• ই-পেপার

রাতে ছোট শিশুদের অতিরিক্ত কান্না থামাতে যা করবেন

পরস্পর উঠাবসায় যে তিনটি কাজ হারাম

মুফতি ওমর বিন নাছির
পরস্পর উঠাবসায় যে তিনটি কাজ হারাম
সংগৃহীত ছবি

ইসলাম মানুষের ইবাদতের পাশাপাশি পারস্পরিক সম্পর্ককেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে। তাই একজন মুসলমান তার উত্তম চরিত্র, সুন্দর আচরণ, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং অন্য মুসলমানের সম্মান রক্ষার মাধ্যমেও মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে। বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পারিবারিক ও সামাজিক পরিমণ্ডলে অনেক সময় মানুষ না বুঝেই অন্যকে উপহাস করে, তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে, দোষ খুঁজে বেড়ায় কিংবা অপমানজনক নামে ডাকে। অথচ এগুলো ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত গুরুতর গুনাহ। পবিত্র কোরআনের সুরা হুজরাতে আল্লাহ তাআলা মুসলমানদের পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু নীতিমালা প্রদান করেছেন। 

মুমিনের জন্য পরস্পর উঠাবসায় তিনটি কাজ হারাম

১. অন্যকে উপহাস করা হারাম
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে ঈমানদাররা! কোনো সম্প্রদায় যেন অন্য কোনো সম্প্রদায়কে উপহাস না করে। হতে পারে, তারা তাদের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)

ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, উপহাস হলো এমনভাবে কারো দোষ, দুর্বলতা বা ত্রুটি তুলে ধরা, যাতে অন্যরা হাসাহাসি করে এবং তাকে হেয় প্রতিপন্ন করে। এটি কুরআনের ভাষায় স্পষ্ট হারাম। আজ অনেকেই কারো চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং, অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা বা শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে হাসাহাসি করে। অথচ আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা তার তাকওয়ার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, বাহ্যিক রূপ বা সম্পদের ভিত্তিতে নয়।

২. অন্যের দোষ তালাশ ও দোষারোপ করা হারাম
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরকে দোষারোপ করো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)

অর্থাৎ অন্যের দোষ খুঁজে বেড়ানো, তাকে অপমান করা বা তার দুর্বলতা প্রকাশ করা একজন মুসলমানের কাজ নয়। তাফসিরে মাআরিফুল কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষ যখন অন্যের দোষ প্রকাশ করে, তখন অপর পক্ষও তার দোষ প্রকাশ করে। কারণ দোষ থেকে কোনো মানুষই সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। তাই মুসলমানের কর্তব্য হলো অন্যের দোষ গোপন রাখা, সংশোধনের চেষ্টা করা এবং নিজের দোষ সংশোধনে ব্যস্ত থাকা।

৩. অপমানজনক নামে ডাকা হারাম
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা একে অপরকে মন্দ নামে ডেকো না।’ (সুরা : হুজুরাত, আয়াত : ১১)

কাউকে খোঁড়া, কানা, অন্ধ, কালা, বোবা কিংবা তার অপছন্দনীয় কোনো নামে সম্বোধন করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানকে এমন গুনাহ দ্বারা লজ্জা দেয়, যা থেকে সে তাওবা করেছে, আল্লাহ তাকে সেই গুনাহে লিপ্ত করে ইহকাল ও পরকালে অপমানিত করবেন।’ (তাফসিরে কুরতুবি)
এ থেকে বোঝা যায়, মানুষের অতীত গুনাহ বা দুর্বলতা নিয়ে তাকে অপমান করা অত্যন্ত নিন্দনীয় কাজ।

আমাদের করণীয় হলো-

১. আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য প্রতিটি মুসলমানকে সম্মান করা।
২. কাউকে উপহাস না করা।
৩. কারো দোষ খুঁজে বেড়ানোর বদলে নিজের সংশোধনে মনোযোগী হওয়া।
৪. কাউকে কষ্ট দেয় এমন নামে না ডাকা।
৫. গীবত, অপবাদ ও কটু ভাষা বর্জন করা।
৬. মুসলিম ভাই-বোনের জন্য আন্তরিকভাবে দোয়া করা।
৭. বিপদে-আপদে তাদের পাশে দাঁড়ানো।
৮. হিংসা ও বিদ্বেষের পরিবর্তে ভালোবাসা ও ক্ষমাশীলতার মনোভাব গড়ে তোলা।

আমরা যদি উপহাস, দোষারোপ ও অপমানজনক নামে ডাকা থেকে বিরত থাকি, তবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে পারস্পরিক বিশ্বাস ও ভালোবাসা প্রতিষ্ঠিত হবে। প্রত্যেক মুসলমান যদি অপর মুসলমানের সম্মানকে নিজের সম্মানের মতো রক্ষা করে, তবে উম্মাহর ঐক্য আরও সুদৃঢ় হবে এবং আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হবে। ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করার, মুসলিম ভাই-বোনদের সম্মান রক্ষা করার এবং উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

মহানবী (সা.)-এর শানে বেয়াদবির ভয়াবহ পরিণতি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
মহানবী (সা.)-এর শানে বেয়াদবির ভয়াবহ পরিণতি
সংগৃহীত ছবি

মানবজাতির ইতিহাসে সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ হলেন মহানবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)। তিনি শুধু একজন নবী নন; তিনি আল্লাহ তাআলার সর্বশেষ রাসুল, সমগ্র বিশ্বের জন্য রহমত স্বরূপ এবং ঈমানদারদের প্রাণের চেয়েও প্রিয় ব্যক্তিত্ব। তাই তাঁর সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অপরিহার্য দাবি। কোরআনুল কারিমে আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা সমুন্নত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং তাঁর প্রতি অবমাননা, বিদ্রূপ ও বেয়াদবির বিরুদ্ধে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছেন।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—যারা মহানবী (সা.)-কে উপহাস করেছে, তাঁর বিরোধিতা করেছে এবং তাঁকে কষ্ট দিয়েছে, তাদের অনেকেই দুনিয়াতেই ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করেছে। এটি আজ শুধু ইতিহাস নয়; বরং প্রতিটি যুগের মানুষের জন্য একটি সতর্কবার্তা যে, আল্লাহর প্রিয় রাসুলের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার পরিণতি অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘নিশ্চয়ই বিদ্রূপকারীদের বিরুদ্ধে তোমার জন্য আমিই যথেষ্ট।’ (সুরা : হিজর, আয়াত : ৯৫)

মহানবী (সা.)-এর সম্মান রক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের ঈমানের অংশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি ঈমান আনো, তাঁকে সাহায্য করো এবং যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করো।’ (সুরা : ফাতহ, আয়াত : ৮–৯)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দেয়, আল্লাহ তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত করেছেন।’ (সুরা : আহজাব, আয়াত : ৫৭)

মক্কার পাঁচ বিদ্রূপকারীর করুণ পরিণতি
মক্কার কুরাইশদের মধ্যে এমন পাঁচজন কুখ্যাত ব্যক্তি ছিল, যারা মহানবী (সা.)-কে বিদ্রূপ, অপমান ও নির্যাতন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে অগ্রগামী ছিল। তারা হলো— ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা, আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব, আসওয়াদ ইবনে আবদে ইয়াগুস, হারেস ইবনে আইতাল ও আস ইবনে ওয়ায়েল সাহমি। 

একদিন জিবরাঈল (আ.) মহানবী (সা.)-এর নিকট উপস্থিত হলে মহানবী (সা.) তাঁদের অত্যাচারের কথা উল্লেখ করেন। এরপর একে একে ওই ব্যক্তিরা সামনে দিয়ে অতিক্রম করলে জিবরাঈল (আ.) তাদের শরীরের নির্দিষ্ট অঙ্গের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘আমি তার জন্য যথেষ্ট।’ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আল্লাহ তাআলার ফয়সালা বাস্তবায়িত হতে শুরু করল।

১. ওয়ালিদ ইবনে মুগিরা : একদিন খুজাআ গোত্রের এক ব্যক্তি তীর ঠিক করছিল। অসাবধানতাবশত একটি তীর ছিটকে এসে ওয়ালিদের আঙুলে আঘাত করে। সামান্য ক্ষতই পরে মারাত্মক হয়ে ওঠে। যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে সে মৃত্যুবরণ করে।

২. আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব : সে সন্তানদের নিয়ে গাছতলায় বসেছিল। হঠাৎ আতঙ্কে চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘আমাকে বাঁচাও! কেউ আমার চোখে কাঁটা ঢুকিয়ে দিচ্ছে!’ তার সন্তানরা কাউকে দেখতে পেল না। কিন্তু সে আর্তনাদ করতে থাকল। শেষ পর্যন্ত তার দৃষ্টিশক্তি নষ্ট হয়ে যায় এবং অন্ধ অবস্থায় যন্ত্রণায় মৃত্যুবরণ করে।

৩. আসওয়াদ ইবনে আবদে ইয়াগুস : তার মাথায় ভয়াবহ ফোড়া ও ক্ষত সৃষ্টি হয়। পুরো মাথা ক্ষতে ভরে যায় এবং সেই দুরারোগ্য ব্যাধিতেই তার মৃত্যু ঘটে।

৪. হারেস ইবনে আইতাল : সে এমন এক অদ্ভুত রোগে আক্রান্ত হয়, যাতে তার পেট হলুদ পানিতে ফুলে যায়। অবস্থা এতটাই ভয়াবহ হয় যে মুখ দিয়েই পেটের ময়লা বের হতে থাকে। দীর্ঘ কষ্টের পর সে মৃত্যুবরণ করে।

৫. আস ইবনে ওয়ায়েল সাহমি : তায়েফ যাওয়ার পথে তার গাধা একটি কাঁটাযুক্ত ঝোপে বসে পড়ে। একটি কাঁটা তার পায়ে গভীরভাবে বিঁধে যায়। সেই ক্ষত বিষাক্ত হয়ে ওঠে এবং যন্ত্রণায় ছটফট করতে করতে তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনাগুলো বর্ণিত হয়েছে ইমাম বায়হাকির আসসুনানুল কুবরা (৯/৮)-এ। ঐতিহাসিক ও সীরাতগ্রন্থগুলোতেও এ ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। 


এই ঘটনাগুলো আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—

১. মহানবী (সা.)-এর সম্মান রক্ষা করা ঈমানের অপরিহার্য অংশ। 
২. মহানবী (সা.)-কে বিদ্রূপ করা বা তাঁর শানে বেয়াদবি করা অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।
৩. আল্লাহ তাআলা চাইলে দুনিয়াতেই অপরাধীদের শাস্তি দিতে পারেন।
৪. মুসলমানের কর্তব্য হলো মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর মর্যাদা সমুন্নত রাখা।
৫. কোনো ব্যক্তি দুনিয়াতে শাস্তি না পেলেও আখিরাতের শাস্তি আরো কঠিন হতে পারে; তাই বাহ্যিক পরিণতি দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া উচিত নয়।

আজকের যুগেও একজন মুসলমানের কর্তব্য হলো নিজের কথা, লেখা, আচরণ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার—সবক্ষেত্রেই মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখা এবং তাঁর আদর্শকে ভালোবাসা, অনুসরণ ও প্রচারের মাধ্যমে প্রকৃত মহব্বতের প্রমাণ দেওয়া। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মহানবী (সা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা, গভীর শ্রদ্ধা এবং তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন। আমিন।

হাদিসের বাণী

ইসলামে যে দুই ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা প্রশংসনীয়

ইসলামী জীবন ডেস্ক
ইসলামে যে দুই ব্যক্তির প্রতি ঈর্ষা প্রশংসনীয়
সংগৃহীত ছবি

সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মহানবী (সা.) বলেছেন, দুটি বিষয়ে ব্যতীত অন্য কোনো বিষয়ে ঈর্ষা করা যায় না। দুটি বিষয় হলো—
১. ওই ব্যক্তির প্রতি (ঈর্ষা করা প্রশংসনীয়), যাকে আল্লাহ তাআলা ধন-সম্পদ দান করেছেন, তারপর সে তা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করার সক্ষমতাও দান করেছেন। 
২. ওই ব্যক্তির প্রতি (ঈর্ষা করা প্রশংসনীয়), যাকে আল্লাহ তাআলা জ্ঞান দান করেছেন আর সে তার জ্ঞানের মাধ্যমে (মানুষের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে) মীমাংসা করেন এবং অন্যকে জ্ঞান শিক্ষা দেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং : ৭৩, সহিহ মুসলিম, হাদিস নং : ১৮৯৬)

হাদিসের শিক্ষাসমূহ :
১. কল্যাণকর বিষয়ে প্রতিযোগিতা করা বৈধ ও প্রশংসনীয়। তাই দুনিয়াবি ভোগ-বিলাসে নয়; বরং নেক আমল, জ্ঞান ও দানশীলতায় একে অপরকে অতিক্রম করার চেষ্টা করা উচিত।
২. এখানে ঈর্ষা বলতে ‘গিবতাহ’ (غِبْطَة) বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ অন্যের নিয়ামত দেখে তার ক্ষতি কামনা না করে নিজের জন্যও এমন নিয়ামত কামনা করা। এটি বৈধ ও উত্তম।
৩. আল্লাহর পথে সম্পদ ব্যয় করা সর্বোত্তম আমলগুলোর একটি। তাই যে ব্যক্তি আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদ সঠিক পথে ব্যয় করে, সে প্রশংসার যোগ্য।
৪. সম্পদ আল্লাহর আমানত। ধন-সম্পদ শুধু ভোগের জন্য নয়; বরং দীন, সমাজ ও মানবকল্যাণে ব্যয় করার জন্যও।
৫. ইলম (দ্বীনি জ্ঞান) মহান নিয়ামত। আল্লাহ যাকে উপকারী জ্ঞান দান করেন, তিনি বিশেষ অনুগ্রহপ্রাপ্ত।
৬. জ্ঞান অনুযায়ী বিচার করা ও আমল করা অপরিহার্য। শুধু জ্ঞান অর্জন করাই যথেষ্ট নয়; বরং সেই জ্ঞান দিয়ে ন্যায়বিচার ও সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
৭. সম্পদ ও জ্ঞানের প্রকৃত মর্যাদা তাদের সঠিক ব্যবহারে। যে সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় হয় এবং যে জ্ঞান মানুষের উপকারে আসে, সেটিই প্রকৃত সফলতা।
৮. মুসলিমের জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত আখিরাতের সফলতা। তাই দুনিয়ার মর্যাদা, পদ-পদবি বা ধন-সম্পদের জন্য নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রতিযোগিতা করা উচিত।

অতএব, এই হাদিস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, মানুষের প্রতি ঈর্ষা নয়; বরং নেক কাজে অনুপ্রাণিত হওয়া একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। তাই আমাদের উচিত আল্লাহর দেওয়া সম্পদ তাঁর পথে ব্যয় করা এবং উপকারী জ্ঞান অর্জন করে তা অনুযায়ী আমল করা ও অন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা। এ দুটি গুণই দুনিয়া ও আখিরাতে প্রকৃত সফলতার অন্যতম চাবিকাঠি।

মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্য লাশ কাটাছেঁড়া করা কি জায়েজ?

মুফতি ওমর বিন নাছির
মেডিক্যাল শিক্ষার্থীদের জন্য লাশ কাটাছেঁড়া করা কি জায়েজ?
সংগৃহীত ছবি

ইসলাম মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে তার সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছে। মানুষের দেহ শুধু কিছু অস্থি, মাংস ও রক্তের সমষ্টি নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলার এক মহামূল্যবান আমানত। জীবিত অবস্থায় যেমন মানুষের জীবন, দেহ ও সম্মান অক্ষুণ্ণ রাখা ফরজ, তেমনি মৃত্যুর পরও তার মরদেহের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইসলামী শরিয়তের অবিচ্ছেদ্য নির্দেশ।

আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো অ্যানাটমি শিক্ষা, যেখানে মানবদেহের গঠন বোঝার জন্য মৃতদেহ কাটাছেঁড়া করানো হয়। কিন্তু একজন মুসলিম শিক্ষার্থীর মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এভাবে মৃত মানুষের দেহ কাটাছেঁড়া করা শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি? যদি এটি বাধ্যতামূলক হয়, তাহলে তার করণীয় কী?

প্রথমত : ইসলামে মানুষের মর্যাদা
মানুষকে আল্লাহ তাআলা সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে বিশেষ সম্মান দান করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানকে সম্মানিত করেছি।’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৭০)
এই আয়াত প্রমাণ করে, মানুষের মর্যাদা শুধু জীবিত অবস্থার জন্য নয়; বরং তার মানবিক সত্তার জন্য। তাই মৃত্যুর পরও তার মরদেহকে অবমাননা করা ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।

দ্বিতীয়ত : মৃতদেহের সম্মান জীবিতের মতোই
রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃত ব্যক্তির মর্যাদাকে জীবিত মানুষের মর্যাদার সমপর্যায়ে বিবেচনা করেছেন। আয়শা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মৃত ব্যক্তির হাড় ভেঙে ফেলা জীবিত অবস্থায় তার হাড় ভেঙে ফেলার মতোই।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৬১৬)

তৃতীয়ত : অঙ্গহানি নিষিদ্ধ
যুদ্ধক্ষেত্রেও ইসলামে মৃতদেহ বিকৃত বা অঙ্গহানি করা নিষিদ্ধ। মুগিরা ইবনে শুবা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘মহানবী (সা.) অঙ্গহানি করতে নিষেধ করেছেন।’ (তাহাবি, হাদিস : ৫০২৪)
যদি শত্রুর মৃতদেহ বিকৃত করা নিষিদ্ধ হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের দেহ কাটাছেঁড়া করা কতটা গুরুতর বিষয়—তা সহজেই অনুমেয়।

বিখ্যাত ফিকহ বিশ্বকোষ ‘আল-মাওসুআহ আল-ফিকহিয়্যাহ’(২৬/১০২)-এ বলা হয়েছে—ফোকাহায়ে কেরাম একমত যে মানুষের চুল বিক্রি করা বা তা থেকে উপকার গ্রহণ করা জায়েজ নয়। কারণ মানুষ সম্মানিত; তাই তার কোনো অংশকে অবমাননা করা বৈধ নয়। এখানে মানুষের একটি ক্ষুদ্র অংশ—চুল—সম্পর্কেও সম্মান রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


তাই শিক্ষার উদ্দেশ্য হলেও মৃত মানুষের দেহ কেটে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিচ্ছিন্ন করা, হাড় ভাঙা বা দেহ বিকৃত করা মূলত শরিয়তের দৃষ্টিতে উচিত নয়। কারণ এর মাধ্যমে মৃত ব্যক্তির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়। তবে যদি মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর জন্য এটি বাধ্যতামূলক হয়, এবং যদি কোনো দেশে এমন ব্যবস্থা থাকে যে মৃতদেহ কাটাছেঁড়া ছাড়া চিকিৎসাশাস্ত্রে পড়াশোনা সম্পন্ন করা সম্ভব নয় এবং শিক্ষার্থী বাস্তবিকই বাধ্য হয়, তাহলে তার করণীয় হলো—সে নিজের পক্ষ থেকে এ কাজকে বৈধ মনে করবে না, নিয়মিত ইস্তিগফার করবে এবং প্রয়োজনে ন্যূনতম সীমায় অংশগ্রহণ করবে। (হিদায়াহ, ৬/৪২৫, দুররুল মুখতার ও রাদ্দুল মুহতার, ৫/৫৮, ফাতহুল কাদির, ৬/৪২৫-৪২৬, বাদায়েউস সানাই, ৬/১৪২, মাজমাউল আনহার, ৩/৮৫-৮৬)

সম্ভাব্য শরিয়তসম্মত বিকল্প ব্যবস্থা
চিকিৎসা শিক্ষা অব্যাহত রাখার জন্য নিম্নোক্ত বিকল্পগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে—

১. উন্নতমানের কৃত্রিম মানবদেহ বা থ্রিডি অ্যানাটমিক্যাল মডেল ব্যবহার করা।
২. ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, ডিজিটাল অ্যানাটমি ও ত্রিমাত্রিক সফটওয়্যারের মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া।
৩. প্রাণীর দেহ (যেখানে শিক্ষাগতভাবে উপযোগী) ব্যবহার করা।
৪. অস্ত্রোপচারের সময় পর্যবেক্ষণমূলক শিক্ষা গ্রহণ করা।
৫. বৈধ শিক্ষামূলক ভিডিও, থ্রিডি অ্যানিমেশন ও সিমুলেশন ব্যবহার করা।

এ ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা বর্তমানে বিশ্বের অনেক মেডিক্যাল প্রতিষ্ঠানে ক্রমশ গুরুত্ব পাচ্ছে। তাই জীবিত মানুষের মতো মৃত মানুষের মরদেহও সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তার দাবিদার। অতএব উপরোক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, চিকিৎসা শিক্ষার উদ্দেশ্যে মৃতদেহ কাটাছেঁড়া বৈধ নয়। তবে যদি কোনো মুসলিম শিক্ষার্থী এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থায় বাধ্য হয়ে পড়েন, যেখানে এর কোনো বাস্তব বিকল্প নেই, তাহলে তিনি আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন, প্রয়োজনের অতিরিক্ত এতে জড়াবেন না এবং শরিয়তসম্মত বিকল্প প্রতিষ্ঠার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করবেন।

উল্লেখ্য : সমকালীন কিছু আলেম চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপরিহার্য প্রয়োজন, জনকল্যাণ এবং নির্দিষ্ট শর্ত (যেমন অনুমোদিত দেহ, মর্যাদা রক্ষা, প্রয়োজনের সীমা অতিক্রম না করা ইত্যাদি) সাপেক্ষে মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদকে বৈধ বলেছেন।