• ই-পেপার

যেভাবে একটি দিন বরকতময় করে কাটাবেন

যুবকদের উদ্দেশে যা বললেন মসজিদে নববির ইমাম শায়খ আল-হুজাইফি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যুবকদের উদ্দেশে যা বললেন মসজিদে নববির ইমাম শায়খ আল-হুজাইফি
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনে এমন কিছু বাণী আছে, যা জীবন পরিচালনার জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা। মহানবী (সা.)-এর এমনই এক অনন্য উপদেশ-বাণীকে কেন্দ্র করে যুবকদের উদ্দেশে পবিত্র মসজিদে নববির জুমার খুতবায় হৃদয়স্পর্শী আলোচনা করেছেন মসজিদে নববির সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আলী বিন আব্দুর রহমান আল-হুজাইফি। 

তিনি খুতবার শুরুতেই সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে উদ্দেশ করে মহানবী (সা.)-এর সেই অমূল্য উপদেশটি স্মরণ করিয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে যুবক! আমি তোমাকে কয়েকটি কথা শিক্ষা দিচ্ছি। আল্লাহকে রক্ষা করো (অর্থাৎ তাঁর আদেশ-নিষেধ মেনে চলো), তাহলে আল্লাহ তোমাকে রক্ষা করবেন। তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে। যখন কিছু চাইবে, আল্লাহর কাছেই চাইবে। যখন সাহায্য প্রার্থনা করবে, আল্লাহর কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করবে। জেনে রাখো, যদি সমগ্র উম্মত তোমার কোনো উপকার করতে একত্রিত হয়, তবে তারা আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্ধারণ করেছেন, তার বাইরে কোনো উপকার করতে পারবে না। আর যদি তারা তোমার ক্ষতি করতে একত্রিত হয়, তবে আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তার বাইরে কোনো ক্ষতিও করতে পারবে না। কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং তাকদিরের পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে।’

এই সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর অর্থবহ হাদিসে একজন মুসলিমের জীবনের সব মৌলিক নীতিমালা স্থান পেয়েছে। তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘আল্লাহকে রক্ষা করো’—এর অর্থ আল্লাহর আদেশ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা, তাঁর নিষেধ থেকে দূরে থাকা এবং তাঁর নির্ধারিত সীমারেখাকে সম্মান করা। যে ব্যক্তি এভাবে জীবন পরিচালনা করে, আল্লাহ তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে নিরাপত্তা, কল্যাণ ও সফলতা দান করেন।

তিনি পবিত্র কোরআনের সেই সুসংবাদ স্মরণ করিয়ে দেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমানদার অবস্থায় সৎকর্ম করবে—সে পুরুষ হোক কিংবা নারী—আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র ও সুন্দর জীবন দান করব এবং তাদের কর্মের সর্বোত্তম প্রতিদান প্রদান করব।’
তারপর তিনি আল্লাহর সেই অঙ্গীকার তুলে ধরেন, যেখানে আল্লাহ বলেন, ‘আর যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ বের করে দেন এবং তাকে এমন উৎস থেকে রিজিক দান করেন, যা সে কল্পনাও করতে পারে না।’

শায়খ আল-হুজাইফি আরো বলেন, তাকওয়ার বরকত শুধু ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তার পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি সুরা কাহফ-এ বর্ণিত দুই এতিম শিশুর ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেন, যেখানে তাদের নেককার পিতার কারণে আল্লাহ তাদের সম্পদ সংরক্ষণ করেছিলেন। এ থেকেই বোঝা যায়, একজন পিতার নেক আমল সন্তানের জন্যও রহমত ও নিরাপত্তার কারণ হতে পারে। এ কারণেই সলফে সালেহিন নিজেদের আমল বৃদ্ধি করতেন এই আশায় যে আল্লাহ তাঁদের সন্তানদেরও হেফাজত করবেন।

শায়খ আল-হুজাইফি ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত—নামাজের গুরুত্বও বিশেষভাবে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, যে ব্যক্তি নামাজ যথাযথভাবে আদায় করে, নামাজের রুকন, শর্ত ও খুশু-খুজু রক্ষা করে, তার জন্য ইসলামের অন্যান্য ইবাদত ও আনুগত্যের কাজ সংরক্ষণ করা সহজ হয়ে যায়। একই সঙ্গে তিনি দৃষ্টি সংযত রাখা, লজ্জাস্থানের হেফাজত করা, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে গুনাহ থেকে বিরত রাখা এবং ইসলামী শিষ্টাচার অনুসরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। 

তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই বাণীর ব্যাখ্যা করেন, ‘আল্লাহকে রক্ষা করো, তুমি তাঁকে তোমার সামনে পাবে।’ এর অর্থ হলো, যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্যে জীবন পরিচালনা করে, আল্লাহ তার প্রতি বিশেষ অনুগ্রহ করেন। তিনি তাকে সঠিক পথের দিশা দেন, বিপদে সাহায্য করেন, শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় দান করেন এবং সর্বাবস্থায় তাঁর রহমত ও তত্ত্বাবধানে রাখেন। তাই একজন মুমিনের জীবনে যত বিপদ-মুসিবতই আসুক না কেন, যদি সে ধৈর্য ধারণ করে এবং আল্লাহর কাছে সওয়াবের আশা রাখে, তবে সেই কষ্টই তার মর্যাদা বৃদ্ধি এবং গুনাহ মাফের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

খুতবায় তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর পূর্ণ নির্ভরতার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়। শায়খ আল-হুজাইফি বলেন, প্রকৃত মুসলমান শুধু আল্লাহর কাছেই প্রার্থনা করে এবং একমাত্র তাঁর ওপরই নির্ভর করে। কারণ উপকার ও ক্ষতির প্রকৃত মালিক একমাত্র আল্লাহ। আসমান ও জমিনের সব ভাণ্ডারের চাবিকাঠি তাঁরই হাতে। তাই এমন বিষয়ে কোনো সৃষ্টির সাহায্য চাওয়া, যা একমাত্র আল্লাহই করতে সক্ষম, তা শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

তিনি হাদিসের শেষ অংশ—‘কলম তুলে নেওয়া হয়েছে এবং পৃষ্ঠাগুলো শুকিয়ে গেছে’—এর ব্যাখ্যায় বলেন, এর মাধ্যমে তাকদিরের প্রতি দৃঢ় ঈমানের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ যা নির্ধারণ করেছেন, তা অবশ্যই ঘটবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানুষ চেষ্টা-প্রচেষ্টা ছেড়ে দেবে। বরং একজন মুমিন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, বৈধ উপায় অবলম্বন করবে এবং ফলাফলের ব্যাপারে আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা রাখবে। এটাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।

শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আওয়াদ আল-জুহানি

মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী। তাই একজন মুমিনের জন্য প্রতিটি দিনই আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নতুন সুযোগ। এই চিরন্তন সত্যই হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন পবিত্র মসজিদুল হারাম-এর সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আওয়াদ আল-জুহানি তাঁর জুমার খুতবায়। 

খুতবার সূচনায় তিনি মুসলিমদের উদ্দেশে বলেন, সর্বাবস্থায়—কথায়, কাজে এবং চরিত্রে—আল্লাহকে ভয় করতে হবে এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকতে হবে। বিচার দিবস আসার আগেই প্রত্যেক মানুষকে নিজের আমলের হিসাব নিজেকেই নিতে হবে। পাশাপাশি পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলো শুধু তিলাওয়াত করলেই চলবে না; বরং সেগুলোর শিক্ষা উপলব্ধি করে জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরই প্রশংসা করেছেন, যারা তাঁর নির্দেশিত সম্পর্কগুলো অটুট রাখে এবং তাঁর আদেশ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে।

খুতবার এক পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় প্রশ্ন রাখেন, আল্লাহ আমাদের যে জান্নাতের দিকে আহ্বান করছেন, আমরা যদি তাঁর সেই আহ্বানে সাড়া না দিই তাহলে কারা তাঁর ডাকে সাড়া দেবে?

তিনি বলেন, এজন্য আমাদের আল্লাহ যেসব সম্পর্ক বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলো রক্ষা করতে হবে। আর এর প্রথম ও সর্বোচ্চ স্তর হলো একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর আনীত শরিয়তের অনুসরণ করা। এরপর রয়েছে সৎকর্মে অটল থাকা, আল্লাহর ভয়ে হৃদয়কে সজীব রাখা, বিচার দিবসের কঠিন হিসাবের আশঙ্কায় নিজেকে গুনাহ থেকে বিরত রাখা এবং সর্বদা নেক আমলের প্রতি যত্নশীল থাকা।

তাই একজন মুমিন শুধু নিজের ইবাদতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সমাজ ও পরিবারের প্রতিও তার দায়িত্ব রয়েছে। সে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করে, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে, দরিদ্র, এতিম ও প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। একই সঙ্গে সে সমাজে সৎকাজের প্রসার ঘটাতে চেষ্টা করে, অন্যায় ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং সর্বদা আল্লাহর স্মরণে নিজের হৃদয়কে জীবন্ত রাখে। কারণ, আল্লাহর জিকিরই মানুষের অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি ও মর্যাদার উৎস।

শায়খ আল-জুহানি বলেন, একজন বান্দাকে আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ় রাখে দুটি শক্তিশালী অনুভূতি— ১. আল্লাহভীতি, ২.  আখিরাতে জবাবদিহির সচেতনতা। যে ব্যক্তি জানে, একদিন তাকে তার প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব দিতে হবে, সে সহজে আল্লাহর অবাধ্য হতে পারে না। আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা এবং তাঁর শাস্তির ভয় মানুষের অন্তরকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনে এবং নেক আমলের পথে পরিচালিত করে।

তিনি মুসলিমদের সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘ আশা, গাফিলতি এবং কালক্ষেপণ যেন কাউকে প্রতারিত না করে। অনেক মানুষ নেক আমলের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা পিছিয়ে দিতে দিতে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, যখন অনুতাপ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। অথচ যদি তারা প্রতিদানের দিনের কথা স্মরণ করত, তবে অবশ্যই নিজেদের প্রস্তুত করত। তাই তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, তিনি যেন আমাদের অন্তরকে পাপের কলুষতা থেকে পবিত্র করেন, আমাদের গুনাহ ক্ষমা করেন এবং নেক আমলের তাওফিক দান করেন।

খুতবার শেষাংশে তিনি আরো বলেন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছেই সাহায্য, হিদায়াত, সফলতা এবং নেক আমলের তাওফিক চাইতে হবে। কারণ সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই হাতে। আর বান্দার দায়িত্ব হলো বৈধ উপায় অবলম্বন করা, আন্তরিক চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। কারণ প্রকৃত সফলতা ধন-সম্পদ বা দুনিয়ার মর্যাদায় নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, নেক আমলে সমৃদ্ধ জীবন গঠন এবং জান্নাতের পথে অবিচল থাকার মধ্যেই নিহিত।

ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমবায়ের ধারণা

মো. আবদুল মজিদ মোল্লা
ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমবায়ের ধারণা
সংগৃহীত ছবি

মানুষ সামাজিক জীব। তার পক্ষে একা জীবনের সব চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। পারস্পরিক সহযোগিতা, অংশীদারি ও সম্মিলিত উদ্যোগ মানুষের পথচলাকে সহজ করে। ইসলাম এই প্রয়োজনকে শুধু স্বীকৃতিই দেয়নি, বরং তা ন্যায়, আল্লাহভীতি ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে পরিচালিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় প্রচলিত ‘সমবায় সমিতি’ (Cooperative Society) শব্দটি না থাকলেও এর মৌলিক দর্শন তথা পারস্পরিক সহযোগিতা, ন্যায়ভিত্তিক অংশীদারি, সম্পদের সুষম ব্যবহার ও সামাজিক কল্যাণ কোরআন-সুন্নাহ দ্বারা সুপ্রমাণিত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কোরো, কিন্তু পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

এই আয়াত ইসলামী সমবায়ের মূলনীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। তা হলো যেকোনো যৌথ উদ্যোগের উদ্দেশ্য হতে হবে কল্যাণ, ন্যায় ও আল্লাহভীতি; অন্যায়, সুদ, প্রতারণা বা মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ণ হয় এমন কোনো কাজে সহযোগিতা বৈধ নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) মুসলিম জাতিকে একটি ঐক্যবদ্ধ ও সহযোগিতামূলক সমাজ গড়ে তুলতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য একটি সুদৃঢ় অট্টালিকার মতো, যার এক অংশ অন্য অংশকে শক্তিশালী করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৪৮১)
অন্য হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘বান্দা যতক্ষণ তার ভাইয়ের সহযোগিতায় থাকে, আল্লাহ ততক্ষণ তার সহযোগিতায় থাকেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬৯৯)

এসব হাদিস থেকে বোঝা যায়, পারস্পরিক সহযোগিতা ইসলামের একটি মৌলিক শিক্ষা। রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরত করার পর সেখানে সহযোগিতানির্ভর একটি সমাজ বিনির্মাণ করেছিলেন। মদিনার আনসার ও মুহাজির সাহাবিরা পরস্পরকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করতেন। পারস্পরিক সহযোগিতায় মদিনার মুসলিম সমাজ অল্প দিনেই হিজরতের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সামলে স্বনির্ভর সমাজে পরিণত হয়েছিল।

ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমবায়ের ধারণার সঙ্গে ‘শিরকত’ (অংশীদারি), ‘মুশারাকা’ ও ‘মুদারাবা’র ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে একাধিক ব্যক্তি বৈধ পুঁজিতে অংশীদার হয়ে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে এবং তারা নিজেদের ভেতর ন্যায়সংগতভাবে লাভ-লোকসান ভাগাভাগি করতে পারে। এসব পদ্ধতির মাধ্যমে ইসলাম সুদনির্ভর অর্থনীতির পরিবর্তে শ্রম ও সহযোগিতানির্ভর অর্থনীতির দিকে পথনির্দেশ করেছে। ইসলাম এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামোর কথা বলে, যেখানে সুদভিত্তিক শোষণের পরিবর্তে অংশীদারি ও ঝুঁকি ভাগাভাগির নীতি প্রতিষ্ঠিত।

ইসলামী সমবায়ের বৈশিষ্ট্য
ইসলামের দৃষ্টিতে একটি আদর্শ সমবায় সমিতির কয়েকটি বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। তা হলো—
১. কল্যাণ চিন্তা : ইসলামী সমবায়ের উদ্দেশ্য হবে সদস্যদের আর্থ-সামাজিক কল্যাণ, শুধু মুনাফা অর্জন নয়। কেননা কোরআনের নির্দেশনা অনুসারে মুসলিম সমাজের সব সহযোগিতা হবে কল্যাণনির্ভর। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা কোরো; কিন্তু পাপ ও সীমা লঙ্ঘনের কাজে সহযোগিতা কোরো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)

২. হালাল উৎস ও বিনিয়োগ : ইসলামী সমবায়ের অর্থের উৎস হবে হালাল এবং তা বিনিয়োগও হবে সম্পূর্ণ হালাল খাতে। সুদ, ঘুষ, জুয়া, প্রতারণা বা হারাম ব্যবসার সঙ্গে কোনো সম্পৃক্ততা থাকা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘হে মানবজাতি! পৃথিবীতে যা কিছু বৈধ ও পবিত্র খাদ্যবস্তু রয়েছে তা থেকে তোমরা আহার কোরো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ কোরো না। নিশ্চয়ই সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৬৮)

৩. আমানতদারিতা : সমবায় পরিচালনায় আমানত রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এ ক্ষেত্রে উদ্যোক্তা ও গ্রাহক উভয়ের আমানত রক্ষা করা জরুরি। ইসলাম যেকোনো আর্থিক লেনদেনে আমানতদারিতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি শিক্ষা দেয়। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন, আমানত যথাযথভাবে তার হকদারের কাছে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৮)

৪. শুরা নীতি অনুসরণ : ইসলাম সম্মিলিত কাজে শুরা নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেয়। এতে সমবায়ের বিনিয়োগ ঝুঁকি কমে যায়, তেমনি স্বেচ্ছাচারিতার অবসান ঘটে। আল্লাহ তাআলা মুমিনদের বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করে বলেছেন, ‘তাদের কাজ পারস্পরিক পরামর্শের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।’ (সুরা : আশ-শুরা, আয়াত : ৩৮)

৫. হিসাব সংরক্ষণ : লিখিতভাবে হিসাব সংরক্ষণ করা না হলে সমবায়ের স্বচ্ছতা রক্ষা করা যায় না। ইসলাম আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে লিখিতভাবে হিসাব সংরক্ষণের নির্দেশ দেয়; শুধু তাই নয়, ন্যায়সংগতভাবে তা লেখার নির্দেশ দেয়। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনরা! তোমরা যখন একে অন্যের সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের জন্য ঋণের কারবার করো তখন তা লিখে রাখো। তোমাদের মধ্যে কোনো লেখক যেন ন্যায্যভাবে লিখে দেয়।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৮২)

বর্তমান সময়ে দারিদ্র্য বিমোচন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টি, কৃষি উন্নয়ন, ক্ষুদ্র সঞ্চয় গড়ে তোলা এবং বেকারত্ব কমাতে ইসলামী নীতিনিষ্ঠ সমবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে, বিশেষ করে গ্রামীণ অর্থনীতিতে সুদমুক্ত সমবায়ভিত্তিক অর্থায়ন মানুষের আত্মনির্ভরশীলতা বৃদ্ধি করতে পারে। একই সঙ্গে সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা, ভ্রাতৃত্ব ও সামাজিক সংহতি শক্তিশালী হয়, যা ইসলামের সামগ্রিক সামাজিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রকৃতপক্ষে ইসলামী আদর্শের সমবায় শুধু একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং ন্যায়, আমানতদারিতা, জবাবদিহি ও সদস্যদের পারস্পরিক আস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি কল্যাণমুখী ব্যবস্থা। ইসলাম সমবায়ের এমন একটি মডেল উপস্থাপন করে, যার ভিত্তি প্রতিযোগিতা নয়; বরং সহযোগিতা। এর লক্ষ্য ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের কল্যাণ নিশ্চিত করা।

অন্যদিকে ইসলামের নীতি, আদর্শ ও শিক্ষা বিসর্জন দেওয়ায় বর্তমান সমাজের অনেক সমবায় উদ্যোগে সফল হচ্ছে না এবং তা সমাজের উপকার করার পরিবর্তে তাতে ক্ষত তৈরি করছে, বিশেষত সুদনির্ভর সমবায় সদস্যদের ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেয় এবং তারা দীর্ঘ মেয়াদে আর্থিক সংকটে পড়ে। এ ছাড়া পরিচালনা পর্ষদের দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া হিসাব, প্রতারণা কিংবা সদস্যদের আমানতের অপব্যবহারের অভিযোগও কম নয়। ইসলামী অর্থনীতিতে সুদ, অসততা ও প্রতারণা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

আল্লাহ সবাইকে দ্বিনের সঠিক বুঝ দান করুন। আমিন।

যে দোয়া পাঠে রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যে দোয়া পাঠে রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের জন্য রহমত লাভের যেসব উপায় রেখেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে সহজ  একটি হলো বেশি বেশি আল্লাহর জিকির ও দোয়া করা। তাই অনেক সময় অল্প কয়েকটি শব্দের একটি জিকিরও আল্লাহর কাছে এত প্রিয় হয় যে, এর মাধ্যমে বান্দার জন্য আল্লাহ রহমতের দরজা খুলে যায়। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন আমরা নবীজির (সা.) সঙ্গে নামাজ আদায় করছিলাম। এ সময় একজন সাহাবি বললেন,

اللَّهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا وَسُبْحَانَ اللَّهِ بُكْرَةً وَأَصِيلاً

উচ্চারণ : আল্লাহু আকবারু কাবিরা, ওয়ালহামদু লিল্লাহি কাছিরা, ওয়া সুবহানাল্লাহি বুকরাতাও ওয়া আসিলা।

অর্থ : ‘আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, মহান। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য— অগণিত প্রশংসা। আর সকাল-সন্ধ্যায় আমি আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি।’

নামাজ শেষে মহানবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই কথাগুলো কে বলেছে?’ সাহাবি নিজের পরিচয় দিলে তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি, এ কথাগুলোর কারণে তার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে।’

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর প্রশংসা, মহিমা ও পবিত্রতা বর্ণনা করা তাঁর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তাই শুধু বড় বড় আমলই নয়, আন্তরিকতা ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে পাঠ করা ছোট ছোট জিকিরও আল্লাহর রহমত লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি তাঁর জিকির করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

হাদিস : সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৬০১, সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং : ৮৮৬।