• ই-পেপার

বালাইনাশক আইন সময়োপযোগী হওয়া প্রয়োজন

  • জীবন কৃষ্ণ বিশ্বাস

মেধা হারানোর মহামারি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকট

ড. শাহরীনা আখতার

মেধা হারানোর মহামারি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সংকট

বাংলাদেশ আজ এক গভীর ও নীরব সংকটের ভেতর দিয়ে অগ্রসর হচ্ছে, যা সরাসরি দেখা না গেলেও রাষ্ট্রের উন্নয়ন কাঠামোর ভেতরে ধীরে ধীরে ফাটল তৈরি করছে। উচ্চ শিক্ষিত, দক্ষ ও সম্ভাবনাময় তরুণদের একটি বড় অংশ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত ক্যারিয়ার গঠনের সিদ্ধান্ত নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ ক্ষয়, যা কৃষি, গবেষণা, প্রশাসন, নীতিনির্ধারণ এবং সামগ্রিক উন্নয়ন সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

দেশে প্রতিবছর বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বিপুলসংখ্যক গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে। কৃষি, প্রকৌশল, চিকিৎসা, তথ্য-প্রযুক্তি এবং উন্নয়ন অধ্যয়নসহ নানা ক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তি তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এই অর্জন যতটা না আশাব্যঞ্জক, তার চেয়ে বেশি উদ্বেগজনক হলো বাস্তবতা। এই মেধাবী তরুণদের একটি বড় অংশ দেশে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে করছে না। ফলে একটি প্রবণতা তৈরি হয়েছে, শিক্ষিত ও দক্ষ তরুণদের বিদেশে পাড়ি জমানো। এটি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার ফল। কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার দুর্বল পরিবেশ, পেশাগত অনিশ্চয়তা এবং স্বীকৃতির অভাব এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করছে।

দেশে উচ্চ শিক্ষিত বেকারত্বের হার উচ্চ। লাখ লাখ তরুণ ডিগ্রি অর্জন করলেও তাদের উপযুক্ত কাজের সুযোগ সীমিত। অনেকেই নিজের যোগ্যতার সঙ্গে মিল রেখে চাকরি পাচ্ছেন না। ফলে তরুণদের মধ্যে একটি গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। শুধু তরুণদের মধ্যেই নয়, বাংলাদেশের সমাজে সব বয়সের মানুষের মধ্যেই এক ধরনের গভীর হতাশা ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কর্মজীবী, মধ্যবয়সী এবং বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষিত, মেধাবী ও পিএইচডিধারী পেশাজীবীরাও আজ গভীর অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। দীর্ঘ অধ্যয়ন, গবেষণা ও দক্ষতা অর্জনের পরও অনেকেই দেশে কাঙ্ক্ষিত মর্যাদা, স্থিতিশীলতা ও পেশাগত নিরাপত্তা পাচ্ছেন না। প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী কাজ, সীমিত গবেষণা সুযোগ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত করে তুলছে। এই অনিশ্চয়তা তাদের মনে বারবার প্রশ্ন জাগায়, এই দেশে থেকে ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই অনেকে উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন, যেখানে কর্মসংস্থান, গবেষণা এবং জীবনমান তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল।

বিদেশমুখিতার প্রধান কারণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মর্যাদা ও স্বীকৃতির সংকট। অনেক তরুণ পেশাজীবী ও গবেষক মনে করেন, দেশে তাঁদের কাজের যথাযথ মূল্যায়ন হয় না। দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব, ধীর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া এবং কখনো কখনো অদৃশ্য চাপ তাঁদের কাজের পরিবেশকে সীমিত করে তোলে। যোগ্যতার চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, প্রভাব বা আনুগত্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, এই ধারণা সব বয়সীদের মধ্যে হতাশা সৃষ্টি করে। ফলে তারা এমন পরিবেশ খোঁজে, যেখানে পরিশ্রম ও মেধার সরাসরি প্রতিদান পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের কৃষি খাত দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলেও এখানে দক্ষ মানবসম্পদের জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রতিবছর অনেক গ্র্যাজুয়েট বের হলেও বাস্তবমুখী ইন্টার্নশিপ, গবেষণা ও উদ্যোক্তা তৈরির কাঠামোবদ্ধ ব্যবস্থা দুর্বল। ফলে ডিগ্রি শেষের আগেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং তারা বিদেশমুখী হয়ে পড়ে। দেশে তাৎক্ষণিক ক্যারিয়ার, গবেষণা সুযোগ ও মর্যাদার অভাব এই প্রবণতাকে আরো তীব্র করে তুলছে।

অনেক তরুণ কৃষিবিদ মনে করেন, দেশে গবেষণার চেয়ে প্রশাসনিক জটিলতা বেশি প্রাধান্য পায়। নতুন ধারণা বাস্তবায়ন করতে গেলে ধীর সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সীমিত গবেষণা তহবিল এবং নানা ধরনের বাধার মুখে পড়তে হয়। আন্তর্জাতিক মানের ল্যাব সুবিধা ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রকল্পের অভাবও একটি বড় বাধা। ফলে যাঁরা উচ্চশিক্ষা বা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যান, তাঁদের একটি বড় অংশ আর ফিরে আসে না। এতে কৃষি খাতে উদ্ভাবন ও আধুনিকায়নের গতি ক্রমশ কমে যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

শুধু কৃষি নয়, উন্নয়ন খাতেও একই ধরনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক উন্নয়ন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও টেকসই উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে দক্ষ পেশাজীবীরা কাজ করলেও তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এখন বিদেশে স্থায়ী হওয়ার পথে যাচ্ছে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, উন্নয়ন খাতের পেশাজীবীদের মধ্যে বিদেশমুখিতা প্রায় ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, বিশেষ করে তরুণ ও মধ্যম স্তরের বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। এর প্রধান কারণ হলো চাকরির অনিশ্চয়তা, প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী নিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার নিরাপত্তার অভাব। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান যেখানে স্থিতিশীল কর্মপরিবেশ, গবেষণা সহায়তা এবং উন্নত সুবিধা প্রদান করে, সেখানে দেশে অনেকেই নিজেদের ভবিষ্যেক অনিশ্চিত মনে করেন এবং বিকল্প খুঁজতে বাধ্য হন।

এই পুরো প্রক্রিয়া শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি রাষ্ট্রীয় কাঠামোর দুর্বলতার স্পষ্ট প্রতিফলন। বাংলাদেশের গবেষণা ও উন্নয়নে জিডিপির মাত্র প্রায় ০.৩% ব্যয় হয়, যা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক অবকাঠামো ও ল্যাব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে, পাশাপাশি মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা পুরোপুরি কার্যকর নয়। সবচেয়ে বড় সংকট হলো দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব ও ধারাবাহিক পরিকল্পনার ঘাটতি, যা মেধা ধরে রাখার পরিবর্তে পরোক্ষভাবে দেশত্যাগকে উৎসাহিত করছে।

বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি উদ্বেগজনক চিত্রও লক্ষ করা যাচ্ছে। নতুন সরকার এলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় এখনো অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতা ও দক্ষতার যথাযথ প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা হয়। প্রশাসনিক কাঠামোর বিভিন্ন স্তরে অভিজ্ঞতা ও মেধাভিত্তিক নেতৃত্বের ঘাটতির অভিযোগও শোনা যায়, যা নীতি বাস্তবায়নকে ধীর করে দিচ্ছে। এই অনিশ্চয়তার কারণে অনেক পরিবার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। উচ্চশিক্ষার নামে সন্তানদের বিদেশে পাঠানো এখন অনেক ক্ষেত্রে নিরাপদ ভবিষ্যৎ ও সম্ভাব্য স্থায়ী বসবাস এর সুযোগ পাওয়ার কৌশল হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে, যা সামাজিক বাস্তবতায় নতুন চাপ তৈরি করছে।

এই সংকট সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব নয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন অবশ্যই সম্ভব। প্রথমত, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কৃষি, প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন এবং খাদ্যব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। দ্বিতীয়ত, মেধাভিত্তিক নিয়োগ ও পদোন্নতি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। তরুণদের মধ্যে এই আস্থা তৈরি করতে হবে যে দক্ষতা ও পরিশ্রমের মূল্য দেশে নিশ্চিতভাবে পাওয়া যায়। তৃতীয়ত, বিদেশফেরত গবেষক ও পেশাজীবীদের জন্য বিশেষ অনুদান, গবেষণা তহবিল এবং ক্যারিয়ার সহায়তা ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে। অনেক দেশ এরই মধ্যে রিভার্স ব্রেইন ড্রেইন নীতির মাধ্যমে সফল হয়েছে। চতুর্থত, উন্নয়ন ও গবেষণা খাতে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রকল্পভিত্তিক অস্থায়ী চাকরির পরিবর্তে স্থিতিশীল পেশাগত কাঠামো তৈরি করা জরুরি।

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার তরুণ জনগোষ্ঠী। কিন্তু সেই জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে দক্ষ অংশ যদি একে একে দেশ ছাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের উন্নয়ন কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়বে। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়; এটি জ্ঞান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং মানবসম্পদের ওপর নির্ভরশীল। সেতু, রেল বা প্রযুক্তি যতই আধুনিক হোক না কেন, মেধা ছাড়া কোনো জাতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, আমরা কি আমাদের সেরা মেধাগুলোকে ধরে রাখতে পারব, নাকি তারা অন্য দেশের উন্নয়নের ভিত্তি হয়ে উঠবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পথচলা, উন্নয়নের গতি এবং জাতীয় সক্ষমতার প্রকৃত শক্তি।

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ অ্যান্ড সাসটেইনেবিলিটি ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

প্রস্তাবিত বাজেট : কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি অপ্রতুল

ড. জাহাঙ্গীর আলম

প্রস্তাবিত বাজেট : কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি অপ্রতুল

গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা শিরোনামে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট প্রস্তাব সংসদে পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী। বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি বছরের মূল বাজেটের তুলনায় তা এক লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বা ১৮.৭৩ শতাংশ বেশি। এ বাজেটের আকার হচ্ছে জিডিপির ১৩.৭ শতাংশ। স্বাধীনতার পর দেশের প্রথম বাজেটের পরিমাণ ছিল ৭৮৬ কোটি টাকা। প্রস্তাবিত নয়া বাজেট ওই বাজেট থেকে ১১৯৩ গুণ বেশি। বাংলাদেশে বাজেট বৃদ্ধির হার সাধারণত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হয়ে থাকে।  এবার তা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। অন্যান্য কারণের মধ্যে প্রধানত সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের অভিপ্রায় বাজেটের আকার সম্প্রসারিত করেছে। তবে দেশের বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির কথা বিবেচনায় নিয়ে সরকারের পরিচালন ব্যয় কমানোর মাধ্যমে একটি আঁটসাঁট বাজেট প্রস্তাবই এবার কাঙ্ক্ষিত ছিল।

প্রস্তাবিত বাজেটে মোট রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়েছে ছয় লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এটি চলতি  অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ২৩ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা হলো পাঁচ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা, তবে প্রকৃত রাজস্ব আদায় পাঁচ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে বলে মনে হয় না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় ছিল চার লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল তিন লাখ ৬৬ হাজার কোটি টাকা। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয় আগামী বছর এবারের তুলনায় প্রায় ৩৯ শতাংশ রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। এটি অনেক বড় প্রত্যাশা। এটি সম্ভব না হলে বাজেট বাস্তবায়নের জন্য ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ গ্রহণ বাড়াতে হবে। তাতে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে। উৎপাদনশীল খাতগুলোকে এর ভার বহন করতে হবে। ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়বে।

প্রস্তাবিত বাজেট : কৃষি খাতে বরাদ্দ ও ভর্তুকি অপ্রতুলগত বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৫.৫ শতাংশ। প্রাথমিক হিসাবে অর্জনের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অনেক কম, ৪.১৪ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৩.৪৯ শতাংশ। এর আগের বছরে ছিল ৪.২২ শতাংশ। এবারের লক্ষ্যমাত্রা ৬.৫ শতাংশ। আগামী বাজেট বাস্তবায়নের হার ও গুণগত মান সন্তোষজনক না হলে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নাও হতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৭.৫ শতাংশ। বাস্তবে এটা হয়তো আরো বেশি হবে। বর্তমানে গড় মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে। গত মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯.০৬ শতাংশ। সম্প্রতি দেশে কৃষির উৎপাদন বিশেষ করে বোরো ধানের উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় আগামী দিনগুলোতে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার অনমনীয় থাকবে বলে ধারণা করা যায়।

প্রস্তাবিত কৃষি বাজেট সংকুচিত হয়েছে। আগামী অর্থবছরে কৃষিবিষয়ক পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৬ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। এ টাকা মোট বরাদ্দের ৪.৯৯ শতাংশ। এর মধ্যে শস্য কৃষি খাতের জন্য রাখা হয়েছে ২৮ হাজার ৮৮১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের ৩.০৮ শতাংশ। বাকি ১.৯১ শতাংশ মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ, বন ও পরিবেশ, ভূমি ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়সমূহের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে। এটা অপ্রতুল। দিনের পর দিন বাজেটে বৃহত্তর কৃষি খাতের হিস্যা হ্রাস পেয়েছে। ২০১১-১২ সালে বৃহত্তর কৃষি খাতের হিস্যা ছিল মোট বাজেটের ১০.৬৫ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটে তা নেমে আসে ৫.৮৬ শতাংশে। এবার তা আরো কমে দাঁড়িয়েছে ৪.৯৯ শতাংশে। ২০০৯-১০ অর্থবছরে কৃষি খাতে প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল ৬.৬৫ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ২.৪২ শতাংশে নেমে আসে। এবার তা ২.৭৮ শতাংশ হবে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। উচ্চ খাদ্য মূল্যস্ফীতি হ্রাস ও এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩০ সালের মধ্যে খাদ্য এবং পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ৪ থেকে ৫ শতাংশ নিশ্চিত করা উচিত। সে লক্ষ্যে ন্যূনপক্ষে মোট বাজেটের ১০ শতাংশ অর্থ কৃষিতে নিয়োজিত করা উচিত।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে ফসল খাতে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ১৭,২৪১ কোটি টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে তার পরিমাণ ধরা হয়েছে ১৭ হাজার এক কোটি টাকা। গত বছরের মূল বাজেট থেকে তা ২৪০ কোটি টাকা কম। ২০১১-১২ সালের সংশোধিত বাজেটে কৃষি ভর্তুকির হিস্যা ছিল ৬.৪ শতাংশ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ২.১৮ শতাংশ নেমে আসে। এবার তা আরো কমে ১.৭৫ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এভাবে কৃষি ভর্তুকির ক্রম হ্রাস অনাকাঙ্ক্ষিত। তাতে বিঘ্নিত হবে কৃষির উৎপাদন। খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাহত হবে। কৃষি খাতে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় উৎপাদন বাড়িয়ে যেতে হলে কৃষি ভর্তুকির পরিমাণ মোট কৃষি উৎপাদন মূল্যের ১০ শতাংশ নিশ্চিত করা উচিত।

বাজেটে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ ৬.০৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু কৃষিসংশ্লিষ্ট অন্যান্য চারটি মন্ত্রণালয়ের মোট বরাদ্দ ৫.৭৯ শতাংশ কমে গেছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ গত বছরের মূল বরাদ্দ থেকে ১৯.৬ শতাংশ এবং সেচ ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বাজেট ৫.৯৯ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। সার্বিক কৃষি উন্নয়ন ও গ্রামীণ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের বাজেট এবার ৪.৬৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। পাট মন্ত্রণালয়ের বাজেট কমেছে ১১.০৫ শতাংশ। শিল্প মন্ত্রণালয়ের বাজেট ১০.৫২ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এভাবে দেশের উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সরাসরিভাবে জড়িত মন্ত্রণালয়সমূহের বরাদ্দ হ্রাস খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি দমনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয় না।

প্রস্তাবিত বাজেটে রেকর্ড পরিমাণ বরাদ্দ বেড়েছে জনপ্রশাসনে। এবারের মোট বরাদ্দ দুই লাখ ৬৩ হাজার ৯৪৫ কোটি টাকা। গত বছরের মূল বরাদ্দ থেকে ৭৭ হাজার ৮৫৭ কোটি টাকা বা ৪১.৮৪ শতাংশ বেশি। এ বরাদ্দ মোট বাজেটের ২৮.১৪ শতাংশ। এর সঙ্গে প্রতিরক্ষা, জনশৃঙ্খলা এবং জননিরাপত্তা যোগ করা হলে মোট বাজেটের প্রায় ৩৬ শতাংশ চলে যায়। এ ক্ষেত্রে সরকারের ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। মন্ত্রণালয়গুলোতে কর্মচারীর সংখ্যা হ্রাস করে নথি অগ্রগমনের ধাপ কমানো উচিত। আগে নতুন পে স্কেল ঘোষণার ক্ষেত্রে ৫০/৬০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির কথা ভাবা হতো। গত আওয়ামী লীগ সরকার তা বাড়িয়ে দিয়েছিল ১২০ শতাংশেরও বেশি। এবারও বেতন বৃদ্ধির হার প্রায় কাছাকাছি। এ চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেবাগ্রহণকারী ও কর প্রদানকারী ব্যক্তিদের দিয়ে নতুন পে স্কেল রিভিউ করা উচিত। দেশের সাধারণ মানুষ কিভাবে জীবন নির্বাহ করে সেদিকে লক্ষ রাখা উচিত। ভবিষ্যতে বাজেট প্রণয়নের সব কার্যক্রম সচিবালয়ের আমলাদের প্রভাবমুক্ত রেখে নিরপেক্ষ কমিশনের মাধ্যমে সম্পন্ন করা উচিত।

বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগে এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ২২ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা। এটি মোট বাজেটের ১৩.০৬ শতাংশ। এ বরাদ্দ জিডিপির প্রায়ই ২ শতাংশ। স্বাস্থ্যসেবা খাতের দুটো বিভাগে মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। এটি মোট বরাদ্দের ৬.৭০ শতাংশ। আগের বাজেটের তুলনায় তা ২০ হাজার ৯৪৪ কোটি টাকা বেশি। মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ দুটো খাতে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাজেট বৃদ্ধি সমর্থনযোগ্য।

প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও সমাজকল্যাণ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬২ হাজার ৪৪ কোটি টাকা। গত বাজেটে ছিল ৪৫ হাজার ৮৩ কোটি টাকা। বরাদ্দ বৃদ্ধির হার ৩৮.২৯ শতাংশ। এ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে একত্রে, পাঁচটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে (সমাজকল্যাণ, মহিলা ও শিশু, খাদ্য, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও মুক্তিযুদ্ধ)। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বর্তমানে বয়স্ক ভাতা প্রতি মাসে দেওয়া হচ্ছে ৬৫০ টাকা আর বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা নারী ভাতা ৯০০ টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটে যথাক্রমে ৫০ ও ১০০ টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বৃদ্ধি পেয়েছে ১১৭.৫৯ শতাংশ। গত বছরের মূল বাজেট ১৩ হাজার ৯৯১ কোটি টাকা থেকে বৃদ্ধি পেয়ে এবার হয়েছে ৩০ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে সামাজিক সুরক্ষা কাঠামো সম্প্রসারণের এই উদ্যোগ সমর্থনযোগ্য।

নয়া বাজেটে নাগরিকদের স্বস্তির জন্য বেশ কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে কর ও শুল্কহার হ্রাস করা হয়েছে। এর মধ্যে চাল, গম, তেলসহ কিছু নিত্যপণ্যের উৎস কর ১ শতাংশ থেকে ০.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে। ভোজ্যতেল উৎপাদনের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর্যন্ত কর অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। শিশু খাদ্যের কাঁচামাল  আমদানিতে শুল্কহার ১৫ শতাংশ থেকে ১০ শতাংশে হ্রাস করা হয়েছে। মসলা ও খেজুর আমদানিতে ৫ শতাংশ রেগুলেটরি শুল্ক প্রত্যাহার করা হয়েছে। কীট ও বালাইনাশক উৎপাদনে ব্যবহৃত ৩৬টি কাঁচামালের আমদানিতে মূল্য সংযোজন কর শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে। জিং সালফেট সার উৎপাদনে ব্যবহৃত জিংক ত্র্যাশ আমদানিতে শুল্ক মওকুফ করা হয়েছে। ভেটেরিনারি মেডিসিন আমদানির ক্ষেত্রে শুল্ক রেয়াত দেওয়া হয়েছে। সারের ব্যবসায়ী পর্যায়ের প্রযোজ্য ৭.৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর অব্যাহতি এবং সব ধরনের কীটনাশক আমদানি পর্যায়ে প্রযোজ্য ৭.৫ শতাংশ আগাম কর অব্যাহতির প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপের ফলে পণ্যমূল্য হ্রাস পাবে। অন্যদিকে কাজুবাদামের ওপর আমদানি শুল্ক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির ফলে দেশের অভ্যন্তরে পণ্যটির উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ উৎসাহিত হবে। পাঙ্গাশ মাছের ফিলেটের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক আরোপ করায় দেশে মৎস্যশিল্পের বাজার প্রতিরক্ষণ নিশ্চিত হবে। 

আগামী অর্থবছর থেকে প্র্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা তিন লাখ ৫০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে তিন লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। মহিলা ও ৬৫ বছরের বা তদূর্ধ্ব বয়সের করদাতাদের করমুক্ত আয়সীমা বেড়ে হবে চার লাখ ২৫ হাজার টাকা। সর্বোচ্চ কর হার আগের মতো ৩০ শতাংশ রাখা হয়েছে। করমুক্ত আয়ের সীমা চার লাখ টাকায় বাড়ানো হলে নিম্ন আয়ের করদাতারা স্বস্তি পেতেন। 

অর্থনীতিতে গতি সঞ্চারের জন্য প্রথম ধাপে (এক বছর) পুনরুদ্ধার কার্যক্রম, দ্বিতীয় ধাপে (এক থেকে তিন বছর) অর্থনীতির উত্তরণ এবং তৃতীয় ধাপে (পাঁচ বছরের মধ্যে) সমৃদ্ধ অর্থনীতি বিনির্মাণের কথা বলা হয়েছে। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.৫ শতাংশে উত্তরণ এবং মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কর জিডিপির অনুপাত ৬.৮ শতাংশ থেকে ৯.৬ শতাংশে এবং রাজস্ব জিডিপির অনুপাত ৮ শতাংশ থেকে ১১ শতাংশে উন্নীত করা হবে। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে এবং দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাবে। তাতে কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধি পাবে। মানুষের দারিদ্র্য লাঘব হবে। স্বস্তি ফিরে আসবে দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে। নয়া সরকারের বাজেট বাস্তবায়নে সাফল্য কামনা করি।

লেখক : একুশে পদকপ্রাপ্ত কৃষি অর্থনীতিবিদ। সাবেক উপাচার্য, ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ (ইউজিভি); সাবেক মহাপরিচালক, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই)।

ভারতীয় হাইকমিশনারকে সুস্বাগত ও অন্যান্য

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীর-উত্তম

ভারতীয় হাইকমিশনারকে সুস্বাগত ও অন্যান্য

গত শুক্রবার ১২ জুন মহান ভারতের মহান হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদী যশোরের বেনাপোল-পেট্রাপোল হয়ে সড়কপথে ঢাকায় এসেছেন। বহুদিন পর একজন প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক দিনেশ ত্রিবেদী বাংলাদেশের হৃদয় জয় করতে এলেন। ভদ্রলোককে দু-তিনবার দেখেছি। তখন তিনি এত বড় ছিলেন না, নামডাকও ছিল না, যখন জর্জ ফার্নান্ডেজ, ওড়িশার বিজু পট্টনায়েক, জয়প্রকাশ নারায়ণ, মোরারজি দেশাই, চরণ সিং, চন্দ্র শেখর, জগজীবন রাম, মধু লিমায়ে, হেমবতী নন্দন বহুগুনা, নানাজি দেশমুখ, অটল বিহারি বাজপেয়ি, লালকৃষ্ণ আদভানি, কর্পূরী ঠাকুর, রাজনারায়ণ, মোহন ধাড়িয়া, ইটনার ভুপেস দাসগুপ্ত, সমর গুহ, শান্তিময় রায়, কমলাপাতি ত্রিপাঠী, সিদ্ধার্থ শংকর রায়, অশোক সেন, গণি খান চৌধুরী, দেবকান্ত বড়ুয়া, যশোবন্ত রাও চৌহান, শরদ পাওয়ার, জ্ঞানী জৈল সিং, বসন্ত শাঠে, দেবীলাল, ভজন লাল, মাধব রাও সিন্ধিয়া, প্রণব মুখার্জি, অজিত পাঁজা, প্রিয়রঞ্জন দাশ মুন্সি, সোমেন মিত্র, সুব্রত মুখার্জি ও নরসিমা রাওয়ের সঙ্গে উঠাবসা করেছি। উনার মনে আছে কি না জানি না, কিন্তু আমার মনে আছে। তাই এই সময় যখন সবচেয়ে ক্ষুরধার দূরদৃষ্টি সম্পন্ন রাজনৈতিক চেতনা সমৃদ্ধ একজন মানুষের প্রয়োজন, তখন বোঝা যায় ভারত কতটা গুরুত্ব দিয়ে দিনেশ ত্রিবেদীর মতো একজন যথাযোগ্য মানুষকে বাংলাদেশে হাইকমিশনার করে পাঠিয়েছে।

ভারতীয় হাইকমিশনারকে সুস্বাগত ও অন্যান্যআমরা বহু বছর সুখ, শান্তি ও সম্প্রীতিতে কাটিয়েছি। সেটি হাজার বছরের কম হবে না। কিন্তু ইংরেজ আমাদের শান্তিতে, সম্প্রীতিতে থাকতে দেয়নি। হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ ঘটিয়ে তারা দারুণ মজায় শাসন করেছে। মারাত্মক বিভেদ সৃষ্টি করেছে উনিশ শতকে। এই বিংশ শতাব্দীর প্রায় পুরোটাই দ্বন্দ্ব, দ্বন্দ্ব আর দ্বন্দ্ব। ১৯০৫ সালে বাংলা ভাগের মধ্য দিয়ে সেটি আবার চরম আকার ধারণ করে। তারপর প্রায় সময়ই দ্বন্দ্ব লেগে থেকেছে। কিন্তু ছোটখাটো কিছু দ্বন্দ্ব থাকার পরও ভারতের স্বাধীনতাসংগ্রামে মুসলমানদের পুরোপুরি পিছে ফেলতে পারেনি। সাতচল্লিশে ভারত-পাকিস্তান আলাদা দুটি রাষ্ট্র হলে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা আরো বেড়ে যায়। পাকিস্তানিরা সব সময় ভারতকে শত্রু রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে চেষ্টা করে। চাণক্যের দেশ ভারত, কিন্তু ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নে যতটা করার তা করেনি। ভারত একটি প্রতিষ্ঠিত কৃষ্টিসভ্যতার, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতির দেশ। সেখান থেকে বাংলাদেশের যতটা সম্মান-সহমর্মিতা পাওয়ার কথা, তা পায়নি। আজ ভারতের যে উত্থান, সে উত্থানে বাংলাদেশের কোনো ভূমিকা নেইএটি যাঁরা ভাবেন, তাঁরা আহাম্মকের স্বর্গে বাস করেন। পাকিস্তান সৃষ্টির পর ১৯৭১ সাল পর্যন্ত ২৩-২৪ বছর পাকিস্তানিরা আমাদের বোঝানোর চেষ্টা করেছে, ভারত কোনো মানবের নয়, দানবের দেশ। শুধু একাত্তরে ক্ষতবিক্ষত, খণ্ডিত অন্তরাত্মা নিয়ে ভারতের শরণার্থী শিবিরে প্রায় কোটি মানুষ জীবন বাঁচাতে আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে ক্যাম্পে ক্যাম্পে কঠিন পরিবেশে তারা ভারতের হৃদয় দেখার বা বোঝার সুযোগ পায়নি। অন্যদিকে ভারতও বাংলার মানুষের অন্তরাত্মা স্পর্শ করতে তেমন চেষ্টা করেনি, বরং আমরা ছিলাম বিদেশিনির্ভর। আমরা ফ্রান্স, জাপান, জার্মানি, ইংল্যান্ড, আমেরিকার জিনিসপত্র ব্যবহার করতাম। চীনের জিনিসপত্রের প্রতি তখন আমাদের তেমন আকর্ষণ ছিল না। সেই সময় প্রায় সবকিছুই যখন ভারত থেকে আসে, ভারতের নিম্নমানের জিনিস আমাদের চোখে লাগতে থাকে। ষড়যন্ত্রকারীরা বলা শুরু করে, ভারত বাংলাদেশকে বাজার বানাতে তাদের দেশের পচা মাল চালাতে আমাদের সাহায্য করেছে। হ্যাঁ, এর যে কোনোই সত্যতা নেই, তা নয়। কিছু ভারতীয় মাড়োয়ারি ব্যবসায়ী তাঁদের পচা মাল আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু বেশিসংখ্যক আমাদের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ভারতের বাজারের নিম্নমানের দ্রব্য, যা তাদের বাজারেই চলেনি, তা এনে আমাদের বিভ্রান্ত করেছেন। সেই সময় ওইভাবে বঙ্গবন্ধু নিহত না হলে এমন হতো না। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর স্বাধীনতার স্বপ্নই অনেকটা ওলটপালট হয়ে যায়। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতের পর আবার বঙ্গবন্ধুর অনুসারীরা ক্ষমতায় এলে ভারতের দৃষ্টি পুরোটাই বাঙালি জাতির ওপর না দিয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ওপর দেওয়া হয়এটি ভারতের জন্য মারাত্মক ভুল। নিশ্চয়ই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সবার প্রতি তাদের একই রকম আচরণ করা উচিত ছিল। কিন্তু তা তারা করেনি বা করতে পারেনি। বাংলাদেশে ভারতের প্রথম হাইকমিশনার হয়েছিলেন আমার টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনীর ছাত্র সুবিমল দত্ত। তারপর সমর সেন। একজন অত্যন্ত ভালো হাইকমিশনার এসেছিলেন বিহারের মাইথনের মুচকুন্দ দুবে। এরপর একজন চমৎকার মহিলা এসেছিলেন বীণা সিক্রি। অভাবনীয় তৎপর যথার্থ একজন ভারতীয় হাইকমিশনার। তারপর মনে হয় এই এলেন রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনায় ভরপুর চাণক্যের দেশের প্রকৃত প্রতিনিধি দিনেশ ত্রিবেদী। দেখা যাক তিনি কী করেন।

ভারতের প্রতি যতটা ক্ষোভ বাংলাদেশের মানুষের, তার চেয়ে অভিমান অনেক বেশি। আর নতুন নেতারা ভারতকে যত তাচ্ছিল্যই করুন, যত খারাপই বলুন, বাংলাদেশের প্রাণ ভারতকে সম্মান করে, ভারত ভারতের মহান প্রাণ বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে আজও আলোড়ন তোলে। কিন্তু এই কয়েক দিন সীমান্তে যা হচ্ছে, তা বলার মতো নয়। বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে বহু মানুষকে পুশ ব্যাক করার ভারতের চিন্তা বা চেষ্টা খুবই হাস্যকর। এমনটা ভারতের জন্য মানায় না। ঠিক আছে, ভারত যাদের ঠেলে পাঠানোর চেষ্টা করছে, তারা যদি ভারতের বোঝা হয়ে থাকে, সরকারি হিসেবে তদন্ত করা হোক। মিথ্যা তদন্ত নয়, সেখানে সত্য থাকতে হবে। বাংলাদেশ-ভারত সরকার যেকোনো জায়গায় বসে তদন্ত করুক, তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক। একসময় আমরা কিন্তু সবাই ভারত উপমহাদেশেরই ছিলাম। হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবার জন্মভূমি ভারতবর্ষ। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত ধাত্রীর ভূমিকা পালন করেছে। এতে আমরা খুবই ঋণী। কিন্তু আমাদের জন্য যে ভারতের তেমন লাভ হয়নি, উপকার হয়নি; এটিও সত্য নয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আগে ভারতের থলিতে কোনো সশস্ত্র বিজয় ছিল না। আটচল্লিশে কাশ্মীরে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারত একেবারে নাস্তানাবুদ হয়েছিল। ১৯৬২ সালে চীন-ভারত যুদ্ধে ভারতের শোচনীয় পরাজয়। ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ হয়। সেখানেও ভারত তেমন সুবিধা করতে পারেনি। একমাত্র ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে যৌথভাবে বিজয় পতাকা হাতে পেয়েছিল ভারত। আজ ভারত এক পরাশক্তি। ব্যাপারগুলো ভারতের হৃদয়কে, যাঁরা ভারতকে চালান, তাঁদের ভেবে দেখতে বলছি। দেখা যাক, দিনেশ ত্রিবেদী কতটা কী করতে পারেন। আমরা সবাই ভারত-বাংলাদেশের সুসম্পর্ক যারা চাই, তারা দুই হাত প্রসারিত করে বুকে জড়িয়ে ধরার অপেক্ষায় থাকলাম।

অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝার পর বিএনপি ক্ষমতায় এসে এই প্রথম বাজেট পেশ করেছে। চিরাচরিত নিয়মের মতো হয়ে গেছে। বাজেট পেশ করে সরকারি দল সেটি যত খারাপই হোক, বলবে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বাজেট, ঠিক তেমনি বিরোধী দল সত্যিকার অর্থে অতি উত্তম বাজেটকেও বলবে একেবারে অখাদ্য, এটি কোনো বাজেটই হয়নি। এ এক অলঙ্ঘনীয় রীতির মতো হয়ে গেছে। আমি এখন বিরোধী দলেও না, সরকারি দলেও না, একেবারে সাধারণ মানুষ। আমার কাছে এই বাজেটকে রাস্তায় ফেলে দেওয়া কাগজের মতো মনে হয়নি। যতটা সম্ভব যথার্থই হয়েছে। দেশের শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ মানুষ বাজেট বোঝে না, বাজেট নিয়ে তাদের তেমন মাথাব্যথাও নেই। তাদের ব্যথা ছেলেমেয়ে নিয়ে কোনোক্রমে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারবে কি না। বাংলাদেশের প্রথম বাজেট হয়েছিল ৫৭৮ কোটি টাকা। আর এবারের বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। কোথায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি আর কোথায় ৫৭৮ কোটি! এই বিপুল বাজেট নিয়ে আমার তেমন ভাবনা নেই, আমার ভাবনা এই বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়ন নিয়ে। তবে একটি বিষয় আমার খুবই অবাক লেগেছে, ট্যাক্স প্রত্যাহারেও বিরোধী দল নিন্দা করেছে। ৬০টি দ্রব্যের ওপর শুল্ক ছাড় দিয়েছে বর্তমান সরকার। আর বাজেটের পরমুহূর্তে প্রতিবছরই নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ে। এবার আহামরি তেমনটি হয়নি। এটি নিশ্চয়ই বাজেটের সফলতা। এ জন্য অবশ্যই অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে অভিনন্দন জানাতে হয়। সেই সঙ্গে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকেও। যদি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দলের না খাওয়া কর্মীদের সামলাতে পারেন, তাহলে অবশ্যই তিনি সাধুবাদ পাবেন এবং এর ফলও দেখতে পাবেন। সরকারে এবং বিরোধী দলে কোনোখানে না থাকায় মুক্তমনে হৃদয়ের সবটুকু দিয়ে মানুষের সরকার হিসেবে, জনগণের সরকার হিসেবে অভিনন্দন জানাতে চাই।

মা ছাড়া সন্তানের অবলম্বন কী? একজন মা সন্তানের জন্য যে কষ্ট করেন, সন্তানকে যে পরিমাণ ভালোবাসেন, পৃথিবীর ইতিহাসে এর কোনো বিকল্প নেই। সেদিন মিরপুরে নূরজাহান বেগম নামের এক পূর্ণবয়সী মা মারা গেছেন। সে এক জঘন্য ইতিহাস। সমাজে প্রতিষ্ঠিত চারটি সন্তান থাকতেও মা কবে মরেছেন কেউ জানে না। মেয়ে মায়ের সঙ্গেই থাকে। অথচ মা মরে পড়ে আছেন, সে মেয়েও জানে না। এক ছেলে কানাডায়, এক ছেলে বুয়েটের শিক্ষক, আরেক ছেলে বাংলাদেশ সরকারের যুগ্ম সচিব। কী হবে আমার দেশে? যুগ্ম সচিব খুবই দায়িত্বপূর্ণ পদ। সে যদি মায়ের সঙ্গে এমন করে, তাহলে দেশের সঙ্গে কেমন করবে? দেশের প্রতি তার কি মায়া থাকবে? আমরা তো সরকারি কর্মচারী নই। আমার মা মারা গিয়েছেন ২০০৪ সালে। তাঁকে ইনটেনসিভ কেয়ারে লাইভ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। ৩ এপ্রিল রাত ১টা ৪০ মিনিটে তাঁর লাইফ সাপোর্ট খুলে দেওয়া হয়। আমি তাঁর দুটি পা বুকে চেপে বারবার কালেমা পড়ছিলাম, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুল্লাহ (সা.)। লাইফ সাপোর্ট খুলে নিলে কী একটা যেন ঘর থেকে চলে গেল। আমি অনেকবার ভেবেছি, শব্দটা এসির কম্প্রেসর বন্ধ হলে যেমন হয় অনেকটা তেমনি। আর এই সমাজের প্রতিষ্ঠিত সন্তানরা মাকে দেখে না, বাবাকে দেখে না। ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছি বউদের খরপোশ, আলাদা হয়ে গেলে সন্তানের খরপোশ, মা-বাবার খরপোশ কোথায়? দেখা যাক, এ নিয়ে সরকার কী করে, সমাজ কী করে? সুস্থ সমাজে এমন অন্যায়-অবিচার চলতে পারে না।

কোথায় আছি, তা-ও বুঝতে পারছি না। রামিসা নামের সাত-আট বছরের ফুলের পাপড়ির মতো একটি সন্তান ধর্ষণের শিকার হয়ে ধর্ষকের হাতেই নিহত হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে অল্প সময়ে ধর্ষক ও ধর্ষকের স্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড দিলেই হবে না, সমাজে দণ্ডের প্রভাব পড়তে হবে। যেকোনো দণ্ড দেওয়া হয় সমাজকে সংশোধিত হওয়ার জন্য, সমাজের দূষিত মানুষকে সমাধান করার জন্য। আশা করি, রামিসা হত্যা ও ধর্ষণের বিচার যথাযথ সমাজের ওপর প্রভাব ফেলবে।

গত পরশু ছিল আমার জন্মদিন। কিছুই বুঝতে পারলাম না। স্ত্রী চলে যাওয়ার পর কেমন যেন সবকিছুই অন্ধকার, খালি খালি লাগে। ছেলেমেয়েদের জন্য দারুণ কষ্ট হয়। এর মধ্যেই সেদিন ১৩ জুন মওলানা মোহাম্মদ আলী কলেজের ভিপি টাঙ্গাইল জেলা কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি আব্দুল হাই আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সেই ১৯৬২-৬৩ সালে শিক্ষা কমিশন আন্দোলন থেকে তাঁর সঙ্গে পরিচয়। সত্যি কথা বলতে কি, একসময় আব্দুল হাই আমার নেতা ছিলেন (১৯৬২-১৯৭১)। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। আগস্টের দিকে জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা মানকারচর এসেছিলেন। সঙ্গে ছিলেন রংপুরের মতিউর রহমান এবং আরো একজন এমপি। মানকারচরে কামাখ্যা মন্দিরের নিচে প্রায় লাখো শরণার্থীর সমাবেশ ঘটিয়েছিলেন এই আব্দুল হাই। তাঁর ক্ষুরধার বক্তৃতা শুনে জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা পিঠ চাপড়ে বলেছিলেন, তোমার ভাষা বুঝিনি, তবু সাধারণের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখলাম, আমরা বাংলা বুঝলে আরো হৃদয়াঙ্গম করতে পারতাম। এমন একজন সাথি, যাঁর আস্থা-বিশ্বাস পরিচয়ের দিন থেকে আমৃত্যু অটুট ছিল। তাঁর জানাজায় শরিক হয়ে কলিজার বোঁটা ছিঁড়ে যেতে চাচ্ছিল। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, মহান আল্লাহ যেন আব্দুল হাইকে বেহেশতবাসী করেন। আর যেন মুক্তিযোদ্ধাদের মান-সম্মান হারাতে না হয়। ইদানীং মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের পতাকায় আবৃত করে পুলিশি সালাম দিয়ে বিউগল বাজিয়ে চিরবিদায় জানানো হয়। কিন্তু যাঁরা বিদায় জানান, তাঁদের তেমন বোধশক্তি নেই। ময়মুরব্বিরও কোনো খবর রাখেন না। টাঙ্গাইল মুক্তিযুদ্ধে শুধু কাদেরিয়া বাহিনীই ছিল। আমি উপস্থিত থাকার পরও দু-চারবার দেখেছি কেউ জিজ্ঞেস করে না, অনুমতি নেয় না। কোনো বোধও নেই। কিন্তু কালিহাতীর ইউএনওকে দেখলাম, তাঁর কিছুটা জ্ঞান-বুদ্ধি আছে। কিন্তু সখীপুরে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার জানাজায় এক মহিলাকে দেখে বলেছিলাম, পুরুষের জানাজায় মহিলা শরিক হয়ে সরকারি সম্মান জানানো শরিয়ত শুদ্ধ নয়। কিন্তু তিনি তা মানেননি, বরং বাচ্চাদের মতো সরকারের দায়িত্ব বলে নানা কথা বলেছেন। সে যাক, আমি যখন সরকারি সম্মানের কথা বলেছিলাম, তখন আমার অন্তরে ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকৃতই রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর কথা। যাঁরা গার্ড অব অনার দেবেন, তাঁরা অজু করে পূতঃপবিত্র হয়ে একজন স্বাধীনতাযুদ্ধের মহান সৈনিককে অন্তিমবিদায় জানাবেন। কিন্তু তা হওয়ার নয়। আল্লাহ আব্দুল হাইকে তাঁর সব ভুলত্রুটি ক্ষমা করে বেহেশতবাসী করুন। আমিন।

লেখক : রাজনীতিক

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব : বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা ও করণীয়

ড. কবিরুল বাশার

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব : বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা ও করণীয়

১৫ জুন বিশ্ব ডেঙ্গু দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘One World Against Dengue’ (ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব)আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। ডেঙ্গু আজ আর কোনো নির্দিষ্ট দেশ, অঞ্চল বা ঋতুর মধ্যে সীমাবদ্ধ একটি রোগ নয়, এটি বিশ্বের দ্রুততম বিস্তারমান মশাবাহিত সংক্রামক রোগগুলোর অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ, বৈশ্বিক যোগাযোগ ও মানুষের ক্রমবর্ধমান চলাচলের ফলে ডেঙ্গু এখন একটি আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে এবং প্রতিবছর আনুমানিক ১০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন মানুষ এই রোগে আক্রান্ত হয়। উষ্ণমণ্ডলীয় ও উপ-উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের নগর ও উপনগর এলাকাগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ডেঙ্গু ভাইরাস সংক্রমিত এডিস মশার কামড়ের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে এবং যদিও বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংক্রমণ উপসর্গহীন অথবা মৃদু জ্বর হিসেবে দেখা দেয়, কিছু ক্ষেত্রে এটি মারাত্মক ডেঙ্গুতে রূপ নিয়ে প্রাণহানির কারণ হতে পারে।

বিশ্ব ডেঙ্গু দিবস সামনে রেখে সিঙ্গাপুরে শুরু হয়েছে এশিয়া ডেঙ্গু সামিট ২০২৬, যেখানে বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশের গবেষক, বিজ্ঞানী, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, নীতিনির্ধারক, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধ, রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিনিধিরা একত্র হয়েছেন। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব প্রতিপাদ্যকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যেই এই সম্মেলনের আয়োজন। ডেঙ্গুর মতো একটি আন্তঃসীমান্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় কোনো দেশ এককভাবে সফল হতে পারে না; প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, তথ্য বিনিময়, গবেষণার সমন্বয় এবং অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি। তাই এশিয়া ডেঙ্গু সামিট শুধু একটি বৈজ্ঞানিক সম্মেলন নয়, বরং বৈশ্বিক সংহতির এক প্রতীক।

ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব : বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা ও করণীয়বাংলাদেশ থেকেও এই সম্মেলনে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ রয়েছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও আইইডিসিআরের গবেষকরা সেখানে অংশগ্রহণ করছেন। তাঁদের উপস্থিতি বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা, গবেষণার ফলাফল এবং ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশের সফল উদ্যোগ ও উদ্ভাবনী কৌশল থেকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। ডেঙ্গু আজ যেহেতু একটি বৈশ্বিক সমস্যা, তাই এর সমাধানও হতে হবে বৈশ্বিক সহযোগিতা ও স্থানীয় উদ্যোগের সমন্বয়ে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ডেঙ্গুর বাস্তবতা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। বিশ্ব ডেঙ্গু দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে ডেঙ্গু এখন আর শুধু একটি মৌসুমি সংক্রামক রোগ নয়, এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ও ক্রমবর্ধমান জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। গত এক দশকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোগটির প্রকোপ ও বিস্তার ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে ২০১৯, ২০২৩ ও ২০২৪ সাল বাংলাদেশের ডেঙ্গু ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে থাকবে। ২০১৯ সালে দেশে এক লাখ এক হাজার ৩৫৪ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল, যা সে সময় পর্যন্ত দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ছিল। কিন্তু মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে সেই রেকর্ড ভেঙে যায়। ২০২৩ সালে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় তিন লাখ ২১ হাজার ১৭৯ এবং একই বছরে এক হাজার ৭০৫ জন মানুষের মৃত্যু ঘটে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ ডেঙ্গুজনিত মৃত্যুর ঘটনা। ২০২৪ সালেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটেনি; ওই বছরে এক লক্ষাধিক মানুষ আক্রান্ত হয় এবং ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। এই ধারাবাহিক উচ্চ সংক্রমণ ও মৃত্যুহার প্রমাণ করে যে বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন কার্যত একটি এন্ডেমিক রোগে পরিণত হয়েছে।

এই পরিস্থিতির পেছনে একাধিক কারণ সক্রিয় রয়েছে। দ্রুত ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নির্মাণাধীন ভবনের অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশ, প্লাস্টিক বর্জ্যের স্তূপ এবং গৃহস্থালি পর্যায়ে পানি জমে থাকার প্রবণতা এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ সৃষ্টি করছে। অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘায়িত বর্ষাকাল, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং আর্দ্রতার পরিবর্তন মশার জীবনচক্রকে আরো অনুকূল করে তুলছে। ফলে যে মৌসুমে আগে ডেঙ্গুর প্রকোপ সীমিত থাকত, এখন সেই সময়সীমা ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। একই সঙ্গে জনসচেতনতার ঘাটতি এবং প্রতিক্রিয়াশীল নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে সমস্যাটি আরো জটিল হয়ে উঠছে।

ডেঙ্গুর প্রভাব শুধু স্বাস্থ্য খাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটও বটে। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক রোগীর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে। হাসপাতালগুলোতে শয্যাসংকট, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি, রক্তের চাহিদা বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপর অতিরিক্ত কর্মচাপ একটি নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে রোগের বিস্তার উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং বহু পরিবারকে আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ডেঙ্গু শক সিনড্রোম এবং অন্যান্য জটিলতার কারণে মৃত্যুর ঘটনাগুলো এই সংকটকে আরো গভীর করে তুলছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বর্তমান ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও স্পষ্ট। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, সীমিত ভেক্টর নজরদারি ব্যবস্থা এবং অতিরিক্ত কীটনাশকনির্ভর নিয়ন্ত্রণ কৌশল দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর ফল দিতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে রোগীর তথ্য, মশার ঘনত্ব এবং পরিবেশগত ঝুঁকির তথ্য একত্রে বিশ্লেষণ করা হয় না। একই ধরনের কীটনাশক দীর্ঘদিন ব্যবহারের ফলে মশার মধ্যে প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি বড় উদ্বেগ।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো একটি সমন্বিত, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং টেকসই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কৌশল গ্রহণ করা। Integrated Vector Management (IVM) বা সমন্বিত ভেক্টর ব্যবস্থাপনা হতে পারে এর মূলভিত্তি। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস। কারণ এডিস মশার বংশবিস্তার বন্ধ না করে শুধু প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিধনের মাধ্যমে দীর্ঘ মেয়াদে সফলতা অর্জন সম্ভব নয়। বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, নির্মাণাধীন ভবন এবং সরকারি স্থাপনাগুলোতে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব লার্ভা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, জৈব নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এবং ব্যাকটেরিয়াভিত্তিক লার্ভিসাইড ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব বাড়াতে হবে।

ফগিং কার্যক্রমকে বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালনা করা জরুরি। অকারণ ও নির্বিচারে ফগিং যেমন দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর নয়, তেমনি এটি পরিবেশের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এর পরিবর্তে রোগের হটস্পট এলাকাগুলো চিহ্নিত করে লক্ষ্যভিত্তিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ভেক্টর সার্ভেইল্যান্স ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে রোগীর তথ্য, মশার ঘনত্ব এবং আবহাওয়াগত উপাত্ত একত্রে বিশ্লেষণ করে আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা বা Early Warning System গড়ে তোলা হবে। আধুনিক প্রযুক্তি, জিআইএস ম্যাপিং, মোবাইলভিত্তিক রিপোর্টিং এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর পূর্বাভাস ব্যবস্থাও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো জনসম্পৃক্ততা। ডেঙ্গু মোকাবেলা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়, এটি একটি সামাজিক আন্দোলন। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ ও বেসরকারি খাতসবার সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী সাফল্য অর্জন সম্ভব নয়। মানুষের আচরণগত পরিবর্তন, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত উৎস ধ্বংস কার্যক্রমকে সামাজিক সংস্কৃতির অংশে পরিণত করতে হবে।

বিশ্ব ডেঙ্গু দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্য ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে এক বিশ্ব আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কেউ একা নয়। এটি এমন একটি সংকট, যার সমাধান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কার্যকর নীতিনির্ধারণ এবং নাগরিক অংশগ্রহণের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মধ্যেই নিহিত। বাংলাদেশের জন্য এই দিবস শুধু সচেতনতা বৃদ্ধির উপলক্ষ নয়, বরং একটি আত্মসমালোচনার সুযোগ, যেখানে আমাদের বর্তমান সীমাবদ্ধতাগুলো চিহ্নিত করে ভবিষ্যতের জন্য একটি শক্তিশালী, সমন্বিত ও টেকসই কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এখনই সময় প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে এসে প্রতিরোধভিত্তিক, তথ্যনির্ভর এবং দীর্ঘমেয়াদি ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কৌশল বাস্তবায়নের। তাহলেই হয়তো আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সুস্থ এবং ডেঙ্গুমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারব।

লেখক : অধ্যাপক, কীটতত্ত্ববিদ ও

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়