আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার নিশ্চিত ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সমন্বিত ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন বিশিষ্টজনেরা। তারা বলেছেন, টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে আদিবাসীদের ভূমির ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সরকার, নাগরিক সমাজ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে একযোগে কাজ করতে হবে।
রবিবার (২১ জুন) রাজধানীর কারিতাস ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট (সিডিআই) মিলনায়তনে বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-ইকোলজি প্ল্যাটফর্ম (বিএপি) প্রকল্প আয়োজিত এক সেমিনারে এসব কথা বলেন তারা।
ভূমি ও আদিবাসী অধিকার এবং জীববৈচিত্র্য সুরক্ষা বিষয়ক এ অ্যাডভোকেসি সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে কারিতাস বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক দাউদ জীবন দাশ বলেন, আদিবাসী সম্প্রদায়ের ভূমি অধিকার ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষার বিষয়টি জাতীয় উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সেমিনারে উত্থাপিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে আদিবাসীদের ভূমি অধিকার সুরক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কার্যকর অগ্রগতি সম্ভব হবে।
সেমিনারে আদিবাসীদের নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ফরিদা আখতার। তিনি বলেন, আদিবাসীদের অনেক কিছুর নাম পরিবর্তন করা হচ্ছে, যা একটি “জেনোসাইড” (গণহত্যা)। এটি বন্ধ হওয়া দরকার। তিনি আরো বলেন, যত্রতত্র ইকোপার্ক স্থাপন বন্ধ করতে হবে। তার মতে, ইকোপার্ক মানুষের অধিকার লঙ্ঘন করে এবং পরিবেশ ও প্রতিবেশ ধ্বংস করে। ভূমির অধিকারসহ আদিবাসীদের সুরক্ষায় বর্তমান সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নেবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. মো. সাদরুজ্জামান বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনসহ নানা কারণে আদিবাসীরা ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং ভূমির অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। বর্তমান সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বারসিকের পরিচালক ও গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই আদিবাসীরা নির্যাতিত ও বিতাড়িত হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে যখন আদিবাসীদের সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর তথ্য উল্লেখ করা হয়, তখন তা রাষ্ট্রীয় সমস্যার ইঙ্গিত দেয়। তাই আদিবাসীদের সমস্যা সমাধানে সরকারকেই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইন্ডিজেনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস (আইপিডিএস)-এর সভাপতি সঞ্জীব দ্রং। তিনি আদিবাসীদের ভূমি অধিকার ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় ১৫ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, আদিবাসীদের প্রথাগত ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি দিতে হবে। সমতলের আদিবাসীদের জন্য আদিবাসী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে একটি স্বতন্ত্র ভূমি কমিশন গঠন করতে হবে। প্রথাগতভাবে ভোগদখলকৃত ভূমির ম্যাপিং ও নিবন্ধনের মাধ্যমে আইনি মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। বন বিভাগের গেজেট, জরিপ বা ফরেস্ট ল্যান্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া ভূমি প্রকৃত মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে।
তিনি আরো বলেন, আদিবাসীদের জীবন ও জীবিকায় প্রভাব ফেলতে পারে এমন যেকোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে তাদের অবহিত সম্মতি গ্রহণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। জাতীয় উদ্যান, ইকো-পার্ক বা অনুরূপ প্রকল্প বাস্তবায়নে আদিবাসীদের অংশীদারিত্ব ও মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। শত্রু সম্পত্তি ও অর্পিত সম্পত্তি আইনের কারণে হারানো ভূমি পুনরুদ্ধারে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ভূমি সংক্রান্ত নথিপত্র সংরক্ষণ, খাজনা প্রদান ও ভূমি জরিপ বিষয়ে আদিবাসীদের প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন কারিতাস বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মেথিন প্রমিলা। এতে আরো বক্তব্য দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কাজী কামরুল ইসলাম, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. শিল্পী কুন্ডু, বাংলাদেশ কৃষক ফাউন্ডেশনের সভাপতি মো. বদরুল আলম, এবং কারিতাস বাংলাদেশের পরিচালক (প্রোগ্রাম) অপূর্ব ম্রং ও ব্যবস্থাপক সুবাস এ. গোমেজ।







