• ই-পেপার

মহররম মাসে যেসব কাজ বর্জনীয়

বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার বিশিষ্ট মসজিদ ‘জামিউল জাজাইর’

ইসলামী জীবন ডেস্ক
বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার বিশিষ্ট মসজিদ ‘জামিউল জাজাইর’
সংগৃহীত ছবি

ভূমধ্যসাগরের নীল জলরাশির তীরে, আলজেরিয়ার রাজধানীতে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আধুনিক ইসলামি স্থাপত্যের এক বিস্ময়—‘জামিউল জাজাইর’। ইসলামের সৌন্দর্য, জ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি ও সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনস্থল এই বিশাল মসজিদ আজ শুধু আলজেরিয়ার নয়, বরং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের গর্বের প্রতীক। চার লাখ বর্গমিটারেরও বেশি বিস্তৃত এই মহাপরিকল্পনা মক্কার মসজিদুল হারাম এবং মদিনার মসজিদে নববীর পর বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ এবং আফ্রিকা মহাদেশের সর্ববৃহৎ মসজিদ হিসেবে স্বীকৃত।

যে ভূমিতে আজ ইসলামের এই মহিমান্বিত কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, ফরাসি ঔপনিবেশিক আমলে সেই এলাকাকে মুসলিম পরিচয় মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারক কার্ডিনাল লাভিজেরির নামে নামকরণ করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর আলজেরিয়া সেই ইতিহাসকে পেছনে ফেলে ইসলামী পরিচয়ের পুনঃপ্রতিষ্ঠা ঘটায়। দীর্ঘ পরিকল্পনা ও নির্মাণকাজ শেষে ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আলজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট আব্দেল মাজিদ তেব্বুন আনুষ্ঠানিকভাবে মসজিদটির উদ্বোধন করেন। 

বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মিনার
জামিউল জাজাইরের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর ২৩৫ মিটার (প্রায় ৮৬৯ ফুট) উচ্চতার মিনার, যা বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ মিনার হিসেবে পরিচিত। ৪৩ তলাবিশিষ্ট এই মিনারটি কেবল আজানের জন্য নির্মিত হয়নি; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জ্ঞান ও সংস্কৃতি কেন্দ্র। এর ভেতরে রয়েছে— ইসলামি সভ্যতা জাদুঘর, গবেষণা কেন্দ্র, আধুনিক গ্রন্থাগার, পর্যটকদের জন্য অবজারভেশন ডেক ও রেস্তোরাঁ ও সাংস্কৃতিক সুবিধা। মিনারের উপরের তলা থেকে পুরো আলজিয়ার্স শহর এবং ভূমধ্যসাগরের অপূর্ব দৃশ্য এক নজরে দেখা যায়। রাতের বেলায় এটি সমুদ্রগামী জাহাজগুলোর জন্য বাতিঘরের ভূমিকাও পালন করে।

লাখো মুসল্লির ইবাদতের কেন্দ্র
মসজিদের মূল নামাজঘরে একসঙ্গে প্রায় ৩৬ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। বিশাল চত্বর ও বহিরাঙ্গনসহ মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মানুষের। ২২ হাজার বর্গমিটার আয়তনের নামাজঘরের উপরে রয়েছে প্রায় ৫০ মিটার ব্যাসের এক বিশাল গম্বুজ। দেয়ালজুড়ে খোদাই করা হয়েছে কোরআনের আয়াত ও দৃষ্টিনন্দন ইসলামি ক্যালিগ্রাফি, যা পুরো পরিবেশকে আধ্যাত্মিক সৌন্দর্যে ভরিয়ে তোলে। মসজিদের মিম্বারটি আফ্রিকান ওক কাঠ ও প্রাকৃতিক মুক্তা দিয়ে নির্মিত। 

ভয়াবহ ভূমিকম্পেও নিরাপদ
আলজিয়ার্স অঞ্চল ভূমিকম্পপ্রবণ হওয়ায় মসজিদটির নিচে বসানো হয়েছে শত শত আধুনিক সিসমিক আইসোলেটর ও ড্যাম্পার। এই প্রযুক্তি ভূমিকম্পের কম্পন উল্লেখযোগ্যভাবে শোষণ করে ভবনকে নিরাপদ রাখে। ফলে এটি আধুনিক প্রকৌশলের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ইসলামিক থিমেটিক গার্ডেন
মসজিদ কমপ্লেক্সের বিশাল অংশজুড়ে রয়েছে এক মনোমুগ্ধকর ইসলামিক বাগান। এখানে কোরআনে উল্লেখিত বিভিন্ন বৃক্ষ যেমন— ত্বীন (ডুমুর), জাইতুন (অলিভ), ডালিম, সুগন্ধি লেবু, জুঁই ফুল রোপণ করা হয়েছে। বিশেষভাবে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতির প্রতীক হিসেবে আল-আকসা প্রাঙ্গণের মাটি থেকে আনা অলিভ গাছও এখানে স্থান পেয়েছে।

স্বর্ণখচিত বিশাল ঝাড়বাতি
মসজিদের কেন্দ্রীয় ঝাড়বাতিটি বিশ্বের বৃহত্তম ও সবচেয়ে দৃষ্টিনন্দন ঝাড়বাতিগুলোর অন্যতম। ১৩.৫ মিটার ব্যাস এবং প্রায় ৯.৫ টন ওজনের এই ঝাড়বাতি ২৪ ক্যারেট স্বর্ণে আবৃত। এতে ব্যবহৃত হয়েছে তিন লক্ষাধিক স্বরোভস্কি ক্রিস্টাল, যা আলো প্রতিফলিত করে পুরো নামাজঘরকে অপূর্ব আভায় আলোকিত করে তোলে।

জ্ঞান, গবেষণা ও সংস্কৃতির কেন্দ্র
জামিউল জাজাইর শুধুমাত্র একটি মসজিদ নয়; এটি একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি জ্ঞানকেন্দ্র। এখানে রয়েছে— দারুল কোরআন, উচ্চতর ইসলামি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, প্রায় ১০ লক্ষ বইয়ের গ্রন্থাগার, আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী হল, আধুনিক ভূগর্ভস্থ পার্কিং ব্যবস্থা। এসব সুবিধা ইসলামের জ্ঞান, গবেষণা ও সংস্কৃতিকে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে নির্মিত হয়েছে। প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে নির্মিত জামিউল জাজাইর ইতিহাস, স্থাপত্য, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি, জ্ঞানচর্চা ও ইসলামি সভ্যতার এক মহাকাব্যিক প্রকাশ। ভূমধ্যসাগরের তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মহান স্থাপনাটি যেন মুসলিম উম্মাহকে স্মরণ করিয়ে দেয়—ইসলাম শুধু ইবাদতের ধর্ম নয়; এটি জ্ঞান, সৌন্দর্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি ও মানবকল্যাণের এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। 

হাদিসের বাণী

যাদের ব্যাপারে মহানবী (সা.) কসম করেছেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
যাদের ব্যাপারে মহানবী (সা.) কসম করেছেন
সংগৃহীত ছবি

আবু কাবশাহ আমর ইবনে সাদ আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন, মহানবী (সা.) বলেন, আমি তিনটি বিষয়ে তোমাদের জন্য কসম করছি। আর তোমাদের কাছে একটি হাদিস বর্ণনা করব, তা তোমরা সংরক্ষণ করে রাখবে, ১. কোনো ব্যক্তি তার সম্পদ থেকে সাদাকাহ করলে তার সম্পদ কমে যায় না। ২. কোনো ব্যক্তির ওপর জুলুম করা হলে, সে তাতে সবর করলে, আল্লাহ তার সম্মান বৃদ্ধি করে দেন। ৩. যে ব্যক্তি ভিক্ষার দরজাকে খোলে, আল্লাহ তাআলা তার জন্যও দরিদ্রতার দরজাকে খুলে দেন। অথবা তিনি এমন কোনো শব্দ বলেছেন।

আর তোমাদেরকে একটি হাদিস বর্ণনা করব, সেটা সংরক্ষণ রাখো। তিনি বললেন, দুনিয়াতে চার ধরনের লোক আছে, ১. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ ও ইলম দান করেছেন, আর সে আল্লাহকে ভয় করে এবং আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখে, আর এতে যে আল্লাহর হক রয়েছে তা সে জানে-(ও সে অনুযায়ী কাজ করে।) তাহলে সে আল্লাহর কাছে উত্তম স্থানে থাকবে। ২. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ ইলম দান করেছেন, কিন্তু সম্পদ দান করেননি। কিন্তু সে সত্য নিয়তে বলে-অমুকের মতো যদি আমারও সম্পদ থাকত, তাহলে আমি অমুকের মতো ভালো কাজ করতাম। ফলে সেও নিয়ত অনুযায়ী সাওয়াব পাবে। আর তাদের দুজনের (দানকারী ও একনিষ্টভাবে দানকরার ইচ্ছাকারী) সাওয়াবও সমান হবে। ৩. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা তাকে ধন-সম্পদ দান করেছেন, কিন্তু তার কোনো ইলম নেই; ফলে সে অবৈধ পন্থায় সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহকে ভয় করে না ও আত্মীয়তার বন্ধন বজায় রাখে না; ও তার সম্পদে কী হক আছে, তা সে জানে না। (আদায় করে না।)-সে আল্লাহর কাছে নিকৃষ্ট স্তরে অবস্থান থাকবে। ৪. এমন বান্দা, যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ ও ইলম কোনো কিছুই দান করেননি; কিন্তু সে বলে, যদি আমার নিকট মাল থাকত, তাহলে আমিও অমুকের মতো আমল করতাম। ফলে তার স্থান নির্ধারিত হবে তার নিয়ত অনুযায়ী। সুতরাং তাদের উভয়ের গুনাহ হবে সমান। (তিরমিজি, হাদিস নং : ২৩২৫, মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নং : ১৮০৩১)

শিক্ষা ও বিধান 
১. সদকা করলে সম্পদ কমে না। তাই রাসুলুল্লাহ (সা.) কসম করে বলেছেন, সদকা করার কারণে সম্পদ কমে না। বাহ্যিকভাবে কিছু অর্থ খরচ হলেও আল্লাহ তাআলা বরকত, কল্যাণ ও প্রতিদানের মাধ্যমে তা পূরণ করে দেন।
২. জুলুমের শিকার হয়ে সবর করলে মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কেউ অন্যায় করলে প্রতিশোধের ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ধৈর্য ধারণ করা এবং আল্লাহর কাছে প্রতিদান আশা করা সম্মান ও মর্যাদা বৃদ্ধির কারণ।
৩. ভিক্ষাবৃত্তি দারিদ্র্যের কারণ। অপ্রয়োজনে মানুষের কাছে হাত পাতার অভ্যাস মানুষকে আত্মমর্যাদাহীন করে এবং দরিদ্রতার দিকে ঠেলে দেয়। ইসলাম কর্ম ও আত্মনির্ভরশীলতাকে উৎসাহিত করে।
৪. ইলম ও সম্পদের সমন্বয় সবচেয়ে বড় নেয়ামত। যে ব্যক্তি সম্পদ ও দ্বীনি জ্ঞান উভয়ই পেয়েছে এবং সেগুলো আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে ব্যবহার করে, সে সর্বোত্তম মর্যাদার অধিকারী।
৫. তাকওয়া সম্পদের সঠিক ব্যবহারের মূল ভিত্তি। সম্পদ থাকলেই সেটা কল্যাণকর হয় না; বরং তাকওয়া থাকলে সম্পদ কল্যাণের মাধ্যম হয়, আর তাকওয়া না থাকলে তা ধ্বংসের কারণ হয়।
৬. আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ দাবি। তাই হাদিসে উত্তম বান্দার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হিসেবে আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার কথা বলা হয়েছে।
৭. সম্পদে আল্লাহর হক রয়েছে। জাকাত, সদকা, আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতা, অসহায়দের সাহায্য—এসব সম্পদের হক। এগুলো আদায় করা মুমিনের দায়িত্ব।
৮. নিয়তের গুরুত্ব অপরিসীম। ভালো কাজ করার আন্তরিক ইচ্ছা থাকলেও সামর্থ্য না থাকলে আল্লাহ তাআলা সেই নিয়তের কারণে পূর্ণ সাওয়াব দান করেন।

এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, মানুষের মর্যাদা সম্পদে নয়, বরং তাকওয়া, ইলম, সৎ নিয়ত ও নেক আমলে। সদকা সম্পদকে বরকতময় করে, সবর সম্মান বৃদ্ধি করে এবং সৎ নিয়ত মানুষকে বড় সাওয়াবের অধিকারী বানায়। অন্যদিকে ইলমহীন সম্পদ ও অসৎ নিয়ত মানুষকে আল্লাহর নিকট নিকৃষ্ট অবস্থানে পৌঁছে দিতে পারে। তাই প্রত্যেক মুমিনের উচিত ইলম অর্জন করা, সম্পদের হক আদায় করা, সৎ নিয়ত রাখা এবং সর্বাবস্থায় আল্লাহকে ভয় করে চলা।

মহররম মাসে মুমিনের করণীয় বিশেষ ১০ আমল

মুফতি ওমর বিন নাছির
মহররম মাসে মুমিনের করণীয় বিশেষ ১০ আমল
সংগৃহীত ছবি

আল্লাহ তাআলা মানুষের জীবনকে কল্যাণময় করার জন্য কিছু সময়, স্থান ও আমলকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছেন। মহররম মাস তেমনই এক মহিমান্বিত মাস। এটি ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস এবং আল্লাহর নিকট সম্মানিত চারটি হারাম মাসের অন্যতম। এই মাস আমাদের নতুনভাবে আত্মশুদ্ধি, তওবা, ইবাদত ও আল্লাহর আনুগত্যের পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ এনে দেয়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক মানুষ মহররমকে শুধু আশুরার শোক বা কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে। অথচ কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে এই মাস হলো ইবাদত, তওবা, নফল রোজা, দান-সদকা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সুবর্ণ সময়। একজন সচেতন মুমিনের উচিত এই মাসের ফজিলত উপলব্ধি করে নিজের আমলনামা সমৃদ্ধ করা।

১. মহররম মাসের মর্যাদা উপলব্ধি করা
মহররম মাসের গুরুত্ব উপলব্ধি করা এবং এ মাসকে সম্মান করা একজন মুমিনের প্রথম করণীয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারোটি; তার মধ্যে চারটি সম্মানিত (হারাম) মাস।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)
মহররম সেই চারটি হারাম মাসের অন্যতম। তাই এ মাসে পাপ থেকে বিশেষভাবে বেঁচে থাকা এবং নেক আমল বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২. আন্তরিক তওবা ও আত্মসমালোচনা করা
হিজরি বছরের সূচনা আত্মসমালোচনা ও নতুনভাবে জীবন গঠনের এক উত্তম সময়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা সবাই আল্লাহর কাছে তওবা কর।’ (সুরা : নুর, আয়াত : ৩১)
মহররম মাসে একজন মুমিন বিগত বছরের ভুল-ত্রুটি স্মরণ করে আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করে তওবা করা এবং নতুন বছরকে নেক আমলের মাধ্যমে শুরু করা জরুরি।

৩. অধিক পরিমাণে নফল রোজা রাখা
রমজানের পর সর্বশ্রেষ্ঠ রোজা হলো মহররম মাসের রোজা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো আল্লাহর মাস মহররমের রোজা।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬৩)
তাই এ মাসে যত বেশি সম্ভব নফল রোজা রাখা মুস্তাহাব।

৪. আশুরার রোজা পালন করা
মহররমের ১০ তারিখ ‘আশুরা’ অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ একটি দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার দিনের রোজা সম্পর্কে আমি আল্লাহর কাছে আশা করি যে, তিনি এর মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৬২)
আর ইহুদিদের বিরোধিতা করার জন্য রাসুল (সা.) ৯ ও ১০ মহররম অথবা ১০ ও ১১ মহররম রোজা রাখার নির্দেশনা দিয়েছেন।

৫. বেশি বেশি নফল ইবাদত ও জিকির করা
মহররম মাসে নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, তাসবিহ, তাহলিল, তাকবির, দোয়া ও ইস্তিগফার বৃদ্ধি করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আমাকে স্মরণ কর, আমিও তোমাদের স্মরণ করব।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৫২)
এ মাসে প্রতিদিন কিছু সময় কোরআন তিলাওয়াত ও আল্লাহর জিকিরে ব্যয় করলে ঈমান মজবুত হয় এবং অন্তর প্রশান্তি লাভ করে।

৬. দান-সদকা ও মানুষের উপকার করা
মহররম মাসে গরিব-দুঃখীদের সাহায্য করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান করা অত্যন্ত প্রশংসনীয় আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণই অগ্রিম পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১১০)
আর দান-সদকা মানুষের বিপদ দূর করে এবং আল্লাহর রহমত লাভের অন্যতম মাধ্যম।

৭. হারাম ও গুনাহের কাজ থেকে দূরে থাকা
হারাম মাসে গুনাহের ভয়াবহতা আরো বেশি। তাই এ মাসে পাপ কাজ, অন্যায়, জুলুম, গীবত, মিথ্যা, অশ্লীলতা ও সকল ধরনের অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা জরুরি। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুতরাং তোমরা এসব (সম্মানিত) মাসে নিজেদের প্রতি জুলুম কর না।’ (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩৬)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সব সময়ই গুনাহ নিষিদ্ধ; তবে হারাম মাসগুলোতে গুনাহের ভয়াবহতা আরো গুরুতর।


৮. বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করা তার উপর আমল করা
নতুন হিজরি বছরের শুরুতে কোরআনের সাথে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার অঙ্গীকার করা অত্যন্ত উত্তম আমল। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয় এই কোরআন এমন পথ প্রদর্শন করে যা সর্বাধিক সরল ও সঠিক।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৯)
মহররম মাসে প্রতিদিন নির্দিষ্ট পরিমাণ কোরআন তিলাওয়াত, অর্থ অধ্যয়ন এবং জীবনে তা বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করা একজন মুমিনের জন্য অত্যন্ত কল্যাণকর।

৯. আত্মীয়তার সম্পর্ক (সিলাতুর রাহিম) সুদৃঢ় করা
আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নেওয়া, সম্পর্কের অবনতি দূর করা এবং পারিবারিক বন্ধন দৃঢ় করা ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি তার রিজিক বৃদ্ধি ও হায়াতের বরকত কামনা করে, সে যেন আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫৯৮৬)
নতুন বছরের শুরুতে আত্মীয়তার সম্পর্ক পুনর্গঠন একটি সুন্দর ও বরকতময় উদ্যোগ হতে পারে।

১০. ইসলামের ইতিহাস ও আশুরার শিক্ষাগুলো অধ্যয়ন করা
মহররম মাস ইসলামের ইতিহাসের বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার স্মারক। বিশেষত আশুরার দিনে আল্লাহ তাআলা মুসা (আ.) ও তাঁর অনুসারীদেরকে ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজা রাখার কারণ সম্পর্কে বলেছেন, ‘এটি এমন এক মহান দিন, যেদিন আল্লাহ মুসা ও তাঁর সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউন ও তার সম্প্রদায়কে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৩৯৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১১৩০)
এ ছাড়াও মহররম মাসে সংঘটিত কারবালার ঘটনা থেকে ঈমান, সত্যের পক্ষে দৃঢ়তা, ত্যাগ ও ধৈর্যের শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।


মহররম মাস নতুন বছরের সূচনা হলেও একজন মুমিনের জন্য এটি শুধু ক্যালেন্ডারের পরিবর্তন নয়; বরং আত্মশুদ্ধি, তওবা, ইবাদত এবং আল্লাহর দিকে ফিরে আসার এক মহামূল্যবান সুযোগ। এ মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে জীবন দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে এবং প্রতিটি নতুন বছর আমাদেরকে আখিরাতের আরো নিকটবর্তী করছে।

অতএব, আসুন আমরা মহররম মাসকে গুনাহ, গাফেলতি ও কুসংস্কারে নষ্ট না করে তওবা, নফল রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির, দান-সদকা এবং নেক আমলের মাধ্যমে সার্থক করে তুলি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহররমের বরকতপূর্ণ দিনগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানোর তাওফিক দান করুন এবং আমাদের জীবনকে তাকওয়া ও নেক আমলে পরিপূর্ণ করে দিন। আমিন।

নকল তালাকনামা তৈরির ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি

মুফতি ওমর বিন নাছির
নকল তালাকনামা তৈরির ক্ষেত্রে সতর্কতা জরুরি
সংগৃহীত ছবি

বিবাহ ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও ধর্মীয় বন্ধন। আল্লাহ তাআলা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে ভালোবাসা, দয়া ও প্রশান্তির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কিন্তু কখনো কখনো বিভিন্ন প্রশাসনিক, আইনি বা পারিবারিক প্রয়োজনে কিছু মানুষ ‘কৃত্রিম’ বা ‘নকল’ তালাকনামা প্রস্তুত করার চিন্তা করেন। অনেকেই মনে করেন, যেহেতু প্রকৃতপক্ষে তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্য নেই, তাই এমন কাগজপত্র তৈরি করলেও কোনো সমস্যা হবে না। অথচ ইসলামী শরিয়তে তালাক একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়; এখানে অসাবধানতা, রসিকতা কিংবা বাহ্যিক অভিনয়ও অনেক সময় বাস্তব তালাকের কারণ হয়ে যেতে পারে। তাই কৃত্রিম তালাকনামা তৈরি করার আগে শরিয়তের বিধান জানা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় একটি কাগজে স্বাক্ষর করার মাধ্যমে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক চিরতরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

বিশেষ সতর্কবাণী
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহর বিধানসমূহকে উপহাসের বস্তু বানিও না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৩১)
এই আয়াত থেকে বোঝা যায় যে, বিবাহ ও তালাকের মতো শরিয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান নিয়ে খেলা করা বা তামাশা করা বৈধ নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি বিষয় এমন যে, এগুলোর বাস্তব কথাও বাস্তব এবং ঠাট্টা-তামাশার কথাও বাস্তব—বিবাহ, তালাক ও রুজু (স্ত্রীকে এক তালাকে রজয়ি দেয়ার পর ফিরিয়ে নেওয়া)।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২১৯৪, তিরমিজি, হাদিস : ১১৮৪)

এই হাদিস প্রমাণ করে যে তালাকের ক্ষেত্রে ‘আমি সত্যি চাইনি’—এমন অজুহাত সবসময় গ্রহণযোগ্য নয়।

নকল তালাকনামা কী?
নকল তালাকনামা বলতে এমন দলিলকে বোঝায়, যা প্রকৃত তালাক দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়; বরং কোনো প্রশাসনিক, আইনি বা অন্য কোনো পার্থিব সুবিধা অর্জনের জন্য প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু ইসলামী ফিকহের দৃষ্টিতে প্রশ্ন হলো—এমন দলিল লিখলে বা স্বাক্ষর করলে কি তালাক সংঘটিত হবে?

নকল তালাকনামা প্রস্তুত করলে কখন তালাক হবে না?
ফুকাহায়ে কেরামের বর্ণনা অনুযায়ী, যদি কোনো ব্যক্তি দুজন সাক্ষীকে উপস্থিত রেখে স্পষ্টভাবে বলে—‘আমি প্রকৃত তালাক দেওয়ার জন্য নয়; বরং একটি কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা প্রস্তুত করছি।’ তাহলে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তার এই বক্তব্য প্রমাণিত থাকবে এবং এ অবস্থায় তালাক কার্যকর হবে না। কারণ সাক্ষীরা পরবর্তীতে সাক্ষ্য দিতে পারবেন যে, তার উদ্দেশ্য প্রকৃত তালাক ছিল না; বরং শুধু একটি আনুষ্ঠানিক কাগজ প্রস্তুত করা ছিল। অন্যথায় সাক্ষী ছাড়া কৃত্রিম তালাকনামা তৈরি করলে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রয়েছে।

যদি কেউ কোনো সাক্ষী ছাড়া তালাকনামা লিখায়, অথবা নিজে পড়ে স্বাক্ষর করে এবং তাতে তালাকের শব্দ উল্লেখ থাকে, তাহলে ইসলামী ফিকহ অনুযায়ী তা বাস্তব তালাক হিসেবে গণ্য হতে পারে। বিশেষত যদি—
সে নিজেই দলিল প্রস্তুত করার নির্দেশ দেয়, অথবা দলিলটি পড়ে স্বাক্ষর করে, অথবা পরে স্বীকার করে যে দলিলটি তার নির্দেশে প্রস্তুত হয়েছে। তাহলে তালাকনামায় যত তালাক লেখা থাকবে, তত তালাকই সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে। ইমাম ইবন আবেদীন রহ. বলেন, ‘যদি কেউ লেখককে বলে, ‘লিখো যে আমার স্ত্রী তালাকপ্রাপ্তা’, তবে লেখক তা না লিখলেও এই বক্তব্য তালাকের স্বীকৃতি হিসেবে গণ্য হবে।’ (রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৬)

আরো বলা হয়েছে, ‘যে দলিল নিজের হাতে লেখা নয় এবং নিজে বলে দেওয়াও হয়নি, তা তালাক হিসেবে গণ্য হবে না; যতক্ষণ না ব্যক্তি তা নিজের বলে স্বীকার করে।’ (রাদ্দুল মুহতার, ৩/২৪৭)
‘আর যদি কেউ মিথ্যা ঘোষণা করার উদ্দেশ্যে বলে, ‘তোমাকে তালাক দেওয়া হলো’, তাহলে সাক্ষীরা তার প্রকৃত উদ্দেশ্যের সাক্ষ্য না দেওয়া পর্যন্ত আইনগতভাবে তালাক কার্যকর বলে বিবেচিত হবে।’ (আদ-দুররুল মুখতার, ৩/২৯৩)

‘যদি সে দাবি করে যে, ‘আমি শুধু ভয় দেখানোর জন্য এমন করেছি’, তবে পূর্বে সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠিত না হলে তার এ দাবি গ্রহণ করা হবে না।’ (আদ-দুররুল মুখতার, ৪/৪৬০)

এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
১. তালাক নিয়ে খেলাধুলা করা হারাম

তালাক শরিয়তের একটি গুরুতর বিধান। এটি নিয়ে অভিনয়, প্রতারণা বা অসতর্ক আচরণ করা বৈধ নয়।

২. মিথ্যা দলিল তৈরি করা গুনাহ
যদি কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়, তাহলে তা প্রতারণার অন্তর্ভুক্ত হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১০১

৩. বিশেষজ্ঞ আলেমের পরামর্শ ছাড়া এমন পদক্ষেপ নেওয়া বিপজ্জনক
অনেক সময় একটি শব্দ, একটি স্বাক্ষর বা একটি বাক্যই বৈবাহিক সম্পর্কের ওপর স্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে। তাই অভিজ্ঞ মুফতি বা নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ ছাড়া এ ধরনের কাজ করা উচিত নয়।

অতএব, কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা প্রস্তুত করার বিষয়টি সাধারণ মানুষের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সংবেদনশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ। ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে তালাক শুধু একটি কাগজের বিষয় নয়; বরং এটি একটি পরিবার, একটি সম্পর্ক এবং বহু অধিকার-দায়িত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত গুরুতর বিধান। তাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে নকল তালাকনামা প্রস্তুত করতে গিয়ে বাস্তব তালাক সংঘটিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তাই কেউ যদি বিশেষ কোনো কারণে কৃত্রিম বা নকল তালাকনামা প্রস্তুত করতেই বাধ্য হয়, তবে অবশ্যই শরিয়তের বিধান অনুযায়ী দুজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে নিজের উদ্দেশ্য স্পষ্ট করে তা করবে। আর ইতোমধ্যে কোনো তালাকনামা প্রস্তুত হয়ে থাকলে, তালাক সংঘটিত হয়েছে কি না—সে বিষয়ে অভিজ্ঞ মুফতি বা দারুল ইফতার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিস্তারিত মাসআলা জেনে নেওয়া আবশ্যক। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে বিবাহ ও তালাকের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সচেতনতা, তাকওয়া এবং শরিয়তের সীমারেখা মেনে চলার তাওফিক দান করুন। আমিন।