• ই-পেপার

আজকের নামাজের সময়সূচি, ২৩ জুন ২০২৬

সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন লাভে যেসব আমল করবেন

মুফতি ওমর বিন নাছির
সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন লাভে যেসব আমল করবেন
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় চাওয়া হলো শান্তি, স্বস্তি ও কল্যাণময় জীবন। ধন-সম্পদ, সম্মান, ক্ষমতা কিংবা ভোগ-বিলাসের প্রাচুর্য থাকলেও যদি অন্তরে প্রশান্তি না থাকে, তাহলে প্রকৃত সুখ অর্জিত হয় না। আবার অনেক মানুষ সীমিত সামর্থ্য নিয়েও আল্লাহর সন্তুষ্টি ও অন্তরের প্রশান্তির কারণে সুখী জীবন অতিবাহিত করেন। ইসলাম মানুষের এই দুনিয়াবী সুখ ও আখিরাতের সফলতার জন্য এমন কিছু আমলের শিক্ষা দিয়েছে, যা শুধু ইবাদতই নয়; বরং জীবনকে আলোকিত করার বাস্তব নির্দেশনাও বটে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম করবে—পুরুষ হোক বা নারী—আমি অবশ্যই তাকে পবিত্র ও সুখময় জীবন দান করব।’ (সুরা : নাহল, আয়াত : ৯৭)
সুতরাং প্রকৃত সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের উৎস হলো আল্লাহর আনুগত্য এবং নেক আমল। নিম্নে এমন ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ আমল তুলে ধরা হলো, যা একজন মুমিনের জীবনকে বরকতময় ও সফল করে তুলতে পারে।

১. নিয়মিত তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করুন
তাহাজ্জুদ হলো আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। রাতের নির্জনতায় যখন মানুষ ঘুমে মগ্ন থাকে, তখন আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে কান্নাভেজা দোয়া করা বান্দার মর্যাদা আল্লাহর কাছে অনেক বেশি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় কর; এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত। আশা করা যায়, তোমার রব তোমাকে প্রশংসিত স্থানে প্রতিষ্ঠিত করবেন।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৭৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, ‘কে আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেব? কে আমার কাছে চাইবে, আমি তাকে দান করব? কে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করব?’(সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৪৫, সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭৫৮)
তাহাজ্জুদ মানুষের দোয়া কবুলের অন্যতম সময় এবং অন্তরের প্রশান্তি লাভের এক অনন্য উপায়।

২. প্রতিদিন সালাতুদ-দুহা (চাশতের সালাত) আদায় করুন
চাশতের সালাত হলো সকালবেলার একটি বিশেষ নফল সালাত, যা শারীরিক সুস্থতা, মানসিক প্রশান্তি এবং রিজিকের বরকতের মাধ্যম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের প্রত্যেক অস্থিসন্ধির জন্য প্রতিদিন সদকা করা আবশ্যক... আর দুহার (চাশতের) দুই রাকাত সালাত এসবের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হয়ে যায়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৭২০)
যারা নিয়মিত চাশতের সালাত আদায় করেন, তারা আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ ও হেফাজতের অন্তর্ভুক্ত হন।

৩. বেশি বেশি ইস্তিগফার করুন
ইস্তিগফার শুধু গুনাহ মাফের উপায় নয়; বরং এটি দুশ্চিন্তা দূর করে, রিজিক বৃদ্ধি করে এবং জীবনে বরকত নিয়ে আসে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি বলেছি, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর; নিশ্চয়ই তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের উপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দ্বারা সাহায্য করবেন।’ (সুরা : নুহ, আয়াত : ১০-১২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিয়মিত ইস্তিগফার করবে, আল্লাহ তার প্রতিটি দুশ্চিন্তা দূর করবেন, প্রতিটি সংকট থেকে উত্তরণের পথ বের করে দেবেন এবং তাকে এমন স্থান থেকে রিজিক দান করবেন, যা সে কল্পনাও করতে পারবে না।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ১৫১৮)
প্রতিদিন অন্তত ১০০ বার ‘أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ وَأَتُوبُ إِلَيْهِ’ পাঠ করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

৪. প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করুন
আয়াতুল কুরসি কোরআনের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আয়াতগুলোর একটি। এটি আল্লাহর মহিমা, ক্ষমতা ও একত্ববাদের এক মহান ঘোষণা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরজ সালাতের পর আয়াতুল কুরসি পাঠ করবে, তার জান্নাতে প্রবেশের পথে মৃত্যু ছাড়া আর কোনো বাধা থাকবে না।’ (সুনানে নাসায়ি, হাদিস : ১০০)
এ আমল মানুষের ঈমানকে শক্তিশালী করে এবং শয়তানের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করে।

৫. নিয়মিত সদাকাহ করুন
সদাকাহ শুধু দরিদ্র মানুষের মুখে হাসি ফোটায় না; বরং এটি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। সদাকাহ মানুষের বিপদ-আপদ দূর করে এবং সম্পদে বরকত আনে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা আল্লাহর পথে তাদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ হলো একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ উৎপন্ন হয় এবং প্রত্যেক শীষে একশত দানা থাকে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৬১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদাকাহ গুনাহকে এমনভাবে মিটিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ২৬১৬)
অল্প হলেও নিয়মিত সদাকাহ করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।

৬. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করুন
নবীজি (সা.)-এর প্রতি দরুদ পাঠ করা ঈমানের ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ। এটি রহমত, বরকত ও দোয়া কবুলের অন্যতম মাধ্যম। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর প্রতি দরুদ পাঠ করেন। হে মুমিনরা! তোমরাও তাঁর প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ কর।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আমার প্রতি একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত নাযিল করেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪০৮)

প্রতিদিন বেশি বেশি ‘اللهم صل على محمد وعلى آل محمد’ পাঠ করা মুমিনের জন্য অশেষ কল্যাণের উৎস।

সুতরাং সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যময় জীবন শুধু ধন-সম্পদ বা বাহ্যিক প্রাচুর্যের নাম নয়; বরং এটি অন্তরের প্রশান্তি, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং আখিরাতের সফলতার সমন্বিত রূপ। তাহাজ্জুদ, চাশতের সালাত, ইস্তিগফার, আয়াতুল কুরসি, সদাকাহ এবং দরুদ শরিফ—এই ছয়টি আমল একজন মুমিনের জীবনকে আলোকিত করতে পারে। এগুলো এমন আমল, যা খুব কঠিন নয়; কিন্তু নিয়মিত পালন করলে জীবনে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এসব আমল আন্তরিকতার সঙ্গে নিয়মিত পালন করার তাওফিক দান করুন, আমাদের দুনিয়ার সকল বৈধ প্রয়োজন পূরণ করুন এবং আখিরাতে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

তাহাজ্জুদের নামাজ যেভাবে সৌভাগ্য বয়ে আনে

মাইমুনা আক্তার
তাহাজ্জুদের নামাজ যেভাবে সৌভাগ্য বয়ে আনে
সংগৃহীত ছবি

রাতের শেষ ভাগে যখন মানুষেরা গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন থাকে, তখন কিছু সৌভাগ্যবান বান্দা নিজেদের বিছানা ছেড়ে মহান আল্লাহর দরবারে হাজির হয়। তারা সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, কান্নাভেজা কণ্ঠে রবের কাছে ক্ষমা, রহমত ও হেদায়েত প্রার্থনা করে।

রাতের শেষ অংশের ইবাদতকে মহান আল্লাহ বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। এটি নেককারদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এবং মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঈমানদের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমার নিদর্শনাবলিতে শুধু তারাই বিশ্বাস করে, যাদেরকে এর দ্বারা উপদেশ দেওয়া হলে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে আর তাদের প্রতিপালকের প্রশংসা সহকারে তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে আর তারা অহংকার করে না। তারা তাদের (দেহের) পার্শ্বগুলো বিছানা থেকে আলাদা করে (জাহান্নামের) ভীতি ও (জান্নাতের) আশা নিয়ে তাদের প্রতিপালককে ডাকে, আর আমি তাদেরকে যে রিজিক দিয়েছি তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় করে।’ (সুরা : সিজদা, আয়াত : ১৫-১৬)

অন্য আয়াতে আল্লাহর বিশেষ বান্দাদের গুণাবলি আলোচনা করতে গিয়ে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা রাতে খুব কমই শয়ন করত। আর তারা রাতের শেষ প্রহরে ক্ষমা প্রার্থনা করত।’ (সুরা : জারিয়াত, আয়াত  : ১৭-১৮)

এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, শেষ রাতে ইবাদত ও ইস্তিগফার করা আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের বিশেষ গুণ। এই গুণে গুণান্বিত হতে পারা অত্যন্ত সৌভাগ্যের, যা মহান আল্লাহর দরবারে মানুষের মর্যাদা বৃদ্ধি করে।

এ ব্যাপারে অবগত করতে গিয়ে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় নবীকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়ো, ওটা তোমার জন্য নফল, শিগগিরই তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রশংসিত স্থানে উন্নীত করবেন।’ (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৭৯)
আমাদের প্রিয় নবী (সা.) তাঁর উম্মতদের শেষ রাতের আমলের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘মহামহিম আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশ অবশিষ্ট থাকাকালে পৃথিবীর নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করে ঘোষণা করতে থাকেন, কে আছে এমন, যে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেব। কে আছে এমন যে আমার নিকট চাইবে। আমি তাকে তা দেব। কে আছে এমন যে আমার নিকট ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে ক্ষমা করব।’ (বুখারি, হাদিস : ১১৪৫)

সাহাবায়ে কেরাম ও সালাফে সালেহিনের জীবনে তাহাজ্জুদের বিশেষ গুরুত্ব ছিল। তাঁরা রাতের শেষ অংশকে নিজেদের আত্মশুদ্ধি, তাওবা, জিকির ও দোয়ার জন্য নির্ধারিত রাখতেন। কারণ তাঁরা জানতেন, এ সময়ের একটি সিজদা ও একটি অশ্রুবিন্দু মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।

সুতরাং শেষ রাতের ইবাদত শুধু একটি নফল আমল নয়; এটি আল্লাহর নৈকট্য, মর্যাদা বৃদ্ধি, গুনাহ মাফ, দোয়া কবুল এবং হৃদয়ের প্রশান্তি অর্জনের এক মহামূল্যবান সুযোগ। যারা ঘুমের মায়া ত্যাগ করে শেষ রাতে আল্লাহর দরবারে দাঁড়ায়, তারা সত্যিই সৌভাগ্যবান। কারণ তাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর বিশেষ রহমত, ক্ষমা ও নৈকট্যের সুসংবাদ। মহান আল্লাহ সবাইকে এই সৌভাগ্য অর্জনের তাওফিক দান করুন। আমিন।

কৃষকের কাজ আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
কৃষকের কাজ আল্লাহর কুদরতের নিদর্শন
সংগৃহীত ছবি

কৃষিকাজ অন্যতম শ্রেষ্ঠ পেশা। এটি আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শনের একটি এবং মানুষের অন্তরে ঈমান সুদৃঢ় করার একটি মাধ্যম। এটি মহান আল্লাহর একত্ববাদের সুস্পষ্ট প্রমাণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ, তোমরা যে বীজ বপন করো? তোমরাই কি তা উৎপন্ন করো, নাকি আমরাই উৎপন্নকারী?’ (সুরা : আল-ওয়াকিয়া, আয়াত : ৬৩-৬৪)

কৃষিজগতের বিভিন্ন বৈচিত্র্য আল্লাহর কুদরতের এক মহান নিদর্শন। কোনোটি শস্য, কোনোটি ফল, কোনোটি ফুল, কোনোটি ঘাস, কোনোটি ফলমূল, কোনোটি শাক-সবজি, কোনোটি লতানো, কোনোটি আবার মাচাবিহীন—সবই আল্লাহর সৃষ্টির বিস্ময়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতএব মানুষ যেন তার খাদ্যের প্রতি দৃষ্টি দেয়।

আমিই প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করেছি, অতঃপর আমি জমিনকে যথাযথভাবে বিদীর্ণ করেছি। তারপর তাতে উৎপন্ন করেছি শস্য, আঙুর, শাক-সবজি, জলপাই, খেজুর, ঘন বৃক্ষরাজির উদ্যান, ফলমূল ও ঘাস—তোমাদের ও তোমাদের পশুদের ভোগের জন্য।’ (সুরা : আবাসা, আয়াত : ২৪-৩২)

কৃষকের কাজ আল্লাহর কুদরতের প্রমাণ : কৃষক মাটিতে একটি বীজ বপন করে, আল্লাহর দেওয়া পানি দিয়ে তা সেচ দেয়, আল্লাহর তৈরি জমি প্রস্তুত করে এবং আল্লাহর দেওয়া যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে। এরপর সে অপেক্ষা করে—এই বীজ থেকে কী বের হয়।

কিন্তু কে সেই বীজকে বিদীর্ণ করে অঙ্কুর বের করেন? কে মাটিকে ভেদ করে ফসল বের করেন? আল্লাহ ছাড়া আর কে?
ফসল দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্বের জীবন্ত উদাহরণ : আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত হলো এমন—যেমন আমি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করি, ফলে তার দ্বারা জমিনের উদ্ভিদ মানুষের ও পশুর খাদ্যের সঙ্গে মিশে যায়। অবশেষে যখন জমিন তার সৌন্দর্য ধারণ করে এবং সুশোভিত হয়, আর তার অধিবাসীরা মনে করে যে তারা এর ওপর পূর্ণ ক্ষমতাবান, তখন আমার আদেশ রাত বা দিনে এসে পড়ে। অতঃপর আমি তাকে এমনভাবে কেটে ফেলি যেন গতকাল এখানে কিছুই ছিল না। এভাবেই আমি চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শনগুলো বিস্তারিত বর্ণনা করি।’ (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ২৪)

এই উদাহরণের মাধ্যমে আল্লাহ মানুষকে বুঝিয়েছেন—মানুষও প্রথমে দুর্বল অবস্থায় জন্মগ্রহণ করে, এরপর যৌবনে শক্তিশালী হয় এবং মনে করে সে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকবে, সবকিছু করতে পারবে। তারপর বার্ধক্য আসে, শক্তি কমে যায়, অবশেষে তার জীবনও সেই ফসলের মতো হয়ে যায়, যা প্রথমে সবুজ ছিল, পরে শুকিয়ে কেটে ফেলা হয়। ফসল, উত্তম কথা ও দান : কথার সঙ্গে ফসলের এবং আল্লাহর পথে ব্যয়ের সঙ্গে ফসলের গভীর মিল রয়েছে।

আল্লাহ তাআলা উত্তম ও মন্দ কথার উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘তুমি কি দেখনি, আল্লাহ কিভাবে দৃষ্টান্ত দিয়েছেন? উত্তম বাক্য হলো উত্তম বৃক্ষের মতো, যার মূল সুদৃঢ় এবং যার শাখা আকাশে। সে তার রবের অনুমতিতে সর্বদা ফল দান করে। আর মন্দ বাক্যের দৃষ্টান্ত হলো মন্দ বৃক্ষের মতো, যা জমিনের ওপর থেকে উপড়ে ফেলা হয়েছে, যার কোনো স্থায়িত্ব নেই।’ (সুরা : ইবরাহিম, আয়াত : ২৪-২৬)

অতএব, উত্তম কথা ও সৎকর্মের সঙ্গে ফসলের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

কৃষিকাজ ও আল্লাহর ইবাদতের সম্পর্ক
১. উদ্ভিদ আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে :
আল্লাহ বলেন, ‘সাত আসমান, জমিন এবং এতে যা কিছু আছে সবই তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। এমন কোনো বস্তু নেই যা তাঁর প্রশংসাসহ তাসবিহ করে না; কিন্তু তোমরা তাদের তাসবিহ বুঝতে পারো না।’ (সুরা : আল-ইসরা/বনি ইসরাঈল, আয়াত : ৪৪)

২. উদ্ভিদ আল্লাহর সামনে সিজদা করে : আল্লাহ বলেন, ‘আর তৃণলতা ও বৃক্ষ উভয়েই সিজদা করে।’ (সুরা : আর-রহমান, আয়াত : ৬)

৩. ফসলের মধ্যে জাকাত আছে : আল্লাহ বলেন, ‘আর ফসল কাটার দিন তার হক (জাকাত) প্রদান করো।’ (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ১৪১)

কৃষিকাজ ও হজের সম্পর্ক : হজের সময় মক্কার পবিত্র এলাকার উদ্ভিদ ও গাছপালা নষ্ট করা নিষিদ্ধ। রাসুুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ মক্কাকে হারাম (পবিত্র) করেছেন। আমার আগে বা আমার পরে কারো জন্য এটি বৈধ নয়। আমার জন্যও দিনের কিছু সময়ের জন্য বৈধ করা হয়েছিল। এর ঘাস কাটা যাবে না, গাছ কাটা যাবে না, শিকার তাড়ানো যাবে না...।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৩৩)

কৃষিকাজ একটি নৈতিক শিক্ষালয়
কৃষি মানুষকে বহু উত্তম চরিত্র শিক্ষা দেয়। যেমন-

১. আমানতদারি : কৃষকের হাতে মানুষের জীবনধারণের একটি বড় আমানত রয়েছে। এই আমানত সঠিকভাবে রক্ষা করা জরুরি। ইউসুফ (আ.) মিসরের রাজার স্বপ্নের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছিলেন— ‘তোমরা সাত বছর ধারাবাহিকভাবে চাষ করবে। অতঃপর যা কাটবে তা শীষের মধ্যে রেখে দেবে, সামান্য যা খাবে তা ছাড়া। এরপর আসবে সাতটি কঠিন বছর, যা তোমাদের সঞ্চিত সব খেয়ে ফেলবে...।’ (সুরা : ইউসুফ, আয়াত : ৪৭-৪৯)

তাঁদের এই পরামর্শ অনুসরণের কারণে আল্লাহর ইচ্ছায় তারা দুর্ভিক্ষ থেকে রক্ষা পেয়েছিল।

২. বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করা : ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে বের হওয়ার পর আল্লাহ তাঁর জন্য ইয়াকতিনগাছ উৎপন্ন করেছিলেন, যা তাঁর দুর্বলতা দূর করেছিল। আল্লাহ বলেন, ‘অতঃপর আমি তাকে তীরে নিক্ষেপ করলাম, তখন সে ছিল অসুস্থ। আর আমি তার ওপর একটি ইয়াকতিনগাছ উৎপন্ন করলাম।’ (সুরা : আস-সাফফাত, আয়াত : ১৪৫-১৪৬)

এভাবেই মরিয়ম (আ.)-এর জন্য খেজুরের ব্যবস্থা করা হয়েছিল— ‘আর তুমি খেজুরগাছের কাণ্ড তোমার দিকে নাড়াও, তা তোমার ওপর পাকা তাজা খেজুর ফেলবে।’ (সুরা : মারইয়াম, আয়াত : ২৫)

৩. আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা : কৃষক প্রতিদিন নিজের চোখের সামনে আল্লাহর নিয়ামত দেখতে পায়। তাই তার উচিত আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা। দুই বাগানের মালিকের ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়—সে আল্লাহর নিয়ামত অস্বীকার করেছিল। তার মুমিন বন্ধু তাকে বলেছিল—‘তুমি যখন তোমার বাগানে প্রবেশ করলে তখন কেন বললে না—মাশাআল্লাহ, আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া কোনো শক্তি নেই?’ (সুরা : আল-কাহফ, আয়াত : ৩৯)
কিন্তু সে শিক্ষা গ্রহণ করেনি। ফলে তার বাগান ধ্বংস হয়ে যায়।

উপসংহার
কৃষকদের জন্য এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে যে মহান আল্লাহ তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং তাঁর সাহাবিদের উদাহরণ দিয়েছেন ফসলের মাধ্যমে। আল্লাহ বলেন, ‘মুহাম্মদ আল্লাহর রাসুল এবং তাঁর সঙ্গীরা কাফিরদের প্রতি কঠোর, নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি দয়ালু। তুমি তাদের দেখবে তারা রুকু ও সিজদায় অবনত, তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে। তাওরাত ও ইনজিলে তাদের দৃষ্টান্ত হলো এমন একটি চারাগাছের মতো, যা প্রথমে কুঁড়ি বের করে, পরে তাকে শক্তিশালী করে, তারপর তা মোটা ও দৃঢ় হয় এবং নিজের কাণ্ডের ওপর দাঁড়িয়ে যায়—যা কৃষকদের আনন্দ দেয়।’ (সুরা : আল-ফাতহ, আয়াত : ২৯)

অতএব, কৃষিকাজ শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়; বরং এটি আল্লাহর নিদর্শন, ইবাদতের একটি ক্ষেত্র এবং মানবতার সেবার এক মহান পথ।

ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে কোনো পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে কোনো পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

ব্যবসা-বাণিজ্য ইসলামে একটি সম্মানজনক পেশা। তাই হালাল উপার্জনকে ইসলামে বিশেষভাবে ইবাদতের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ব্যবসার ক্ষেত্রে সততা, আমানতদারিতা এবং আইন মেনে চলার বিষয়েও ইসলাম অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছে। বর্তমান যুগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আমদানি-রপ্তানির ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—কেউ যদি সরকারি ট্যাক্স বা শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিদেশ থেকে পণ্য নিয়ে আসে, তাহলে সে কি গুনাহগার হবে? আর সেই পণ্য বিক্রি করে অর্জিত অর্থ কি হারাম হবে?

ইসলামে আইন মেনে চলার গুরুত্ব
ইসলাম মুসলমানকে শৃঙ্খলাবদ্ধ ও দায়িত্বশীল নাগরিক হতে শিক্ষা দেয়। যে দেশে একজন মুসলমান বসবাস করে, সে দেশের বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত আইন মেনে চলা তার কর্তব্য। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর আনুগত্য কর, রাসূলের আনুগত্য কর এবং তোমাদের মধ্যকার কর্তৃত্বশীল ব্যক্তিদেরও আনুগত্য কর।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৫৯)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, শরিয়তবিরোধী নয় এমন রাষ্ট্রের আইন ও বিধান মান্য করা মুসলমানের দায়িত্ব।

ট্যাক্স প্রদান সম্পর্কে ইসলামের নির্দেশনা
যদি কোনো মুসলিম সরকার বা রাষ্ট্র জনগণের কল্যাণ, নিরাপত্তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং জনসেবার জন্য ন্যায্য ও বৈধ কর বা শুল্ক নির্ধারণ করে, তাহলে তা পরিশোধ করা উচিত। কারণ এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের দায়িত্ব এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার একটি অংশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুসলমানরা তাদের চুক্তি ও অঙ্গীকারের উপর অটল থাকবে।’ (সুনানে আবু দাউদ)
যেহেতু একজন নাগরিক রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর অধীনে বসবাস করে, তাই সেই আইনি দায়িত্ব পালন করাও তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া কি গুনাহ?
সাধারণভাবে ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া সততা ও দায়িত্বশীলতার পরিপন্থী। একজন মুসলমানের উচিত আইনসম্মত পাওনা গোপন না করা এবং রাষ্ট্রকে প্রতারণা না করা। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা মানুষের প্রাপ্য বস্তু কমিয়ে দিও না।’ (সুরা : আরাফ, আয়াত : ৮৫)

এ ছাড়াও রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম)
সুতরাং ইচ্ছাকৃতভাবে শুল্ক বা ট্যাক্স গোপন করা এবং প্রতারণার মাধ্যমে তা এড়িয়ে যাওয়া একজন মুসলমানের আদর্শ চরিত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আনা পণ্য কি হারাম?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়ার কাজটি যদি অন্যায় বা গুনাহ হয়ও, তবুও এর কারণে পণ্যটি নিজে হারাম হয়ে যায় না। কারণ পণ্যের বৈধতা নির্ভর করে পণ্যের প্রকৃতির উপর। যদি পণ্যটি মূলত হালাল ও বৈধ হয়, তবে ট্যাক্স না দেওয়ার কারণে তা হারাম বস্তুতে পরিণত হয় না। ফোকাহায়ে কেরাম বলেন যে, কোনো লেনদেনের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি গুনাহ থাকলে সেটি সব সময় পণ্যের মূল বৈধতাকে নষ্ট করে না। তাই ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে আমদানি করা বৈধ পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করা মূলত বৈধ থাকবে এবং সেই পণ্যের ব্যবসা থেকে অর্জিত আয়ও মূলত হালাল হিসেবে গণ্য হবে। (বাদাইউস সানায়ে, ৫/১২৯, বুহুস ফি কাদায়া ফিকহিয়্যা মুয়াসারাহ, পৃষ্ঠা : ১৬৬)

একজন মুসলমান ব্যবসায়ীর করণীয়
১. ব্যবসায় সততা বজায় রাখা।
২. রাষ্ট্রের বৈধ আইন মেনে চলা।
৩. প্রতারণা ও গোপনিয়তা পরিহার করা।
৪. হালাল উপার্জনের প্রতি যত্নবান হওয়া।
৫. সন্দেহযুক্ত বিষয় থেকে দূরে থাকা।
৬. আল্লাহর ভয়কে ব্যবসার মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করা।

ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যকে উৎসাহিত করেছে, কিন্তু সেই সঙ্গে সততা, ন্যায়পরায়ণতা ও আইনানুগ আচরণের ওপর জোর দিয়েছে। তাই কোনো রাষ্ট্রের বৈধ ও ন্যায্য ট্যাক্স বা শুল্ক থাকলে তা পরিশোধ করা একজন মুসলমানের জন্য উত্তম ও দায়িত্বপূর্ণ কাজ। তবে যদি কেউ ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে বৈধ কোনো পণ্য আমদানি করে, তাহলে তার এই কাজটি নৈতিক ও শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে; কিন্তু এর ফলে পণ্যটি নিজে হারাম হয়ে যায় না। তাই সেই বৈধ পণ্যের ক্রয়-বিক্রয় এবং তা থেকে অর্জিত উপার্জনও মূলত হারাম বলে গণ্য হবে না।

তবুও একজন মুত্তাকি মুসলমানের জন্য সর্বোত্তম পথ হলো—সন্দেহ ও বিতর্কিত বিষয় থেকে দূরে থেকে স্বচ্ছতা, সততা এবং আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনা করা। কেননা হালাল উপার্জনের বরকত শুধু সম্পদ বৃদ্ধি করে না; বরং তা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জীবনের সফলতার পথ সুগম করে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক উপার্জন, সততার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা এবং সকল প্রকার প্রতারণা ও অন্যায় থেকে বেঁচে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।