পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী। তাই একজন মুমিনের জন্য প্রতিটি দিনই আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নতুন সুযোগ। এই চিরন্তন সত্যই হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন পবিত্র মসজিদুল হারাম-এর সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আওয়াদ আল-জুহানি তাঁর জুমার খুতবায়।
খুতবার সূচনায় তিনি মুসলিমদের উদ্দেশে বলেন, সর্বাবস্থায়—কথায়, কাজে এবং চরিত্রে—আল্লাহকে ভয় করতে হবে এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকতে হবে। বিচার দিবস আসার আগেই প্রত্যেক মানুষকে নিজের আমলের হিসাব নিজেকেই নিতে হবে। পাশাপাশি পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলো শুধু তিলাওয়াত করলেই চলবে না; বরং সেগুলোর শিক্ষা উপলব্ধি করে জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরই প্রশংসা করেছেন, যারা তাঁর নির্দেশিত সম্পর্কগুলো অটুট রাখে এবং তাঁর আদেশ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে।
খুতবার এক পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় প্রশ্ন রাখেন, আল্লাহ আমাদের যে জান্নাতের দিকে আহ্বান করছেন, আমরা যদি তাঁর সেই আহ্বানে সাড়া না দিই তাহলে কারা তাঁর ডাকে সাড়া দেবে?
তিনি বলেন, এজন্য আমাদের আল্লাহ যেসব সম্পর্ক বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলো রক্ষা করতে হবে। আর এর প্রথম ও সর্বোচ্চ স্তর হলো একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর আনীত শরিয়তের অনুসরণ করা। এরপর রয়েছে সৎকর্মে অটল থাকা, আল্লাহর ভয়ে হৃদয়কে সজীব রাখা, বিচার দিবসের কঠিন হিসাবের আশঙ্কায় নিজেকে গুনাহ থেকে বিরত রাখা এবং সর্বদা নেক আমলের প্রতি যত্নশীল থাকা।
তাই একজন মুমিন শুধু নিজের ইবাদতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সমাজ ও পরিবারের প্রতিও তার দায়িত্ব রয়েছে। সে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করে, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে, দরিদ্র, এতিম ও প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। একই সঙ্গে সে সমাজে সৎকাজের প্রসার ঘটাতে চেষ্টা করে, অন্যায় ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং সর্বদা আল্লাহর স্মরণে নিজের হৃদয়কে জীবন্ত রাখে। কারণ, আল্লাহর জিকিরই মানুষের অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি ও মর্যাদার উৎস।
শায়খ আল-জুহানি বলেন, একজন বান্দাকে আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ় রাখে দুটি শক্তিশালী অনুভূতি— ১. আল্লাহভীতি, ২. আখিরাতে জবাবদিহির সচেতনতা। যে ব্যক্তি জানে, একদিন তাকে তার প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব দিতে হবে, সে সহজে আল্লাহর অবাধ্য হতে পারে না। আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা এবং তাঁর শাস্তির ভয় মানুষের অন্তরকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনে এবং নেক আমলের পথে পরিচালিত করে।
তিনি মুসলিমদের সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘ আশা, গাফিলতি এবং কালক্ষেপণ যেন কাউকে প্রতারিত না করে। অনেক মানুষ নেক আমলের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা পিছিয়ে দিতে দিতে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, যখন অনুতাপ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। অথচ যদি তারা প্রতিদানের দিনের কথা স্মরণ করত, তবে অবশ্যই নিজেদের প্রস্তুত করত। তাই তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, তিনি যেন আমাদের অন্তরকে পাপের কলুষতা থেকে পবিত্র করেন, আমাদের গুনাহ ক্ষমা করেন এবং নেক আমলের তাওফিক দান করেন।
খুতবার শেষাংশে তিনি আরো বলেন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছেই সাহায্য, হিদায়াত, সফলতা এবং নেক আমলের তাওফিক চাইতে হবে। কারণ সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই হাতে। আর বান্দার দায়িত্ব হলো বৈধ উপায় অবলম্বন করা, আন্তরিক চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। কারণ প্রকৃত সফলতা ধন-সম্পদ বা দুনিয়ার মর্যাদায় নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, নেক আমলে সমৃদ্ধ জীবন গঠন এবং জান্নাতের পথে অবিচল থাকার মধ্যেই নিহিত।




