যাবতীয় সনদপত্রসমূহ পরীক্ষাপূর্বক ভর্তি করার জন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়কে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ কর্তৃক প্রাথমিক অনুমতি প্রদান করা হয়।
তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, মন্ত্রণালয়ের পদ্ধতি ছাড়াও, সরাসরি ভর্তি বিজ্ঞপ্তিতে কোনো নির্দেশনা না থাকলেও ভর্তি আবেদনের নির্দিষ্ট সময়সীমায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অফিসিয়াল ই-মেইল ঠিকানায় মেইলের মাধ্যমে কেউ আগ্রহ প্রকাশ করলে সেক্ষেত্রে ভর্তি প্রক্রিয়ার কার্যক্রম শুরু হতো। তবে, ভর্তি বিজ্ঞপ্তি ছাড়াও কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি-ইচ্ছুক হয়ে মেইল পাঠালে তাকে পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে অন্তর্ভুক্ত করার কার্যক্রম শুরু করতে পারবে প্রশাসন।
সম্প্রতি বৈশ্বিক শিক্ষার বাজারে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ পরিধি বৃদ্ধির লক্ষ্যে গতবছরের ২৯ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দপ্তর চালু করা হয়েছে। এর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে রয়েছেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক মশিউর রহমান।
এই দপ্তর চালু হওয়ার পর বেশ কয়েকটি বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এরমধ্যে তুরস্ক এবং মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে শিক্ষার্থী বিনিময় চুক্তির আওতায় কার্যক্রমও চলমান। এই বিষয়টিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের এখানে না আসার পেছনে বিশ্ববিদ্যালয়ের অসংখ্য সীমাবদ্ধতা এবং সংকটকে তুলে ধরে দপ্তরটির পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মশিউর রহমান বলেন, ‘এখানে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি না হওয়ার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। এখান রেজাল্ট কখন দেয়, সেটার কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই। কিন্তু তাদের তো এখানে অবস্থান করার একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকে। ফলে এটার কোন সমাধান নেই এখানে। যে কারণে তারা এখানে আগ্রহী হচ্ছে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে কোনো কোর্স, শিক্ষক প্রোফাইল নিয়ে ডিটেইলস নাই। ফলে তারা কিছু জানতে পারছে না। না জানলে আসবে কীভাবে?’
এর জন্যে আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিত বাড়ানোর কথা জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, কুবি কয়টা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেয়? এখানে যদি আমাদের পরিচিতিই না থাকে, তাহলে বিদেশিরা জানবে কীভাবে আমাদের সম্পর্কে। এর জন্য তিনি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন এবং যোগদানের দিকে মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেন তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ২১ বছরে ভর্তি হওয়া মাত্র চারজন বিদেশি শিক্ষার্থীর প্রত্যেকেই প্রকৌশল অনুষদভুক্ত আইসিটি এবং সিএসই বিভাগের ছিলেন। এনিয়ে আক্ষেপ রয়েছে অনুষদটিতেও।
প্রকৌশল অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. তোফায়েল আহমেদ বলেন, মাধব-জাহাঙ্গীর আমারই স্টুডেন্ট ছিলো। তারা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আবেদন করেছিল, তারপর আমাদের এখানে তখন ভর্তি হয়েছিল। এখন অনেক বছর এখানে ভর্তি নেই।
আলাদা নীতিমালা প্রণয়ন নিয়ে তিনি বলেন, নীতিমালা করলে সেটা শিক্ষার্থীবান্ধব করতে হবে, যেন সরাসরি আবেদন করতে পারে। তাদের ভাষাগত অসুবিধা হবে কিনা সেটাও দেখতে হবে। বিদেশির বেশিরভাগই প্রযুক্তিগত বিষয় পড়তে আসে। আমাদের এখানে থাকা সুযোগ-সুবিধার ভিত্তিতে তারা এখানে চয়েজ করবে কিনা, এটাও দেখতে হবে। আবেদনের প্রক্রিয়াটা সহজ করতে হবে। তাদেরকে নিরাপদ আবাসন, সুযোগ-সুবিধা দিতে পারলে তারা হয়ত আকৃষ্ট হবেন।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার (অতিরিক্ত দায়িত্ব) নুরুল করিম চৌধুরী বলেন, এখানে বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়া উচিত। পূর্বে ভর্তি হয়েছিল কিন্তু এখন যেহেতু হচ্ছে না, বিষয়টি আমাদের উপাচার্য স্যারের কাছে উপস্থাপন করব। কীভাবে সমাধান করা যায়, সেটি নিয়ে আলোচনা করব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, ‘আমরা প্রত্যাশামতো র্যাংকিংয়ে পৌঁছাতে পারিনি। তারমধ্যে আমাদের ওয়েবসাইট আপডেট না হওয়ায় সেখানে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। তাদের আবাসন সংকট রয়েছে, কোর্স সম্পর্কিত তথ্য থাকে না। আমরা সবকিছু নিয়েই ভাবছি। আমরা আমাদের ঘাটতিগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।’