যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান গত রবিবার গভীর রাতে ঘোষণা করেছে। এই ঘোষণার পরদিন গত সোমবার সকালে ইসরায়েলে ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা। পাকিস্তান ও ইরান উভয় দেশ জানিয়েছে, এই চুক্তির মধ্যে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে বা যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুতা অবসানের বিষয়টি রয়েছে। তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এ শর্তটি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছেন, ইসরায়েল এই চুক্তির শর্ত মানতে বাধ্য নয়। এ বক্তব্যের পরপরই সোমবার ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননজুড়ে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ওয়াইনেট গত সোমবার এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো এই চুক্তির বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বলেছেন, ইসরায়েল এই চুক্তি মানতে বাধ্য নয় এবং লেবানন নিয়ে ইরানের কোনো শর্ত তাঁরা মানবেন না। এ বক্তব্যের সুর ধরে গত সোমবার ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাত্জ বলেন, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী কোনো সময়সীমা ছাড়াই লেবানন, সিরিয়া ও গাজার নিরাপত্তা অঞ্চলগুলোতে অবস্থান করবে।
চুক্তিটি নিয়ে নিজের ক্ষোভ প্রকাশ করে এক্স অ্যাকাউন্টে একটি পোস্ট করেছেন চরম কট্টরপন্থী ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ। তিনি লিখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে এ চুক্তি ইসরায়েল এবং পুরো মুক্ত বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর।’ তিনি আরো বলেন, ইসরায়েলকে এখন একাই ইরানের বিরুদ্ধে তাদের অভিযান চালিয়ে যেতে হবে। এদিকে ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন গভির এক্সে লিখেছেন, ‘ট্রাম্পের চুক্তি আমাদের ওপর বাধ্যবাধকতা তৈরি করে না। ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অধীন রাষ্ট্র নয়, আমরা একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।’
ইসরায়েলের মন্ত্রীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং নিজ দেশের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সরাসরি সমালোচনা এড়িয়ে গেলেও বিরোধী দল ও ডানপন্থী শিবিরের নেতাদের মধ্যে তীব্র ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। এমনকি নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকরাও ট্রাম্পের ওপর চরম ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। ইসরায়েলের ‘চ্যানেল ১৪ নিউজ’-এর সাংবাদিক ইনন মাগাল, যাঁকে ইসরায়েলে দেশটির প্রধানমন্ত্রীর মুখপাত্র হিসেবে গণ্য করা হয়, এক্স অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ইরান ও লেবাননের যুদ্ধে ইসরায়েলকে একা ফেলে দেওয়া হয়েছে। তিনি ট্রাম্পকে পরাজিত ব্যক্তি এবং মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ঘৃণ্য ব্যক্তি বলে আখ্যা দেন। ইনন মাগাল মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারকে ইঙ্গিত করে একটি সাধারণ ইহুদিবিদ্বেষী গালি ব্যবহার করে ‘লিটল জিউস’ (ছোট ইহুদি) বলে উল্লেখ করেন। একই টেলিভিশন চ্যানেলের আরেক সাংবাদিক শিমন রিকলিন গতকাল বলেন, ‘এ মুহূর্তে ইসরায়েলের সবচেয়ে বেশি যা প্রয়োজন, তা হলো নিজের সার্বভৌমত্ব।’ তিনি বলেন, ইসরায়েলের যে নিজস্ব স্বার্থ আছে, তা এই ‘বিশ্বাসঘাতক আমেরিকা’কে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই সার্বভৌমত্ব প্রয়োজন।
ট্রাম্প যা বললেন : প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, লেবাননে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে ‘আরো দায়িত্বশীল হতে হবে’ এবং ইসরায়েলের আগ্রাসন ও হিজবুল্লাহকে সামলানোর পদ্ধতিতে তিনি ‘খুশি নন’। এদিকে ইরান সতর্ক করে বলেছে, এখন থেকে লেবাননের ওপর যেকোনো ইসরায়েলি হামলা অথবা এর ভূখণ্ডে অব্যাহত দখলদারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত অন্তর্বর্তী চুক্তির লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে। যুদ্ধের শুরুতে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় অসংখ্য ইরানি কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তিনি মনে করেন ইরানের ‘এখন যৌক্তিক নেতৃত্ব রয়েছে’। তিনি বলেছেন, যে ইরানি নেতারা ‘সম্পূর্ণ অযৌক্তিক’ ছিলেন, তাঁরা ‘এখন আর নেই’।
ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত জি৭ সম্মেলনের ফাঁকে ইরানের পরিস্থিতি নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের বর্তমান নেতারা ‘চরমপন্থী নন’ এবং তাঁরা ‘তাঁদের দেশকে সাহায্য করতে চান’। তিনি আশা প্রকাশ করেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাঁদের একটি ‘ভালো সম্পর্ক’ থাকবে। চূড়ান্ত চুক্তি হয়ে গেলে ইরানের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ‘ভালো’ হবে, কিন্তু ইরানের নেতাদের প্রথমে ‘নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে’।
কাতারের আশাবাদ : কাতার বলেছে, ইরান-মার্কিন চুক্তির ফলে বিশ্বে এলএনজি সরবরাহ শুরু হবে বলে আশা করা যায়। কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেছেন, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সমঝোতা স্মারকের আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের জন্য শুক্রবার জেনেভায় কাতারের প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন।
মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার : ইরানের সঙ্গে প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর অবরোধ প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর এ ঘোষণার পর অন্তত তিনটি ইরানি তেলবাহী ট্যাংকার এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যবাহী দুটি কার্গো জাহাজ সফলভাবে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। মঙ্গলবার (১৬ জুন) ইরানের আধাসরকারি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার সন্ধ্যায় জাহাজগুলো যাত্রা শুরু করেছে। প্রেস টিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সংশ্লিষ্ট সামুদ্রিক সূত্রগুলো বলছে, জাহাজগুলো এখন কোনো বাধা ছাড়াই আন্তর্জাতিক জলসীমা দিয়ে চলাচল করছে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে থাকবেন গালিবাফ : ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ সমাপ্তকারী চুক্তির স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে সুইজারল্যান্ডে যোগ দেবেন বলে মঙ্গলবার জানিয়েছেন ইরানের এক উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া তথ্য মতে, মজিদ তাখত-রাভাঞ্চি বলেছেন, ‘চুক্তি স্বাক্ষরের স্থান হবে সুইজারল্যান্ড, তবে সঠিক অবস্থান এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। স্বাক্ষরের পরপরই পরবর্তী দফার আলোচনা শুরু হবে।’ সূত্র : মেহের নিউজ, এএফপি, আল জাজিরা, মিডল ইস্ট আই