অদৃশ্য এক শক্তির নিয়ন্ত্রণে মাধবপুরের প্রায় ১০ কোটি টাকার ৩টি সিলিকা বালু মহাল। যেখান থেকে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে দিনে রাতে বালু তুলে বিক্রি করছে একটি সিন্ডিকেট।প্রভাবশালী কতিপয় নেতার কালো থাবায় দেদারছে বালু তুলা হলেও বন্ধ করতে পারছে না প্রশাসন। যে কারনে আদায় হচ্ছে না রাজস্ব।
সরকারি কোষাগার সমৃদ্ধ হওয়ার বিপরীতে কোটি কোটি টাকায় পকেট ভরছে বালু চোর সিন্ডিকেটের। যা নিয়ে সচেতন মহলে ও নেটিজেনদের মাঝে সমালোচনা চলছে। সিলিকা বালুর হরিলুট নিয়ে প্রথমসারির গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে। এতেও টনক নড়ছেনা প্রশাসনের! কি এমন অদৃশ্য শক্তি? যে কারণে অবৈধ সিলিকা বালু বন্ধে ভূমিকা রাখছে না কেউ। এই প্রশ্ন সোনাই নদীর দু'পাড়ের বাসিন্দাদের।
প্রকাশ্যে দিবালোকে সোনাই নদীর মনতলা, মনতলা চৌমুহনী এবং রসুলপুর, শাহজিবাজার ছড়া এই ৪টি কোয়ারী থেকে বালু তোলা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসন দেখেও না দেখার ভান করছে। এই ৪টি মহাল ইজারা হলে সরকারী কোষাগারে প্রায় ১০ কোটি টাকার রাজস্ব জমা হতো।
খনিজ সম্পদ উন্নয়ন ব্যুরো কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৪৩০ বাংলা অর্থাৎ ২০২৩ সালে মাধবপুরের রসুলপুর, মনতলা ও মনতলা চৌমুহনী বালু কোয়ারী (অংশ-০১)-৫৬৫ স্মারকের ইজারা দেওয়া হয়েছিল। যেখানে ভ্যাট, টেক্সসহ প্রায় ৭ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছিল। ওই তিন কোয়ারীর ইজারার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ২০২৫ সনের ১৩ এপ্রিল।
রাজনৈতিক সরকার গঠনের পর থেকে কোন ধরনের ইজারা ছাড়াই মাধবপুর উপজেলার রঘুনন্দন পাহাড়, শাহজিবাজার রাবার বাগান, সোনাই নদী এবং বিভিন্ন ছড়া থেকে অবাধে সিলিকা বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ছাড়াই রঘুনন্দন পাহাড়, সুরমা ও তেলিয়াপাড়া চা বাগানের বিভিন্ন ছড়া এবং সোনাই নদীর বিভিন্ন স্থানে শতাধিক ড্রেজার মেশিন বসিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে স্থানীয়দের দাবি।
সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, রঘুনন্দন পাহাড়ের শাহজীবাজার রাবার বাগান সংলগ্ন খেলার মাঠ, সাতপাড়িয়া ছড়া, মনতাজ শাহ মাজার সংলগ্ন তেতুলতলা ছড়া, জেদ্দা ছড়া, সুরমা চা বাগানের রসুলপুর ছড়া, তেলিয়াপাড়া চা বাগানের সীমনা ছড়া এবং সোনাই নদীর বোরহানপুর, ভবানীপুর, দুর্লভপুর, আফজলপুর, বহরা, কাশিমপুর, আলাবক্সপুর, মনোহরপুর, মঙ্গলপুর, গাজীপুর ও আশ্রবপুর মৌজাসহ আশপাশের এলাকায় ব্যাপকভাবে বালু উত্তোলন চলছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব ড্রেজার দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ থেকে ৩ লাখ ঘনফুট বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। উত্তোলিত বালু ট্রাক ও ট্রাক্টরের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। এতে পাহাড়, নদী ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। বিশেষ করে সোনাই নদীতে নির্মিত দুটি রাবার ড্যাম ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ।
এই বালু কান্ডের সঙ্গে কিছু প্রভাবশালী নেতা, স্থানীয় প্রশাসনের অসৎ কর্মচারীর যোগসাজস রয়েছে। যে কারণে প্রশাসন কঠোর কোন ভূমিকা রাখছে না বলে ক্ষোভ প্রকাশ করছে সচেতন মহল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ১৪৩৩ বাংলা সনের জন্য মনতলা সাধারণ বালুমহালের ইজারা নেন মাধবপুর পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ফিরোজ মিয়া। তার মালিকানাধীন মেসার্স শারমীন এন্টারপ্রাইজ কিসমতপুর কিসমত ও মনোহরপুর এই দুই মৌজার সাধারণ বালুর জন্য ইজারা গ্রহণ করে। সাধারণ বালুমহালের আড়ালে সোনাই নদীর আশপাশের প্রায় ৩০টি মৌজার সিলিকা বালু বিক্রি করা হচ্ছে বলে স্থানীয় একাধিক লোকজন জানিয়েছে।
এই অভিযোগ অস্বীকার করে মাধবপুর পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘তারা কেবল ইজারাকৃত সাধারণ বালু বিক্রি করছে।’
এ বিষয়ে মাধবপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো: মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমি নতুন যোগদান করেছি। কিছু বালু জব্দ করে ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে, সিলিকা কি না পরীক্ষা করার জন্য। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজ সিলিকা বালু মহালের ইজারা না থাকার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান, অবৈধ বালু বন্ধে আমাদের প্রশাসন কঠোর অবস্থানে আছে। মোবাইল কোর্টে জরিমান ও কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। পুলিশকেও চোরাই বালু বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য বলা হয়েছে।