আমাদের সমাজে বা পরিবারে কলহ তৈরি হওয়ার পেছনে যে সমস্যাগুলো কাজ করে, তার মধ্যে অন্যতম বড় সমস্যা হলো সামান্য কষ্ট পেলেই অন্যের সব অবদান ভুলে যাওয়া। কারো একটি কথা কিংবা একটি ভুলকে বড় করে দেখে তার সারা জীবনের সব অবদানকে অস্বীকার করে বসা।
বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা হয় যে, যে ব্যক্তিটি আমাদের অসংখ্যবার উপকার করেছে, বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছে, আন্তরিক পরামর্শ দিয়েছে, দুঃসময়ে সাহায্য করেছে, কোনো একদিন তার একটি আচরণ আমাদের মন খারাপ করে দিলে আমরা তার সব অবদান ভুলে যাই। এমনকি তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতে শুরু করি। ফলে তার ভালো গুণগুলো জেনেশুনে আড়াল করি এবং সুযোগ পেলেই তার দোষত্রুটি অন্যের কাছে তুলে ধরি।
বিদ্বেষ আমাদের মস্তিষ্ককে এমনভাবে বিকৃত করে দেয় যে প্রতিপক্ষের কোনো গুণই আমাদের চোখে পড়ে না, বরং তার গুণগুলোকেও শয়তান বিভিন্ন যুক্তি দিয়ে আমাদের সামনে ত্রুটি হিসেবে উপস্থাপন করে।
আমরাও শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করে সর্বত্র তার ত্রুটি ছড়াতে থাকি। এমনকি যার পেছনে আমরা এসব ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকি, বেইনসাফপূর্ণ আচরণ করি, বেশির ভাগ সময় দেখা যায় সে আমাদের আত্মীয়, বন্ধু বা কাছের মানুষই হয়।
অথচ মহান আল্লাহ শত্রুর সঙ্গেও ইনসাফ করার নির্দেশ দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে তিনি বলেছেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায়ের সাথে সাক্ষ্যদানকারী হিসেবে সদা দণ্ডায়মান হও।
কোনো কওমের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদেরকে কোনোভাবে প্ররোচিত না করে যে তোমরা ইনসাফ করবে না। তোমরা ইনসাফ করো, তা তাকওয়ার নিকটতর এবং আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে সবিশেষ অবহিত।’ (সুরা : মায়েদা, আয়াত : ৮)
এই আয়াত আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে শত্রুর ক্ষেত্রেও সুবিচার করতে হয়। অতএব আপনজন, প্রতিবেশী, সহকর্মী বা বন্ধুদের একটি ভুলের কারণে তাদের সব ভালো দিক অস্বীকার করা, তাদের সব ভুলকে ভুল হিসেবে প্রচার করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী।
মানুষের মধ্যে ভুলত্রুটি থাকতে পারে। কারণ মহান আল্লাহ মানবজাতিকে দুর্বল করে সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দুর্বল করে।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৮)
দুর্বলতার মানেই হলো মানুষের ভুল হয়ে যাওয়া, সীমাবদ্ধতা থাকা স্বাভাবিক। তাই একজন মানুষের একটি ত্রুটিকে সামনে এনে তার সব গুণকে অন্ধকারে ফেলে দেওয়া, তার সারা জীবনের অবদানগুলো ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া ন্যায়সংগত নয়।
প্রতিটি মানুষের মধ্যেই দোষ-গুণ থাকবে, এর মধ্যেই নিজেদের মধ্যে সমন্বয় করে চলতে হবে। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘কোনো মুমিন পুরুষ কোনো মুমিন নারীর প্রতি বিদ্বেষ-ঘৃণা পোষণ করবে না; (কারণ) তার কোনো চরিত্র অভ্যাসকে অপছন্দ করলে তার অন্য কোনোটি (চরিত্র-অভ্যাস) সে পছন্দ করবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৩৫৪০)
এই হাদিসটি স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারে হলেও অন্য মানুষের প্রতি একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিরও শিক্ষা দেয়। একজন মানুষের মধ্যে যেমন ত্রুটি থাকতে পারে, তেমনি অসংখ্য গুণও থাকতে পারে, এটাই স্বাভাবিক। তাই নিজেদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে সেই গুণগুলোও স্মরণ করতে হবে। তার অবদানগুলোর কথা স্মরণ করলে বিদ্বেষ অনেকাংশে কমে যাবে ইনশাআল্লাহ।
তা ছাড়া মানুষের অবদান মনে রেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করাও ঈমানের অংশ। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না সে আল্লাহর প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না। অথবা যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ নয়, সে আল্লাহর প্রতিও অকৃতজ্ঞ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮১১)
অতএব কারো কাছ থেকে পাওয়া দু-একটি কষ্টের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে তার শত শত উপকার ভুলে যাওয়া কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে না। এটা নিছক হিংসা ও ক্ষোভ। যা মানুষকে অন্যায়ভাবে মিথ্যা অপবাদ দিতে উদ্বুদ্ধ করে। অন্যের চরিত্র ও সফলতা হরণের মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত করে।
অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে কারো ওপর অপবাদ দেওয়া তো দূরের কথা, তার মধ্যে বাস্তবে কোনো দোষ থাকলেও তা ব্যাপকভাবে প্রচার করার ব্যাপারে অনুৎসাহ দিয়েছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে, আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২৫৪৪)
এটি অবশ্য সেই ক্ষেত্রে, যেখানে কারো গোপন পাপ ঢেকে রাখলে সমাজের ক্ষতি বা অন্যের অধিকার নষ্ট হয় না। কিন্তু শত্রুতার জেরে মানুষের ব্যক্তিগত দুর্বলতা, ভুল বা অতীতের ত্রুটি প্রচার করা ইসলামের দৃষ্টিতে নিষিদ্ধ।
এমনকি কাউকে হেয় করার জন্য তার দোষত্রুটি অনুসন্ধান করাও নিষেধ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা ধারণা করা থেকে বিরত থাক। ধারণা বড় মিথ্যা ব্যাপার। তোমরা দোষ তালাশ কোরো না, গোয়েন্দাগিরি কোরো না, পরস্পর হিংসা পোষণ কোরো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ কোরো না এবং পরস্পর বিরোধে লিপ্ত হয়ো না; বরং তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ভাই ভাই হয়ে যাও।’ (বুখারি, হাদিস : ৬০৬৪)
অন্য হাদিসে আরো কঠোর ভাষায় মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘হে সেসব লোক, যারা শুধু মুখে ঈমান এনেছে কিন্তু অন্তরে ঈমান প্রবেশ করেনি! তোমরা মুসলিমদের গিবত করবে না ও দোষত্রুটি তালাশ করবে না। কারণ যারা তাদের দোষত্রুটি খুঁজে বেড়াবে আল্লাহও তাদের দোষত্রুটি খুঁজবেন। আর আল্লাহ কারো দোষত্রুটি তালাশ করলে তাকে তার ঘরের মধ্যেই অপদস্থ করে ছাড়বেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ৪৮৮০)
মহানবী (সা.) এসব কাজ কতটা অপছন্দ করলে বলেছেন যে, যারা মুখে ঈমান এনেছে, কিন্তু তা অন্তরে প্রবেশ করেনি! বোঝা গেল, অন্যের দোষচর্চা করে বেড়ানো, অন্যের ক্ষতি করার চেষ্টা করা ঈমানবিরোধী কাজ।
অন্যের বিনাশ কামনা কখনোই ঈমানের পরিচয় হতে পারে না। বরং যারা অন্যের কল্যাণ চায়, তারাই মুমিন। আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, মহানবী (সা.) বলেন, ‘তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার ভাইয়ের জন্য সেটাই পছন্দ করবে, যা তার নিজের জন্য পছন্দ করে।’ (বুখারি, হাদিস : ১৩)
অর্থাৎ একজন মুমিনের অন্তরে মানুষের জন্য শুভ কামনা থাকবে। কারো মধ্যে সত্যিই যদি দোষত্রুটি থাকে, সে ওই লোকটার অপমান চাইবে না, বরং সে চাইবে যে লোকটা সংশোধিত হোক। তাকে সংশোধন করার প্রয়াসে নেওয়া পদক্ষেপগুলো হবে গঠনমূলক ও কল্যাণকামী মনোভাব নিয়ে।
জীবনে চলার পথে আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু কিংবা সহকর্মীর সঙ্গে মনোমালিন্য হতেই পারে। তাই বলে তাদের সব অবদান ভুলে গিয়ে তাদের ক্ষতি করার জন্য আদাজল খেয়ে নেমে পড়া মুসলমানের বৈশিষ্ট্য নয়। বরং এ রকম পরিস্থিতিতে রাগ সংবরণ করে ক্ষমা করে দেওয়া ঈমানের দাবি। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ৩৪)
মনে রাখতে হবে, মহান আল্লাহ সবার অন্তরের খবর জানেন। মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ, কথাবার্তা, কাজকর্ম ফেরেশতারা লিখে রাখেন। কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষকে নিজ নিজ কর্মের হিসাব দিতে হবে।
মহান আল্লাহ সবাইকে অতিরিক্ত রাগ, ক্ষোভ, হিংসার বশবর্তী হয়ে ষড়যন্ত্রমূলক ঘৃণ্য কাজ করা থেকে বিরত থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।




