মহররম ইসলামী বছরের প্রথম মাস এবং আল্লাহ তাআলার নিকট মর্যাদাপূর্ণ চারটি হারাম মাসের অন্যতম। এ মাস ইবাদত, তওবা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে যুগে যুগে কিছু মানুষ এ মাসের প্রকৃত শিক্ষা থেকে বিচ্যুত হয়ে বিভিন্ন কুসংস্কার, বিদআত ও শরিয়তবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে মহররমের বরকত ও শিক্ষার পরিবর্তে সমাজে বিভ্রান্তি, বাড়াবাড়ি ও ধর্মীয় অপসংস্কৃতির প্রসার ঘটেছে।
ইসলাম আমাদেরকে প্রত্যেক আমল কোরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে করার শিক্ষা দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) যে পথ দেখিয়েছেন, সেটিই হলো মুক্তি ও সফলতার পথ। তাই মহররম মাসের ফজিলত অর্জন করতে হলে যেমন কিছু আমল পালন করা জরুরি, তেমনি কিছু ভুল ও বর্জনীয় কাজ থেকেও দূরে থাকা আবশ্যক। আসুন, কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মহররম মাসে প্রচলিত কয়েকটি বর্জনীয় আমল সম্পর্কে জানি।
১. আশুরাকে শোক ও মাতমের দিবস বানানো
অনেক মানুষ আশুরার দিনকে শুধু শোক, বিলাপ ও মাতমের দিন হিসেবে পালন করে। অথচ ইসলাম কোনো ব্যক্তির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে স্থায়ী শোক দিবস পালনকে সমর্থন করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
لَيْسَ مِنَّا مَنْ لَطَمَ الْخُدُودَ وَشَقَّ الْجُيُوبَ وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ
‘সে আমাদের দলভুক্ত নয়, যে গালে আঘাত করে, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহেলিয়াতের মতো বিলাপ করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১২৯৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১০৩)
অতএব আশুরাকে শোক ও বিলাপের দিবস বানানো সুন্নাহসম্মত নয়।
২. নিজের শরীরে আঘাত করা ও রক্ত ঝরানো
কিছু সম্প্রদায় আশুরার দিনে নিজেদের শরীরে আঘাত করে, শিকল বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে রক্তাক্ত করে এবং এটিকে ইবাদত বা ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ মনে করে। কিন্তু ইসলাম স্পষ্টভাবে আত্মনির্যাতন নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—
وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ ۚ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا
‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংস কর না। নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন,
وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ
‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ কর না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৯৫)
অতএব নিজেকে আঘাত করা, রক্ত ঝরানো বা শারীরিক কষ্ট দেওয়া ইসলামে বৈধ নয়।
৩. বিদআত ও মনগড়া ইবাদত চালু করা
অনেক স্থানে মহররম উপলক্ষে বিশেষ নামাজ, বিশেষ জিকির, নির্দিষ্ট রাকাতের সালাত বা বিশেষ অনুষ্ঠানকে ধর্মীয় আমল হিসেবে প্রচার করা হয়; অথচ এগুলোর কোনো সহিহ ভিত্তি নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ
‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন চালু করবে যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৬৯৭)
সুতরাং দ্বিনের নামে নতুন নতুন ইবাদত আবিষ্কার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪. বিশেষ খাবার রান্না আবশ্যক মনে করা
কিছু অঞ্চলে আশুরার দিনে বিশেষ খাবার, খিচুড়ি বা নির্দিষ্ট খাদ্য প্রস্তুত করাকে ধর্মীয় কর্তব্য মনে করা হয়। বাস্তবে কোরআন বা সহিহ হাদিসে আশুরার দিন বিশেষ কোনো খাবার রান্না করাকে ইবাদত হিসেবে প্রমাণিত করা হয়নি। কেউ সাধারণ দান-সদকার উদ্দেশ্যে খাবার বিতরণ করলে তা সওয়াবের কাজ হতে পারে, কিন্তু এটিকে সুন্নাহ বা বাধ্যতামূলক ধর্মীয় রীতি মনে করা সঠিক নয়।
৫. ভিত্তিহীন ফজিলতের গল্প ও জাল হাদিস প্রচার করা
মহররম মাস এলেই অনেক মনগড়া ঘটনা, জাল হাদিস ও ভিত্তিহীন ফজিলতের বর্ণনা ছড়িয়ে পড়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন,
مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ
‘যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার নামে মিথ্যা বলবে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১০৭)
তাই কোনো বর্ণনা প্রচারের আগে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
৬. হারাম মাসের মর্যাদা নষ্ট করে গুনাহে লিপ্ত হওয়া
মহররম যেহেতু হারাম মাস, তাই এ মাসে গুনাহ, অন্যায়, জুলুম, গীবত, মিথ্যা ও অশ্লীলতায় লিপ্ত হওয়া থেকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,
فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ
‘সুতরাং তোমরা এসব সম্মানিত মাসে নিজেদের প্রতি জুলুম কর না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)
এ আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে হারাম মাসগুলোতে পাপ থেকে আরো বেশি সতর্ক থাকতে হবে।
মহররম মাস আমাদের জন্য শোক, কুসংস্কার বা বিদআতের মাস নয়; বরং এটি তাকওয়া, আত্মশুদ্ধি, তওবা ও ইবাদতের মাস। একজন সচেতন মুমিন কখনো আবেগ, অন্ধ অনুসরণ বা সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির ভিত্তিতে দ্বীনের আমল নির্ধারণ করেন না; বরং কোরআন ও সহিহ সুন্নাহকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেন।
তাই আসুন, আমরা মহররম মাসে সব ধরনের বিদআত, কুসংস্কার, মাতম, আত্মনির্যাতন ও ভিত্তিহীন কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকি এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো বিশুদ্ধ আমলের মাধ্যমে এ মাসের বরকত অর্জনের চেষ্টা করি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সত্যকে সত্য হিসেবে গ্রহণ এবং তার অনুসরণ করার, আর অসত্যকে অসত্য হিসেবে চিনে তা থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।




