পরিবেশসংক্রান্ত বিচার ত্বরান্বিত করার জন্য পরিবেশ আদালত আইন, ২০১০ নামের একটি আইন প্রণয়ন করা হয়। এই আইন অনুযায়ী পরিবেশ আইন বলতে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার কর্তৃক সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা নির্ধারিত অন্য কোনো আইন বা এই সব আইনের অধীনে প্রণীত বিধিমালা বোঝাবে। পরিবেশ আদালত বলতে এই আইনের অধীনে গঠিত পরিবেশ আদালতকে বোঝাবে।
এই আইনের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা প্রতিটি জেলায় এক বা একাধিক পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। প্রতিটি পরিবেশ আদালত জেলা সদরে উপস্থিত থাকবে। কোনো জেলায় একাধিক পরিবেশ আদালত থাকলে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এলাকা নির্ধারণ করে দেবে। এই আইনের বর্ণিত সব অপরাধের জন্য মহাপরিচালক বা তাঁর কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে সরাসরি মামলা করতে পারবেন। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অপরাধ সংঘটনে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি বা এর অংশবিশেষ, যানবাহন বা এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পণ্যসামগ্রী বা বস্তু বাজেয়াপ্ত বা বিলিবন্দোবস্ত করার আদেশ দিতে পারেন। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের তলব অনুসারে উপস্থিত কোনো মামলার সাক্ষীকে তাঁর সাক্ষ্যগ্রহণ ব্যতিরেকে ফেরত বা ছাড় দেওয়া হবে না। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগ গঠনের তারিখ থেকে ১৮০ দিনের মধ্যে মামলার বিচারকাজ সমাপ্ত করবে। পরিবেশ আইনে অপরাধসংক্রান্ত বিষয় পরিদর্শন করবেন একজন পরিদর্শক। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড বা কোনো কিছু বাজেয়াপ্ত বা বিনষ্ট করার আদেশ প্রদান করতে পারেন।
সম্প্রতি বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স এবং পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন একটি ওয়েবিনারের আয়োজন করে। ওয়েবিনারে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বিদ্যমান পরিবেশ আদালত আইন সংশোধন করার ওপর জোর দেন। তাঁদের মতে, পরিবেশ আইন প্রয়োগে একটি পরিবেশ ফোর্স ইউনিট গঠন প্রয়োজন। পরিবেশদূষণকারী প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স স্থগিত বা বাতিলের ব্যবস্থা রাখা, সরকারি প্রকল্প ও প্রতিষ্ঠানকে ক্ষতিপূরণ এবং জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন এই আইনের সংশোধন। তাঁদের মতে, পরিবেশ আদালতে সরাসরি মামলা করার অধিকার না থাকাটা নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।
পরিবেশ আদালত আইনের এসব অবস্থানের কারণেই মামলা হচ্ছে কম। একটি তথ্য মতে, ঢাকার মূল পরিবেশ আদালতে বর্তমানে বিচারাধীন মোট মামলার সংখ্যা আট হাজার ২৩১। এর মধ্যে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের অধীনে মামলা হয়েছে মাত্র ১৩২টি। এর অর্থ ৯৮ শতাংশ মামলাই অন্য মামলা। গত ২৩ বছরে পরিবেশ আদালত প্রতিষ্ঠার পর মামলা হয়েছে মাত্র ৫৯২টি। এর মধ্যে নিষ্পত্তিকৃত মামলার সংখ্যা ৪৭৬। এই তথ্য দেখলে মনে হয়, বাংলাদেশে তেমন পরিবেশদূষণই হয় না। মামলা আর হবে কি। কিন্তু বাস্তবতা আরো ভয়ংকর। বায়ুদূষণ বা শব্দদূষণের পাশাপাশি নদী বা জলাশয় দূষণের অবস্থা ভয়াবহ।
বাংলাদেশে বায়ুদূষণে প্রতিবছরে মারা যায় ৮০ হাজার মানুষ। এতে বাড়ছে বিষণ্নতা। বায়ুদূষণের কারণে জিডিপির ৪ শতাংশেরও বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে নভেম্বর থেকে মার্চ মাস সময় পর্যন্ত দূষণের মাত্রা এত বেশি থাকে, যা সারা বছরের প্রায় ৬৫ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের আরো একটি তথ্য মতে, বাংলাদেশে ২০১৯ সালে বায়ুদূষণ জনিত সমস্যায় ৭৮ থেকে ৮৮ হাজার মানুষ মারা গেছে।
স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার কোয়ালিট ফান্ডিং ২০২৩-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বায়ুর গুণগত মানোন্নয়নের তহবিলপ্রাপ্তিতে তৃতীয় ছিল বাংলাদেশ। প্রতিবেদনে আরো জানানো হয়, ২০১৫ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বায়ুর মানোন্নয়নে বাংলাদেশ ২.৪ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তা পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ বায়ুদূষণ মোকাবেলায় তেমন একটি অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
বাংলাদেশে প্লাস্টিক দ্রব্যাদির বাজার এক বিলিয়ন ডলারের। প্লাস্টিক উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় চার হাজার। ঢাকায় প্রতিদিন এক কোটি ২০ লাখ পলিব্যাগের বর্জ্য ফেলা হয়। প্লাস্টিকের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছেই। বাংলাদেশে ২০০৫ সালে এর বার্ষিক মাথাপিছু ব্যবহার ছিল তিন কেজি। এটি বেড়ে ২০২০ সালে হয়েছে ৯ কেজি। অর্থাৎ ১৫ বছরে বার্ষিক মাথাপিছু প্লাস্টিকের ব্যবহার বেড়েছে তিন গুণ। বাংলাদেশে প্রতিদিন তিন হাজার টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদিত হয়। বিশ্বব্যাংকের তথ্য মতে, ঢাকায় প্রতিদিন ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়। ঢাকার মোট প্লাস্টিক বর্জ্যের ৩৭.২ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে উৎপাদিত প্লাস্টিক বর্জ্যের ৬০ শতাংশ মেশে রাস্তাঘাট আর নদীতে। মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, আমাদের দেশে প্রতিবছর আট লাখ ২১ হাজার ২৫০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য হয়। এর মাত্র ৪০ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ দুই লাখ ২৮ হাজার টন পুনর্ব্যবহার করা হয়, আর বাকি অংশ পরিবেশেই থেকে যায়।
পলিথিনের স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি অনেক। চোখ জ্বালা করা, শ্বাসকষ্ট, লিভারের সমস্যা, ক্যান্সার, চর্মরোগ থেকে শুরু করে অনেক ক্ষতিকর রোগের জন্য দায়ী। আমরা বাজারে গেলে পলিথিনে করেই সবকিছু নিয়ে আসি। এমনকি বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্যও। অথচ পলিথিনে মোড়ানো এসব খাবারই খাদ্যে বিষক্রিয়ার জন্য দায়ী। মাছ-মাংস পলিথিন ছাড়া আমরা রাখি না। কিন্তু পলিথিনে মাছ-মাংস প্যাকিং করলে অবায়বীয় ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হয়। প্লাস্টিকের বর্জ্য মাইক্রো ও ন্যানো কণারূপে মানুষের শরীরে ঢুকে হরমোনজনিত নানা সমস্যা সৃষ্টি করছে। এটি মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের নানা রোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুক্রাণু ও ডিম্বাণু উৎপাদন ব্যাহত করছে। ক্যান্সারসহ ত্বকের নানা রকম রোগ সৃষ্টি করছে।
জীবজগতের ৮০ শতাংশের বসবাস বনে। প্রায় ৬০ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদের আবাসস্থল এই বন। এ ছাড়া উভচর প্রজাতির ৮০ শতাংশ, পাখি প্রজাতির ৭৫ শতাংশ এবং স্তন্যপায়ী প্রাণী প্রজাতির ৬৮ শতাংশের বসবাস বনে। কিন্তু ধীরে ধীরে উজাড় হয়ে যাচ্ছে এসব বন। এফএও-এর মতে, বিশ্বব্যাপী ২০০০ থেকে ২০১৫ সাল নাগাদ প্রায় ১.৪ শতাংশ বন হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশে বেশির ভাগ বন ধ্বংস হচ্ছে দখলের মাধ্যমে। বন বিভাগের তথ্য মতে, সারা দেশে দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৫৮ একর বন দখলে চলে গেছে। ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত গড়ে ২৫ হাজার একর বনভূমি দখল হয়েছে। এসব বন ধ্বংসের কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বন্যপ্রাণী। এ ব্যাপারে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর নেচার কনজারভেশনের ২০১৫ সালের প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ৩১। এক হাজার ৬০০ প্রাণী প্রজাতির মধ্যে ৩৯০টি হুমকির মধ্যে রয়েছে। আর ৫০টির বেশি প্রজাতি ঝুঁকিতে রয়েছে। আইইউসিএনের ২০০০ ও ২০১৫ সালের প্রতিবেদন তুলনা করলে দেখা যাবে এই বিলুপ্তির হার অত্যধিক। ২০০০ সালে বিলুপ্ত প্রাণী প্রজাতির সংখ্যা ছিল ১৩। অর্থাৎ ১৫ বছরে ১৮টি প্রাণী প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে, যা ভয়াবহ বিলুপ্তির হারকে নির্দেশ করছে।
ভয়াবহ বায়ুদূষণের তিনটি প্রধান কারণের একটি ইটভাটা। বাংলাদেশে যত্রতত্রই ইটভাটা রয়েছে। একটি তথ্য মতে, এর সংখ্যা প্রায় আট হাজার। আর এর অর্ধেকই অবৈধ। অবৈধ ইটভাটা বন্ধে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ উচ্চ আদালতে বেশ কয়েকটি রিট করেছে। এতে কিছুটা সফলতা এলেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হয়নি। ইটভাটার কারণে শুধু বায়ুদূষণই হচ্ছে না। ইট তৈরির জন্য মাটির প্রয়োজন পড়ে। ফসলি জমি থেকে মাটি কেটে ইট তৈরি করা হচ্ছে। ফসলি ক্ষেতের মাটির ওপরের অংশেই মূলত সার থাকে। কৃষকরা না বুঝে মুনাফার লোভে মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। এতে ফসলি জমির ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে হাজারেরও বেশি ইটভাটা রয়েছে, যেখানে সনাতন পদ্ধতিতে কাঠ পুড়িয়ে ইট তৈরি করা হয়। এতে অসংখ্য কাঠের প্রয়োজন পড়ে, যা গাছ কেটে তৈরি করা হয়। ইটভাটার জন্য এভাবে অসংখ্য গাছ কাটার কারণে পরিবেশের ওপর চাপ বেড়ে যাচ্ছে।
যে হারে দূষণ বাড়ছে, ক্ষয়ক্ষতি বাড়ছে, মৃত্যু বাড়ছে; সে হারে পরিবেশ মামলা নেই বললেই চলে। এই অবস্থায় বিদ্যমান পরিবেশ আইন সংশোধন জরুরি। বিশেষ করে পরিবেশ মামলা করার অধিকার অবশ্যই প্রত্যেক নাগরিককে দেওয়া উচিত। কেননা পরিবেশ অধিকারও এখন এক ধরনের মানবাধিকার।
লেখক : পরিবেশবিষয়ক লেখক




অন্যদিকে প্রায় সমসাময়িক সময়ে অর্থনৈতিক যাত্রা শুরু করা এবং সস্তা শ্রমের বিশাল জনমিতিক লভ্যাংশ (পপুলেশন ডিভিডেন্ড) থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ আজও প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক উল্লম্ফন এবং বাংলাদেশের এই দীর্ঘস্থায়ী অনগ্রসরতা দুই দেশের নীতিমালার পার্থক্যকেই স্পষ্ট করে।
এ বছর এবং/অথবা পরের বছর চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে।’ ম্যাকগুয়ার আরো বলেন, ‘বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরে রেকর্ড পরিমাণে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হওয়ার কারণে পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রি পর্যন্ত উচ্চ তাপমাত্রা সম্ভব।’ ‘এল নিনো’ হলো প্রশান্ত মহাসাগরের একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়ার ধরন, যা বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বাড়ায় এবং সম্ভবত এই গ্রীষ্মে এটি আবির্ভূত হবে। প্রকৃতপক্ষে এই সপ্তাহে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের কিছু অংশে তাপমাত্রা আটত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছেছে। ইংল্যান্ডের পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এবং ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের দক্ষিণ-পশ্চিমের কিছু অংশের জন্য অতি তাপপ্রবাহের অ্যাম্বার সতর্ক সংকেত জারি করা হয়েছে।