• ই-পেপার

সব হিসাব বিশ্বকাপে মিলবে না

  • ইকরামউজ্জমান

ওবিই মহাযজ্ঞ : মানবিক জ্ঞানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

ড. আলা উদ্দিন

ওবিই মহাযজ্ঞ : মানবিক জ্ঞানের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কা

পণ্য মাপার দাঁড়িপাল্লায় মানুষের মগজ মেপে দেখার এক মহাযজ্ঞ শুরু হয়েছে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। নাম তার আউটকাম-বেসড এডুকেশন (ওবিই)। যেকোনো নতুন দাওয়াইয়ের মতোই একে ঘিরেও স্তুতি আর প্রচারের কোনো কমতি নেই। বলা হচ্ছে, এই পদ্ধতি আমাদের শিক্ষাকে এক ধাক্কায় বৈশ্বিক মানে উন্নীত করবে এবং পাস করার পরপরই শিক্ষার্থীরা করপোরেট দুনিয়ায় নিজেদের স্থান করে নেবে। আপাতদৃষ্টিতে বাজারমুখী দক্ষতার এই চমৎকার মোড়কটি বেশ আকর্ষণীয়। কিন্তু বিজ্ঞান বা কারিগরি শিক্ষার বাইরে, বিশেষ করে কলা ও সমাজবিজ্ঞানের মতো মানবিক অনুষদগুলোর জন্য এই মহাযজ্ঞ আসলে কেমন এক গভীর সংকট আর চ্যালেঞ্জ বয়ে আনছে, তা তলিয়ে দেখার সময় এসেছে।

এখানেই আধুনিক শিক্ষার এক অদ্ভুত বাণিজ্যিক বাস্তবতার কথা বলতে হয়। আমরা যখন উত্তর-আধুনিক সমাজতত্ত্বের চোখ দিয়ে এই পরিবর্তনকে দেখি, তখন ফরাসি দার্শনিক জঁ-ফ্রাঁসোয়া লিয়োতার্দের সেই ল্যাঙ্গুয়েজ গেম বা ভাষার খেলার তত্ত্বটি মনে পড়ে। লিয়োতার্দ সতর্ক করেছিলেন, আধুনিক পুঁজিবাদী বিশ্বে জ্ঞানের বৈধতা নির্ধারিত হয় তার সত্যতা বা নৈতিকতা দিয়ে নয়, বরং তার কার্যকারিতা বা পারফরমেটিভিটি দিয়ে। অর্থাৎ আপনার অর্জিত জ্ঞান বাজারে ঠিক কতটা বিক্রি করা যাবে, সেটিই হবে তার একমাত্র পরিচয়। ওবিই পদ্ধতি মূলত এই দর্শনের ওপর ভিত্তি করেই দাঁড়িয়ে আছে। এটি শিক্ষাকে স্রেফ কতগুলো পরিমাপযোগ্য আউটকাম বা দক্ষতার ছাঁচে ফেলে দিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হলো, সমাজবিজ্ঞান বা দর্শনের মতো বিষয়গুলো কি শুধু জিপিএ বা নির্দিষ্ট কোনো চাকরির দক্ষতার ছকে বেঁধে ফেলা সম্ভব?

সমাজবিজ্ঞানের একজন শিক্ষার্থী যখন ক্লাসরুমে কার্ল মার্ক্সের ক্যাপিটাল পড়ে কিংবা কোনো নৃবিজ্ঞানী মাঠ পর্যায়ে গিয়ে প্রান্তিক মানুষের যাপিত জীবনের গল্প শোনে, তখন তার ভেতরে এক ধরনের বিমূর্ত চিন্তার জন্ম হয়। সে সমাজকে প্রশ্ন করতে শেখে, কাঠামোগত বৈষম্যগুলো ধরতে পারে এবং একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। ওবিইর নতুন নিয়মে এই গভীর মানবিক রূপান্তরকে মাপা হবে কতগুলো কাঠখোট্টা পয়েন্ট বা অবজেক্টিভের মাধ্যমে। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছেশিক্ষার্থীরা নতুন কিছু ভাবার বা পড়ার চেয়ে শুধু অ্যাসাইনমেন্টের ছক পূরণ করে দ্রুত গ্রেড পাওয়ার এক অসুস্থ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠছে। সৃজনশীলতার এই অমানবিক অবদমন মানবিক অনুষদগুলোর মৌলিক চরিত্রকেই ধ্বংস করে দিচ্ছে।

এখানেই কার্ল মার্ক্সের সেই পণ্যপূজা বা কমোডিটি ফেটিশিজমের তত্ত্বটি এক নতুন রূপে আমাদের সামনে হাজির হয়। মার্ক্স বলেছিলেন, পুঁজিবাদ মানুষের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্ককে পণ্যের সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে ফেলে। ওবিইর এই জামানায় আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাও যেন এক নতুন পণ্যপূজার শিকার। এখানে ছাত্র ও শিক্ষকের মধ্যকার সেই চিরাচরিত গভীর আত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মিথস্ক্রিয়া আড়ালে চলে যাচ্ছে, আর বড় হয়ে উঠছে স্রেফ একটি ডিগ্রি বা সার্টিফিকেট নামের চূড়ান্ত পণ্য। শিক্ষক এখানে আর মুক্তবুদ্ধির চর্চাকারী বা পথপ্রদর্শক নন, তিনি হয়ে উঠছেন একজন ডেটা এন্ট্রি অপারেটর বা করপোরেট ম্যানেজার, যাঁর দিন কাটবে ওবিইর জটিল ফরম পূরণ আর রিপোর্টিংয়ের পেছনে। আর শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠছে সেই কারখানার কাঁচামাল, যাদের ঘষেমেজে করপোরেট দুনিয়ার জন্য সস্তা শ্রমিক হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে।

হয়তো না বুঝেই এক ধরনের পদ্ধতিগত উপনিবেশায়নের ফাঁদে পা দিচ্ছি। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তাঁর বিখ্যাত নিবন্ধে যেভাবে গবেষণার আড়ালে পশ্চিমা নব্য উপনিবেশবাদী শোষণের

রূপটি দেখিয়েছিলেন, এই ওবিই পদ্ধতির ক্ষেত্রেও ঠিক একই বাস্তবতা প্রযোজ্য। ওবিই মডেলটি মূলত পশ্চিমা করপোরেট এবং টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটগুলোর উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের স্থানীয় সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং গ্রামীণ বাস্তবতা পশ্চিমা দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। গবেষণায় যেমন বিউপনিবেশায়ন দরকার, তেমনি ওবিইর ব্যবচ্ছেদ বা স্থানীয়করণ দরকার ছিল। আমাদের সমাজবিজ্ঞানের কাজ ছিল এ দেশের মাটির মানুষের ভাষা ও অধিকারের কথা বলা, কিন্তু ওবিই যখন শুধু গ্লোবাল মার্কেট ডিমান্ডের কথা বলে, তখন আমাদের নিজস্ব লৌকিক জ্ঞান বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের লড়াইয়ের মতো বিষয়গুলো কারিকুলাম থেকে চিরতরে ব্রাত্য হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব আরো মারাত্মক। বাংলাদেশের চাকরির বাজার এখনো এক ধরনের কাঠামোগত বৈষম্য আর অঘোষিত গ্লাস সিলিং বা কাচের ছাদ দিয়ে নিয়ন্ত্রিত। এখানে শুধু দক্ষতা থাকলেই সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরি হয় না; অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, লিঙ্গীয় পক্ষপাত এবং সামাজিক পরিচয় বড় ভূমিকা পালন করে। ওবিই পদ্ধতি দাবি করে যে এটি শিক্ষার্থীদের শতভাগ কর্মমুখী করবে, কিন্তু এটি আসলে আমাদের করপোরেট বাজারের গভীর বৈষম্যগুলোকে আড়াল করে এক ধরনের মেকি মেরিটক্রেসির (মেধাতন্ত্র) ধারণা তৈরি করছে। শিক্ষার্থীরা যখন ওবিইর সব ছক পূরণ করেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাবে না, তখন তাদের মধ্যে তীব্র একাকিত্ব এবং হতাশার জন্ম নেবে। সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুরখাইমের ভাষায়, এ ধরনের হঠাৎ পরিবর্তন ও সামাজিক নিয়মহীনতা সমাজে অ্যানোমিক বা অরাজকতাগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়, যার লক্ষণ আমরা এরই মধ্যে এ দেশের শিক্ষিত বেকার যুবকদের মধ্যে দেখতে পাচ্ছি।

এখানেই শেষ নয়, ওবিই পদ্ধতির এই অতি যান্ত্রিকতা আমাদের পরিবেশগত ও মানবিক সংকটের সংবেদনশীলতাকেও কমিয়ে দিচ্ছে। বাংলাদেশ যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কৃষি খাতে বার্ষিক হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হচ্ছে এবং লাখ লাখ মানুষ উপকূল ছেড়ে শহরে এসে উদ্বাস্তুজীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে, তখন আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন এক গভীর রাজনৈতিক ও পরিবেশগত বোঝাপড়া। কিন্তু ওবিইর সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট দক্ষতার সিলেবাস মানুষকে শুধু তার নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে শেখায়, চারপাশের বড় বড় সামাজিক সংকটের প্রতি তাকে উদাসীন করে তোলে। মানবিক অনুষদের শিক্ষার্থীরা যদি শুধু করপোরেট রিপোর্টিং শেখে আর সামাজিকভাবে অন্ধ হয়ে যায়, তবে এই বিশাল মানবিক দুর্যোগগুলো মোকাবেলা করবে কে?

কেন এটি নিয়ে এখন গভীরভাবে ভাবা দরকার? কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কোনো বাণিজ্যিক কারখানা নয় যে দিনশেষে সেখানে শুধু কতগুলো দক্ষ রোবট তৈরি করে বাজারে ছেড়ে দেওয়া হবে। ২০২৬ সালের এই আধুনিক বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে প্রযুক্তি আর বাজারের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার চেষ্টা অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু সেই চেষ্টার মূল্য যদি হয় মানুষের মুক্তচিন্তা ও মানবিক বোধের বলিদান, তবে সেই উন্নয়ন হবে অন্তঃসারশূন্য। কলা ও সমাজবিজ্ঞানের কাজই হলো মানুষকে মানুষ হিসেবে ভাবতে শেখানো, বাজারের দাস বানানো নয়।

ওবিইর এই মহাযজ্ঞকে যদি আমরা কলা ও সমাজবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে অন্ধভাবে প্রয়োগ করতে থাকি, তবে আমরা হয়তো ভালো কেরানি বা ম্যানেজার পাব, কিন্তু কোনো সংবেদনশীল দার্শনিক, সমাজবিজ্ঞানী বা চিন্তাশীল লেখক কিংবা ক্রিটিক্যাল বুদ্ধিজীবী না পাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। তাই সময় এসেছে এই যান্ত্রিক ছকগুলোকে ভেঙে সামাজিক-মানবিক অনুষদগুলোর জন্য একটি নিজস্ব, নমনীয় এবং স্থানীয় সংস্কৃতিবান্ধব মূল্যায়নের মডেল তৈরি করার। জ্ঞানের জগৎ যেন শুধু বাজারের পণ্য না হয়ে ওঠে, বরং তা যেন মানুষের মনের জানালা খুলে দেওয়ার অবারিত আকাশ হিসেবেই টিকে থাকে। কাচের ছাদ ভাঙার লড়াইটা যেমন জরুরি, তেমনি শিক্ষার ওপর চেপে বসা এই যান্ত্রিকতার শিকল ভাঙাটাও আজ আমাদের অস্তিত্বের লড়াই।

লেখক : অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

শিশুর বিকাশে ঘরোয়া বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব

ড. নিয়াজ আহম্মেদ

শিশুর বিকাশে ঘরোয়া বিনোদনের নেতিবাচক প্রভাব

শিশুদের বিকাশে আমাদের সনাতন বিনোদন ব্যবস্থার জায়গায় প্রধানত শহুরে সমাজে ঘরোয়া বিনোদন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ ধরনের বিনোদনের প্রতি শিশুদের অভ্যস্ত হওয়া তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। আমরা হয়তো বিবিধ কারণে এ ধরনের বিনোদনের প্রতি সন্তানদের অভ্যস্ত করছি। সময়ের স্বল্পতা, পর্যাপ্ত মাঠের অভাব, শিশুদের নিরাপত্তাঝুঁকি কিংবা অন্য কোনো কারণে আমরা ঘরোয়া বিনোদনে সন্তানদের নিয়ে যাচ্ছি। এই বিনোদনে শিশুদের মধ্যে কোনো শিক্ষণীয় বিষয় লক্ষ করা যায় না, বরং এক ধরনের প্রতিযোগিতা এবং আসক্তি তাদের মধ্যে তৈরি করে।

আমরা হয়তো এ ধরনের বিনোদনকে বিকল্প ভাবছি। কিন্তু এই বিকল্পের পরিণতি নিয়ে ভাবছি না। এখনো আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে ছোট-বড় মাঠ আছে। এ ছাড়া বাইরে কোনো না কোনো মাঠ পাওয়া যায়। কিন্তু লক্ষ করলে দেখবেন, ছুটির দিন কিংবা বিকেলবেলা এই মাঠ ব্যবহারের কোনো সুযোগ অনেক প্রতিষ্ঠান দেয় না। দ্বিতীয়ত, এখানে নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনায় যদি মাঠগুলো বিদ্যালয়ের সময়ের বাইরে খুলে দেওয়া হয়, তাহলে অনেক শিক্ষার্থী এর সুযোগ নিতে পারে। আমাদের শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া এবং টিউশনে এতটাই ব্যস্ত রাখি যে ছুটির দিন ছাড়া তাদের কোনো অবসরই নেই। অনেক ক্ষেত্রে শুক্রবারও তাদের টিউশন থাকে। শিশুদের সারাক্ষণ লেখাপড়ায় ব্যস্ত না রেখে প্রতিদিন একটি নির্দিষ্ট সময়ে খেলাধুলা ও অন্যান্য বিনোদনের সঙ্গে পরিচিত করে না তুলতে পারলে তাদের পরিপূর্ণ বিকাশ কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। অধুনা বিনোদন বলতে বাইরের কোনো রেস্টুরেন্টে খাওয়া এবং এক কোণে সেই ঘরোয়া বিনোদন। যেভাবেই বলি না কেন, ঘরোয়া বিনোদন শিশুদের বিকাশের পরিবর্তে গেমসের প্রতি এক ধরনের আসক্তি এবং আবার প্রতিযোগিতামূলক মনোভাব তৈরি করছে।

আমরা বই পড়ে যতটা না শিখি, তার চেয়ে বেশি জানা ও শেখা যায় আন্তঃসম্পর্কের মাধ্যমে। অবশ্যই শিশুদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকবে এবং গঠনমূলক প্রতিযোগিতার মাধ্যমেই শিশুরা বেশি শিখবে। ঘরোয়া বিনোদনে আটকে থাকা শিশুর সঙ্গে অন্যদের তেমন কোনো আন্তঃসম্পর্ক তৈরি হয় না। শিশুদের পছন্দ, বিকল্পের অভাব এবং ঝামেলামুক্ত হওয়ায় আজ এমন বিনোদনের প্রতি আকর্ষণ বাড়ছে।

অন্যদিকে আমরা যদি বাইরের বিনোদনের দিকে লক্ষ করি তাহলে দেখব, এখানে শেখার সুযোগ অনেক বেশি। ফুটবল, ক্রিকেট এবং অন্যান্য খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের শারীরিক বিকাশ ও গড়ন তৈরি হয়, মানসিক শক্তি ও সাহস বেড়ে যায়, যা তাদের অনেক দূর নিয়ে যায়। অন্যের সঙ্গে তারা দ্রুত মিশতে পারে। আরো বড় সুবিধা আন্তঃসম্পর্কের মাধ্যমে তাদের ধ্যান-ধারণা, মনের বিকাশ, আচার-আচরণের পরিবর্তন মোটাদাগে তাদের সামাজিকীকরণে এক বড় ভূমিকা পালন করে। পরিবারের বাইরে যে প্রতিনিধিকে আমরা সামাজিকীকরণের বড় মাধ্যম বলি, তা হলো পিয়ার গ্রুপ। তাদের সঙ্গে ওঠাবসা এবং খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুরা যা শেখে, তা অন্য কোনো মাধ্যমে কোনোভাবেই শিখতে পারে না। মানুষের সঙ্গে মানুষের ভাবের বিনিময় না হলে প্রকৃত শিক্ষা কখনো সম্পূর্ণ হয় না। প্রকৃতপক্ষে আমরা আমাদের শিশুদের নিজেদের অজান্তে কিংবা বাস্তবতার নিরিখে এক অর্থে বঞ্চিত করছি; যার পরোক্ষ প্রভাব পড়ছে সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ এবং পরবর্তী জীবনে বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে আন্তঃসম্পর্কের ওপর। অনেক সময় দেখা যায়, শিশু বড় হয়ে বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে একদম মেলামেশা করে না। বাসায় মেহমান এলে তাদের সঙ্গে সৌজন্যমূলক আলাপ-আলোচনা এবং কথাবার্তা পর্যন্ত হয় না। আমরা এমনও লক্ষ করি, শিশুরা একসঙ্গে থেকেও কারো সঙ্গে কারো ভাব বিনিময় করতে দেখা যায় না। মোবাইল আসক্তি তাদের পেয়ে বসে।

আমাদের সনাতন বিনোদন ব্যবস্থার দিকে ফিরে যাওয়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। বিদ্যালয়ের মাঠকে উন্মুক্ত করে দিতে হবে, যেখানে বিকেলবেলা শিশুরা খেলতে পারে। মাঠের নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। যে বিনোদন আমরা ঘরের মধ্যে ব্যবস্থা করছি, তাকে বাইরে নিয়ে আসতে হবে, যেখানে সবাই একসঙ্গে কিংবা কয়েকজন শিশু বিনোদন পেতে পারে। প্রতিটি বিদ্যালয়ের মাঠে দোলনা ও শারীরিক গড়ন তৈরি হয় এমন সব খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশুদের বিরতি শুধু টিফিন নয়, নাম হবে টিফিন এবং খেলাধুলা। এ কাজে তাদের পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বিদ্যালয়ে শিশুরা শুধু একাডেমিক লেখাপড়া করতে যায় না। একজন পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার ভিত তৈরিও বড় বিষয়। সুষ্ঠু সামাজিকীকরণ এবং বিকাশ মুখ্য বিষয়। মানুষের সঙ্গে মেশার এবং ভাব বিনিময়ের এক চারণভূমি হবে প্রতিটি বিদ্যালয়। আমরা যদি বিদ্যালয়গুলোকে এভাবে তৈরি করতে পারি, তাহলে ঘরোয়া বিনোদনের প্রতি শিশুদের আকর্ষণ থাকবে না। শিশুরা ঘরোয়া বিনোদনকে না বলবে। এ কাজে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, অভিভাবক, দায়িত্বশীল ও সচেতন ব্যক্তিবর্গ এ কাজে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারেন। সবার দায়িত্বশীল ভূমিকা পারবে আমাদের শিশুদের সনাতন বিনোদনকে পুনরায় ব্যাপকভাবে ফিরিয়ে আনতে।

লেখক : অধ্যাপক, সমাজকর্ম বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

বাংলাদেশ-ভারতে একই রক্তপ্রবাহ, গঙ্গা-পদ্মায় একই জলপ্রবাহ : অভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতির বন্ধন

গোপালকৃষ্ণ গান্ধী

বাংলাদেশ-ভারতে একই রক্তপ্রবাহ, গঙ্গা-পদ্মায় একই জলপ্রবাহ : অভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতির বন্ধন

ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনে দীনেশ ত্রিবেদীর চেয়ে উপযুক্ত নিয়োগ আর হতে পারত না। তাঁকে হাইকমিশনার হিসেবে নিয়োগের সিদ্ধান্তকে আমি স্বাগত জানাই। দুই দশক ধরে আমি তাঁকে চিনি, বিশেষ করে ২০০৪ থেকে ২০০৯ সালে কলকাতার রাজভবনে কাজ করার সময় থেকে। সে কারণেই আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, এই নিয়োগ যথার্থ হয়েছে।

তখন তিনি ছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম ঘনিষ্ঠ ও প্রভাবশালী রাজনৈতিক সহকর্মী। কলকাতার তাজ হোটেলে এক অনুষ্ঠানে তিনি এসে নিজের পরিচয় দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, শুভ সন্ধ্যা, স্যার। আমি দীনেশ ত্রিবেদী। আপনার ভাই রাজমোহন গান্ধীকে চেনার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। কিছুদিন পর নন্দীগ্রাম প্রসঙ্গে আলোচনা করতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি তৃণমূল প্রতিনিধিদল নিয়ে আমার কাছে আসেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দীনেশও। মমতা মজা করে বলেছিলেন, তোমরা দুজনই গুজরাটি, গুজরাটিতে কথা বলোকেম ছো, কেম ছো! (কেমন আছ, কেমন আছ)। কিন্তু আমরা কেউই গুজরাটিতে কথা বলিনি; উপস্থিত সবার বোঝার সুবিধার জন্য ইংরেজিতেই আলাপ চালিয়েছিলাম। তবু ভাষার একটি আলাদা সম্পর্ক তো থেকেই যায়, যা আমাকে দীনেশের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত করেছিল। পরে মমতা ও দীনেশের রাজনৈতিক বিচ্ছেদে আমি দুঃখ পেয়েছিলাম। মমতার জন্য, কারণ তিনি একজন তীক্ষ বুদ্ধি ও নিরপেক্ষ সহকর্মীকে হারিয়েছিলেন; আর দীনেশের জন্য, কারণ তাঁকে দলবদলকারী আখ্যা পাওয়ার ঝুঁকি নিতে হয়েছিল। তবে দুজনই যথেষ্ট দৃঢ়চেতা মানুষ; তাঁরা সেই বিচ্ছেদ সামলে নিয়েছেন।

গুজরাটি পরিবারে জন্ম হলেও দীনেশ ত্রিবেদী তাঁর শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় কাটিয়েছেন কলকাতায়। ফলে তিনি একজন বাংলাভাষী অবাঙালি। এই পরিচয় তাঁকে ভারতের সংসদ ও মন্ত্রিসভায় বাংলার এক স্বতন্ত্র উপস্থিতি দিয়েছিল এবং এখন ঢাকায় তাঁর দায়িত্ব পালনের জন্য তাঁকে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিকভাবে বিশেষভাবে উপযুক্ত করে তুলেছে।

ইতিহাসের দিকে সংক্ষেপে তাকালে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে ভারতের প্রথম হাইকমিশনার হিসেবে সুবিমল দত্তকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন ভারতীয় সিভিল সার্ভিসের কর্মকর্তা, ভারতের দীর্ঘতম মেয়াদের পররাষ্ট্রসচিব এবং সাবেক রাষ্ট্রপতির সচিব। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করেন। চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া সুবিমল দত্ত ছিলেন একজন বাঙালি। তখনকার উষ্ণ ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া এক বাঙালি হিন্দুকে ভারতের প্রতিনিধি হিসেবে পাঠানোকে কেউ অস্বাভাবিক মনে করেনি। তাঁর অসাধারণ কূটনৈতিক দক্ষতার কারণে বাংলাদেশে তাঁর নিয়োগকে অত্যন্ত শুভ বলে বিবেচনা করা হয়েছিল। পরে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন ঢাকায় জন্ম নেওয়া আরেক বাঙালি সমর সেন।

বাংলাদেশে ভারতের হাইকমিশনারদের তালিকায় আরো কয়েকজন বিশিষ্ট বাঙালির নাম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কূটনীতিক, পর্বতারোহী ও আলোকচিত্রী দেব মুখার্জি। আবার কয়েকজন অবাঙালি হাইকমিশনারও ছিলেন, যাঁদের সঙ্গে বাংলার গভীর সম্পর্ক ছিল। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মুচকুন্দ দুবে, যিনি বিহার-ঝাড়খণ্ড অঞ্চলে জন্মগ্রহণ করলেও মাতৃভাষার মতো সাবলীল বাংলায় কথা বলতেন; কৃষ্ণন শ্রীনিবাসন, যিনি দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নাতনি বৃন্দার স্বামী এবং বিক্রম দোরাইস্বামী, যাঁর বাবা ভারতীয় বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন।

বাংলাদেশ-ভারতে একই রক্তপ্রবাহ, গঙ্গা-পদ্মায় একই জলপ্রবাহ : অভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতির বন্ধন
সুতরাং ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনারদের বেশির ভাগেরই নিয়োগ ছিল স্বাভাবিক কূটনৈতিক নিয়োগ, তবে কিছু ক্ষেত্রে বাংলার সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক থাকা ব্যক্তিদের বাছাই করা হয়েছে। এতে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধন আরো দৃঢ় হয়েছে। দীনেশ ত্রিবেদী, যিনি বাংলা জানেন ও বাংলায় কথা বলতে পারেন, সেই মূল্যবান ধারাবাহিকতাই বজায় রাখছেন। তিনিই এই পদে প্রথম রাজনৈতিক বা কূটনীতিকের বাইরে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তি।

বাংলাদেশে পৌঁছে তিনি বলেছিলেন, ভারতের ১৪০ কোটি এবং বাংলাদেশের ২০ কোটি মানুষ একসঙ্গে অনেক বড় অর্জন করতে পারে। তাঁরা একই আকাশ, একই বাতাস এবং একই বেদনা ভাগ করে নেয়। তিনি আরো বলেন, আমরা যা-ই করি না কেন, একসঙ্গে করতে হবে; একা থেকে কেউ শক্তিশালী হতে পারে না। তাঁর এই বক্তব্য শুনে আমার মনে হয়েছে, এ কথা যথার্থ।

দীনেশ মূলত একজন রাজনীতিক, সাহিত্যিক বা শিল্প-সংস্কৃতির মানুষ নন। তবে আকাশ, বাতাস ও বেদনার যে উপমা তিনি ব্যবহার করেছেন, তা যেন দুর্ভিক্ষপীড়িত ও যন্ত্রণাক্লিষ্ট বাংলাকে ঘিরে গড়ে ওঠা এক সাংস্কৃতিক স্মৃতির ভাণ্ডার থেকে উঠে এসেছে। সেই বাংলার কথা মনে করিয়ে দেয় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা ও গান, সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র এবং অমর্ত্য সেনের দারিদ্র্যবিষয়ক গবেষণা।

উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই তিনজনেরই বাংলাদেশের সঙ্গে শিকড়ের সম্পর্ক রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষদের জমিদারি ছিল কুষ্টিয়ার শিলাইদহে; সত্যজিৎ রায়ের পিতা ও পিতামহের জন্ম কিশোরগঞ্জে; আর অমর্ত্য সেনের পারিবারিক শিকড় ঢাকা ও মানিকগঞ্জে। দীনেশের বক্তব্য সেই বাংলারও স্মৃতি বহন করে, যাকে ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষের ছবিতে তুলে ধরেছিলেন আলোকচিত্রী সুনীল জানা এবং যাকে শিল্পী সোমনাথ হোর তাঁর তেভাগা আন্দোলন ও ১৯৪৬-৪৭ সালের দাঙ্গার চিত্রমালায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন।

দীনেশের বক্তব্যের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন, তা প্রত্যাশিত ছিল। কিন্তু তা সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যার ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর বক্তব্যকে যদি কেউ ভারতের পক্ষ থেকে বাংলাদেশকে আত্মসাৎ করার কোনো অন্তর্নিহিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন বলে মনে করেন, তবে তা শুধু রাজনৈতিকভাবেই নয়, সভ্যতাগত দিক থেকেও ভুল। তিনি এমন একটি অনুভূতির কথা বলেছেন, যা ভারত বিভাগের সময় থেকেই বিদ্যমান। অনেকেই তখন মনে করেছিলেন, রেডক্লিফ রেখা স্থায়ী হয়েছে, পাকিস্তান বাস্তবতা, পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশও বাস্তবতা, কিন্তু তা সত্ত্বেও পারস্পরিক কল্যাণের জন্য অনেক কিছু একসঙ্গে করা সম্ভব।

জওয়াহেরলাল নেহরুর প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য কে সি নিয়োগী ১৯৪৯ সালের ১১ মার্চ সংসদে বলেছিলেন, ভারত ও পাকিস্তান সার্বভৌম রাষ্ট্র হয়েও যৌথ অর্থনৈতিক উন্নয়নের স্বপ্ন দেখতে পারে, এমনকি একটি অর্থনৈতিক ও শুল্ক ইউনিয়নও গঠন করতে পারে।

আজকের পৃথিবীতে যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরেশীয় অর্থনৈতিক ইউনিয়ন কিংবা আফ্রিকান ইউনিয়নের মতো আঞ্চলিক জোট সক্রিয় রয়েছে, তখন দীনেশ ত্রিবেদীর আশাবাদকে শুধু গ্রহণযোগ্যই নয়, বাস্তববাদী ও প্রগতিশীল বলেও বিবেচনা করা যায়।

হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী যদি পুরনো সেতুগুলোকে আরো মজবুত করে নতুন সেতু নির্মাণ করেন এবং দুই দেশের আলোচনায় অবিশ্বাস ও বিদ্বেষমূলক ভাষা কমাতে ভূমিকা রাখেন, তাহলে তা উভয় দেশের জন্যই কল্যাণকর হবে।

শেষে একটি ঘটনার কথা বলি। আজকের বাংলাদেশের অনেকের কাছে সেটি হয়তো খুব গ্রহণযোগ্য না-ও হতে পারে। কারণ এটি শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে। তবে এর নৃতাত্ত্বিক ও পরিবেশগত সত্যতা তাঁরা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবেন।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে ঢাকায় ফেরার পথে সদ্যঃস্বাধীন বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান দিল্লিতে যাত্রাবিরতি করেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান। জনতার অনুরোধে তিনি একটি সমাবেশে বাংলায় ভাষণ দেন। মঞ্চ থেকে নামার সময় এক ব্যক্তি একটি প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ধরেছিলেন। এতে লেখা ছিল ‘India-Bangladesh same blood. Ganga-Padma same flood.’ বাংলায় যার অর্থ—‘ভারত-বাংলাদেশ একই রক্ত, গঙ্গা-পদ্মা একই বন্যা।

এটিই আমাদের দুই রাষ্ট্রের সার্বভৌম সত্য। এই সত্যই যেন আমাদের বন্ধুত্ব রক্ষা করে এবং অগ্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যায়।

লেখক : মহাত্মা গান্ধীর দৌহিত্র, আধুনিক ভারতীয় ইতিহাসের গবেষক, লেখক ও সাবেক কূটনীতিক

পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল (২০০৪-২০০৯) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি অশোকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক

কর আদায় ও ব্যবসা প্রসারের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি

ফারুক মেহেদী

কর আদায় ও ব্যবসা প্রসারের মধ্যে ভারসাম্য জরুরি

দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য যখন একটি ক্রান্তিকাল পার করছে, সেই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিএনপি জোট সরকার একটি বড় বাজেট দিয়েছে, যা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্যবসা চাঙ্গা করা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোসহ সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। প্রায় দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে ক্ষমতার বাইরে থাকায় মানুষের চাহিদা পূরণের বিশাল চাপ রয়েছে বিএনপি জোটের এই সরকারের ওপর। তাই স্বাভাবিকভাবেই এগুলো পূরণের সুযোগ নেবে এ সরকার।

তবে বড় বাজেট বাস্তবায়নের এই লক্ষ্যের মধ্যে বড় রাজস্ব আয় করারও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বড় রাজস্ব লক্ষ্য মানে বেশি বেশি কর আদায়। আর তা করতে হবে বলে স্বাভাবিকভাবেই করদাতা, বিশেষ করে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা ও সাধারণ মানুষের ওপর চাপ পড়বে। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা হচ্ছে, বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে হবে, বেশি রাজস্ব আদায়ও করতে হবে। তবে ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তাকে স্বস্তিও দিতে হবে, যাতে তাঁরা করের বোঝার কবলে পড়ে ব্যবসায় অব্যাহত লোকসান দিতে থাকেন কিংবা ব্যবসা গুটিয়ে চলে যান। এটির ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে নতুন বাজেট বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় দিক।   

দশকের পর দশক ধরে চলে আসা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিনির্ভর উন্নয়ন মডেল এখন কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে স্থবিরতার মুখে পড়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে অর্থনীতির ক্ষত সারিয়ে তোলার জন্য ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্ট্যাবিলাইজেশন বা সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘদিনের জমে থাকা সংকটের গভীরতা এতটাই বেশি যে এর প্রভাব দৈনন্দিন জনজীবনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

কর আদায় ও ব্যবসা প্রসারের মধ্যে ভারসাম্য জরুরিঅর্থনীতির বর্তমান অবস্থার পর্যালোচনায় দেখা যায় যে মূল্যস্ফীতি এখন শুধু একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নির্ধারণকারী প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে, যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির প্রভাবে মুদ্রাপ্রবাহ কমানোর ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে। তবু খাদ্য ও জ্বালানি পণ্যের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্রমাগত সংকুচিত করছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যাংকিং খাতের সংকট অর্থনীতিতে একটি বড় ধরনের বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে উচ্চ সুদের হার, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট দেশের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থায় ফাটল ধরিয়েছে। বর্তমানে মোট ঋণের একটি বিশাল অংশ খেলাপি হওয়ার কারণে ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অর্থের প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে, যা নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রে বড় অন্তরায়।

বিনিয়োগ এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অস্থিরতা লক্ষ করা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের চাহিদা আগের তুলনায় কমেছে, যার ফলে এ খাত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের গতি বেগবান হচ্ছে না। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট কাটাতে আমদানি নিয়ন্ত্রণ করা হলেও এর ফলে উৎপাদনমুখী শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, যা সামগ্রিক উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগকারীরা উচ্চ সুদের হার এবং অস্থির বিনিময় হারের কারণে নতুন প্রকল্প গ্রহণে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন, যদিও সরকার দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে সক্ষম এমন শিল্পকাঠামো গড়ে তোলার পথে পর্যাপ্ত নীতি সহায়তার অভাব এখনো বড় একটি দুর্বলতা।

রাজস্ব আদায়ের করুণ দশা বর্তমান পরিস্থিতির অন্যতম উদ্বেগজনক দিক। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিশাল রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কাজ করলেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। কর-জিডিপি অনুপাত ৭-৮ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর ফলে সরকারের নিজস্ব আয় থেকে যে তহবিল হওয়ার কথা, সেটি কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হচ্ছে না। ফলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ঠিকমতো বাস্তবায়িত হচ্ছে না। চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে এডিপিতে খরচ করা গেছে মাত্র ৫৬ হাজার কোটি টাকা। অথচ সংশোধিত উন্নয়ন বাজেটই ছিল দুই লাখ কোটি টাকা। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ব্যাহত হওয়ায় এই খাত থেকেও সরকার কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব পায়নি। ফলে রাজস্ব ঘাটতি এরই মধ্যে এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।

রাজস্ব ঘাটতি মেটানোর জন্য সরকারকে বাধ্যতামূলকভাবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। এই অঙ্কও এক লাখ কোটি টাকার বেশি। এই ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট বা সরকারি ঋণের চাপে বেসরকারি খাতের ঋণ পাওয়ার পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে, যার ফলে বেসরকারি বিনিয়োগ হ্রাস পাচ্ছে এবং অর্থনীতিতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি স্তিমিত হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প অর্থের অভাবে দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতাকে কমিয়ে দিচ্ছে।

তাই সরকারকে যেমন ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বিশাল বাজেট বাস্তবায়ন করতে সাত লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে, তেমনি এই বিশাল রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে গিয়ে সরকারকে কর আদায় এবং ব্যবসা-বিনিয়োগের মধ্যে একটি নিখুঁত ভারসাম্যও বজায় রাখতে হবে। এই সংকটময় সময়ে করের বোঝা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের ওপর সরাসরি চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তাই কর আদায়কে শুধু বাধ্যতামূলক অর্থ সংগ্রহের উপায় হিসেবে না দেখে একে একটি সেবা ও উন্নয়নমুখী কাঠামোতে রূপান্তর করতে হবে। সরকারের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এই বাড়তি কর যাতে সক্ষম সব স্তর থেকে আদায় করা যায় তার একটি পথনকশা তৈরি করা। এটি কোনোভাবেই যেন যারা নিয়মিত বর্ধিত হারে কর দিচ্ছে, তাদের ওপর যাতে আরো চাপ না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। আর এটি না হলে বিনিয়োগ নিরুৎসাহ হবে এবং অর্থনীতি আরো সংকুচিত হয়ে পড়তে পারে।

মোটাদাগে, ব্যবসা-বিনিয়োগের প্রসার আর কর আদায়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। এর সঙ্গে রাজস্ব আদায় বাড়াতে ফাঁকি কমানোতে জোর দিতে হবে। এ জন্য ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের কোনো বিকল্প নেই। করপ্রক্রিয়া যদি পুরোপুরি অনলাইনভিত্তিক এবং হয়রানিমুক্ত করা যায়, তবে মানুষ নিজের ইচ্ছায়ই রিটার্ন দাখিল করবে, যার ফলে সরকারি কোষাগারে রাজস্ব বাড়বে অথচ ব্যবসায়ী বা নাগরিকের ভোগান্তি কমবে। এ ছাড়া করনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিকতা থাকা অত্যন্ত জরুরি। উদ্যোক্তারা তখনই বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন, যখন তাঁরা নিশ্চিত থাকবেন যে আগামী কয়েক বছর তাঁদের ব্যাবসায়িক পরিবেশ বা করের শর্ত হঠাৎ করে পরিবর্তিত হবে না। করকাঠামোকে বিনিয়োগবান্ধব করতে হলে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দিতে হবে।

বিনিয়োগকে চাঙ্গা রাখার জন্য সরকারকে ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন, দুর্নীতিমুক্ত ওয়ানস্টপ সেবা প্রদান এবং সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করলে নতুন নতুন শিল্প গড়ে উঠবে, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে অর্থনীতিতে গতি আনবে। যখন ব্যবসা বাড়বে এবং মানুষের আয় বাড়বে, তখন পরোক্ষভাবেই সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। অর্থাৎ কর আদায় এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি একে অপরের পরিপূরক হতে পারে, যদি সরকার করদাতাকে হয়রানি না করে বরং তাঁকে ব্যবসার প্রসারে সহায়তা করে। সংকটময় এই সময়ে উন্নয়নের চাকা সচল রাখতে হলে কর ব্যবস্থাপনায় কঠোরতা নয়, বরং স্বচ্ছতা, অটোমেশন এবং ব্যবসা সহায়ক পরিবেশ তৈরি করাই হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই কৌশল।

ব্যবসার পরিচালন ব্যয় কমাতে হলে কর ও ভ্যাট ব্যবস্থাপনার আমূল ডিজিটাল রূপান্তর প্রয়োজন, যাতে অডিট বা এনবিআরের অফিসে হয়রানি ছাড়াই উদ্যোক্তারা ঘরে বসে করসংক্রান্ত সব কাজ সম্পন্ন করতে পারেন। করের উচ্চহার ব্যবসায়ীদের নিরুৎসাহ করে। তাই হার কমিয়ে করজাল সম্প্রসারণ করলে তা সরকারের রাজস্ব খাত ও ব্যবসায়ীউভয়ের জন্যই কল্যাণকর হবে। এর পাশাপাশি বর্তমান উচ্চ সুদহারের বাজারে উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে স্বল্প সুদে পুনরর্থায়ন স্কিম এবং ঋণ পুনর্গঠনের বিশেষ সুযোগ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। লজিস্টিকস খাতের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং ওয়ানস্টপ সার্ভিসের মাধ্যমে ব্যাবসায়িক লাইসেন্স ও অনুমতি প্রাপ্তি সহজ করা হলে বিনিয়োগের পথে থাকা আমলাতান্ত্রিক দেয়ালগুলো ভেঙে পড়বে।

রাজস্ব আদায়ের কৌশল হিসেবে জোরপূর্বক আদায়ের চেয়ে যদি ব্যবসা সহায়ক পরিবেশের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়, তবেই অর্থনীতিতে নতুন করে প্রাণ ফিরবে। নীতিমালার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক যৌক্তিকীকরণ এবং নির্দিষ্ট শিল্প খাতের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর অবকাশ সুবিধা দিলে তা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আত্মবিশ্বাস জোগাবে। সরকার যখন করদাতার পরিধি বাড়াতে ডেটাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার করবে এবং ব্যবসায়ীদের অংশীদার হিসেবে গণ্য করবে, তখনই ৯ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে। সরকার ও ব্যবসায়ীদের এই সমন্বিত প্রয়াসই পারে বর্তমান সংকট কাটিয়ে বিনিয়োগপ্রবাহকে চাঙ্গা করতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা সচল রাখতে।

সব শেষে বলব, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বন্ধ কারখানা চালু, পুরনো ব্যবসার প্রসারসহ বিভিন্ন প্রণোদনামূলক কর্মকাণ্ডের জন্য যে ৬০ হাজার কোটি টাকার তহবিল দেওয়ার ঘোষণা করেছে, এটি ভালো উদ্যোগ। এখন এর সুফল যাতে প্রকৃত ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা পান সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। এটি যেন বিগত সময়ের মতো লুটপাট কিংবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে টাকা নিয়ে চম্পট দেওয়ার পুরনো সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি না হয়।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও

কালের কণ্ঠের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক