• ই-পেপার

শহীদ জননী জাহানারা ইমামের মৃত্যুবার্ষিকী আজ

পরিচ্ছন্নতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম ‘মাওলিনং’

অনলাইন ডেস্ক
পরিচ্ছন্নতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম ‘মাওলিনং’

ভারতের উত্তর-পূর্বে, মেঘালয় রাজ্যের একটি ছোট্ট গ্রাম ‘মাওলিনং’। প্রায় ৬০০ মানুষের এই শান্ত গ্রামটি আজ বিশ্বজুড়ে পরিচিত এক নামে—‘এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম’। ২০০৩ সালে ‘ডিসকভার ইন্ডিয়া’ ম্যাগাজিন কর্তৃক এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকেই গ্রামটির ভাগ্য বদলে যায়। প্রতি শনিবার এখানে এক হাজারেরও বেশি পর্যটকের সমাগম ঘটে। 

মাওলিনং গ্রামে পরিচ্ছন্নতা কোনো সাময়িক অভিযান নয়, বরং এটি এখানকার বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার অংশ। একদম ছোটবেলা থেকেই শিশুদের পরিচ্ছন্নতার পাঠ দেওয়া হয়। প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে শিশুরা দল বেঁধে রাস্তায় নেমে শুকনো পাতা ঝাড়ু দেয় এবং বাঁশের তৈরি ময়লার ঝুড়িগুলো খালি করে। গ্রামবাসীরা প্রত্যেকে নিজেদের ঘরের পাশাপাশি সরকারি বাগান ও রাস্তার পরিচর্যা করেন। পচনশীল বর্জ্য দ্রুত অপসারণের বিষয়ে সবাই সমান সচেতন।

২০১৪ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তার জাতীয় ‘স্বচ্ছ ভারত মিশন’ শুরুর পর একটি রেডিও ভাষণে মাওলিনংয়ের প্রশংসা করে বলেছিলেন, এখানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা বাসিন্দাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই স্বীকৃতি গ্রামটিকে আরো জনপ্রিয় করে তোলে। কৃষিজীবী বাসিন্দারা ধীরে ধীরে পর্যটন ব্যবসায় যুক্ত হন; গড়ে ওঠে হোমস্টে, রেস্তোরাঁ ও স্মারকচিহ্নের দোকান।

পর্যটনের হাত ধরে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসলেও, দুই দশক ধরে টানা দর্শনার্থীদের আনাগোনা এবং সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় গ্রামের চেনা শান্ত পরিবেশকে বিঘ্নিত করছিল। বিশেষ করে, পর্যটকদের ফেলে যাওয়া প্লাস্টিকের বোতলের একটি ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর গ্রাম কমিটি ভারসাম্য বজায় রাখার তাগিদ অনুভব করে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে প্রতি রবিবার দিনের বেলা বেড়াতে আসা পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। গ্রাম কমিটির সদস্য প্রেসিয়াস খোংডুপ জানান, গ্রামটির সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং যে শৃঙ্খলার কারণে একসময় মাওলিনং সর্বাগ্রে স্বতন্ত্র ছিল, তা রক্ষা করার জন্যই এই সিদ্ধান্ত।

মাওলিনংয়ের জনসংখ্যা শতভাগ খাসি খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের। সপ্তাহের ছয় দিন পর্যটকদের সেবায় ব্যস্ত থাকার পর, রবিবার দিনটি তারা নিজেদের পরিবার ও ধর্মীয় উপাসনার জন্য তুলে রাখতে চান। স্থানীয় বাসিন্দা ফেস্টিভ্যাল খারিম্বা বলেন, আমরা গির্জায় যেতে, উপাসনা করতে সময় পাই। রবিবার পর্যটকরা এখানে থাকলে আমাদের সমস্যা হতো। অবশ্য যারা আগে থেকে গ্রামের গেস্টহাউস বুক করে থাকেন, তারা এই নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত। নিষেধাজ্ঞার দিনে মাওলিনংয়ের প্রবেশদ্বারে কালো ধাতব গেট বন্ধ থাকে। পর্যটকদের কোলাহলমুক্ত গ্রামে তখন কেবল শোনা যায় গির্জা থেকে ভেসে আসা স্তোত্রগানের সুর। ভারতের দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক পর্যটক এই নিয়মে শুরুতে কিছুটা অবাক হলেও, গ্রামবাসীর এই সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাচ্ছেন। অধ্যাপক বিজয়া দেবনাথ, যিনি মেঘালয়ে ছুটিতে এসে এই গ্রামের ফটক থেকে ফিরে যাচ্ছিলেন, তিনি বলেন, এই মানুষেরা প্রতিনিয়ত গ্রামটিকে এত পরিচ্ছন্ন রাখছে, আমরা সেটাই দেখতে চেয়েছিলাম। মাওলিনং আমাদের এই আশা দেখায় যে যৌথ প্রচেষ্টায় চারপাশ পরিষ্কার রাখা সম্ভব।

স্বচ্ছ ভারত মিশনের এক যুগ পরেও যেখানে ভারতের বহু অঞ্চলের স্যানিটেশন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে মাওলিনং এক অনন্য ব্যতিক্রম। এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রামের এই খেতাব শুধু পর্যটন আকর্ষণের জন্য নয়, বরং বাসিন্দাদের কঠোর শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের ফসল। 

মানুষের গলা যখন বিমানের সাথে পাল্লা দেয়

কালের কণ্ঠ ডেস্ক
মানুষের গলা যখন বিমানের সাথে পাল্লা দেয়
প্রতীকী ছবি/ এআই দিয়ে তৈরি

একজন মানুষ কত জোরে চিৎকার করতে পারে? একজন সাধারণ মানুষ গড়ে ৯২ ডেসিবেল পযন্ত চিৎকার করতে পারে। আর স্বাভাবিকভাবে মানুষের কান ৭০ ডেসিবেল পর্যন্ত শব্দ সইতে পারে। তাই বলে ১২২ দশমিক ৪ ডেসিবেল! বিশ্বাস করতে কষ্ট হতে পারে। ডেসিবেলের হিসেবে বুঝতে হয়তো অসুবিধা হতে পারে। ১২২ ডেসিবেল মানে একটি জেট বিমানের উড্ডয়ন বা কাছ থেকে একটি অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের আওয়াজ শোনার অভিজ্ঞতা। অতি মানবিক এই আওয়াজ বেরিয়েছে একজন মানুষের গলা থেকেই।

অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরার বাসিন্দা জোসেফ ম্যাকগ্রেল-বেটাপ ১২২ দশমিক ৪ ডেসিবেল জোরে চিৎকার করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন। ম্যাকগ্রেল একজন এয়ার কন্ডিশনার পরিচ্ছন্নতাকমী। উচ্চকণ্ঠের কারণে তাকে শহরের ঘোষক হিসেবেও নিয়োগ দেয়া হয়েছে। অবশ্য এই নিয়োগটি সম্মানসূচক।

গত সপ্তাহে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস ৫৮ বছর বয়সী ম্যাকগ্রেলের চিৎকারের স্বীকৃতি দিয়েছে। তিনি ‘নাও’ বলে চিৎকার করেছিলেন, যা ১২২ দশমিক ৪ ডেসিবেল শব্দ তৈরি করে। বিশ্ব রেকর্ড গড়ার জন্য তাকে ৭ বার চেষ্টা করতে হয়েছে। এর  আগে এই রেকর্ডটি ছিল উত্তর আয়ারল্যান্ডের স্কুলশিক্ষিকা অ্যানালিসা ফ্ল্যানাগানের। ১৯৯৪ সালে তিনি ‘কোয়ায়েট’ বলে চিৎকার করেছিলেন, যা ১২১ দশমিক ৭ ডেসিবেল শব্দ সৃষ্টি করেছিল।

বিশ্বরেকর্ড গড়ার পর ম্যাকগ্রেল-বেটাপ মঙ্গলবার বলেন, ’প্রশিক্ষণ নিয়ে বা অনুশীলন করে এটা করা সম্ভব নয়। আপনাকে কেবল বিশেষ করে বিশ্বরেকর্ড চেষ্টার দিনটির জন্যই এটি জমিয়ে রাখতে হবে।’ বিশ্বরেকর্ড গড়তে ৭ বার উচ্চস্বরে ‘নাও’ বলতে গিয়ে পরের কয়েকদিন ম্যাকগ্রেলের গলা ভেঙ্গে গিয়েছিল, কণ্ঠস্বর কর্কশ হয়ে গিয়েছিল। অভিজ্ঞতাটি তার জন্য ভয়াবহ হলেও এটি করে বেশ মজা পেয়েছেন ম্যাকগ্রেল।

ম্যাকগ্রেল-বেটাপ অবশ্য নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠের ব্যক্তির চেয়ে বরং বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠের পুরুষ হিসেবে  বিবেচনা করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এর আগে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠের পুরুষের কোনো রেকর্ড ছিল না।

ম্যাকগ্রেল বলেন, ‘আমি আনন্দিত যে তিনি (ফ্ল্যানাগান) তার রেকর্ডটি ধরে রাখতে পেরেছেন। সুতরাং তিনি এখনও বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠের নারী এবং আমি বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠের পুরুষ।’

২০১৭ সালে ক্যানবেরার অফিসিয়াল ঘোষক হিসেবে নিযুক্ত হওয়ার পর তিনি প্রতিযোগিতামূলকভাবে উচ্চকণ্ঠী হয়ে ওঠেন। এটি স্থানীয় সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত একটি সম্মানসূচক এবং খণ্ডকালীন ভূমিকা, যাকে তিনি ’একটু মজা’ হিসেবে বিবেচনা করেন। শহরের ঘোষক হিসেবে তার নাম 'লর্ড জোসেফ'।

তিনি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠান, স্কুলের মেলা এবং গাড়ি প্রদর্শনীতে ঘোষণা দেন। ম্যাকগ্রেল-বেটাপ জানান, শহরের ঘোষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর এ ব্যাপারে আগের রেকর্ড খুঁজতে গিয়ে তিনি ঘটনাক্রমে ফ্ল্যানাগানের রেকর্ডের সন্ধান পান।

বিশ্বরেকর্ডের চেষ্টার জন্য ‘নাও’ শব্দটি চূড়ান্ত করার আগে তিনি বেশ কয়েকটি শব্দ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছিলেন। গত ২ মে ক্যানবেরার একটি রেডিও স্টুডিওতে একজন পেশাদার শাব্দিক প্রকৌশলী সাক্ষীদের উপস্থিতিতে তার ‘নাও’ চিৎকার রেকর্ড করেছিলেন। ফাইলগুলো গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসের কাছে পাঠানো হয়, যারা গত শুক্রবার ম্যাকগ্রেলের রেকর্ডটি ঘোষণা করে।

এর আগেও ম্যাকগ্রেল-বেটাপ আরেকটি বিশ্বরেকর্ড গড়েছিলেন। ২০১৯ সালে তিনি ৬০.০৩ সেকেন্ডে ১০টি তীর ছুড়ে রেকর্ড গড়েছিলেন। তবে নয় মাস পর, ৭ বছর বয়সীেএক ছেলে ম্যাকগ্রেল-বেটাপের রেকর্ডটি ১১.৪ সেকেন্ডের ব্যবধানে ভেঙ্গে দেয়। তবে তীরন্দাজির রেকর্ডটি পুনরুদ্ধার করতে বা চিৎকারের রেকর্ডটি ধরে রাখার ব্যাপারে ম্যাকগ্রেলের তেমন আগ্রহ নেই। তিনি বলেন, ’কেউ যদি আমাকে ছাড়িয়ে যায়, তবে তা চমৎকার হবে। রেকর্ড তো গড়াই হয় ভাঙার জন্য।’

খুলনা বিভাগীয় সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদের সভা ২৭ জুন

অনলাইন ডেস্ক
খুলনা বিভাগীয় সমিতির কার্যনির্বাহী পরিষদের সভা ২৭ জুন
সংগৃহীত ছবি

খুলনা বিভাগীয় সমিতি ঢাকার কার্যনির্বাহী পরিষদ ২০২৬-২৮ এর প্রথম সভা শনিবার (২৭ জুন) অনুষ্ঠিত হবে। এ দিন বিকেল সাড়ে ৫টায় এরিস্টোক্র্যাট রিসোর্ট (পূর্বাচল বাণিজ্য মেলার সন্নিকটে এবং এশিয়ান হাইওয়ে বাইপাস সড়ক সংলগ্ন) রাথুরা, উলুখোলায় অনুষ্ঠিত হবে।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি মোহাম্মদ আলি আজগার লবি এমপি। খুলনা বিভাগীয় সমিতি ঢাকার সাধারণ সম্পাদক মো. রবিউল ইসলাম সভায় উপস্থিত থাকার জন্য সদস্যদের বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছেন।

মার্কিন মুলুকের কাহিনি

ককেশিয়ান এক নারীর বিচিত্র জগৎ!

ড. রশিদ উল আহসান চৌধুরী
ককেশিয়ান এক নারীর বিচিত্র জগৎ!
সংগৃহীত ছবি

মিনেসোটার ডাউন টাউন মিনিয়াপলিস থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে ছিমছাম সুন্দর ছোট্ট উপশহর বারন্সভিলের অবস্থান। এই ছোট শহরটার আয়তন প্রায় ২৭ বর্গমাইল। আর এখানেই ১৭৬০ একর জায়গাজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে মোট ৭৬টি পার্ক। ফলে বারন্সভিল শহরের যেকোনো জায়গায় বসবাসরত যেকোনো নাগরিক বাসা থেকে বেরিয়ে কয়েক কদম হাঁটলেই একটা পার্কের সন্ধান পেয়ে যাবেন। এতগুলো পার্কের মধ্যে একটি পার্ক নিকলে এভিনিউয়ের পাশ ঘেঁষে ৭৬ একর জায়গা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এর নাম ক্রস টাউন ওয়েস্ট পার্ক। এই পার্কে আছে হাঁটার জন্য লম্বা একটা ট্রেইল। আছে মাঝারি সাইজের দুটো লেক। আর সারা পার্কজুড়ে ছড়িয়ে আছে এলম, গ্রিন অ্যাশ, ম্যাপেল, বার্চ, ওক ও জানা-অজানা হরেক রকমের গাছ গাছালি।

পার্কের ভেতর হাঁটাচলা করলেই গভীর বনে হাঁটার অনুভূতিটা সহজেই পাওয়া যায়। সারা সামার জুড়ে লেক দুটোর টইটুম্বুর স্বচ্ছ কালচে নীল জলে বিচরণ করে এক ঝাঁক বিভিন্ন প্রজাতির হাঁস, মিনি আকারের কচ্ছপ আর বেশ কিছু সাদা আর খয়েরি রঙের বক; যাদের মূল উদ্দেশ্য লেক থেকে মাছ শিকার করে উদরপূর্তি করা। ট্রেইলের আশপাশের জঙ্গলে বিচরণ করে অসংখ্য কাঠবিড়ালি আর ছাই রঙের খরগোশ। মাঝে মাঝে এক রঙা হরিণ এবং টার্কি প্রজাতির মোরগেরও দেখা মেলে।

এক দিন এই ট্রেইল দিয়ে হাঁটতে গিয়ে লেকের মাঝ বরাবর উঠে যাওয়া কাঠের পাটাতনের ব্রিজে দাঁড়িয়ে এক ককেশিয়ান মহিলাকে দেখতে পেলাম। তিনি পরম মমতায়, নিবিষ্ট মনে একটা প্যাকেট থেকে ওটের তৈরি রুটি বের করে পানিতে ছুড়ে ফেলছেন। আর ব্রিজের নিচে এক দঙ্গল খাদ্য রসিক হাঁস সেগুলো কবজা করতে চারদিকে পাঁয়তারা করছে। এর মাঝে বেশ কয়েকটা মিনি কচ্ছপ পানির নিচে সাঁতরাতে সাঁতরাতে খোল থেকে মুখটা পানির ওপরে তুলে ওটের টুকরোগুলো ধরতে প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু হাঁসগুলোর দাপট আর দ্রুত গতির কারণে তাদের সব প্রচেষ্টাই বারবার ব্যর্থ হচ্ছে। 

আরেক দিন দেখি সেই মহিলাই একটা ব্যাগ হাতে ট্রেইল ধরে ধীর গতিতে হেঁটে যাচ্ছেন আর তার পেছনে পেছনে এক ঝাঁক হাঁস প্যাক প্যাক শব্দ করে তাকে অনুসরণ করছে। একদম যেন হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা আর তার অনুগত অনুসারী। কোনো কোনো দিন দেখি প্রচণ্ড বাতাসের কারণে রাস্তাজুড়ে পরে থাকা গাছের ভাঙা ডাল আর লতা পাতাগুলো সরিয়ে পরম যত্নে রাস্তার পাশে সরিয়ে রাখছেন। আবার কোনো কোনো দিন দেখি পার্কের বেঞ্চে তিনি ধ্যানরত ঋষির মতো নির্বাক হয়ে বসে আছেন আর তার পায়ের আশপাশে বেশ কয়েকটা কাঠবেড়ালি আর খরগোশ ঘুরে ঘুরে রাস্তা থেকে খাদ্য দানা তুলে নিয়ে উদরস্ত করছে। মানুষ আর প্রাণীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান দেখে বিস্মিত হই। ধারণা করি, এই মহিলা নিশ্চিত পার্কের কোনো কর্মকর্তা হবেন। কিন্তু আমার ধারণা ভ্রান্ত ছিল।

বাঙ্গাল আর মার্কিনিদের সাংস্কৃতিক আচার ব্যবহার অনেক ক্ষেত্রেই বিপরীতধর্মী। এখানে ট্রেইল ধরে হাঁটার সময় পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যাওয়া মার্কিনিরা মৃদু হাসি দিয়ে ‘হাই’ শব্দটা উচ্চারণ করে। আর আবহাওয়া চমত্কার হলে ‘নাইস ওয়েদার’ বা ‘লাভলি ডে’ এ ধরনের মন্তব্য করে পাশ কেটে বেরিয়ে যায়। মার্কিনিদের এ ধরনের ব্যবহার ভালো লাগে আর মনটাকে করে তোলে প্রফুল্ল। তেমনি  দারুন এই মহিলার সাথে হাই হ্যালো করতে করতে একদিন পরিচয় হয়ে গেল। নাম তার প্যাটরিসিয়া লিলি। তুলা রাশির জাতিকা এই মহিলার জন্ম ১৯৫৩ সালের অক্টোবর মাসের ১৮ তারিখ বরফ ঝরা এক শীতের রাতে। মহিলা একজন পাক্কা মিনেসোটিয়ান। অর্থাত্ এই মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যে তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন, শৈশব, কৈশোর আর যৌবনে এখানেই বেড়ে উঠেছেন। বিয়ে, চাকরিবাকরি করে এখানেই থিতু হয়েছেন। এখন অনেক দিন ধরে একাকী অবসর কাটাচ্ছেন। পার্কের অতি নিকটেই তার নিজের বাড়ি, এখন তিনি সেখানেই থাকেন। অবাক বিষয় হলো তিনি কখনোই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সফর করেননি এবং অনেক মার্কিনির মতো বহিঃবিশ্ব সম্পর্কে তার ধারনা একেবারেই সীমিত।

প্যাটরিসিয়া খোদ রাজধানী মিনিয়াপলিসের কেন্দ্র সেন্টপলে জীবনের বড় অংশ কাটিয়েছেন। বেবি বুমার জেনারেশনে জন্মগ্রহণকারী এই মহিলার ছিল আরো সাত ভাই বোন। বাবা ছিলেন একজন সেলসম্যান আর পরিবারের আকার ছিল যথেষ্ট বড়। তাই পরিবারের কষ্ট লাঘব করতে হাই স্কুল পার হয়েই স্বাধীন জীবিকা অর্জনের জন্য  মাত্র ১৭ বছর বয়সে প্যাটরিসিয়া ঘর  হতে বেরিয়ে পরেন। আকাশ পথে উড়ালের স্বপ্ন তার অনেক দিনের। তাই এয়ারলাইনসে এয়ার হোস্টেসের চাকরি নিয়ে বহু বছর আমেরিকার আকাশ পথে এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়িয়েছেন। পরে এক রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীর সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়ে চাকরি ছেড়ে দেন এবং নিজেকে হোম মেকারে রূপান্তরিত করেন। দীর্ঘ বিবাহিত জীবনে তার একটা ছেলেসন্তানও জন্মগ্রহণ করে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে লাঙ্গ ক্যানসারে ছেলে মৃত্যুবরণ করে। ছেলের মৃত্যুর পর প্যাটরিসিয়া মানব কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করে কেয়ার গিভারের চাকরি গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ সময় ধরে অসংখ্য প্রবীণ দম্পতির দেখভাল করেন। অবসর গ্রহণের পর বর্তমানে তিনি তার সাধ্যের মধ্যে প্রাণপরিবেশ রক্ষায় নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন।

প্রাণিকুলের প্রতি নিবেদিত প্রাণ এই নারী ছোটবেলা থেকেই বিপন্ন এবং অকুলে ডোবা প্রাণীদের বিভিন্ন জায়গা থেকে খুঁজে বের করে নিজের বাসস্থানে নিরাপদ আশ্রয় দিতেন। এই তালিকা খুবই লম্বা আর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত আছে অসংখ্য প্রাণী। যেমনঃ  কুকুর, বেড়াল, খরগোশ, টিয়া এবং গিনিপিগ। প্যাটরিসিয়ার যুক্তি খুবই সরল-প্রাণীরা অবলা। বিশেষ করে তারা যখন সংকটে পরে, তখন তাদের দেখভাল করার কেউ থাকে না। কাজেই মানবকুলের দায়িত্ব অবলা এই প্রাণীদের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খোলা মনে এগিয়ে আসা। প্রাণীদের কেবল খাবার দিলে হবে না, তাদের অস্তিত্ব রক্ষা করার জন্য পরিবেশের যত্ন নিতে হবে। পরিবেশকে নিরাপত্তা দিলেই প্রাণীরা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে। পার্কের কোনো বেতনভোগী কর্মকর্তা না হয়েও কেবল এ যুক্তিতে ভদ্রমহিলা পার্কের পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য বিনা পারিশ্রমিকে অষ্টমের পেয়াদার মতো প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন। খ্রিস্টান ক্যাথলিক ধর্ম পালনকারী প্যাটরিসিয়া তার এই কল্যাণমুখী কাজের জন্য ধর্মীয় নির্দেশাবলিকে সব চেয়ে বড় অনুপ্ররণা বিবেচনা করেন, আর প্রায়ই বলেন, জেসাস সেজ লাভ দাই নেইবার, বি ইট আ হিউম্যান বিং অর এন অ্যানিম্যাল। 

আর দশটা সাধারণ মার্কিনির মতো প্যাটরিসিয়া আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে মোটেই মাথা ঘামায় না। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কী ধরনের ঘটনা ঘটছে, সে বিষয়ে তার একেবারেই কোনো ধারণা নেই। তার চিন্তাভাবনা, দৃষ্টিভঙ্গি সব কিছুই ঘুরপাক খায়  মার্কিন মুলুক নিয়ে। এর বাইরে যে বিশাল একটা জনগোষ্ঠী আর বহু দেশের অস্তিত্ব আছে সে সম্পর্কে তার ইষৎ ধারণা আছে। কিন্ত  নেই একবিন্দুও কৌতূহল। এ ক্ষেত্রে সে সাধারণ মার্কিনিদের চিন্তাভাবনার আদর্শ প্রতিবিম্ব। প্যাটরিসিয়া লিলি অবশ্যই জানে বিশ্বে অনেক দেশ আছে যেগুলো অনুন্নত এবং ভঙ্গুর। এ দেশগুলোর জনগণ অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল। তাই সে মনে করে উন্নত দেশগুলোর উচিত পৃথিবীর সব সম্পদের সুষম বণ্টন করে আদর্শিকভাবে একটা ইউটোপিয়ান বিশ্ব সৃষ্টি করা। তবে সম্পদের সুষম বণ্টন কিভাবে করা যায়, আন্তর্জাতিক রাজনীতি সম্পর্কে স্বল্প ধারণা থাকায়, সে যথাযথ বিশ্লেষণ করতে পারে না। দুঃখের বিষয়, বাংলাদেশ সম্পর্কে প্যাটরিসিয়া লিলির কোনো ধারণা নেই। গুগল ম্যাপ আর ইন্টারনেট খুলে তাকে জ্ঞান দিতে হল। আর যখনই বলা হলো বাঙালি সমাজের সংস্কৃতি, ধ্যান-ধারণা, জীবনযাপন ও আচার-ব্যবহার অনেকাংশে মার্কিনিদের বিপরীতমুখী। কেন জানি তখন সে অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে বাংলাদেশকে দেখার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করল। সুযোগ-সুবিধা মতো তাকে বাংলাদেশ সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানাব। এই অপেক্ষায় আছি।  

লেখক : বিশেষ লেখক, কালের কণ্ঠ, যুক্তরাষ্ট্র