ভারত-পাকিস্তান ভাগের আগে আমাদের এ অঞ্চলে পুলিশ বাহিনী গঠিত হয়। সেই ধারাবাহিকতায় পুলিশের ৩৭তম মহাপরিদর্শক ছিলেন বেনজীর আহমেদ। বাংলাদেশ হওয়ার পর আইজিপি তালিকায় তাঁর অবস্থান ২৮তম। তিনি একজন মেধাবী, করিৎকর্মা ও দাপুটে অফিসার ছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনের আলোকিত অংশের চেয়ে ভয়ংকর, অন্ধকার অংশই বেশি। ব্যক্তিগত জীবন থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে তিনি একজন নষ্ট মানুষ। এমন কোনো অপকর্ম নেই, যা তিনি করেননি। ক্ষমতার অপব্যবহার করে গুম-খুনসহ সব করেছেন। ঢাকার নাটক-সিনেমার বহু নায়িকাকে নিয়েও আছে অনেক রসালো গল্প। দুর্নীতির বরপুত্র বলা যায় তাঁকে। নামে-বেনামে বেশুমার সম্পদ করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন ও আদালতে মামলা চলছে। অনেক ঘটনার নাটের গুরু বেনজীর আহমেদ দেশ থেকে খুবই নিরাপদে বিদেশে চলে যান। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। ১২ জুন দুবাই পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করেছে। এখন বাংলাদেশ সরকারের দায়িত্ব তাঁকে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা। তাঁর সব অপকর্মের সঠিক বিচার এবং উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলে দেশে আইনের শাসনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হবে। আইন ও সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান-ভারত ভাগ হওয়ার আগে পুলিশের প্রথম মহাপরিদর্শক ছিলেন জাকির হোসেন। তিনি ১৯৪৭ সালের ১৫ মে আইজিপি হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম আইজিপি আবদুল খালেক। তিনি ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নিয়োগ লাভ করেন। বর্তমান আইজিপি পুলিশের ৪১তম শীর্ষ কর্মকর্তা। এ পদে অতীতে যাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন, তাঁদের বেশ কয়েকজন পরবর্তী সময়ে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হয়েছেন, সচিব হয়েছেন, রাষ্ট্রদূত হয়েছেন। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া প্রায় সবাইকে নিয়েই পুলিশ বাহিনী গর্ববোধ করে। অবসরে যাওয়ার পরও অনেক আইজিপি ছিলেন পুলিশ বাহিনীর বাতিঘর। আবার বেনজীরের মতো কয়েকজনের কারণে এ বাহিনী আজ ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। চব্বিশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের সময় আমরা দেখেছি, পুলিশকে আনসার বাহিনী পাহারা দিয়ে রেখেছিল। একটি বাহিনীর এ করুণ অবস্থার জন্য বেনজীর আহমেদ অনেকাংশেই দায়ী। তিনি যখন ঢাকা মহানগরের কমিশনার, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ানের (র্যাব) মহাপরিচালক এবং সর্বশেষ আইজিপি হয়েছিলেন তখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দানবে পরিণত হয়েছিল। তাঁর দম্ভ এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে সিনিয়র-জুনিয়র সহকর্মী, রাজনৈতিক নেতারাও স্তম্ভিত হয়েছেন। তিনি যেসব ক্রাইম করেছেন, সেগুলোর অনেক কিছু¦ই সাধারণ মানুষ জানে না। দুর্নীতি দমন কমিশন বা সরকারের অন্যান্য দপ্তর তাঁর প্রকাশ্য কিছু দুর্নীতি বা অপকর্মের কথা জানে। তবে পুলিশ বাহিনীতে কর্মরত তাঁর ব্যাচমেট, সিনিয়র-জুনিয়র সহকর্মীরা আরও বেশি জানেন। সে সময় অনেকেই ভয়ে মুখ খোলেননি। পুলিশ বাহিনীতে তিনি যাঁর প্রতি রুষ্ট হয়েছেন, তাঁর জীবন অতিষ্ঠ করে দিয়েছেন।
তেমনি একটি ঘটনা তাঁর চাকরিজীবনের মধ্য-সময়ের। ১৯৯৮ সালের ২০ আগস্ট থেকে ২০০০ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি কিশোরগঞ্জের এসপি ছিলেন। সে সময় একজন জুনিয়র সহকর্মীর স্ত্রীর প্রতি কুনজর যায় বেনজীরের। জুনিয়র কর্মকর্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে প্রথমে নিজে নিজে চেষ্টা করলেন। স্ত্রীকে তিনি ঢাকায় পাঠিয়ে দেন। কিন্তু তাতেও ক্ষান্ত হননি এসপি সাহেব। জুনিয়র শিক্ষানবিশ কর্মকর্তাকে নানাভাবে হয়রানি করতে থাকেন। পরে পরিস্থিতি অনেক দূর পর্যন্ত গড়ায়। বাধ্য হয়ে জুনিয়র কর্মকর্তা আইজিপি বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন। সে সময় আইজিপি ছিলেন এ আই বি ওয়াই সিদ্দিকী। ঘটনার সত্যতা তদন্ত করার জন্য আইজিপি দায়িত্ব দেন বেনজীরেরই ব্যাচমেট এক কর্মকর্তাকে। তিনি বিস্তারিত তদন্ত করে ঘটনার সত্যতা পান। তদন্তের স্বার্থে তিনি বেনজীরের বক্তব্য জানতে চাইলে ব্যাচমেট বন্ধুর প্রতি তিনি মহাক্ষিপ্ত হন। সেই ক্ষিপ্ততায় শেষ পর্যন্ত দুই বন্ধুর সম্পর্ক শত্রুতায় পরিণত হয়। ব্যক্তিগত জীবনে এ ধরনের অনেক ঘটনাই তাঁর ব্যাচমেট, বন্ধুমহলের কাছে শোনা যায়। তিনি দুবাইতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর নায়িকা পরীমণি তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুকে লেখেন, ‘মজা’। নায়িকার এই ছোট্ট অথচ অনেক অর্থবহ একটি মাত্র শব্দ নিয়েও নেটিজেনে অনেক আলোচনা হচ্ছে।
বেনজীরের বন্ধুমহল মনে করে, তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির যেসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া গেছে, সেগুলো প্রকৃত দুর্নীতির কাছে নস্যি। তেমনি একটি ভয়াবহ ঘটনা ঘটে ২০১২ সালে। মাদকের একটি বড় চালান ধরা পড়ে। তখন বেনজীর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার। মাদক কারবারিরা তখন বেনজীরের কাছে যায়। বেনজীর তাদের সঙ্গে এক হাজার কোটি টাকায় রফা করেন। টাকা লেনদেন হওয়ার পর কাজে হাত দেন বেনজীর। চালানে প্রকৃতই মাদক নাকি অন্য কিছু তা পরীক্ষা করতে স্যাম্পল পাঠানো হয় ল্যাবরেটরিতে। সাত দিন পর ল্যাব রিপোর্টে মাদক হয়ে যায় কেমিক্যাল। মহানন্দে মাদকের চালান নিয়ে চলে যায় মাদক কারবারিরা। এদিকে মাদক কেমিক্যাল হয়ে যাওয়া এবং এক হাজার কোটি টাকা লেনদেনের খবর চলে যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে। প্রধানমন্ত্রী বেনজীরকে তলব করেন। বেনজীর যখন প্রধানমন্ত্রীর কক্ষে প্রবেশ করেন তখন সেখানে অন্য একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান উপস্থিত ছিলেন। বেনজীরকে দেখেই প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আসো আসো। তুমি নাকি এক হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে গেছ। এত টাকা দিয়ে কি করবা?’ প্রধানমন্ত্রীর কথার ত্বরিত উত্তরে বেনজীর বলেছিলেন, ‘টাকা দিয়ে আমি কিছু করব না। সব টাকা আমি আপনার আওয়ামী লীগের ফান্ডে দিয়ে দেব।’ বেনজীরের এই অত্যন্ত দৃঢ় ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ উত্তরে প্রধানমন্ত্রী প্রথমে কিছুটা স্তম্ভিত হয়ে যান। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে অন্য প্রসঙ্গে কথা বলে সেদিন তিনি বেনজীরকে বিদায় করেন। সেখানে উপস্থিত গোয়েন্দাপ্রধানের মুখ থেকে ঘটনাটি আমি জেনেছি। ওই গোয়েন্দাপ্রধান আরও একটি বড় দুর্নীতির তথ্য আমার সঙ্গে এক আড্ডায় বলেছিলেন। সে ঘটনাও মাদককেন্দ্রিক।
২২০ কোটি টাকার আরেকটি মাদকের চালান ধরা পড়ে। বেনজীর তখন আইজিপি। মাদক কারবারিরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বিষয়টি সুরাহা করার চেষ্টা করে। এতে বাদ সাধেন আইজিপি। তখন স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেনজীরকে ডেকে বিষয়টি মীমাংসা করার দায়িত্ব দেন। তখন তিনি সেই আগের ফর্মুলায় মাদকের স্যাম্পল ল্যাব টেস্টে পাঠিয়ে মাদককে কেমিক্যালে রূপান্তর করেন। ১৫০ কোটি টাকার বিনিময়ে এই চালান ছেড়ে দেওয়ার কাজটি করা হয়। এই টাকার মধ্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পান ৫০ কোটি টাকা। বাকিটা থাকে বেনজীরের পকেটে। মাদককে কেমিক্যাল বানানোর এই চতুরতায় বেনজীরের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী ছিলেন পুলিশের একটি গোয়েন্দা শাখায় কর্মরত ইংলিশ মাহবুব নামে পরিচিত পুলিশের একজন কর্মকর্তা।
বেনজীরকে নিয়ে এ ধরনের আরও অনেক অজানা কাহিনি আছে, যা পুলিশের, সরকারের অন্যান্য গোয়েন্দা বিভাগের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা জানেন। তিনি যখন পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন তখন ভয়ে অনেকেই মুখ খোলেননি। কারণ এ দাপুটে কর্মকর্তা মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, আমলা, ব্যবসায়ী বা সমাজের বিশিষ্ট কোনো ব্যক্তিকেও গুরুত্ব দিতেন না। একবার আলোচিত এক নায়িকাকে নিয়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী ও প্রবীণ এক নেতার ভাগনেকে সাদা পোশাকের পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে গুরুতর আহত করেন। বিষয়টি নিয়ে ওই নেতা প্রথমে বেনজীরকে ফোন করেন। কিন্তু নেতার ফোন তিনি ধরেননি। অবশেষে নেতা বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানান। কিন্তু বেনজীর কোনো কিছুকেই পাত্তা দেননি।
বেনজীরের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ যে লিখে শেষ করা যাবে না। ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ের প্রশ্রয়ে তিনি জনগণের বন্ধু পুলিশ থেকে দানবে পরিণত হয়েছিলেন। তিনি শুধু নিজে দুর্নীতি, গুম, খুন করেননি-গোটা পুলিশ বাহিনীকেও নষ্ট করে দিয়ে গেছেন। পুলিশ বাহিনীর ভিতরে তিনি একটি বলয় তৈরি করেছিলেন। ওই বলয়ে যাঁরা ছিলেন তাঁরা ছিলেন আরও বেপরোয়া। বিএনপি নেতা এবং তৎকালীন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের মতো একজন সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাকে পুলিশ কর্মকর্তা হারুন ও বিপ্লব যেভাবে প্রকাশ্যে শারীরিক নির্যাতন করেছেন তা দেশবাসী দেখেছে। এ ধরনের ঘটনা কোনো সভ্য দেশে কল্পনাও করা যায় না। এমন ন্যক্কারজনক ঘটনার পর রাষ্ট্রের শীর্ষ পর্যায় থেকে বাহবা দেওয়া হয়েছিল।
ব্যক্তি বেনজীর একদিকে যেমন দুর্নীতিবাজ, নারীলিপ্সু অথবা অন্য অনেক অপরাধে অপরাধী হিসেবে নিজেকে মাফিয়ায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন; অন্যদিকে পুলিশের মতো একটি বাহিনীকে ধ্বংস করেছেন। এমনিতেই পুলিশের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অভিযোগের শেষ নেই। বাহিনীর শীর্ষ পর্যায় থেকে এত সব অপকর্মকে উৎসাহিত করলে দেশের আইনশৃঙ্খলার ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়াটাই স্বাভাবিক। যার খেসারত এখন পুলিশ বাহিনী এবং দেশকে দিতে হচ্ছে। ভাবমূর্তি ফিরিয়ে পেশাদারি দৃঢ়তায় ফিরতে হিমশিম খাচ্ছে পুলিশ।
চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের যে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে, এর মূল কারণ আওয়ামী লীগ সরকারের দলনপীড়ন নীতি এবং বেনজীরের বেপরোয়া পুলিশি ব্যবস্থা। সে সময় সেনা, আনসার বাহিনী, এমনকি সাধারণ মানুষ পুলিশকে পাহারা দিয়ে রেখেছিল। এমন কলঙ্ক কাটিয়ে উঠতে পুলিশের অনেক দিন সময় লাগবে। এটি এই বাহিনীর জন্য কলঙ্কজনক অধ্যায়। বর্তমান সরকারের বয়স চার মাস। শত চেষ্টা করেও সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারছে না। প্রতিদিনই কোনো না কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। মানুষ হত্যা এখন নিত্যদিনের ঘটনায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বেনজীরকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে। সব অপকর্মের সঠিক বিচার করতে হবে। পুলিশ বাহিনীর মধ্যে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে-অপরাধী যত ক্ষমতাবানই হোক না কেন, সব সময় তার ক্ষমতা একরকম থাকে না। অপরাধীর বিচার অবশ্যই হতে হবে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে, বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যে পন্থা সরকার অবলম্বন করবে, সেখানে যেন বেনজীরের পক্ষ নিয়ে কেউ কোনো রকম কলকাঠি নাড়ার সুযোগ না পায়। সর্ষের মধ্যে যেন ভূত না থাকে। বেনজীর এত অপরাধ করেছেন যে তার তালিকা করা মুশকিল। অপরাধের কৌশলও তাঁর জানা আছে। আবার অপরাধ থেকে বাঁচার কৌশলও তাঁর জানা। রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো অপকৌশল যদি বেনজীরের হয়ে কাজ করে, তাহলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে না। পুলিশ বাহিনীতেও শৃঙ্খলা ফিরবে না। আর পুলিশ বাহিনীতে শৃঙ্খলা না ফিরলে সরকারকে পদে পদে বিপদের সম্মুখীন হতে হবে।
লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রতিদিন




