চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ সময়ে সম্পূরক বাজেটের মাধ্যমে অতিরিক্ত ব্যয়ের অনুমোদন নেওয়ার প্রচলিত প্রক্রিয়া নিয়ে জাতীয় সংসদে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা। তারা অভিযোগ করেছেন, সরকার আগে ব্যয় সম্পন্ন করে পরে সংসদের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন চাইছে। এর ফলে সংসদের আর্থিক নজরদারি ও অনুমোদনের সাংবিধানিক ক্ষমতা কার্যত ‘লোক দেখানো’ বা আনুষ্ঠানিকতায় সীমিত হয়ে যাচ্ছে।
সোমবার (১৫ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট ও ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ‘দেশের জিডিপির আকার প্রায় ৬৮ লাখ কোটি টাকা হলেও প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে। মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ দশমিক ৫ শতাংশের ঘরে আটকে আছে।’
আর্থিক খাতের সংকট তুলে ধরে তিনি আরো বলেন, ‘খেলাপি ঋণ মোট বিতরণকৃত ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যার আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২২ শতাংশ থেকে কমে প্রায় ৫ শতাংশে নেমে এসেছে এবং ব্যাংকিং খাতে মূলধন পর্যাপ্ততাও ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে।’ ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে প্রকৃত সক্ষমতাহীনদের ঋণ দেওয়া হয়েছে এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে সুদের ও ডলারের হার নির্ধারণ করায় এই বিপর্যয় নেমে এসেছে বলে তিনি দাবি করেন।
অর্থপাচারের প্রসঙ্গ টেনে রুমিন ফারহানা বলেন, ‘শ্বেতপত্র অনুযায়ী গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। আর গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির তথ্য অনুযায়ী, ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে।’
নতুন সরকারের বৈদেশিক অর্থায়ন নিয়ে তিনি বলেন, ‘আইএমএফ আগের ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি নতুন সরকারের জন্য বহাল থাকবে না বলে জানিয়েছে। ফলে নতুন করে চুক্তি করতে হবে। এ অবস্থায় সরকারকে চীন বা অন্য কোনো দেশের ঋণের দিকে ঝুঁকতে হতে পারে, যেখানে সুদের হার ও পরিশোধের চাপ—দুই-ই বেশি।’
বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরী বলেন, ‘অর্থপাচার এবং রপ্তানি খাতের দুর্বলতা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দেশ ক্রমেই আমদানিনির্ভর হয়ে পড়লেও রপ্তানি সেই হারে বাড়ছে না, যা বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, বরাদ্দ বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে দেওয়ায় প্রকৃত উপকারভোগীরা কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাচ্ছেন না।’
একই দলের সংসদ সদস্য মো. আব্দুল গফুর সম্পূরক বাজেটের যৌক্তিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন। তিনি বলেন, ‘অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়ার ঘটনা সরকারের আর্থিক শৃঙ্খলার ঘাটতি এবং ব্যয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারই প্রতিফলন।’
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের হিমশিম খাওয়ার চিত্র তুলে ধরে আব্দুল গফুর বলেন, ‘সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার হওয়া উচিত ছিল বাজার নিয়ন্ত্রণ। কিন্তু কার্যকর বাজার তদারকির পরিবর্তে সরকার অতিরিক্ত বরাদ্দ চাইছে। অতিরিক্ত অর্থের কতটুকু বাজার মনিটরিংয়ে ব্যয় হবে?’ তিনি সম্পূরক বাজেটের একটি অংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ ও ভর্তুকি খাতে স্থানান্তরের প্রস্তাব দেন।
সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনার শুরুতেই বিরোধী দলের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন খরচের পর অনুমোদন নেওয়ার প্রচলিত রীতির সমালোচনা করে এই ‘প্র্যাকটিস’ বন্ধের দাবি জানান।
জামায়াতের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ নাজিবুর রহমান বলেন, ‘সংবিধানের ৯১ অনুচ্ছেদের আওতায় সরকার অতিরিক্ত ব্যয় করে পরে তা সম্পূরক বাজেট হিসেবে সংসদে আনে। খরচ হয়ে যাওয়ার পর তা সংসদে আসায় অনুমোদন দেওয়া ছাড়া সংসদের সামনে আর কোনো বাস্তব বিকল্প থাকে না। সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন, ২০০৯ অনুযায়ী সংশোধিত বাজেট যথাসম্ভব মার্চ মাসের মধ্যে সংসদে উপস্থাপনের বাধ্যবাধকতার কথা মনে করিয়ে দেন তিনি।’
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মঞ্জুরি দাবির আলোচনায় বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মো. আবদুল আলিম বলেন, ‘আগে খরচ, পরে অনুমোদন নয়; ‘আগে অনুমোদন, পরে খরচ’—এই নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। অর্থবছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে ব্যয় করার প্রবণতা অপচয় ও অনিয়মের ঝুঁকি বাড়ায়।’
সংসদ সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ স্বীকার করেন, রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের আগে সংসদের অনুমোদন নেওয়ার ব্যবস্থা থাকলে সংসদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হতো।
স্পিকার বলেন, ‘আমিও বিশ্বাস করি, রাষ্ট্রীয় খরচ যা কিছু, সেটা আগেই সংসদে অনুমোদন নেওয়া উচিত। তবে নানা কারণে এটা হয়তো সম্ভব হয় না। দীর্ঘদিন ধরে সম্পূরক বাজেট একই পদ্ধতিতে পাস হয়ে আসায় এটি এক ধরনের সংসদীয় রেওয়াজে পরিণত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যতে সংসদের সার্বভৌমত্ব আরও শক্তিশালী করার জন্য বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনার সুযোগ রয়েছে।’