• ই-পেপার

ইসলামী অর্থব্যবস্থায় সমবায়ের ধারণা

শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আওয়াদ আল-জুহানি

মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মসজিদুল হারামের জুমার খুতবার সারসংক্ষেপ
সংগৃহীত ছবি

পৃথিবীর জীবন ক্ষণস্থায়ী। তাই একজন মুমিনের জন্য প্রতিটি দিনই আত্মসমালোচনা, আত্মশুদ্ধি এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নতুন সুযোগ। এই চিরন্তন সত্যই হৃদয়স্পর্শী ভাষায় তুলে ধরেছেন পবিত্র মসজিদুল হারাম-এর সম্মানিত ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আওয়াদ আল-জুহানি তাঁর জুমার খুতবায়। 

খুতবার সূচনায় তিনি মুসলিমদের উদ্দেশে বলেন, সর্বাবস্থায়—কথায়, কাজে এবং চরিত্রে—আল্লাহকে ভয় করতে হবে এবং সত্যের ওপর অবিচল থাকতে হবে। বিচার দিবস আসার আগেই প্রত্যেক মানুষকে নিজের আমলের হিসাব নিজেকেই নিতে হবে। পাশাপাশি পবিত্র কোরআনের আয়াতগুলো শুধু তিলাওয়াত করলেই চলবে না; বরং সেগুলোর শিক্ষা উপলব্ধি করে জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। কারণ, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরই প্রশংসা করেছেন, যারা তাঁর নির্দেশিত সম্পর্কগুলো অটুট রাখে এবং তাঁর আদেশ নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করে।

খুতবার এক পর্যায়ে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন ভাষায় প্রশ্ন রাখেন, আল্লাহ আমাদের যে জান্নাতের দিকে আহ্বান করছেন, আমরা যদি তাঁর সেই আহ্বানে সাড়া না দিই তাহলে কারা তাঁর ডাকে সাড়া দেবে?

তিনি বলেন, এজন্য আমাদের আল্লাহ যেসব সম্পর্ক বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন, সেগুলো রক্ষা করতে হবে। আর এর প্রথম ও সর্বোচ্চ স্তর হলো একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনা, তাঁর রাসুল (সা.)-এর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করা এবং তাঁর আনীত শরিয়তের অনুসরণ করা। এরপর রয়েছে সৎকর্মে অটল থাকা, আল্লাহর ভয়ে হৃদয়কে সজীব রাখা, বিচার দিবসের কঠিন হিসাবের আশঙ্কায় নিজেকে গুনাহ থেকে বিরত রাখা এবং সর্বদা নেক আমলের প্রতি যত্নশীল থাকা।

তাই একজন মুমিন শুধু নিজের ইবাদতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং সমাজ ও পরিবারের প্রতিও তার দায়িত্ব রয়েছে। সে পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণ করে, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে, দরিদ্র, এতিম ও প্রতিবেশীর প্রতি সহানুভূতিশীল হয়। একই সঙ্গে সে সমাজে সৎকাজের প্রসার ঘটাতে চেষ্টা করে, অন্যায় ও অশ্লীলতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং সর্বদা আল্লাহর স্মরণে নিজের হৃদয়কে জীবন্ত রাখে। কারণ, আল্লাহর জিকিরই মানুষের অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি ও মর্যাদার উৎস।

শায়খ আল-জুহানি বলেন, একজন বান্দাকে আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ় রাখে দুটি শক্তিশালী অনুভূতি— ১. আল্লাহভীতি, ২.  আখিরাতে জবাবদিহির সচেতনতা। যে ব্যক্তি জানে, একদিন তাকে তার প্রতিটি কথা ও কাজের হিসাব দিতে হবে, সে সহজে আল্লাহর অবাধ্য হতে পারে না। আল্লাহর সন্তুষ্টির আশা এবং তাঁর শাস্তির ভয় মানুষের অন্তরকে গুনাহ থেকে ফিরিয়ে আনে এবং নেক আমলের পথে পরিচালিত করে।

তিনি মুসলিমদের সতর্ক করে বলেন, দীর্ঘ আশা, গাফিলতি এবং কালক্ষেপণ যেন কাউকে প্রতারিত না করে। অনেক মানুষ নেক আমলের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও তা পিছিয়ে দিতে দিতে এমন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, যখন অনুতাপ ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। অথচ যদি তারা প্রতিদানের দিনের কথা স্মরণ করত, তবে অবশ্যই নিজেদের প্রস্তুত করত। তাই তিনি মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেন, তিনি যেন আমাদের অন্তরকে পাপের কলুষতা থেকে পবিত্র করেন, আমাদের গুনাহ ক্ষমা করেন এবং নেক আমলের তাওফিক দান করেন।

খুতবার শেষাংশে তিনি আরো বলেন, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর কাছেই সাহায্য, হিদায়াত, সফলতা এবং নেক আমলের তাওফিক চাইতে হবে। কারণ সমস্ত ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব একমাত্র তাঁরই হাতে। আর বান্দার দায়িত্ব হলো বৈধ উপায় অবলম্বন করা, আন্তরিক চেষ্টা করা এবং ফলাফলের জন্য আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখা। কারণ প্রকৃত সফলতা ধন-সম্পদ বা দুনিয়ার মর্যাদায় নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন, নেক আমলে সমৃদ্ধ জীবন গঠন এবং জান্নাতের পথে অবিচল থাকার মধ্যেই নিহিত।

যেভাবে একটি দিন বরকতময় করে কাটাবেন

মুফতি ওমর বিন নাছির
যেভাবে একটি দিন বরকতময় করে কাটাবেন
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো সময়। হারিয়ে যাওয়া অর্থ ফিরে পাওয়া সম্ভব, কিন্তু চলে যাওয়া একটি মুহূর্তও আর ফিরে আসে না। তাই একজন মুমিনের প্রতিটি দিন হওয়া উচিত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক নতুন সুযোগ। যেদিন আল্লাহর স্মরণে শুরু হয়, হালাল উপার্জনে অতিবাহিত হয় এবং ইবাদত ও সৎকর্মের মাধ্যমে শেষ হয়—সেই দিনই প্রকৃত অর্থে বরকতময় দিন।

আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা প্রায়ই বরকতের অভাব অনুভব করি। সময় আছে, কিন্তু কাজ শেষ হয় না; উপার্জন আছে, কিন্তু তৃপ্তি নেই; সুযোগ আছে, কিন্তু প্রশান্তি নেই। এর মূল কারণ অনেক সময় আল্লাহর দেওয়া বরকত থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেওয়া। অথচ কোরআন ও সহিহ হাদিস আমাদের এমন কিছু আমল শিখিয়েছে, যেগুলো নিয়মিত পালন করলে একটি দিন বরকত, প্রশান্তি ও কল্যাণে পরিপূর্ণ হতে পারে।

১. ফজরের আগে জেগে তাহাজ্জুদ ও দোয়ার মাধ্যমে দিন শুরু করা
দিনের সর্বোত্তম সূচনা হলো শেষ রাতে আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো। এই সময় আল্লাহ তাআলা বান্দার দোয়া কবুল করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করুন। এটি আপনার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, আপনার প্রতিপালক আপনাকে প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৭৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমাদের রব প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৪৫)

২. সময়মতো ফজরের সালাত আদায় করা
ফজরের সালাত দিনের সবচেয়ে বরকতময় সূচনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করল, সে আল্লাহর নিরাপত্তার মধ্যে রইল।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৬৫৭)
আরও বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার উম্মতের জন্য দিনের প্রথম ভাগে বরকত দান করুন।’ (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ২৬০৬)
এ কারণে সকালকে অলসতা বা ঘুমে নষ্ট না করে উৎপাদনশীল কাজে ব্যয় করা সুন্নত।

৩. সকাল-সন্ধ্যার নিয়মিত জিকির করা
সকাল ও সন্ধ্যার মাসনুন জিকির মানুষকে শয়তানের কুমন্ত্রণা, বিপদ-আপদ ও অকল্যাণ থেকে রক্ষা করে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ করো, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫২)
রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় বিভিন্ন দোয়া ও যিকির পাঠ করতেন এবং সাহাবিদেরও তা শিক্ষা দিতেন। (হিসনুল মুসলিম)

৪. কোরআন তিলাওয়াতের মাধ্যমে অন্তরকে আলোকিত করা
যে দিন কোরআনের তিলাওয়াত দিয়ে শুরু হয়, সে দিন আল্লাহর রহমত দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই এই কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সরল।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৯)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি সে, যে কোরআন শিক্ষা করে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫০২৭)

৫. পাঁচ ওয়াক্ত সালাত যথাসময়ে আদায় করা
সালাত মুমিনের জীবনের মূল ভিত্তি। এটি দিনের প্রতিটি অংশকে বরকতময় করে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সালাত অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)

৬. হালাল উপার্জন ও সততার সঙ্গে কাজ করা
বরকতের অন্যতম প্রধান উৎস হলো হালাল রিজিক। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পৃথিবীর হালাল ও পবিত্র বস্তু থেকে আহার করো।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৬৮)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন নবী, সিদ্দীক ও শহিদদের সঙ্গে থাকবে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯)

৭. মানুষের উপকার করা
একটি বরকতময় দিন সেই দিন, যেদিন অন্তত একজন মানুষের উপকার করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় সেই ব্যক্তি, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (তাবারানি, হাদিস : ৫৭৮৭)

৮. দান-সদকা করা
সদকা কখনো সম্পদ কমায় না; বরং বরকত বৃদ্ধি করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দান-সদকা সম্পদ কমায় না।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৫৮৮)

৯. গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা ও বেশি বেশি ইস্তিগফার করা
পাপ বরকতকে নষ্ট করে, আর ইস্তিগফার বরকতের দরজা খুলে দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো... তিনি তোমাদের জন্য আকাশ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন, সম্পদ ও সন্তান বৃদ্ধি করবেন এবং তোমাদের জন্য উদ্যান ও নদী সৃষ্টি করবেন।’ (সুরা : নুহ, আয়াত : ১০–১২)

১০. দিন শেষে আত্মসমালোচনা ও আল্লাহর কাছে তাওবা করা
একজন সফল মুমিন প্রতিদিন নিজের হিসাব নেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সকল আদম সন্তানই ভুলকারী, আর ভুলকারীদের মধ্যে সর্বোত্তম তারা, যারা বেশি বেশি তাওবা করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৯৯)

দিনের শেষে তাওবা, ইস্তিগফার এবং ঘুমানোর পূর্বের মাসনুন আমলগুলো পালন করলে পরবর্তী দিনের জন্যও বরকতের ভিত্তি তৈরি হয়।

শেষকথা, বরকত শুধু সম্পদের প্রাচুর্যের নাম নয়; বরং অল্প সময়ে অধিক কল্যাণ, অল্প সম্পদে তৃপ্তি, অল্প আমলে অধিক সওয়াব এবং জীবনে আল্লাহর রহমত লাভের নামই বরকত। একজন মুসলিম যদি প্রতিটি দিন আল্লাহর নামে শুরু করে, সালাত, কোরআন, জিকির, হালাল উপার্জন, মানুষের সেবা ও আন্তরিক তাওবার মাধ্যমে দিন অতিবাহিত করে, তবে তার জীবনে আল্লাহ তাআলা দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ দান করবেন। আসুন, আমরা প্রত্যেকে আজ থেকেই প্রতিটি দিনকে বরকতময় করার এই কোরআন-সুন্নাহভিত্তিক আমলগুলো নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের দৃঢ় সংকল্প করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের প্রতিটি দিনকে ঈমান, আমল, শান্তি, রহমত ও বরকতে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।

যে দোয়া পাঠে রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যে দোয়া পাঠে রহমতের দরজা খুলে দেওয়া হয়
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদের জন্য রহমত লাভের যেসব উপায় রেখেছেন তার মধ্যে সবচেয়ে সহজ  একটি হলো বেশি বেশি আল্লাহর জিকির ও দোয়া করা। তাই অনেক সময় অল্প কয়েকটি শব্দের একটি জিকিরও আল্লাহর কাছে এত প্রিয় হয় যে, এর মাধ্যমে বান্দার জন্য আল্লাহ রহমতের দরজা খুলে যায়। আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন আমরা নবীজির (সা.) সঙ্গে নামাজ আদায় করছিলাম। এ সময় একজন সাহাবি বললেন,

اللَّهُ أَكْبَرُ كَبِيرًا وَالْحَمْدُ لِلَّهِ كَثِيرًا وَسُبْحَانَ اللَّهِ بُكْرَةً وَأَصِيلاً

উচ্চারণ : আল্লাহু আকবারু কাবিরা, ওয়ালহামদু লিল্লাহি কাছিরা, ওয়া সুবহানাল্লাহি বুকরাতাও ওয়া আসিলা।

অর্থ : ‘আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ, মহান। সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য— অগণিত প্রশংসা। আর সকাল-সন্ধ্যায় আমি আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা করছি।’

নামাজ শেষে মহানবী (সা.) জিজ্ঞাসা করলেন, ‘এই কথাগুলো কে বলেছে?’ সাহাবি নিজের পরিচয় দিলে তিনি বলেন, ‘আমি দেখেছি, এ কথাগুলোর কারণে তার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে।’

এই হাদিস থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর প্রশংসা, মহিমা ও পবিত্রতা বর্ণনা করা তাঁর কাছে অত্যন্ত প্রিয়। তাই শুধু বড় বড় আমলই নয়, আন্তরিকতা ও একনিষ্ঠতার সঙ্গে পাঠ করা ছোট ছোট জিকিরও আল্লাহর রহমত লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হতে পারে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে বেশি বেশি তাঁর জিকির করার তাওফিক দান করুন। আমিন।

হাদিস : সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ৬০১, সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং : ৮৮৬।

চিকিৎসাসেবায় সাত নারী সাহাবির অসামান্য অবদান

ইসলামী জীবন ডেস্ক
চিকিৎসাসেবায় সাত নারী সাহাবির অসামান্য অবদান
সংগৃহীত ছবি

মানবসভ্যতার ইতিহাসে চিকিৎসাসেবা এক মহৎ ও সম্মানজনক পেশা। অসুস্থের সেবা, আহতের পরিচর্যা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ আমল। এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি একটি প্রাণ রক্ষা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করল।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৩২)

ইসলামের প্রাথমিক যুগে নারী সাহাবিরাও চিকিৎসা ও মানব সেবায় অনন্য অবদান রেখে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। যুদ্ধক্ষেত্রে আহতদের সেবা, অসুস্থদের পরিচর্যা, খাদ্য ও পানি সরবরাহ—এসব ক্ষেত্রেই তাঁদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইসলামের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়। এসব মহীয়সী নারীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—

১. রুফাইদা আল-আসলামিয়া (রা.) : তিনি এই মহীয়সী নারীদের অগ্রভাগে রয়েছেন। তাঁকে ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম নারী চিকিৎসক হিসেবে উল্লেখ করা হয়। চিকিৎসা দক্ষতা, মানবিকতা এবং সাংগঠনিক সক্ষমতার অপূর্ব সমন্বয় ছিল তাঁর মধ্যে। যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সাহাবিদের চিকিৎসার জন্য তিনি একটি অস্থায়ী চিকিৎসা শিবির পরিচালনা করতেন। খন্দকের যুদ্ধে সা‘দ (রা.)-এর বাহুর শিরায় আঘাত লাগে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তাকে রুফাইদার তাঁবুতে নিয়ে যাও; তিনি আহতদের চিকিৎসা করতেন। আর রাসুলুল্লাহ (সা.) তার খোঁজ নিতে এসে সন্ধ্যায় জিজ্ঞেস করতেন, সন্ধ্যা কেমন কাটল? এবং সকালে জিজ্ঞেস করতেন, আজ সকাল কেমন হলো? (আল আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ১১২৯)

রুফাইদা ছিলেন একজন নারী, যিনি আহতদের চিকিৎসা করতেন। তিনি নিজ উদ্যোগে মুসলিমদের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন এবং আহতদের চিকিৎসা-পরিচর্যার দায়িত্ব পালন করতেন। (আল ইসাবাহ : ৮/১৩৬, উসদুল গাবাহ : ৭/১১১, তারজামাহ : ৬৮২৫, ফাতহুল বারি : ৭/৬১৪)

এ ঘটনা রুফাইদা (রা.)-এর চিকিৎসা দক্ষতার প্রতি নববী স্বীকৃতির উজ্জ্বল প্রমাণ।

২. উম্মে আতিয়্যা আল-আনসারিয়া (রা.) : উম্মে আতিয়্যা আল-আনসারিয়া ছিলেন চিকিৎসাসেবায় আরেক অনন্য নাম। তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে সাতটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি। আমি সৈন্যদের পেছনে অবস্থান করতাম, তাদের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করতাম, আহতদের চিকিৎসা করতাম এবং অসুস্থদের সেবা করতাম।’ (মুসলিম, হাদিস : ১৮১২)

এই হাদিস স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে চিকিৎসা ও সেবাব্যবস্থায় নারী সাহাবিদের ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

৩. উম্মে সুলাইম (রা.) : উম্মে সুলাইম (রা.)-এর জীবনেও আমরা একই চিত্র দেখতে পাই। তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে পানি সরবরাহ করতেন, আহতদের প্রাথমিক চিকিৎসা দিতেন এবং জরুরি মুহূর্তে সাহসিকতার সঙ্গে সেবায় আত্মনিয়োগ করতেন। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) উম্মে সুলাইম ও আনসারদের কয়েকজন নারীকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধে যেতেন, তাঁরা পানি পান করাতেন এবং আহতদের চিকিৎসা করতেন। (মুসলিম, হাদিস : ১৮১০)

৪. রুবাইয়্যি বিনতে মুআউয়িয (রা.) : হাদিসে এসেছে, রুবাইয়্যি বিনতে মুআউয়িয (রা.)-ও চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত ছিলেন। রুবাইয়্যি বিনতে মুআউয়িয (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমরা (যুদ্ধের ময়দানে) নবী (সা.)-এর সঙ্গে থেকে লোকদের পানি পান করাতাম, আহতদের পরিচর্যা করতাম এবং নিহতদের মদিনায় পাঠাতাম।’ (বুখারি, হাদিস : ২৮৮২)

এ বর্ণনা যুদ্ধক্ষেত্রে নারী সাহাবিদের সেবামূলক ভূমিকার এক জীবন্ত চিত্র তুলে ধরে।

৫. নুসাইবা বিনতে কাব (রা.) : নুসাইবা বিনতে কা‘ব (রা.) শুধু বীর যোদ্ধাই ছিলেন না; যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সাহাবিদের পানি পৌঁছে দেওয়া, সেবাযত্ন করা এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা সহায়তা দেওয়ার মহান দায়িত্বও পালন করেছেন। (আল ইসাবাহ : ৮/৩৩৪)
তাঁর জীবনে বীরত্ব ও মানবসেবার অপূর্ব সমন্বয় লক্ষ করা যায়।

৬. উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) : উম্মুল মুমিনিন আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.) ছিলেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা। ফিকহ, হাদিস ও শরিয়তে তাঁর গভীর প্রজ্ঞার পাশাপাশি চিকিৎসাবিদ্যায়ও তিনি বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন। উরওয়া ইবন যুবাইর বলেন, ‘চিকিৎসাবিদ্যা, ফিকহ ও কবিতায় আমি আয়েশা (রা.)-এর চেয়ে অধিক জ্ঞানী কাউকে দেখিনি।’ (আল ইসাবাহ : ৮/২৩৩)

৭. হামনা বিনতে জাহশ (রা.) : হামনা বিনতে জাহশ (রা.) উহুদের যুদ্ধে উপস্থিত ছিলেন। তিনি তৃষ্ণার্তদের পানি পান করাতেন এবং আহতদের সেবা করতেন। (আত তবাকাতুল কুবরা লি ইবনে সাদ : ৮/১৯১, তারজামাহ : ৪১৭৮)

তাঁর এই আত্মনিবেদন যুদ্ধকালীন মানবসেবার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।এভাবে নারী সাহাবিদের জীবন আমাদের সামনে এক অনন্য আলোকবর্তিকা হয়ে আছে। তাঁরা শিখিয়েছেন পর্দা, শালীনতা ও তাকওয়ার সৌন্দর্য অক্ষুণ্ন রেখেও চিকিৎসা ও মানব সেবায় অসাধারণ অবদান রাখা সম্ভব।

তাই উল্লিখিত নারী সাহাবিদের জীবনী আজকের নারী চিকিৎসক ও নার্সদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।