আমাদের সমাজে মিরাস (উত্তরাধিকার) সংক্রান্ত অবহেলা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কারো মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পদের সুষ্ঠু নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়, যার ফলে পরিবারে বিরোধ ও আত্মীয়তার বন্ধন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কখনো কখনো এমনও ঘটনা ঘটে যে উত্তরাধিকার সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জেরে মৃত ব্যক্তির দাফন পর্যন্ত আটকে থাকে (নাউজুবিল্লাহ)। অথচ শরিয়ত কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মৃত ব্যক্তির সম্পদের ওপর চারটি সুস্পষ্ট কর্তব্য নির্ধারণ করেছে।
কাফন-দাফনের ব্যবস্থা করা : মৃত ব্যক্তির সম্পদ থেকে সর্বপ্রথম তার কাফন-দাফনের প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহ করা হবে। কারণ মৃত্যুর পর একজন মুসলিমের সম্মানজনক দাফন নিশ্চিত করা জীবিতদের ওপর ফরজে কিফায়া।
তবে যদি কোনো আত্মীয়-স্বজন বা শুভানুধ্যায়ী স্বেচ্ছায় নিজ সম্পদ থেকে এই ব্যয় বহন করেন, তাহলে মৃতের সম্পদ থেকে ব্যয় করা আবশ্যক থাকবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) মৃতের সম্মান রক্ষার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, তোমরা তোমাদের মৃতদের দ্রুত দাফন করো। (মুসলিম, হাদিস : ৯৪৪)
বিদায় হজে ইহরাম অবস্থায় এক ব্যক্তি উটের পিঠ থেকে পড়ে গিয়ে মারা যান। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘তোমরা তাকে বরই পাতাসহ পানি দিয়ে গোসল দাও এবং তার নিজের দুটি কাপড়েই তাকে কাফন পরাও।’ (বুখারি, হাদিস : ১২৬৫)
অন্য হাদিসে এসেছে, উহুদের যুদ্ধে যখন মুসআব ইবনে উমাইর (রা.) শহীদ হন, তখন তাঁর কাফনের জন্য শুধু একটি চাদর অবশিষ্ট ছিল। খাব্বাব (রা.) বর্ণনা করেন : রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের নির্দেশ দিলেন যেন আমরা তা দিয়ে তার মাথা ঢেকে দিই এবং তার পায়ের ওপর ‘ইজখির’ (এক প্রকার সুগন্ধি ঘাস) দিয়ে দিই। (বুখারি, হাদিস : ১২৭৬, মাআরিফুল কোরআন : ২/৩২০, আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহ : ৬/৪৪০)
ঋণ পরিশোধ করা : দ্বিতীয় কর্তব্য হলো মৃত ব্যক্তির সব ঋণ পরিশোধ করা। তার ওপর কারো হক থাকলে মিরাস বণ্টনের আগেই তা আদায় করা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘(মিরাস বণ্টন হবে) তার কৃত অসিয়ত পূরণের পর এবং ঋণ পরিশোধের পর।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ১১)
ঋণের গুরুত্ব এত বেশি যে শহীদের মতো মহান মর্যাদাপ্রাপ্ত ব্যক্তির গুনাহও ঋণের কারণে অবশিষ্ট থাকতে পারে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, শহীদের সব গুনাহ ক্ষমা করা হয়, কিন্তু ঋণ ক্ষমা করা হয় না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৮৮৫-১৮৮৬, আহকামুল কোরআন, জাসসাস (রহ.) কৃত, ২/১২০, আল মাবসুত, সারাখসি (রহ.) কৃত, ৯/২০৩, মাআরিফুল কোরআন : ২/৩২০)
স্ত্রীর অনাদায়ী মোহরও ঋণের অন্তর্ভুক্ত : স্বামীর ওপর স্ত্রীর মোহর যদি অনাদায়ী থাকে, তবে সেটিও শরিয়তের দৃষ্টিতে ঋণ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে সমাজে এ বিষয়ে মারাত্মক অবহেলা রয়েছে। যদি স্ত্রী স্বতঃস্ফূর্তভাবে ও পূর্ণ সন্তুষ্টচিত্তে মোহর মওকুফ না করেন, তবে তা স্বামীর ওপর ঋণ হিসেবেই বহাল থাকবে। জবরদস্তি, সামাজিক চাপ বা মানসিক বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে মোহর মাফ করিয়ে নিলে শরিয়তে তা গ্রহণযোগ্য নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা নারীদের তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান করো।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ৪)
হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শর্তগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পূরণ করার যোগ্য হলো সেই শর্ত, যার মাধ্যমে তোমরা নারীদের লজ্জাস্থানকে নিজেদের জন্য হালাল করেছ (অর্থাৎ মোহরানা)।’ (বুখারি, হাদিস : ২৭২১)
বৈধ অসিয়ত পূর্ণ করা : তৃতীয় কর্তব্য হলো মৃত ব্যক্তির বৈধ অসিয়ত বাস্তবায়ন করা। ঋণ পরিশোধের পর অবশিষ্ট সম্পদের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ থেকে তার বৈধ অসিয়ত পূরণ করা হবে। যেমন—নামাজের কাজার ফিদয়া আদায়, রোজার ফিদয়া প্রদান—এ ধরনের অন্যান্য বৈধ অসিয়ত।
কিছু অসিয়ত আছে এমন, যা কার্যকর করা যাবে না। যেমন—অবৈধ কাজের অসিয়ত, কোনো ওয়ারিশের অনুকূলে বৈষম্যমূলক অযৌক্তিক অসিয়ত (অন্য ওয়ারিশদের অনুমতি ছাড়া)। (আল মাবসুত : ৯/২০২, মাআরিফুল কোরআন : ২/৩২০, আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহ : ৬/৪৪০)
তার বৈধ অসিয়তসমূহ পরিত্যক্ত সম্পদের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ থেকে আদায় করতে হবে। এ সীমার মধ্যে থেকেই অসিয়ত বাস্তবায়ন করা শরিয়তের বিধান। যদি এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ দ্বারা সম্পূর্ণ অসিয়ত পূরণ করা সম্ভব না হয়, তবে অবশিষ্ট সম্পদ থেকে তা পূরণ করা আবশ্যক নয়; বরং এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্তই তা সীমাবদ্ধ থাকবে। তবে সব ওয়ারিশ স্বতঃস্ফূর্তভাবে সম্মত হলে এবং তাদের মধ্যে কেউ অপ্রাপ্তবয়স্ক না থাকলে, পরিত্যক্ত সম্পদের অতিরিক্ত অংশ থেকেও অসিয়ত পূর্ণ করা যেতে পারে। (আল ফাতাওয়া আল হিন্দিয়্যাহ : ৬/১১৪, ইমদাদুল মুফতিন, পৃ. ৮৬৩)
মিরাস বণ্টন করা : ওপরের তিনটি কর্তব্য সম্পন্ন করার পর অবশিষ্ট সম্পদ শরিয়তের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী ওয়ারিশদের মধ্যে বণ্টন করা হবে—এটিই চতুর্থ ও চূড়ান্ত কর্তব্য। দুঃখজনকভাবে এ ক্ষেত্রেই সমাজে সবচেয়ে বেশি অবহেলা দেখা যায়। অনেকে মনে করেন, সম্পদ যেহেতু পরিবারেই আছে, তাই এখনই ভাগ করার প্রয়োজন নেই; আবার কেউ প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখে, ফলে দুর্বল ওয়ারিশদের হক নষ্ট হয়। অথচ ব্যক্তির ইন্তেকালের সঙ্গে সঙ্গেই তার পরিত্যক্ত সম্পদে শরিয়ত নির্ধারিত ওয়ারিশদের মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, পুরুষদের জন্য রয়েছে মা-বাবা ও নিকটাত্মীয়দের রেখে যাওয়া সম্পদে অংশ এবং নারীদের জন্যও রয়েছে অংশ। (সুরা : নিসা, আয়াত : ৭)
মিরাসে কারো প্রাপ্য অংশ থেকে তাকে বঞ্চিত করা শুধু সামাজিক অন্যায় নয়; এটি আল্লাহ নির্ধারিত অধিকারে হস্তক্ষেপ, যা কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত।