• ই-পেপার

প্রকৃতির নানা রং ও জাতের ফলফলাদি আল্লাহর বিশেষ নিয়ামত

স্ত্রীদের খুশি করতে মহানবী (সা.) যেসব বিষয়ে যত্নবান ছিলেন

মুফতি ওমর বিন নাছির
স্ত্রীদের খুশি করতে মহানবী (সা.) যেসব বিষয়ে যত্নবান ছিলেন
সংগৃহীত ছবি

পরিবার একটি সমাজের ভিত্তি, আর দাম্পত্য জীবন সেই ভিত্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও আন্তরিকতার ওপরই নির্ভর করে একটি পরিবারের সুখ-শান্তি। আজকের ব্যস্ত জীবনে অনেক পরিবারে ভুল বোঝাবুঝি, মানসিক দূরত্ব ও সম্পর্কের টানাপোড়েন দেখা যায়। অথচ মহানবী (সা.) প্রায় দেড় হাজার বছর আগেই এমন এক আদর্শ দাম্পত্য জীবনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, যা আজও সমগ্র মানবজাতির জন্য অনুসরণীয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর কাছে সর্বোত্তম। আর আমি আমার স্ত্রীদের কাছে তোমাদের সবার চেয়ে উত্তম।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ৩৮৯৫)
এই একটি হাদিসই একজন আদর্শ স্বামীর পরিচয় তুলে ধরতে যথেষ্ট। তারপরও স্ত্রীদের মনরক্ষায় মহানবী (সা.)-এর জীবন থেকে কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো। যদিও নিম্মুক্ত বিষয়গুলোতে বিশেষভাবে স্ত্রীদের কথা বলা হয়েছে। তবে সুখময় দাম্পত্য জীবনে উভয়কেই এসব বিষয়ে যত্নবান হতে হবে।    

১. স্ত্রীর কাজে সহযোগিতা করা
অনেকেই মনে করেন, ঘরের কাজ শুধু নারীর দায়িত্ব। কিন্তু মহানবী (সা.) নিজেই এই ধারণার বিপরীত শিক্ষা দিয়েছেন। রাষ্ট্র পরিচালনা, দাওয়াত, বিচার এবং ইবাদতের মতো অসংখ্য দায়িত্ব পালন করেও তিনি পরিবারের কাজে স্ত্রীদের সহযোগিতা করতেন। আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, মহানবী (সা.) ঘরে কী করতেন? তিনি বলেন, ‘তিনি পরিবারের কাজকর্মে সাহায্য করতেন। আর নামাজের সময় হলে নামাজে চলে যেতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬৭৬)
এ থেকেই বোঝা যায়, পরিবারের কাজে সহযোগিতা করা নববী সুন্নত।

২. স্ত্রীর প্রশংসা করা 
প্রশংসা মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা সৃষ্টি করে। মহানবী (সা.) তাঁর স্ত্রীদের গুণাবলির প্রশংসা করতেন এবং তাদের মর্যাদা তুলে ধরতেন। তিনি বলেন, ‘নারীদের মধ্যে মরিয়ম ও ফেরাউনের স্ত্রী আসিয়া পূর্ণতা অর্জন করেছেন। আর সকল নারীর ওপর আয়েশার মর্যাদা এমন, যেমন সব খাবারের ওপর সারীদের মর্যাদা।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৩৪১১)
এ শিক্ষা দেয় যে, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে মজবুত করতে আন্তরিক প্রশংসার বিকল্প নেই।

৩. স্ত্রীকে নিজের হাতে খাবার খাওয়ানো
ইসলামে স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার প্রকাশও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। স্ত্রীকে নিজের হাতে খাবার তুলে দেওয়াকে সওয়াবের কাজ বলা হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে যে ব্যয় করবে, তার প্রতিদান পাবে; এমনকি স্ত্রীকে যে এক লোকমা খাবার মুখে তুলে দেবে, তারও সওয়াব পাবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬২৮)
তিনি স্ত্রীদের ব্যবহৃত পাত্র থেকেই পানি পান করতেন, যা ছিল গভীর ভালোবাসার এক অনন্য প্রকাশ।

৪. স্ত্রী ও সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া
দাম্পত্য জীবনে শুধু আর্থিক দায়িত্ব পালন করাই যথেষ্ট নয়; মানসিক উপস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উকবা ইবনে আমির (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি মহানবী (সা.)-কে মুক্তির পথ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘তোমার জিহ্বাকে সংযত রাখো, তোমার ঘর যেন তোমার জন্য প্রশস্ত হয় (অর্থাৎ পরিবারের সঙ্গে বেশি সময় কাটাও) এবং নিজের গুনাহের জন্য কাঁদো।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৪০৬)
আজকের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যস্ত জীবনে এই শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।

৫. ভালোবেসে সুন্দর নামে ডাকা
ভালোবাসার ভাষা কখনো কঠোর হতে পারে না। মহানবী (সা.) স্ত্রীদের আদর করে সুন্দর নামে ডাকতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) আমাকে কখনো ‘হুমাইরা’ (লালিমাময়) বলে সম্বোধন করতেন।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৪৭৪)
এতে দাম্পত্য জীবনে ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও মানসিক বন্ধন আরও দৃঢ় হয়।

৬. স্ত্রীর সঙ্গে ভালোবাসা ও রোমান্টিক আচরণ
মহানবী (সা.)-এর দাম্পত্য জীবন ছিল ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও সৌন্দর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমি যে স্থানে মুখ রেখে পানি পান করতাম, মহানবী (সা.) ঠিক সেই স্থানেই মুখ রেখে পানি পান করতেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩০০)
এসব ঘটনা প্রমাণ করে, ইসলামে স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ও আন্তরিকতা অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ।

৭. স্ত্রীকে নিয়ে ভ্রমণে যাওয়া
দাম্পত্য সম্পর্কে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে একসঙ্গে সময় কাটানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আয়েশা (রা.) বলেন, ‘সফরে যাওয়ার সময় মহানবী (সা.) স্ত্রীদের মধ্যে লটারির ব্যবস্থা করতেন; যার নাম উঠত, তাকেই সঙ্গে নিয়ে যেতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৫৯৩)
এতে বোঝা যায়, স্ত্রীকে নিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া সময়ের অপচয় নয়; বরং সম্পর্ককে গভীর করার একটি সুন্দর মাধ্যম।

৮. ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ
ইসলাম কখনো স্বামী-স্ত্রীর বৈধ ভালোবাসাকে নিরুৎসাহিত করেনি। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘একবার মহানবী (সা.) তাঁর এক স্ত্রীকে চুম্বন করলেন, তারপর নামাজের জন্য বের হলেন; নতুন করে ওজু করলেন না।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৫০২)
এ হাদিস প্রমাণ করে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ভালোবাসার স্বাভাবিক প্রকাশ ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয়।

আজকের পৃথিবীতে পারিবারিক অশান্তি, বিবাহবিচ্ছেদ এবং মানসিক দূরত্বের অন্যতম কারণ হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সময় ও ভালোবাসার অভাব। অথচ মহানবী (সা.)-এর জীবন আমাদের শেখায়—একজন আদর্শ স্বামী কখনো কর্তৃত্বপরায়ণ হন না; বরং তিনি হন সহযোগী, সহানুভূতিশীল, দয়ালু এবং ভালোবাসাপূর্ণ। তিনি স্ত্রীদের সম্মান দিয়েছেন, তাদের অনুভূতির মূল্য দিয়েছেন, পরিবারের কাজে অংশ নিয়েছেন, প্রশংসা করেছেন, সময় দিয়েছেন এবং ভালোবাসা প্রকাশে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেননি। তাই সুখী, শান্তিময় ও বরকতময় দাম্পত্য জীবন গড়তে চাইলে আমাদের প্রত্যেকের উচিত মহানবী (সা.)-এর এই মহান আদর্শকে নিজেদের জীবনে বাস্তবায়ন করা। কারণ তাঁর দেখানো পথেই রয়েছে পারিবারিক শান্তি, পারস্পরিক ভালোবাসা এবং দুনিয়া-আখিরাতের প্রকৃত সফলতা।

যে চারটি গুণ পরিবারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনে

মুফতি ওমর বিন নাছির
যে চারটি গুণ পরিবারে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি বয়ে আনে
সংগৃহীত ছবি

অনেক মানুষ আছেন, যাদের আয় সীমিত; তবু তাদের সংসারে প্রশান্তি, তৃপ্তি ও সুখের কমতি নেই। আবার কেউ কেউ বিপুল সম্পদের মালিক হয়েও অশান্তি, উদ্বেগ ও অপূর্ণতায় ভোগেন। এই দুই অবস্থার পার্থক্যের নামই হলো ‘বরকত’। ইসলামের দৃষ্টিতে বরকত শুধু অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্য নয়; বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ, যা অল্পকে অনেক এবং সীমিতকে অর্থবহ করে তোলে। সময়, সম্পদ, জ্ঞান, পরিবার কিংবা স্বাস্থ্যে যখন বরকত আসে, তখন মানুষের জীবন হয়ে ওঠে শান্তিময় ও পরিপূর্ণ। তাই একজন মুমিনের জন্য বরকতের প্রকৃত অর্থ জানা এবং তা অর্জনের পথ অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বরকতের অর্থ- মুসলিম হিসেবে আমরা প্রতিদিনের কথাবার্তা, দোয়া এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ে ‘বরকত’ শব্দটি ব্যবহার করি। সালামের জবাবে বলি, ‘আপনার ওপর আল্লাহর শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।’ ঈদের দিনে বলি ‘ঈদ মোবারক’। নতুন বিবাহিত দম্পতির জন্যও সুন্নত অনুযায়ী বরকতের দোয়া করা হয়। আরবি ভাষা ও ব্যাকরণবিদদের মতে, ‘বরকত’ শব্দের অর্থ স্থায়িত্ব, দৃঢ়তা, বৃদ্ধি, প্রাচুর্য এবং কল্যাণের ধারাবাহিকতা। সহজ ভাষায়, কোনো কাজে যখন আল্লাহর বরকত থাকে, তখন সামান্য প্রচেষ্টা থেকেও আশাতীত ফল লাভ করা যায়।

বরকতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থ হলো- কল্যাণের ধারাবাহিকতা। অর্থাৎ শুধু প্রাপ্তি নয়, সেই প্রাপ্তির স্থায়িত্ব ও উপকারিতাও বরকতের অন্তর্ভুক্ত। সামগ্রিকভাবে বরকত হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে এমন এক বিশেষ অনুগ্রহ, যা মানুষের জীবনকে কল্যাণময়, অর্থবহ এবং দীর্ঘস্থায়ী সুফলে পরিপূর্ণ করে।

পবিত্র কোরআনের বহু স্থানে ‘বরকত’ শব্দ ও তার বিভিন্ন রূপ এসেছে। মহান আল্লাহ নিজেই কোরআনকে বরকতময় কিতাব হিসেবে ঘোষণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘এটি এমন এক কিতাব, যা আমি নাজিল করেছি; এটি অত্যন্ত বরকতময়।’ (সুরা : আনআম, আয়াত : ৯২)

হাদিসে বরকতের প্রকৃত প্রভাব আরও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, সে একটি নেকি পাবে। আর প্রতিটি নেকি দশ গুণ বৃদ্ধি করে দেওয়া হবে...।’ (তিরমিজি , হাদিস নং : ২৯১০)

এই হাদিস প্রমাণ করে, আল্লাহর বরকত থাকলে সামান্য আমলও বহুগুণ ফলপ্রসূ হয়ে ওঠে। অনেক সময় মানুষ সম্পদ, সুযোগ-সুবিধা ও বাহ্যিক সফলতা অর্জন করেও অন্তরে শান্তি খুঁজে পায় না। আবার সীমিত আয় ও সাধারণ জীবনযাপন করেও কেউ সুখী ও তৃপ্ত থাকেন। এই পার্থক্যের মূল কারণ হলো বরকতের উপস্থিতি বা অনুপস্থিতি। আর জীবনে বরকত ফিরিয়ে আনার কার্যকর উপায় হলো-

১. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ হওয়া : বরকত লাভের প্রথম শর্ত হলো কৃতজ্ঞতা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা যদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি করে দেব।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ৭)
কৃতজ্ঞতা শুধু মুখের কথা নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতকে তার সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করাও কৃতজ্ঞতার অংশ। তাই তাঁর যে কোনো নেয়ামতের যথাযথ কৃতজ্ঞতা আদায় করা উচিত।

২. দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করা : প্রতিদিনের ব্যস্ততার মাঝেও কিছু সময় আল্লাহর কাছে দোয়ার জন্য নির্ধারণ করা উচিত। বিশেষভাবে তিনটি বিষয়ে বরকতের জন্য দোয়া করা প্রয়োজন— সময়ের বরকত, সম্পদের বরকত ও স্বাস্থ্যের বরকত। সময়ের বরকত কর্মদক্ষতা বাড়ায়, সম্পদের বরকত অভাব দূর করে এবং স্বাস্থ্যের বরকত মানুষকে কর্মক্ষম ও স্বাবলম্বী রাখে।

৩. নামাজকেন্দ্রিক জীবন গড়ে তোলা : পাঁচ ওয়াক্ত নামাজকে কেন্দ্র করে দিনের পরিকল্পনা সাজালে জীবনে শৃঙ্খলা ও আত্মিক প্রশান্তি আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।’ (সুরা : আনকাবুত, আয়াত : ৪৫)

৪. আত্মীয়তা ও সামাজিক সম্পর্ক রক্ষা করা : পরিবার ও সমাজের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা বরকতের অন্যতম মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি এবং আয়ুতে বরকত কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৫৯৮৬)

এভাবে সুসম্পর্ক, সততা এবং উত্তম আচরণ মানুষের জীবনে আল্লাহর রহমত, বরকত ও নুসরত বয়ে আনে।

অতএব, বরকত এমন একটি নেয়ামত, যা অর্থ দিয়ে কেনা যায় না; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যমে লাভ করতে হয়। জীবনে বরকত থাকলে অল্প সম্পদেও সুখ থাকে, সীমিত সময়েও কাজ সম্পন্ন হয় এবং সাধারণ জীবনও হয়ে ওঠে প্রশান্তিময়। তাই আমাদের উচিত কৃতজ্ঞতা, নামাজ, দোয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা এবং উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বরকত লাভের চেষ্টা করা। কারণ প্রকৃত সফলতা শুধু বেশি পাওয়া নয়; বরং আল্লাহর দেওয়া সামান্য নিয়ামতের মধ্যেও অসীম কল্যাণ খুঁজে পাওয়ার নামই বরকত।

দুর্বলতা কাটিয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠার দোয়া

ইসলামী জীবন ডেস্ক
দুর্বলতা কাটিয়ে শক্তিশালী হয়ে ওঠার দোয়া
সংগৃহীত ছবি

মানুষ জন্মগতভাবেই দুর্বল। কখনো শারীরিক দুর্বলতা, কখনো মানসিক ভঙ্গুরতা, কখনো রাগ-অহংকার, আবার কখনো কৃপণতা ও সংকীর্ণতা তার চরিত্রকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। এসব দুর্বলতা শুধু ব্যক্তির আত্মিক উন্নতির পথেই বাধা সৃষ্টি করে না, বরং পরিবার, সমাজ ও মানবসম্পর্কেও অশান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অথচ একজন প্রকৃত মুমিনের কামনা হলো—তিনি যেন শক্ত ঈমানের অধিকারী, কোমল হৃদয়ের মানুষ এবং উদার চরিত্রের অধিকারী হতে পারেন। আর এ জন্য হাদিসে বর্ণিত একটি দোয়া হলো-

 اَللّٰهُمَّ إنّيْ ضَعِيْفٌ فَقَوِّنِيْ وَإِنِّيْ شَدِيْدٌ فَلَيِّنِيْ وَإِنِّيْ بَخِيْلٌ فَسَخِّنِيْ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা ইন্নি দ্বায়িফুন ফা ক্বাওওয়িনি, ওয়া ইন্নি শাদিদুন ফা লায়্যিনি, ওয়া ইন্নি বাখিলুন ফা সাখখিনি। 

অর্থ : ‘হে আল্লাহ আমি দুর্বল, অতএব আমাকে শক্তিশালী করুন। আমি রূঢ়, আমাকে নম্রতা দান করুন। আমি কৃপণ, আপনি আমাকে বদান্যতা দান করুন।’ (মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস নম্বর : ৫১৭৯)

বর্তমান সমাজের অবক্ষয় রোধে কোরআনের নির্দেশনা

মুফতি ওমর বিন নাছির
বর্তমান সমাজের অবক্ষয় রোধে কোরআনের নির্দেশনা
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান বিশ্বে মানবসভ্যতা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও অর্থনীতিতে অভূতপূর্ব উন্নতি অর্জন করলেও নৈতিকতা, মানবিকতা ও মূল্যবোধের ক্ষেত্রে এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। দুর্নীতি, মাদকাসক্তি, সন্ত্রাসবাদ, পারিবারিক ভাঙন, অন্যায়-অবিচার, হিংসা-বিদ্বেষ, বৈষম্য, প্রতারণা এবং নৈতিক অবক্ষয় সমাজকে ক্রমেই অস্থিতিশীল করে তুলছে। মানুষের অন্তর থেকে আল্লাহভীতি, ন্যায়পরায়ণতা ও মানবিক মূল্যবোধ কমে যাওয়ায় সামাজিক শান্তি বিঘ্নিত হচ্ছে। অথচ আল্লাহ তাআলা মানবজাতির হিদায়াতের জন্য পবিত্র কোরআন নাজিল করেছেন। এটি শুধু একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান, যা ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ন্যায়, ইনসাফ, শান্তি, মানবিকতা এবং কল্যাণের সর্বোত্তম দিকনির্দেশনা প্রদান করে। 

১. উত্তম চরিত্র গঠন করা 
সমাজের অবক্ষয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হলো নৈতিক চরিত্রের দুর্বলতা। কোরআন মানুষকে সত্যবাদিতা, সততা, ধৈর্য, বিনয়, ক্ষমাশীলতা, দয়া, আমানতদারিতা ও ন্যায়পরায়ণতার শিক্ষা দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ন্যায়বিচার, সদাচার এবং আত্মীয়-স্বজনকে দান করার নির্দেশ দেন; আর অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘন থেকে নিষেধ করেন।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯০)

২. ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা
অন্যায়, বৈষম্য ও পক্ষপাতিত্ব সমাজে অশান্তির অন্যতম কারণ। কুরআন বিচারকার্যে নিরপেক্ষতা ও ন্যায়বিচারের ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! তোমরা ন্যায়বিচারের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকো, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সাক্ষ্য দাও, যদিও তা তোমাদের নিজেদের, পিতা-মাতা কিংবা নিকট আত্মীয়দের বিরুদ্ধে হয়।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১৩৫)

৩. দুর্নীতি, ঘুষ ও প্রতারণা প্রতিরোধ করা
বর্তমান সমাজে দুর্নীতি উন্নয়নের অন্যতম বড় বাধা। কোরআন অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ ও প্রতারণাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ কোরো না এবং বিচারকদের কাছে ঘুষ হিসেবে তা পৌঁছে দিও না, যাতে জেনে-শুনে মানুষের সম্পদের কোনো অংশ অন্যায়ভাবে গ্রাস করতে পারো।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ১৮৮)

৪. মাদক, জুয়া ও অশ্লীলতা থেকে বিরত থাকা
মাদকাসক্তি, জুয়া ও অনৈতিক জীবনযাপন ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্য ধ্বংসাত্মক। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা! নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ধারণের শর—এসব শয়তানের অপবিত্র কাজ। সুতরাং এগুলো থেকে দূরে থাকো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।’ (সুরা : মায়িদাহ, আয়াত : ৯০-৯১)

৫. পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করা
পরিবার একটি সমাজের মৌলিক ভিত্তি। কোরআন পরিবারে ভালোবাসা, দায়িত্ববোধ ও পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা দেয়। আল্লাহ বলেন, ‘আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে—তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি লাভ করো। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : রূম, আয়াত : ২১)

৬. মানবিকতা, দানশীলতা ও সামাজিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করা
কোরআন দরিদ্র, এতিম, অসহায় ও প্রতিবেশীর অধিকার রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো... পিতা-মাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকট প্রতিবেশী, দূর প্রতিবেশী, সহচর এবং মুসাফিরের প্রতি সদ্ব্যবহার করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৩৬)

৭. পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব, ঐক্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা
বিভেদ ও দলাদলি সমাজকে দুর্বল করে। তাই কোরআন ঐক্যবদ্ধ থাকার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই ভাই। তাই তোমরা তোমাদের দুই ভাইয়ের মধ্যে মীমাংসা করে দাও।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১০)

৮. নারী-পুরুষের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করা
কোরআন নারী ও পুরুষ উভয়কেই সম্মানজনক মর্যাদা প্রদান করেছে এবং ন্যায়সংগত অধিকার ও দায়িত্ব নির্ধারণ করেছে। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের মধ্যে কোনো কর্মীর কর্ম নষ্ট করি না—সে পুরুষ হোক বা নারী; তোমরা একে অপরের অংশ।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১৯৫)

এছাড়া আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘নিশ্চয়ই মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী... আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৩৫)

৯. অপরাধ দমনে গুরুত্ব দেওয়া 
কোরআন চুরি, হত্যা, ব্যভিচার, মিথ্যা অপবাদ ও প্রতারণা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকতে নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ অশ্লীলতা, অন্যায় ও সীমালঙ্ঘনকে নিষিদ্ধ করেছেন।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯০)

১০. শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার উৎসাহিক করা 
ইসলামের প্রথম ওহিই ছিল জ্ঞান অর্জনের আহ্বান। আল্লাহ বলেন, ‘পড়ো, তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’ (সুরা : আলাক, আয়াত : ১)

শেষকথা, বর্তমান সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, মাদকাসক্তি, সহিংসতা, বৈষম্য, পারিবারিক ভাঙন এবং মূল্যবোধের সংকট মানবসভ্যতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পবিত্র কোরআন মানুষের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের জন্য এমন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা উপস্থাপন করেছে, যার মূল ভিত্তি হলো তাকওয়া, ন্যায়বিচার, সততা, মানবিকতা, দানশীলতা, ভ্রাতৃত্ব, পারস্পরিক সম্মান এবং জ্ঞানচর্চা। যদি ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ কুরআনের এই মহান আদর্শগুলো আন্তরিকভাবে অনুসরণ করে, তবে অন্যায়, দুর্নীতি, হিংসা, বৈষম্য ও অশান্তি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেতে পারে এবং একটি ন্যায়ভিত্তিক, শান্তিপূর্ণ, মানবিক ও কল্যাণমুখী সমাজ প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআনের শিক্ষা বুঝে তা নিজেদের জীবন ও সমাজে বাস্তবায়ন করার তাওফিক দান করুন। আমিন।