ভারতের পুনের ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়াল হত্যার ঘটনায় নতুন দাবি নিয়ে সামনে এসেছেন অভিযুক্ত চেতন চৌধুরীর বাবা। প্রাথমিক তদন্ত শেষে পুলিশের ধারণা, কেতন আগরওয়ালের বাগদত্তা সিয়া গোয়েল এবং তার প্রেমিক চেতন চৌধুরী পরিকল্পিতভাবে প্রথমে ভারী বস্তু দিয়ে আঘাত করেন ও পরে ৪০০ ফুট ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়ে ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালকে হত্যা করেন। দুই অভিযুক্তকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তারা এখন সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডে আছে।
তবে চেমন চৌধুরীর বাবা বাবুলাল চৌধুরী দাবি করেছেন, এ ঘটনায় তার ছেলের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সিয়া গোয়েল নিজে বাঁচার জন্য চেতনকে ফাঁসাচ্ছে। বাবুলাল চৌধুরী দাবি করেন, সিয়ার সঙ্গে চেতনের প্রেমের সম্পর্কের যে কথা বলা হচ্ছে, তা তারা জানতেন না। বাবুলালের দাবি, থানায় যাওয়ার আগে তিনি কখনো সিয়ার নাম শোনেননি, দেখেনওনি।
পুলিশ রিমান্ডে থাকা চেতন চৌধুরীর সঙ্গে থানায় দেখা করেন তার পরিবারের সদস্যরা। চেতনের বাবা দাবি করেন, চেতন তাদের বলেছে, ঘটনার সময় তিনি বেশ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তবে চেতন কেন ওই সময় লোহাগড় দুর্গে গিয়েছিলেন, এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর ছিল না তার বাবার কাছে। চেতনও তাদের এ ব্যাপারে কিছু বলেনি। ব্যবসায়ী বাবুলাল চৌধুরী পুনেতে একটি দোকান চালান।
তিনি দাবি করেন, ‘আমার ছেলে মোটেই এমন নয়। সে নিয়মিত দোকানের কাজে আসত।’
চেতনের চাচা উদয়রাম চৌধুরীও তার ভাতিজাকে নির্দোষ দাবি করে বলেন, ‘চেতন একজন খেলোয়াড় এবং সব সময় সরাসরি কথা বলা মানুষ। বাজারে বা এলাকায় কেউ কখনো তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করেনি।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের পরিবারের কেউ চেতনের প্রেমের সম্পর্কের কথা জানত না।’ তিনি জানান, থানায় তারা এক মিনিটের জন্য চেতনের সঙ্গে কথা বলতে পেরেছিলেন। কাঁদতে কাঁদতে চেতন তাদের বলেছেন, তিনি নির্দোষ, তাকে ফাঁসানো হচ্ছে।
চেতনের আইনজীবী রাম সাহানেরও দাবি তার মক্কেল নির্দোষ, ‘এফআইআরে কথিত অপরাধে তার (চেতন) ভূমিকার কথা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি। প্রধান আসামির প্রেমিক, শুধু এ ভিত্তিতেই তাকে মামলায় জড়ানো হয়েছে।’
তবে পরিবার ও আইনজীবীর দাবির সঙ্গে পুলিশের তদন্তের কোনো মিল নেই। গত ১৮ জুন কেতন আগরওয়াল পুনের লোহাগড় দুর্গ থেকে পড়ে মারা যান। সঙ্গে থাকা তার বাগদত্তা সিয়া গোয়েল পুলিশ ও পরিবারকে জানান, ছবি তোলার সময় কেতন পড়ে গেছেন। প্রাথমিকভাবে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা মনে হলেও পরে পরিবার ও পুলিশ নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বুঝতে পারে এটি একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। প্রাথমিক তদন্তে সম্পৃক্ততা নিশ্চিত হওয়ায় ঘটনার ৫ দিন পর গত ২৩ জুন সিয়া গোয়েল ও তার প্রেমিক চেতন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন পুনের একটি আদালত নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুজনকে ৭ দিনের পুলিশ রিমান্ডে পাঠিয়েছেন।
গত বছরের নভেম্বর থেকে সিয়া ও চেতন প্রেমের সম্পর্কে জড়িয়েছেন। গত ফেব্রুয়ারিতে পারিবারিকভাবে ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালের সঙ্গে সিয়ার বাগদান হয়। প্রস্তুতি চলছিল আগামী নভেম্বরে জমকালো বিয়ের অনুষ্ঠানের। এ জন্য জয়পুরে ১৭ কোটি টাকায় একটি প্রাসাদ ভাড়া করা হয়েছিল। অতিথিদের আনা-নেওয়ার জন্য দুটি বিমান প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। কিন্তু সিয়া ও তার প্রেমিক চেতন মিলে তাদের প্রেমের পথের কাঁটা হয়ে দাঁড়ানো কেতনকে একেবারে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন এবং ১৮ জুন লোহাগড় দুর্গে তা বাস্তবায়ন করেন।
মোবাইল কল রেকর্ড পর্যালোচনা করে পুলিশ দেখেছে, গত ৭ মাসে সিয়া ও চেতন ২ হাজার ৪ বার টেলিফোনে মোট ২৩৮ ঘণ্টা কথা বলেছেন। সিসিটিভি ফুটেজ পুলিশ দেখেছে, ঘটনার দিন সিয়া ও কেতনকে ২০-৩০ ফুট পেছন থেকে হুডি পরা এক যুবক অনুসরণ করছিলেন। সে যুবকটিই চেতন। ৩৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তামপাত্রায় ট্র্যাকিং ট্রেইলে হুডি পরার সন্দেহ থেকেই পুলিশ চেতন পর্যন্ত পৌঁছাতে পেরেছে।
পুনের (গ্রামীণ) পুলিশ সুপার সন্দ্বীপ সিং গিল জানান, ১৮ জুন সকালেও পুনের একটি ক্যাফেতে সিয়া ও চেতন বৈঠক করেছেন। পুলিশের ধারণা, সকালের বৈঠকে সিয়া ও চেতন মিলে কেতনকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন এবং ঠিক কোন জায়গা থেকে তাকে ফেলে দেওয়া হবে, তা ঠিক করেন। বহুল আলোচিত এ মামলার তদন্ত সম্পর্কে সন্দ্বীপ গিল বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে সব সূত্র এক সুতায় গাঁথার পর সিয়া ও চেতনের পূর্বপরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের বিষয়টি সামনে এসেছে।’





