• ই-পেপার

মুমিন অনর্থক কাজে আগ্রহী হয় না

কোরআন থেকে শিক্ষা

পর্ব-১১৫৬

কোরআন থেকে শিক্ষা

আয়াতের অর্থ

আমি তাদেরই সুকৃতিগুলো গ্রহণ করে থাকি এবং মন্দ কাজগুলো ক্ষমা করি, তারা জান্নাতবাসীদের অন্তর্ভুক্ত। তাদেরকে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা সত্য। আর এমন এক লোক আছে, যে তার মা-বাবাকে বলে, আফসোস! তোমাদের জন্য! তোমরা কি আমাকে এই ভয় দেখাতে চাও যে আমি পুনরুত্থিত হবো যদিও আমার পূর্বে বহু পুরুষ গত হয়েছে? তখন তার মা-বাবা আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করে করে বলে, দুর্ভোগ তোমার জন্য! তুমি বিশ্বাস স্থাপন কোরো, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অবশ্যই সত্য।... (সুরা : আহকাফ, আয়াত : ১৬-১৭)

আয়াতদ্বয়ে আবু বকর (রা.)-এর মর্যাদা ঘোষণা করা হয়েছে।

শিক্ষা ও বিধান

১. তাফসিরবিদরা বলেন, (১৫ নম্বর) আয়াতটি আবু বকর (রা.)-এর ব্যাপারে অবতীর্ণ হয়েছে। তবে এর শিক্ষা সবার জন্য প্রযোজ্য।

২. দুনিয়া ও আখিরাতে আল্লাহ পুরস্কার ও শাস্তির যত অঙ্গীকার করেছেন তার সবই সত্য। সবই তিনি বাস্তবায়ন করবেন।

৩. আয়াত দ্বারা মা-বাবার আনুগত্যের ফজিলত ও পুরস্কার প্রমাণিত হয়।

৪. দ্বিন ও ইসলামের ক্ষেত্রে মা-বাবার আনুগত্য করা আবশ্যক। এ ক্ষেত্রে তাদের অবাধ্য হওয়ার পরিণতি ভয়াবহ।

৫. উম্মত এই বিষয়ে একমত যে নবীদের পর সর্বোত্তম মানুষ আবু বকর (রা.)। তাঁর মর্যাদা একাধিক আয়াত ও অসংখ্য হাদিস দ্বারা প্রমাণিত।

(বুরহানুল কুরআন : ৩/৩৬৩)

 

সমাজে প্রচলিত কিছু সূক্ষ্ম কুফর-শিরক

মুফতি দিদার হুসাইন
সমাজে প্রচলিত কিছু সূক্ষ্ম কুফর-শিরক

অনেকেই মনে করেন, শিরক মানেই শুধু মূর্তি পূজা করা। কিন্তু পবিত্র কোরআন-হাদিসে এমন বহু বিষয়কে শিরক বলা হয়েছে, যা মূর্তি পূজার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়।

এখানে কিছু উদাহরণ দেয়া হলো

আল্লাহ ছাড়া অন্যের ওপর ভরসা করা : পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, আর মুমিনরা যেন একমাত্র আল্লাহর ওপরই ভরসা করে। (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ১২২)

যখন কেউ মনে করে যে কোনো ব্যক্তি, পীর, নেতা বা শক্তি আল্লাহর ইচ্ছার বাইরে তার উপকার বা ক্ষতি করতে পারে, তখন তা শিরকের দিকে নিয়ে যায়।

আল্লাহ ছাড়া অন্যের কাছে দোয়া করা : পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, আর আল্লাহকে বাদ দিয়ে এমন কাউকে ডেকো না, যে তোমার উপকারও করতে পারে না, অপকারও করতে পারে না। (সুরা : ইউনুস, আয়াত : ১০৬)

এ আয়াতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ডাকতে নিষেধ করা হয়েছে। দোয়া একটি ইবাদত। তাই বিপদ-আপদ দূর করার জন্য মৃত ব্যক্তি, কবর বা অলিদের কাছে সাহায্য চাওয়া কোরআনের দৃষ্টিতে বৈধ নয়; বরং দোয়া একমাত্র মহান রবের কাছেই করতে হবে।

অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, বলুন (হে নবী), আমি তো কেবল আমার প্রতিপালককেই ডাকি এবং তাঁর সঙ্গে কাউকেই শরিক করি না।

(সুরা : জিন, আয়াত : ২০)

এই আয়াতে তাওহিদের মূল শিক্ষা তুলে ধরা হয়েছে, আল্লাহকে একমাত্র আহবান করা এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক না করা।

দুনিয়াবি স্বার্থে আল্লাহর হুকুম অমান্য

করা : মহান আল্লাহ বলেন, মানুষের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহ ছাড়া অন্যকে আল্লাহর

সমকক্ষরূপে গ্রহণ করে এবং তাদেরকে আল্লাহকে ভালোবাসার মতো ভালোবাসে।

(সুরা : আল-বাকারাহ, আয়াত : ১৬৫)

এই আয়াত দ্বারা বোঝা যায়, কোনো ব্যক্তি, মতবাদ বা দলকে অনুসরণ করতে গিয়ে কিংবা ভালোবাসতে গিয়ে যদি আল্লাহর আদেশকে উপেক্ষা করা হয়, বুঝে নিতে হবে, নিজের অজান্তেই আল্লাহর ভালোবাসা ও উপাসনায় অন্য কাউকে শরিক করে ফেলেছে। 

আল্লাহর আইনকে অস্বীকার করে অন্যকে চূড়ান্ত বিধানদাতা মনে করা : এই বিশ্বাসও একটি মানুষের ঈমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, কখনো কখনো ধ্বংস করে দেয়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে তাদের পণ্ডিত ও সন্ন্যাসীদের রব বানিয়ে নিয়েছে। (সুরা : তাওবা, আয়াত : ৩১)

মুফাসসিরিনে কেরাম এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেছেন, তারা তাদের আলেমদের সিজদা করত না; বরং হারামকে হালাল এবং হালালকে হারাম বানানোর ক্ষেত্রে অন্ধ আনুগত্য করত।

রিয়া তথা লোক-দেখানো ইবাদত : ইবাদতের উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি না হয়ে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ হলে তাতে শিরকের অনুপ্রবেশ ঘটে। আল্লাহ বলেন, অতএব দুর্ভোগ সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য, যারা তাদের সালাত সম্পর্কে উদাসীন; যারা লোক-দেখানোর জন্য কাজ করে। (সুরা : মাউন, আয়াত: ৪-৬)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, আমি কি তোমাদের এমন বস্তু সম্পর্কে সংবাদ দেব, যা তোমাদের জন্য দাজ্জালের চেয়েও অধিক ভয়ংকর। (বর্ণনাকারী বলেন) আমরা বললাম, হ্যাঁ, অবশ্যই। তিনি (সা.) বললেন, গোপন শিরক। যেমনকোনো ব্যক্তি নামাজ পড়ছিল, অতঃপর কেউ তাকে দেখছে বলে সে নামাজকে খুব সুন্দর করে পড়তে শুরু করল। (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৪২০৪)

আল্লাহ ছাড়া গায়েবের জ্ঞান অন্য কারো আছে বলে বিশ্বাস করা : আমাদের সমাজে কেউ কেউ মনে করে যে পীর, জ্যোতিষরা ভবিষ্যতের কথা জানেন, এটা ঈমানবিধ্বংসী বিশ্বাস। এ ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, গায়েবের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে। তিনি ছাড়া কেউ তা জানে না। (সুরা : আল-আনআম, আয়াত : ৫৯)

আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা

করা : রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমরা কবরের ওপর বোসো না এবং কবরের দিকে (মুখ করে) সালাত আদায় কোরো না।

(মুসলিম, হাদিস : ৯৭২)

অন্য হাদিসে এসেছে, আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুল (সা.) যে রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেননি, সে রোগশয্যায় থেকে বলেছেন, ইহুদি ও নাসারাদের প্রতি আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। তারা তাদের নবীদের কবরগুলোকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছে।

(বুখারি, হাদিস : ৪৪৪১)

কোরআন ও হাদিসের আলোকে দেখা যায়, মানুষের ইবাদত মনে করা অনেক কাজ ও বিশ্বাস মানুষকে কুফর ও শিরকের দিকে নিয়ে যায়। তাই একজন মুসলিমের কর্তব্য হলো তাওহিদের সঠিক ধারণা অর্জন করা, নিজের বিশ্বাস ও আমলকে কোরআন-সুন্নাহর আলোকে যাচাই করা এবং সব ধরনের শিরক থেকে বেঁচে থাকা।

শিশুকে স্তন্যদানে ইসলামের নির্দেশনা

মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াহইয়া
শিশুকে স্তন্যদানে ইসলামের নির্দেশনা

আল্লাহ মায়ের দুধের ওপর সন্তানের অধিকার দিয়েছেন। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতেও শিশুর সুষ্ঠু বিকাশ, শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পূর্ণতা লাভে মায়ের দুধ অপরিহার্য। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো বর্তমান যুগে কোনো কোনো মা তার সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে চান না, খাওয়ালেও খুব কম খাওয়ান। তাঁরা তাঁদের শিশুকে শুধু বাজারের গুঁড়া দুধ খাইয়ে লালন করে থাকেন। অথচ এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে সন্তানের জন্য প্রদত্ত খাবার। তাই মায়ের শারীরিক অসুস্থতা কিংবা বিশেষ কোনো অপারগতা না থাকলে সন্তানকে বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত করার সুযোগ নেই। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, মায়েরা নিজেদের বাচ্চাদেরকে পূর্ণ দুই বছর স্তন্যদান করবে, যদি দুধ খাওয়ার পূর্ণ মেয়াদ সমাপ্ত করতে চায়।

(সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৩৩)

তাফসিরবিদরা বলেন, আয়াত থেকে বোঝা যায় যে সন্তানকে দুধ পান করানো ওয়াজিব এবং বিশেষ অপারগতা ছাড়া স্তন্যদান থেকে বিরত থাকার অবকাশ নেই।

(জামিউ আহকামিসসিগার : ১/১২৩)

অন্যদিকে দেখা যায়, অনেক মা সন্তানকে তিন-চার বছরও দুধ খাওয়ান। আবার অনেকে আড়াই বছর খাওয়ানো যায় মনে করে এই মেয়াদ পূর্ণ করেন। এটা ভুল। সন্তান অনূর্ধ্ব দুই বছর মায়ের বুকের দুধ খেতে পারবে। দুই বছরের বেশি বয়সী সন্তানকে দুধ পান করানো নাজায়েজ। দুই বছর দুধ পান করানোর বিষয়টি সুরা বাকারার ২৩৩ নম্বর আয়াতে রয়েছে। এ ছাড়া আবদুল্লাহ বিন আব্বাস (রা.) বলেছেন, মায়ের দুধ পানের সময় দুই বছরই। (সুনানে দারাকুতনি : ৪/১৭৪)

অনেকে মনে করেন, দুই বছরের বেশি দুধ পান করানো যায় নাএ কথা ঠিক, তবে শিশুর স্বাস্থ্যহানির আশঙ্কা থাকলে কিংবা অন্য খাবারে অভ্যস্ত না হলে আড়াই বছর বুকের দুধ খাওয়ানোর সুযোগ আছে এমন ধারণাও ভুল। শিশুকে দুই বছরের বেশি বুকের দুধ খাওয়ানোর কোনো সুযোগ নেই, শিশু অন্য খাবারে অভ্যস্ত না হলেও।

যে ছেলে-মেয়ে এক মায়ের দুধ পান করেছে তারা পরস্পর দুধ ভাই, দুধ বোন। এদের মধ্যে বিয়েশাদি হারাম। অথচ এ মাসআলাটির প্রতি অনেকেই ভ্রুক্ষেপ করে না। গ্রামগঞ্জে মহিলারা শখ করেই একে অন্যের সন্তানকে দুধ খাইয়ে থাকেন। আবার অনেকে প্রয়োজনবশতও খাওয়ান। যেমনমায়ের অসুখ হলে বাচ্চাকে পার্শ্ববর্তী অন্য মা দুধ পান করান, কিন্তু এ বিষয়টি এখানেই শেষ হয়ে যায়। যিনি দুধ পান করালেন তিনিও এটা স্মরণ রাখেন না, অন্যদেরও জানানো হয় না। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-পড়শিদেরও বিষয়টি জানা থাকে না। ফলে অনেক সময় দেখা যায়, কোনো কোনো দম্পতির বিয়ে হয়ে সন্তান-সন্ততি হয়ে যাওয়ার পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দুধ ভাই-বোনের সম্পর্কের খোঁজ পাওয়া যায়। কত ভয়াবহ ব্যাপার! এ জন্য প্রথমত দুধ পান করানোর বিষয়ে সতর্ক হওয়া জরুরি। শিশুর দুধের অভাব বা প্রয়োজন ছাড়া শুধু শখ করে কিংবা হাসিঠাট্টা করে অন্য মায়ের দুধ পান করানো থেকে বিরত থাকা জরুরি।

আর যদি কোনো শিশুকে দুধ পান করানো হয়, তবে এ দুধ-সম্পর্কের কথা আত্মীয়-স্বজনকে জানানো এবং এ সম্পর্কের সংরক্ষণ করা জরুরি, বরং ডায়েরিতে নোট করে রাখা উচিত। (তাফসিরুল মানার : ৪/৪৭০; ফিকহুস সুন্নাহ : ২/৪০৩)

অনেকে মনে করেন, শিশু তার দাদি-নানির দুধ পান করতে পারবে না। যদি দুধ পান করে, তবে মা-বাবার বৈবাহিক সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। শিশু তার দাদি-নানির দুধ পান করলে মা-বাবার সম্পর্ক নষ্ট হবে না। (আহসানুল ফাতাওয়া : ৫/১২৫)

কোনো কোনো এলাকায় দেখা যায়, খালাতো ভাই-বোন বা চাচাতো ভাই-বোন, যাদের মধ্যে পর্দা ফরজ, তারা বড় হলে পর্দা করতে পারবে নাএ আশঙ্কায় ছোট থাকতেই খালা বা চাচির দুধ খাইয়ে দেওয়া হয়, যেন তারা বড় হয়ে পর্দা লঙ্ঘনের গুনাহে পতিত না হয়। যৌথ পরিবারে এমনটি বেশি ঘটে থাকে। অথচ শরিয়তে দুধ-সম্পর্কের বিধান এ উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি। দুধ-সম্পর্কের ভিত্তি হবে সন্তানের দুধের প্রয়োজনকে কেন্দ্র করে। পর্দার হুকুম আদায় করতে পারবে না এ আশঙ্কায় দুধ পান করানো সমীচীন নয়। (ফাতাওয়ায়ে শামি : ৬/৩৬৯)

দুধ-সম্পর্কের কারণে দুধ ভাই-বোনের দেখা-সাক্ষাৎ বৈধ হয়ে যায় এবং তাদের মধ্যে বিয়েশাদি হারাম হয়ে যায়। কিন্তু তারা সব ক্ষেত্রে রক্ত সম্পর্কীয় আসল মাহরামের মতো নয়। আজকাল দুধ ভাই-বোনের চালচলন আপন ভাই-বোনের মতোই দেখা যায়, যা মোটেই কাম্য নয়। একইভাবে তাদের একাকী সফরসম দূরত্বে  যাওয়াও ঠিক নয়। (সংক্ষেপিত)

বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে কিছু পরামর্শ

শায়খ উমায়ের কোব্বাদী
বউ-শাশুড়ির সম্পর্ক নিয়ে কিছু পরামর্শ

আমরা বউমা ও শাশুড়ির প্রতি বিশেষ কিছু পরামর্শ তুলে ধরছি। প্রথমে আসা যাক, শাশুড়ির প্রতি বিশেষ পরামর্শ সম্পর্কে। শাশুড়ির প্রতি বিশেষ পরামর্শ একটাইঅন্তর প্রশস্ত করতে হবে। আর অন্তর প্রশস্ত করতে হলে তিনটি কাজ করতে হবে।

১. বউমার ভুলচুক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে হবে

দুঃখজনক হলেও সত্য যে আমাদের সমাজে অনেক শাশুড়ি আছেন, পুত্রবধূকে আপন করে নিতে পারেন না। তাকে বাড়ির সেবিকা বা চাকরানি মনে করেন। শাশুড়ি নিজের মেয়েকে এক চোখে দেখেন, পুত্রবধূকে ভিন্ন চোখে দেখেন। এ জন্য একটি ব্যাপার স্পষ্ট থাকা দরকার যে পুত্রবধূর ওপর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ফরজ করা হয়নি। সুতরাং এ জন্য তাকে শারীরিক কিংবা মানসিক নির্যাতন করতে পারবেন না; বরং আপনার উচিত অন্তর প্রশস্ত করা। তার ভুলচুক ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখা। টুকটাক বিষয় নিয়ে বউমার সঙ্গে মতবিরোধ হতেই পারে। সে জন্য খামোখা ঝগড়াঝাঁটি করতে যাবেন না। চেষ্টা করুন তার মতকেও গুরুত্ব দিতে।

হাদিস শরিফে এসেছে, এক ব্যক্তি নবী (সা.)-এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কাজের লোককে প্রতিদিন কতবার মাফ করব? তিনি চুপ থাকলেন। লোকটি আবার একই প্রশ্ন করলে এবারও তিনি চুপ থাকলেন। তৃতীয়বার প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, প্রতিদিন তাকে তোমরা ৭০ বার মাফ করবে। (আবু দাউদ, হাদিস : ৫১৬৪)

লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, যেখানে খাদেম বা চাকরকে প্রতিদিন ৭০ বার মাফ করার কথা বলা হয়েছে, সেখানে এই মেয়েটি তো আপনার বউমা। আপনি বড়, সে ছোট। ভুল তো ছোটরাই করে। সুতরাং মাফ করে দিন।

২. পুত্র ও পুত্রবধূর সবকিছুতে নাক গলাবেন না

মনে রাখবেন, আপনার ছেলে এখন আপনার ছোট্ট বাবু নয়। সে এখন বড় হয়েছে। তার পার্সোনাল লাইফ আছে। আপনার পুত্র ও পুত্রবধূর দাম্পত্য জীবনে একে অন্যের প্রতি কিছু দায়িত্ব ও অধিকার রয়েছে। এখন যদি আপনি এসব বিষয়েও নাক গলানো শুরু করেন, তাদের নিজেদের মতো করে দাম্পত্য জীবন উপভোগ করার স্পেস না দেন। যেমনছেলে তার স্ত্রীর জন্য কিছু আনলে আপনি যদি বলেন, এত দামিটা কেন আনল কিংবা আমার জন্য বা আমার মেয়ের জন্য কেন আনল না; অথবা ধরুন, ছেলে তার স্ত্রীকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে যেতে চায় আর আপনি এক্কেবারে না করে বসলেন, তাহলে মনে রাখবেন, সুখ ও শান্তি আপনার  ছাদের নিচে কক্ষনো আসবে না। সুতরাং তাদের এসব পার্সোনাল বিষয়ে আপনাকে ছাড় দিতে হবে।

আসলে উক্ত সমস্যার অন্যতম কারণ হলো ছেলেকে বিয়ে করানোর পর মা মনে করে, এই বুঝি ছেলে পর হয়ে গেল। বউমাকেই বেশি গুরুত্ব দেবে। আর বোধ হয় তাঁকে সেভাবে পাত্তাও দেবে না। ছেলের অধিকারবোধ নিয়ে তাঁরা আশঙ্কায় ভোগেন বিধায় এমনটি করে থাকেন। এ জন্য এ ক্ষেত্রে মায়ের উচিত অন্তরটাকে বড় করা।

৩. পুত্রবধূর ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করুন

কিছু শাশুড়ি আছে বউমার ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করা তো দূরের কথা, বরং পদে পদে তার ভুল ধরতেই ব্যস্ত থাকেন। ছেলের কাছে বউয়ের নামে গোপনে দুর্নাম করেন। নুন থেকে চুন খসলে ছেলের কাছে বিচার দেন। নিজের মেয়েদের কাছে বলে বেড়ান। এমনকি বাইরের মানুষের সামনে অপদস্থ করেন। আর মেয়েদের কাছে বললে এটা তো স্বাভাবিক যে এ দুর্নামগুলো তাদের স্বামীর কানেও পৌঁছে। তখন বউয়ের জন্য প্রধান বিচারপতি বনে যায় মেয়ে কিংবা তার স্বামী! যার কারণে আমাদের সমাজের বেশির ভাগ ননদ তাদের ভাবিকে দাজ্জাল মনে করে। আর ভাবিরা ননদকে দাজ্জাল মনে করে।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, এটার জন্য অন্যতম দায়ী কিন্তু শাশুড়ি। অথচ শাশুড়ি যদি বউয়ের বদনাম না করে তার দোষগুলো গোপন করতেন এবং তার ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করতেন, তাহলে পারিবারিক বিবাদ-কলহ অনেকাংশে কমে যেত। তাই শাশুড়িকে বলব, আল্লাহকে ভয় করুন। বউয়ের গিবত করা, তাকে অপবাদ দেওয়া থেকে দূরে থাকুন, তার দোষগুলো মায়ের মতো করে লুকিয়ে রাখুন, তার ভালো গুণগুলোর প্রশংসা করুন; দেখবেন, আপনার সংসারে অশান্তি থাকবে না।

৩. নিজের মেয়ে ও বউমাকে এক দৃষ্টিতে দেখুন

অনেক শাশুড়ি আছেন, ঘরে যদি কোনো অবিবাহিত মেয়ে থাকে তাহলে তার কোনো দোষ আছে বলে মনেই করেন না। মনে করেন, সব দোষ শুধু পুত্রবধূর। এটা জঘন্য অন্যায়।

মনে রাখতে হবে যে আইন দিয়ে জীবন-সংসার চলে না। একটু আগে বলেছিলাম, পুত্রবধূর ওপর শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা ফরজ করা হয়নি। এটা তো আইনের কথা। বাস্তবতা হলো আইনের রুক্ষ বাঁধনের ওপর ভিত্তি করে হয়তো তালাক ঠেকানো যাবেযদিও অনেক সময় তাও সম্ভব হয় না; কিন্তু সুখ-শান্তি কখনোই আসবে না। কেননা, এটা যেমন আইন, তেমনি এটাও আইন যে স্ত্রীকে তার মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া কিংবা ব্যবস্থা করে দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব নয়; বরং ইসলামী আইনজ্ঞরা এ পর্যন্তও বলেছেন, স্ত্রীর মা-বাবা সপ্তাহে মাত্র একবার আসবেন, তাও মেয়েকে দূর থেকে দেখে চলে যাবেন। তাঁদের ঘরে বসিয়ে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া স্বামীর দায়িত্ব নয়।

সুতরাং আইনের এসব চৌহদ্দিতে পড়ে থাকা মানে অশান্তি ডেকে আনা; বরং বউমাকেও ভাবতে হবে যে তাকেও একদিন শাশুড়ি হতে হবে। হতে হবে বৃদ্ধা। আর বৃদ্ধাবস্থায় পুত্রবধূর কাছ থেকে কিরূপ আচরণ প্রত্যাশা করেএ প্রশ্ন নিজেকে করলে শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে কেমন আচরণ করবে তার জবাব সে পেয়ে  যাবে।

বউমার প্রতি বিশেষ পরামর্শ

পারিবারিক সুখ-শান্তি যেন বিনষ্ট না হয় এ লক্ষ্যে বউমার প্রতি সংক্ষেপে কিছু বিশেষ পরামর্শ পেশ করছি। যদি মানতে পারেন তাহলে ইনশাআল্লাহ শ্বশুরকে বাবা এবং শাশুড়িকে মা হিসেবে পাবেন।

১. শ্বশুর-শাশুড়ির আনুগত্য ও সেবা করুন

সুখের নীড় রচনা করতে হলে পুত্রবধূর উচিত স্বতঃস্ফূর্তভাবে যতটুকু সম্ভব শ্বশুর-শাশুড়ির খিদমত করা। একে নিজের জন্য সৌভাগ্যের বিষয় মনে করা। দুঃখজনক হলো আজকাল এমন নারীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে, যাঁরা বিয়ের পর শ্বশুর-শাশুড়ির সঙ্গে আর থাকতে চান না বা তাঁদের সেবা করা নিজেদের ওপর জুলুম মনে করেন। অনেকে শ্বশুর-শাশুড়ি সম্পর্কে মিথ্যা কথা বলে স্বামীকে তাঁর মা-বাবার বিরুদ্ধাচরণ করতে উসকানি দেন। উদ্দেশ্য হলো, শ্বশুর-শাশুড়ি থেকে আলাদা হয়ে স্বাধীন জীবন যাপন করা অথবা শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা থেকে অব্যাহতি পাওয়া।

অথচ ওই নারীই একসময় যখন আরেকজন মেয়ের শাশুড়ি হন, তখন চান নিজের পুত্রবধূ তাঁর ভালোমন্দ খোঁজখবর নিক। সেবাযত্ন করুক। তাঁদের পাশেই থাকুক। এটা সম্পূর্ণ দ্বিচারিতা ছাড়া আর কিছু নয়।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।

(মুসলিম, হাদিস : ৪৫)

২. শ্বশুরবাড়ির বদনাম বাবার বাড়িতে করবেন না

আপনার শ্বশুরবাড়ি হলেও সেটি আপনার স্বামীর নিজের বাড়ি। তা ছাড়া বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িই হয়ে যায় নিজের বাড়ি। আর নিজের বাড়ির বদনাম কেউ সহ্য করতে পারে না। তাই শ্বশুরবাড়ির বদনাম করলে আপনার স্বামী রেগে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। কারণ সেই বাড়ির সব সদস্য তাঁর আপনজন। তাই শ্বশুরবাড়ির বদনাম করবেন না। যদি সুযোগ পান তবে প্রশংসা করুন। এতে আপনার স্বামী খুশি থাকবেন। ভালো থাকবে আপনার সম্পর্ক। সংসারও সুখের হবে।

৩. মাঝে মাঝে শাশুড়িকে তাঁর পছন্দের কিছু উপহার দেওয়া

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমরা পরস্পরে হাদিয়া বিনিময় করো। এর দ্বারা অন্তরের সংকীর্ণতা ও হিংসা-বিদ্বেষ দূর হয়ে যায়।

(মুসনাদে আহমদ, হাদিস : ৯২৫০)

এই হাদিয়া নিজেই কিনে দিতে হবে তা জরুরি নয়, বরং মাঝে মাঝে স্বামীকে কিনে দিতে বলা। এতে শাশুড়ি মনে মনে অনেক খুশি হবেন এবং পুত্রবধূকে বেশি স্নেহ করবেন।

৩. শ্বশুরালয়ের বদনাম প্রতিবেশীর কাছে করবেন না

এটাও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এই প্রতিবেশী আপনার বদনামের কথা তার পেটে রাখবে না, এটা শতভাগ নিশ্চিত। সন্দেহ নেই, যার কারণে আপনার সংসারে আগুন জ্বলে উঠবে। তা ছাড়া এর কারণে গিবতের গুনাহ হয়।

৪. শাশুড়ির কাছ থেকে তার অতীতের সুখ-দুঃখের গল্প  শুনবেন

এতে সম্পর্কের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা বাড়বে। শাশুড়ির প্রতি এক প্রকার আবেগ তৈরি হবে। শাশুড়ি আপনাকে শাসন কিংবা বকাঝকা করে থাকলে তার কারণ কী; এটাও বোঝা সহজ হবে।

মহান আল্লাহ সহায় হোন।