বাংলাদেশে এখনো রক্তের বড় অংশের চাহিদা পূরণ হয় রোগীর স্বজন ও পরিচিতজনদের মাধ্যমে। অথচ নিরাপদ ও টেকসই রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন স্বেচ্ছায় রক্তদানের একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি। বর্তমানে দেশে মোট রক্তের চাহিদার মাত্র ৩০ শতাংশ আসে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে। এই হার শতভাগে উন্নীত করতে সামাজিক সচেতনতা, আধুনিক ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বিশ্ব রক্তদাতা দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশনের আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, রক্ত কোনো কারখানায় তৈরি হয় না। একজন মানুষের দেওয়া রক্তই আরেকজন মানুষের জীবন বাঁচানোর একমাত্র মাধ্যম। তাই রক্তদানকে জরুরি মুহূর্তের প্রতিক্রিয়া হিসেবে নয়, বরং নিয়মিত সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
রাজধানীর মালিবাগে থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালে বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) দিনব্যাপী আয়োজিত অনুষ্ঠানে আলোচনা সভা, স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি এবং নিয়মিত রক্তদাতাদের সম্মাননা প্রদান করা হয়।
৩০ শতাংশ থেকে শতভাগে পৌঁছানোর লক্ষ্য
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. মনজুর মোরশেদ। তিনি জানান, বর্তমানে ফাউন্ডেশনের প্রয়োজনীয় রক্তের প্রায় ৩২ শতাংশ আসে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে। আগামী বছরের মধ্যে এই হার ৫০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার বাড়ানো কেবল একটি আকাঙ্ক্ষা নয়; এর জন্য প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা। উন্নত দেশগুলোর উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, সেখানে স্বেচ্ছায় রক্তদানের হার প্রায় শতভাগের কাছাকাছি। বাংলাদেশেও ধাপে ধাপে সেই পর্যায়ে যেতে হবে।
অধ্যাপক মোরশেদ বলেন, থ্যালাসিমিয়া রোগীদের জীবন নিয়মিত রক্ত পাওয়ার ওপর নির্ভরশীল। সময়মতো রক্ত না পেলে তাদের শারীরিক বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। তাই পর্যাপ্ত ও নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করা থ্যালাসিমিয়া চিকিৎসার অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
পেশাদার রক্তদাতা থেকে নিরাপদ ব্যবস্থায় অগ্রগতি
অনুষ্ঠানে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ডা. মুরাদ সুলতান বলেন, বাংলাদেশের রক্ত সঞ্চালন ব্যবস্থায় ইতিবাচক পরিবর্তন এলেও স্বেচ্ছায় রক্তদানের ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে।
তিনি বলেন, একসময় দেশে বিপুল পরিমাণ রক্ত আসত পেশাদার রক্তদাতাদের কাছ থেকে, যা নিরাপত্তার দিক থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। বর্তমানে সেই প্রবণতা প্রায় বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। তবে এখনো রক্তের বড় অংশের জন্য রোগীর পরিবার ও স্বজনদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
মুরাদ সুলতান বলেন, নিরাপদ রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে স্বজননির্ভর ব্যবস্থা থেকে বের হয়ে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাভিত্তিক একটি জাতীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। রক্তদাতাদের উৎসাহিত করতে রক্ত সংগ্রহ কেন্দ্রগুলোর সেবার মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, অনেক সময় রক্তদাতারা প্রতিকূল পরিবেশে রক্ত দেন। রক্তদান কেন্দ্রগুলো এমন হওয়া উচিত, যেখানে একজন রক্তদাতা সর্বোচ্চ সম্মান, স্বাচ্ছন্দ্য ও যত্ন পান। রক্তদাতাদের অভিজ্ঞতা উন্নত করতে তিনি কেন্দ্রগুলোকে ‘ফাইভ স্টার’ মানের সেবামুখী করার পরামর্শ দেন।
জাতীয় ডাটাবেজ ও ডিজিটাল রিমাইন্ডারের প্রস্তাব
স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির প্রস্তাব দেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, একটি জাতীয় ডাটাবেজ থাকলে প্রয়োজনের সময়ে দ্রুত রক্তদাতা শনাক্ত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পরপর মোবাইল বার্তা বা ডিজিটাল রিমাইন্ডারের মাধ্যমে রক্তদাতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা গেলে নিয়মিত রক্তদাতার সংখ্যা বাড়বে।
ডা. মুরাদ সুলতান স্কুল পর্যায় থেকে রক্তদান সম্পর্কে ইতিবাচক শিক্ষা চালুর ওপরও গুরুত্ব দেন। ১৮ বছর বয়সের আগে কেউ রক্ত দিতে না পারলেও ছোটবেলা থেকেই মানবিকতা ও রক্তদানের গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা তৈরি করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরো বলেন, রক্তদানের পর তাৎক্ষণিক স্বীকৃতি, সার্টিফিকেট প্রদান এবং নিয়মিত যোগাযোগ রক্তদাতাদের দীর্ঘমেয়াদে যুক্ত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রক্তদাতাদের সম্মাননা ও অভিজ্ঞতা বিনিময়
অনুষ্ঠানে নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদাতা মোহাম্মদ হাবিব তার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, ২০১৮ সাল থেকে তিনি নিয়মিত রক্তদান করছেন। রক্তদানের পর ফাউন্ডেশন থেকে যোগাযোগ ও খোঁজখবর নেওয়ার বিষয়টি তাকে আরো উৎসাহিত করে।
বক্তারা আরো বলেন, নিরাপদ রক্ত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে স্বেচ্ছায় রক্তদানকে কেবল একটি কর্মসূচি নয়, বরং একটি সামাজিক সংস্কৃতিতে পরিণত করতে হবে। থ্যালাসিমিয়া রোগীদের জীবন বাঁচাতে সরকার, চিকিৎসক, গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারা।
আলোচনা সভা শেষে থ্যালাসিমিয়া রোগীদের জন্য সর্বোচ্চ সংখ্যকবার রক্তদানকারী ব্যক্তি, বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও রক্তদাতা সংগঠনকে সম্মাননা স্মারক ও সার্টিফিকেট দেওয়া হয়।
সম্মাননা পাওয়া প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের মধ্যে ছিল রবি আজিয়াটা, আইডিএলসি ফাইন্যান্স, লা মেরিডিয়ান ঢাকা, রেনেসাঁ ঢাকা গুলশান হোটেল, ব্যাবিলন গ্রুপ, আহসানউল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, পুলিশ ব্লাড ব্যাংক, সন্ধানী, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন, বাঁধন এবং মেডিসিন ক্লাব।
এদিকে, বিশ্ব রক্তদাতা দিবস উপলক্ষে থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালে দিনব্যাপী স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। তরুণ স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের পাশাপাশি ফাউন্ডেশনের কর্মীরাও থ্যালাসিমিয়া রোগীদের জন্য রক্তদান করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশনের ভাইস-চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সৈয়দা মাসুমা রহমান, মুগদা মেডিকেল কলেজের সহযোগী অধ্যাপক ও থ্যালাসিমিয়া ফাউন্ডেশন হাসপাতালের কনসালটেন্ট ডা. জান্নাতুল ফেরদৌস, চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. সাজিয়া ইসলামসহ সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বক্তব্য দেন। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ফাউন্ডেশনের ব্লাড ট্রান্সফিউশন স্পেশালিস্ট ডা. রাজিয়া সুলতানা।




