দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাহাড়, জনপদ ও উপকূলীয় অঞ্চল আবারও যেন ফিরে যাচ্ছে এক অশনি সংকেতের দিকে। অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেছেন সাধারণ মানুষ। পটিয়া, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, বাঁশখালী ও আনোয়ারাসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যবসায়ী, প্রবাসীর স্বজন, ঠিকাদার, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এমনকি সাধারণ পথচারীদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিভিন্ন অপরাধী চক্র।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এই অবনতির বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মাসুদ আলমও। তিনি বলেন, ‘দক্ষিণ চট্টগ্রামে অপহরণ, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। যারা এসব অপরাধে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
দক্ষিণ চট্টগ্রামের ভূ-প্রকৃতি বরাবরই আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। পটিয়ার হাবিলাসদ্বীপ, ধলঘাট, কেলিশহর, হাইদগাঁও, খরনা, কচুয়াই সংলগ্ন পাহাড়ি এলাকা, সাতকানিয়ার পূর্বাঞ্চল, লোহাগাড়ার পদুয়া ও চুনতি সীমান্তবর্তী অঞ্চল, চন্দনাইশের দুর্গম পাহাড়ি জনপদ এবং বাঁশখালীর পাহাড়-উপকূল মিলিত এলাকাগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিচ্ছিন্ন সন্ত্রাসী ও অপরাধী গোষ্ঠীর নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে পরিচিত।
স্থানীয়রা জানায়, একসময় এসব এলাকায় বনদস্যু, অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী ও চোরাকারবারিদের তৎপরতা ছিল প্রকাশ্য। পরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে পরিস্থিতির উন্নতি হলেও সাম্প্রতিক সময়ে আবারও সংঘবদ্ধ অপরাধচক্র মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বর্তমানে অপরাধীরা আগের মতো প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া না দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর কৌশল বেছে নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচয় গড়ে তোলা, চাকরির প্রলোভন, ব্যবসায়িক বৈঠকের নামে ডেকে নেওয়া কিংবা সড়কে গতিরোধ করে অপহরণের মতো ঘটনা বেড়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পটিয়া-চন্দনাইশ-সাতকানিয়া অংশের কিছু নির্জন এলাকা, লোহাগাড়ার পাহাড়ি পথ এবং বাঁশখালীর উপকূলীয় অঞ্চলকে অনেক ক্ষেত্রে ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অপহরণের পর ভুক্তভোগীদের দুর্গম স্থানে আটকে রেখে পরিবারের কাছে মোবাইল ফোনে মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে। টাকা না দিলে শারীরিক নির্যাতনের ভিডিও বা ভয়ভীতি প্রদর্শনমূলক বার্তা পাঠানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে।
একাধিক ভুক্তভোগীর স্বজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক পরিবার সামাজিক সম্মানহানি, নিরাপত্তা শঙ্কা এবং প্রতিশোধের ভয়ে থানায় অভিযোগ পর্যন্ত করেন না। ফলে অধিকাংশ ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না এবং অপরাধীরা থেকে যায় আড়ালে।
দক্ষিণ চট্টগ্রাম প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, পটিয়া ও বাঁশখালীর বিপুলসংখ্যক মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে কর্মরত।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্র জানায়, অপরাধীরা এখন প্রবাসীদের স্বজনদের আর্থিক সক্ষমতার তথ্য সংগ্রহ করে তাদের লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। মোবাইল ফোনে চাঁদা দাবি, নির্মাণকাজে বাধা সৃষ্টি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অপহরণের হুমকি দিয়ে অর্থ আদায়ের প্রবণতা বাড়ছে। এ ছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে গড়ে ওঠা কিছু কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসায়ী ও ছিনতাইকারী চক্রও ধীরে ধীরে সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে, গত ১৭ মে চট্টগ্রাম পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় পুলিশ সুপার মাসুদ আলম বলেন, ‘দক্ষিণ চট্টগ্রামের কয়েকটি স্পর্শকাতর এলাকা ইতিমধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। অপহরণ ও চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্তে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কেউ রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব খাটিয়ে পার পাবে না।’
তিনি আরো বলেন, ‘অপরাধীরা এখন প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ করছে। তাই পুলিশও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ এবং গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করেছে। বিভিন্ন থানাকে বিশেষ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রাতের টহল, চেকপোস্ট ও গোপন অভিযান বাড়ানো হয়েছে।’
পুলিশ সুপার মাসুদ আলম গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘প্রকৃত তথ্য তুলে ধরুন। কোনো অপরাধের তথ্য পেলে দ্রুত পুলিশকে জানান। জনগণ, সাংবাদিক ও পুলিশ একসঙ্গে কাজ করলে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে অপরাধমুক্ত করা সম্ভব।’
তিনি সাধারণ জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘অপহরণ বা চাঁদাবাজির শিকার হলে ভয় না পেয়ে দ্রুত থানায় অভিযোগ করুন। তথ্যদাতার পরিচয় শতভাগ গোপন রাখা হবে।’
সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় অপহরণ ও চাঁদাবাজির গুঞ্জন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাইবিহীন তথ্যও ছড়িয়ে পড়ছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক আরো বাড়িয়ে তুলছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সন্ধ্যার পর নির্জন সড়কে চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অনেক পরিবার প্রয়োজন ছাড়া রাতে বাইরে বের হওয়া কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও উপকূলীয় ইউনিয়নগুলোতে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেশি।
জেলা পুলিশের দাবি, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতোমধ্যে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। সন্দেহভাজন কয়েকজনকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে এবং অপরাধী চক্রগুলোর নেটওয়ার্ক শনাক্তে গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাহাড়, উপকূল ও মহাসড়কসংলগ্ন অঞ্চলের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য দীর্ঘদিন ধরেই অপরাধীদের জন্য সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করেছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং সংঘবদ্ধ চক্রের পুনরুত্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে কি না, সেটি গভীরভাবে তদন্তের দাবি রাখে।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, অতীতের মতো কঠোর অভিযান, গোয়েন্দা নজরদারি এবং জনসচেতনতার সমন্বয়ে দক্ষিণ চট্টগ্রামকে আবারও অপহরণ ও চাঁদাবাজিমুক্ত নিরাপদ জনপদে পরিণত করা সম্ভব হবে। বর্তমানে সেই লক্ষ্যেই তাকিয়ে আছে পাহাড়, জনপদ ও উপকূলের লাখো মানুষ।