মহাকাব্যিক রোমান্টিক সিনেমা ‘রোমান হলিডে’ গ্রেগরি প্যাক আর অড্রে হেপবার্নকে তো অমরত্ব দিয়েছেই, বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দিয়েছিল দুই চাকার এক স্কুটারকেও। ১৯৫৩ সাংবাদিক গ্রেগরির ভেসপার পেছনে বসে রাজকুমারী হেপবার্নের রোমের রাস্তায় ঘুরে বেড়ানোর দৃশ্য এখনও নস্টালজিক করে কোটি কোটি মানুষকে। সেই যে ভেসপার দুরন্ত গতি, তা আর থামেনি। এখন আধুনিক সব মোটর সাইকেলের ভিড়েও ভেসপা টিকে আছে তার আভিজাত্য, আইকনিক স্টাইল নিয়ে; কোটি মানুষের নস্টালজিয়া হয়ে।
১৯৪৬ সালে প্রথম ভেসপা নেমেছিল রাস্তায়। তারপর ১৯৫৩ সালে রোমান হলিডের পর্দা ধরে বিশ্বজোড়া খ্যাতি। সেই ভেসপার ৮০ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে ঐতিহাসিক রোম সেজেছিল রঙিন সাজে। চারদিনের এ উৎসবে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ভেসপাপ্রেমীরা জড়ো হয়েছিলেন। বৃহস্পতিবার শুরু হয়ে রবিবার শেষ হয়েছে বর্ণাঢ্য ভেসপা উৎসব। শনিবার ছিল ভেসপার গ্র্যান্ড র্যালি। সেদিন রোমের আইকন কলোসিয়াম আর রোমান ফোরামের আশেপাশের রাস্তা ছিল ভেসপায় সয়লাব। ১০ হাজারেরও বেশি ভেসপাপ্রেমী তাদের প্রিয় বাহন নিয়ে সামিল হয়েছিলেন র্যালিতে। ভেসপার চেনা খটখট আওয়াজে সেদিন আড়ালে ছিল বিলাসবহুল সব গাড়িও।
ভেসপার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পিয়াজিও এবং ভেসপাপ্রেমীদের বৈশ্বিক সংগঠন ভেসপা ওয়ার্ল্ড ক্লাব এ উৎসবের আয়োজন করে। ঐতিহাসিক রোম শহরের পৌর প্রশাসন এ আয়োজনের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার রোমের মেয়র রবার্তো গুয়ালতিয়েরি স্টেডিয়াম অফ দ্য মার্বেলস-এ ফিতা কেটে উৎসববের উদ্বোধন করার পর বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা ভেসপাপ্রেমীরা নেচে, গেয়ে, স্লোগান দিয়ে, পতাকা উড়িয়ে উৎসবে যোগ দেন। অনেকেই সরাসরি উপহারের দোকানের দিকে ছুটে যান। সেখান থেকে তারা ভেসপা জ্যাকেট ও টুপি থেকে শুরু করে ভেসপা কম্বল, ভেসপা পানির বোতল এবং ভেসপার ছাতা পর্যন্ত কিনে নেন। যারা একদম শুরুতে এসেছিলেন, তাদের বেশিরভাগেরই নজর ছিল সীমিত সংস্করণের হেলমেটের দিকে, যাতে লেখা ছিল ‘৮০ ইয়ার্স অফ অ্যান আইকন’। একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীতে ভেসপার কিছু ক্লাসিক দৃশ্য দেখানো হয়েছিল— যেমন ফুলের মাঠে পিকনিক করা দম্পতি, বিকিনি ও বিচবল নিয়ে সমুদ্র সৈকতে ছুটি কাটানো বা ভূমধ্যসাগরীয় রোদের নিচে রোড ট্রিপ। এর পাশাপাশি এমন কিছু দৃশ্যও ছিল যা কেউ কল্পনাও করবে না, যেমন ১৯৬৩ সালে অভিযাত্রী সোরেন নিলসেনের ভেসপায় চড়ে সুমেরু বৃত্তে পৌঁছানো।
ভেসপার জন্মদির বৃহস্পতিবার থেকেই নানা প্রান্ত থেকে আসা ভেসপাপ্রেমীরা রোমে জড়ো হন। তাতে বদলে যায রোমের চেনা চেহারা। শহরের সমস্ত রাস্তাঘাট নানান রঙের ভেসপা আর একই রঙের টি-শার্ট পরা মানুষে সয়লাব। স্টেডিয়াম অফ দ্য মার্বেলস-এর বাইরের পার্কিং লটে আট দশকের সব মডেলের ভেসপার সারি দেখতে ভিড় করেছেন হাজারো মানুষ। রোমের মোড়ে মোড়ে সুন্দর করে সাজানো ভেসপার খটখট আওয়াজ মুহূর্তে মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় ষাটের দশকে। ঐতিহাসিক এ শহরে নস্টালজিয়ার টান- দুয়ে মিলে অন্যরকম এক সুর।
ইউরোপ, আমেরিকা, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ফিলিপাইন, জামানি, জাপান- বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ রোমে এসেছেন ভেসপার আহবানে, ভালোবাসার টানে। ফ্রান্স থেকে এসেছেন অবসরপ্রাপ্ত নাটালি ডুনান্ড। ভেসপার ৮০তম জন্মদিনের সাখে নিজের ৬১তম জন্মদিনও উদযাপন করছেন এই নারী, ‘ভেসপার প্রতি এই ভালোবাসা আসলে ইতালীয় শৈলী, স্বাধীনতা আর ষাটের দশকের প্রতি টান থেকে। আমি এটি খুব ভালোবাসি।’ ডুনান্ডের প্রিয় বাহনের পেছনে বসেছিল তার প্রিয় পোষা কুকুরটিও। আট বছর বয়সী মেয়েকে পেছনে বসিয়ে টোকিও থেকে এসেছেন এক ভেসপাপ্রেমী। আলাদা করে অনেকের নজর কেড়েছেন জার্মানি থেকে আসা এক ব্যক্তি। তার বাম পায়ের পেশিবহুল গোড়ালিতে ভেসপা লোগোর ট্যাটুর পাশে সুন্দর হাতের লেখায় তিনটি শব্দ লেখা ছিল, ‘লা দোলচে ভিটা’, যার অর্থ ‘মধুময় জীবন’।
ভেসপা মানে শুধু নস্টালজিয়া নয়, যারা ষাটের দশকে জন্ম নেননি; তারাও ভেসপা ভালোবাসেন। এ যেন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা। অনেকেই বলছেন, তারা বড় মোটরসাইকেল ছেড়ে হালকা এবং সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য ভেসপা বেছে নিয়েছেন। কারণ এটা চালাতে কোনো ঝামেলা নেই। ৫৯ বছর বয়সী ট্রাক ড্রাইভার অ্যান্ড্রু ওয়ালটন ২০ বছর আগে প্রথম ভেসপা কিনেছিলেন, তারপর অন্য দিকে নজর দেননি। তিনি বলেন, ‘শুধু উঠুন, মোচড় দিন আর চলতে শুরু করুন। একদম সহজ কাজ।’ তিনি নিউক্যাসল থেকে আট দিন ধরে ভেসপা চালিয়ে রোমে এসেছেন উৎসবে যোগ দিতে। প্রথমে ফেরি দিয়ে রটারড্যাম, তারপর জার্মানির রাইন নদী হয়ে অস্ট্রিয়ার রোমান্টিক রোড এবং সবশেষে ইতালির উপকূল ধরে নিচে নেমে এসেছেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও অল্পকিছু মানুষ ভেসপার প্রেমে মজেছেন। এ এমনই এক টান, একবার পড়লে আর ফেরা যায় না। ইন্ডিয়ানার ১০৮ বছর পুরোনো এক গাড়ি ডিলারশিপের মালিক বার্ক স্যান্ডম্যান দুই দশক আগে প্রথম ভেসপা কিনেছিলেন। আশেপাশে এর কোনো বিক্রেতা নেই দেখে তিনি সরাসরি ভেসপা কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করেন। এরপর থেকে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক হাজারেরও ভেসপা বিক্রি করেছেন এবং নিজের জন্য রেখেছেন ১৫টি। ভেসপা ভিলেজের ভেতরে দাঁড়িয়ে স্যান্ডম্যান বলেন, ‘ভেসপা নিয়ে কেউ কখনো কোনো খারাপ কথা বলে না। সত্যি বলতে, এটা অবিশ্বাস্য। যারা অন্য ব্র্যান্ড ছেড়ে ভেসপা ব্যবহার শুরু করে, তারা আর কখনো পেছনে ফিরে তাকায় না। এর মধ্যে অন্যরকম একটা ব্যাপার আছে। আর সবাই ইতালীয় জিনিস পছন্দ করে। ইউরোপ থেকে ফিরে এসে অনেকেই এই ভেসপার প্রেমে পড়ে যান।’
চার চাকার জগতে ফোক্সওয়াগনের বিটলের যে মর্যাদা, দুই চাকায় ভেসপা তেমনি। আবেগ, ভালোবাসা আর স্মৃতির এক রোমান্টিক রসায়ন। একবার কেউ ভেসপায় চড়লে তা আর ছাড়তে পারেন না, অন্তত ভুলতে তো পারেনই না।
ভেসপার শুরুর গল্পটা বেশ মজার। ভেসপার নির্মাতা প্রতিষ্ঠান পিয়াজিও আসলে বিমান বানাতেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পিয়াজিও উদোক্তারা দেখতে পান, তাদের কারখানাটি ধ্বংস হয়ে গেছে। এখানে আবার বিমান বানানো সম্ভব নয়। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পিয়াজিও আকাশ থেকে মাটিতে নেমে আসেন। বানান দুই চাকার ভেসপা। অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে বানানো সেই ভেসপাই পিয়াজিওকে আবার খ্যাতির আকাশে তুলে দেয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালির অর্থনীতিতে গতি আনতেও এই দুই চাকার ভেসপার অবদান কম নয়।
পিয়াজিওর বিপণন বিভাগের নির্বাহী ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেভিড জানোলিনির জানান, ‘প্রথম দিকে নারীরাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য, কারণ তারা দীর্ঘ স্কার্ট পরেও পা না দেখিয়ে এটি সহজেই চালাতে পারতেন। এর গঠন, এর মার্জিত রূপ এবং অত্যন্ত আকর্ষণীয় ভঙ্গিটি পুরুষের চেয়ে নারীর সাথেই বেশি মানানসই।’ তবে ভেসপার প্রাথমিক লক্ষ্য পূরণ হয়নি। নারীরা তো বটেই, বিশ্বের কোটি পুরুষের হৃদয়ও জয় করেছে ভেসপা। ষাটের দশকে প্রেমিকাকে কল্পনায় অড্রে হেপবার্ন ভেবে ভেসপায় ঘুড়ে বেড়ানোর স্বপ্ন দেখেননি, এমন রোমান্টিক পুরুষ খুঁজে পাওয়া ভার। জানোলিনি জানান, গত ৮০ বছরে পিয়াজিও বিশ্বজুড়ে ২ কোটি ভেসপা বিক্রি করেছেন। বর্তমানে বিশ্বের ১১০টি দেশে এটি বিক্রি হয়।