• ই-পেপার

একাধিক বিয়ে হওয়া নারী জান্নাতে কোন স্বামীর সঙ্গে থাকবেন?

অর্ডার বাতিল হলে কাস্টমস বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের বিধান

মুফতি ওমর বিন নাছির
অর্ডার বাতিল হলে কাস্টমস বা প্রতিষ্ঠানের দেওয়া অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণের বিধান
সংগৃহীত ছবি

বর্তমান যুগে অনলাইন কেনাকাটা মানুষের জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ পণ্য ক্রয় করে থাকেন। তবে অনেক সময় দেখা যায়, বিদেশ থেকে অর্ডারকৃত কোনো পণ্য কাস্টমস জটিলতা, আমদানি বিধিনিষেধ কিংবা অন্যান্য প্রশাসনিক কারণে গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর আগেই বাতিল হয়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণত ক্রেতাকে তার পরিশোধিত অর্থ ফেরত দেওয়া হয়। কখনো কখনো প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের অসুবিধার কথা বিবেচনা করে মূল টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত কিছু অর্থও প্রদান করে থাকে। এ অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই অনেক ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মনে প্রশ্ন জাগে—এই অতিরিক্ত অর্থ গ্রহণ করা কি বৈধ? এটি কি সুদের অন্তর্ভুক্ত হবে, নাকি শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ উপহার হিসেবে গণ্য হবে?

লেনদেনের ক্ষেত্রে বৈধতা ও স্বচ্ছতা
ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনকে বৈধ ঘোষণা করেছে এবং তা ন্যায়, সততা ও পারস্পরিক সন্তুষ্টির ভিত্তিতে পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনরা! তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ কোরো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে হলে তা বৈধ।’ (সুরা : নিসা, আয়াত : ২৯)

এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, বৈধ ও স্বচ্ছ উপায়ে সম্পদ অর্জন করা ইসলামে অনুমোদিত।

সুদ কী?
শরিয়তের দৃষ্টিতে সুদ (রিবা) হলো এমন অতিরিক্ত অর্থ, যা কোনো ঋণ বা বিনিময় চুক্তিতে পূর্বশর্ত হিসেবে নির্ধারিত থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২৭৫)

ফোকাহায়ে কেরাম বলেন, ‘রিবা হলো এমন অতিরিক্ত সুবিধা, যা কোনো চুক্তিতে প্রতিদান ছাড়াই শর্তসাপেক্ষে নির্ধারণ করা হয়।’ (বুহুস ফি কাদায়া ফিকহিয়্যা মুআসিরাহ, ২/১৫৫)
অতএব, কোনো অতিরিক্ত অর্থকে সুদ বলার জন্য অন্যতম মৌলিক শর্ত হলো—সেটি পূর্বনির্ধারিত ও শর্তযুক্ত হতে হবে।

অতিরিক্ত অর্থ যদি পূর্বশর্ত না হয়
যদি কোনো গ্রাহক একটি পণ্য ক্রয় করেন এবং পরে কোনো কারণে পণ্যটি বাতিল হয়ে যায়, এরপর প্রতিষ্ঠান বা কাস্টমস কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের ক্ষতি, সময় নষ্ট বা অসুবিধার কথা বিবেচনা করে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অতিরিক্ত কিছু অর্থ প্রদান করে, অথচ এই অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার বিষয়ে আগে কোনো শর্ত, চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি না থাকে, তাহলে তা সুদ হিসেবে গণ্য হবে না। বরং তা উপহার (হাদিয়া), অনুদান বা ক্ষতিপূরণস্বরূপ সৌজন্য প্রদানের অন্তর্ভুক্ত হবে। 

আর ইসলাম উপহার প্রদান ও গ্রহণকে উৎসাহিত করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা পরস্পর উপহার আদান-প্রদান করো, এতে পারস্পরিক ভালোবাসা বৃদ্ধি পাবে।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৫৯৪)
সুতরাং এই উপহার  শরিয়তসম্মত, তাই তা গ্রহণ করা বৈধ।

হানাফি ফিকহের প্রসিদ্ধ গ্রন্থ মিরকাতুল মাফাতিহ-এ উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘কোনো অতিরিক্ত প্রদান যদি পূর্বশর্তবিহীন হয় এবং তা অনুগ্রহ বা সৌজন্যবশত প্রদান করা হয়, তাহলে তা বৈধ উপহারের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (মিরকাতুল মাফাতিহ, ৬/২৪৩৮)

একইভাবে সমসাময়িক ইসলামি গবেষকরাও উল্লেখ করেছেন যে, কোনো পুরস্কার, বোনাস বা অতিরিক্ত অর্থের বৈধতার অন্যতম শর্ত হলো এটি যেন প্রদানকারীর পক্ষ থেকে স্বেচ্ছায় প্রদত্ত অনুদান হয় এবং এর বিপরীতে গ্রহীতার ওপর কোনো আর্থিক দায়বদ্ধতা আরোপিত না হয়।

অতএব, কোনো ব্যক্তি যদি দারাজ বা অন্য কোনো অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে পণ্য অর্ডার করেন এবং কাস্টমস বা প্রশাসনিক কারণে সেই পণ্য বাতিল হয়ে যায়, এরপর প্রতিষ্ঠানটি মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার পাশাপাশি ১. অতিরিক্ত কিছু অর্থ প্রদান করে, তাহলে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিবেচ্য হবে—
১. অতিরিক্ত অর্থটি আগে থেকে চুক্তিবদ্ধ বা শর্তযুক্ত ছিল না।
২. গ্রাহক অতিরিক্ত অর্থ দাবি করেননি।
৩. এটি কোনো ঋণের ওপর নির্ধারিত অতিরিক্ত অর্থ নয়।
৪. প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছায় তা প্রদান করেছে।
৫. অর্থটি ক্ষতিপূরণ, সৌজন্য বোনাস বা উপহার হিসেবে দেওয়া হয়েছে।
এসব শর্ত পূরণ হলে উক্ত অতিরিক্ত অর্থ শরিয়তের দৃষ্টিতে হাদিয়া বা অনুদান হিসেবে গণ্য হবে এবং তা গ্রহণ করা বৈধ হবে, ইনশাআল্লাহ।


ইসলাম লেনদেনের ক্ষেত্রে ন্যায়, স্বচ্ছতা ও পারস্পরিক সন্তুষ্টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। কোনো অতিরিক্ত অর্থ তখনই সুদে পরিণত হয়, যখন তা পূর্বশর্তযুক্ত ও চুক্তিবদ্ধ অতিরিক্ত সুবিধা হিসেবে নির্ধারিত থাকে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠান বা কর্তৃপক্ষ যদি স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রাহকের প্রতি সৌজন্য, ক্ষতিপূরণ বা উপহার হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করে, তাহলে তা সুদের অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং বৈধ হাদিয়া হিসেবে গণ্য হবে।

তাই দারাজ বা অনুরূপ প্রতিষ্ঠানের অর্ডার বাতিলের ক্ষেত্রে কাস্টমস বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রদত্ত অতিরিক্ত অর্থ যদি পূর্বশর্তহীন ও স্বেচ্ছাপ্রদত্ত হয়, তাহলে তা গ্রহণ করা শরিয়তসম্মত এবং এতে কোনো গুনাহ নেই। তবে মুসলমানের উচিত সর্বদা নিজের উপার্জন ও ভোগে হালাল-হারামের ব্যাপারে সতর্ক থাকা এবং সন্দেহজনক বিষয় থেকে দূরে থাকা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও সম্মানকে নিরাপদ রাখে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৫২)

সর্বশেষ কথা হলো, পার্থিব জীবনের লেনদেনে একজন মুমিনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সে শুধু লাভ-ক্ষতির হিসাব দেখে না; বরং হালাল-হারামের মানদণ্ডেও প্রতিটি বিষয়কে যাচাই করে। অনলাইন কেনাকাটার এই যুগে বিভিন্ন কারণে অর্ডার বাতিল হওয়া এবং তার বিপরীতে অতিরিক্ত অর্থ পাওয়ার ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে মূল বিবেচ্য বিষয় হলো, সেই অতিরিক্ত অর্থটি কোনো পূর্বশর্ত, চুক্তি বা সুদভিত্তিক লেনদেনের অংশ কি না।

যদি অতিরিক্ত অর্থ সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায়, কোনো দাবি বা পূর্বনির্ধারিত শর্ত ছাড়াই ক্ষতিপূরণ, সৌজন্য বা উপহার হিসেবে প্রদান করা হয়, তাহলে তা বৈধ হাদিয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে এবং গ্রহণ করতেও শরিয়তের কোনো বাধা নেই। কারণ ইসলাম বৈধ উপহারকে উৎসাহিত করে, কিন্তু শর্তযুক্ত অতিরিক্ত সুবিধা তথা রিবাকে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করেছে। 

সুতরাং একজন সচেতন মুসলমানের কর্তব্য হলো, প্রতিটি আর্থিক লেনদেনে আল্লাহভীতিকে প্রাধান্য দেওয়া, সন্দেহজনক বিষয় থেকে বেঁচে থাকা এবং হালাল উপার্জনের প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। কেননা দুনিয়ার সামান্য সম্পদের চেয়ে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও হালাল রিজিকের বরকতই একজন মুমিনের প্রকৃত সফলতার ভিত্তি।

হাদিসের বাণী

সমাজে অসৎকাজ থেকে বাধা না দেওয়ার পরিণতি

ইসলামী জীবন ডেস্ক
সমাজে অসৎকাজ থেকে বাধা না দেওয়ার পরিণতি
সংগৃহীত ছবি

নোমান ইবনে বাশির (রা.) থেকে বর্ণিত, নবি কারিম (সা.) বলেছেন, আল্লাহর নির্ধারিত সীমায় অবস্থানকারী এবং ওই সীমা লঙ্ঘনকারীর দৃষ্টান্ত হলো ওই কাফেলার মতো, যারা দুই তলাবিশিষ্ট একটি জাহাজে আরোহণ করার জন্য লটারির মাধ্যমে কিছু লোক নিচতলায় অবস্থান করল আর কিছু লোক ওপরের তলায়...।

হাদিসের সহজ ও সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা : একটা জাহাজে কয়েকজন লোক আরোহণ করল। কেউ নিচে কেউ ওপরে। তো নিচতলার লোকজনের পানির প্রয়োজন দেখা দিল। তারা সেই পানির জন্য ওপরের তলায় না গিয়ে ভাবল, আমাদের নিচেই তো পানি আছে, তাই তারা সেই জাহাজের তলা ফুটা করার সিদ্ধান্ত নিল। এখন ওপরের তলার লোকজন যদি নিচতলার লোকজনকে বাধা না দেয়, তাহলে সবাই ডুবে মরবে। আর যদি এই ধ্বংসাত্মক কাজ থেকে নিষেধ করে, তাহলে সবাই বেঁচে যাবে। আর এই দৃষ্টান্ত অসৎ কাজের বাধা প্রদান না-করার সাথে করা হয়েছে। সমাজে যদি অসৎকাজের বাধা প্রদান না থাকে, তাহলে পুরো সমাজ এই জাহাজবাসীর মতো ধ্বংস হয়ে যাবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নম্বর : ২৪৯৩)

শিক্ষা ও বিধান

১. সমাজে কেউ অন্যায়, পাপ বা ক্ষতিকর কাজ করলে তাকে যথাসাধ্য বাধা দেওয়া মুসলমানদের দায়িত্ব। কেননা ইসলাম অন্যায়ের প্রতি নীরব থাকাকে সমর্থন করে না।

২. একজন ব্যক্তি বা একটি গোষ্ঠীর অন্যায় কাজের পরিণতি অনেক সময় পুরো সমাজকে ভোগ করতে হয়। জাহাজের ছিদ্র যেমন সবাইকে ডুবিয়ে দেয়, তেমনি সমাজে ছড়িয়ে পড়া পাপ ও অপরাধও সামষ্টিক বিপর্যয় ডেকে আনে।

৩. মানুষ একা নয়; সবাই একটি সমাজের অংশ। তাই অন্যের ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড দেখে উদাসীন থাকা উচিত নয়।

৪. নীরবতা অনেক সময় অপরাধে সহযোগিতার শামিল। যারা জাহাজে ছিদ্র করতে চেয়েছিল, তাদের বাধা না দিলে উপরতলার লোকেরাও ধ্বংস হতো। একইভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেওয়া অনেক সময় সেই অন্যায়ের পরোক্ষ সমর্থন হয়ে যায়।

৫. সঠিক সময়ে উপদেশ, নসিহত ও সংশোধনের চেষ্টা ব্যক্তি ও সমাজকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে পারে।

৬. কেউ নিজের ইচ্ছামতো এমন কিছু করতে পারে না, যা অন্যের ক্ষতি বা সামষ্টিক ক্ষতির কারণ হয়। ইসলামে ব্যক্তিস্বাধীনতারও সীমারেখা আছে।

সবশেষে এই হাদিস আমাদের শেখায় যে, একটি সমাজের মানুষ পরস্পরের সঙ্গে এমনভাবে জড়িত, যেমন একটি জাহাজের যাত্রীরা। সমাজে অন্যায়, পাপ ও ক্ষতিকর কাজকে প্রশ্রয় দিলে তার ক্ষতি শেষ পর্যন্ত সবার ওপর এসে পড়ে। তাই ব্যক্তি ও সমাজকে রক্ষা করতে হলে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও উত্তম পদ্ধতিতে সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে বাধা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করতে হবে।

অশুভ লক্ষণ ও অকল্যাণ থেকে বাঁচতে যে দোয়া পড়বেন

ইসলামী জীবন ডেস্ক
অশুভ লক্ষণ ও অকল্যাণ থেকে বাঁচতে যে দোয়া পড়বেন
সংগৃহীত ছবি

মানুষের জীবন সুখ-দুঃখ, আশা-নিরাশা, কল্যাণ-অকল্যাণের নানা ঘটনার সমষ্টি। কখনো এমন কিছু দৃশ্য, স্বপ্ন, সংবাদ বা পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যা মানুষের মনে অশুভ আশঙ্কা, ভয় কিংবা উদ্বেগ সৃষ্টি করে। জাহেলি যুগে মানুষ নানা কুসংস্কার, অশুভ লক্ষণ ও কল্পিত অমঙ্গলের ওপর বিশ্বাস করত। ইসলাম এসে এসব ভিত্তিহীন ধারণা দূর করে মানুষের হৃদয়ে তাওহিদ, আল্লাহর ওপর ভরসা এবং তাকদিরের প্রতি বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করেছে। একজন মুমিন জানে, কোনো বস্তু, ব্যক্তি, দিন বা ঘটনার নিজস্বভাবে কল্যাণ বা অকল্যাণ সাধনের ক্ষমতা নেই; সব কিছুই আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও ফয়সালার অধীন।

তবে মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতার কারণে কখনো কখনো মনে অশুভ আশঙ্কা জাগতেই পারে। এমন পরিস্থিতিতে একজন মুমিনের উচিত আল্লাহর ওপর ভরসা করা এবং তাঁর কাছে দোয়ার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করা। দোয়াটি হলো-  


اللَّهُمَّ لَا طَيْرَ إِلَّا طَيْرُكَ، وَلَا خَيْرَ إِلَّا خَيْرُكَ، وَلَا إِلَهَ غَيْرُكَ

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মা লা ত্বাইরা ইল্লা ত্বাইরুকা ওয়া লা খাইরা ইল্লা খাইরুকা ওয়া লা ইলাহা গাইরুকা।

অর্থ : হে আল্লাহ! আপনার পক্ষ থেকে অশুভ মঞ্জুর না হলে অশুভ বলে কিছু নেই। আপনার কল্যাণ ছাড়া কোনো কল্যাণ নেই। আর আপনি ছাড়া কোনো প্রকৃত ইলাহ নেই। 

হাদিস : ইবনে ওমর (রা) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অশুভ লক্ষণ ও অকল্যাণ থেকে বাঁচতে মানুষ যেন এই দোয়া পাঠ করে।  (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস নম্বর : ৭০৪৫)

হাদিসের বর্ণনায় দেশের সীমান্ত পাহারার মর্যাদা ও ফজিলত

ইসলামী জীবন ডেস্ক
হাদিসের বর্ণনায় দেশের সীমান্ত পাহারার মর্যাদা ও ফজিলত
সংগৃহীত ছবি

দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু একটি নাগরিক দায়িত্ব নয়; বরং এটি একটি মহান ইবাদতও বটে। মানুষের জীবন, সম্পদ, স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় যারা সতর্ক প্রহরায় নিয়োজিত থাকেন, ইসলাম তাদের জন্য ঘোষণা করেছে বিশেষ মর্যাদা ও বিরাট সওয়াবের সুসংবাদ। ইসলামী পরিভাষায় সীমান্ত ও জনপদ রক্ষার উদ্দেশ্যে শত্রুর অনুপ্রবেশ প্রতিরোধে সতর্ক অবস্থানে থাকাকে বলা হয় ‘রিবাত’। কোরআন ও হাদিসে এই আমলের এমনসব ফজিলত বর্ণিত হয়েছে, যা অনেক নফল ইবাদতের চেয়েও অধিক মর্যাদাপূর্ণ।

কোরআনে সীমান্ত পাহারায় সতর্ক থাকার নির্দেশ
মহান আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ করো, ধৈর্যে অটল থাকো, সীমান্তে ও প্রহরায় নিয়োজিত থাকো এবং আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পারো।’ (সুরা আল-ইমরান : আয়াত ২০০)

মুফাসসিরিনে কেরাম বলেন, এ আয়াতে মুসলিম সমাজ, রাষ্ট্র ও জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ‘রাবিতু’ শব্দটি সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা রক্ষার গুরুত্বের প্রতি বিশেষ ইঙ্গিত বহন করে।

এক দিনের সীমান্ত পাহারা দুনিয়ার সব কিছুর চেয়েও উত্তম
সাহল ইবনে সাদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে এক দিন সীমান্ত পাহারা দেওয়া দুনিয়া ও এর ওপর যা কিছু আছে তার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৮৯২)
দুনিয়ার বিপুল সম্পদ, ক্ষমতা ও ভোগ-বিলাসের সঙ্গে তুলনা করেও সীমান্ত পাহারার প্রকৃত মর্যাদা প্রকাশ করা সম্ভব নয়। হাদিসটি এই মহান আমলের অসাধারণ ফজিলত স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে।

এক দিন-এক রাতের প্রহরা এক মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ
সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে এক দিন ও এক রাত সীমান্ত পাহারা দেওয়া এক মাস রোজা রাখা এবং এক মাস রাতভর ইবাদত করার চেয়েও উত্তম।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য আত্মনিবেদিত দায়িত্ব পালন অনেক সময় দীর্ঘ নফল ইবাদতের চেয়েও বেশি সওয়াবের কারণ হতে পারে।

মৃত্যুর পরও বন্ধ হয় না সওয়াব
একই হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘যদি এ অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, তবে তার আমলের সওয়াব অব্যাহত থাকবে, তার জন্য রিজিক প্রবাহিত হতে থাকবে এবং সে কবরের পরীক্ষার ভয় থেকে নিরাপদ থাকবে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৯১৩)
সাধারণত মানুষের মৃত্যুর সঙ্গে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত পাহারা ও নিরাপত্তা রক্ষার মতো জনকল্যাণমূলক দায়িত্বের প্রতিদান আল্লাহ তাআলা মৃত্যুর পরও অব্যাহত রাখেন।

যে রাত কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ
আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘আমি কি তোমাদের এমন এক রাতের কথা বলব না, যা কদরের রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ? সে হলো ওই প্রহরীর রাত, যে ভয়সংকুল স্থানে পাহারা দেয় এবং আশঙ্কা করে যে হয়তো সে তার পরিবারের কাছে জীবিত ফিরে যেতে পারবে না।’ (আল মুসতাদরাক আলা আসসহিহাইন, হাদিস : ২৪২৪, তারগিব ওয়াত তারহিব : ১২৩২)

এ হাদিস সীমান্তরক্ষীদের আত্মত্যাগ, ঝুঁকি ও আন্তরিকতার উচ্চ মর্যাদা তুলে ধরে।

যে চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না
সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি চোখকে জাহান্নামের আগুন স্পর্শ করবে না—এক. যে চোখ আল্লাহর ভয়ে অশ্রু ঝরায়; দুই. যে চোখ আল্লাহর পথে রাত জেগে পাহারা দেয়।’ (তিরমিজি, হাদিস : ১৬৩৯)
এ হাদিসে সীমান্ত ও জনপদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য জাহান্নাম থেকে মুক্তির সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।


একটি রাতের প্রহরায় জান্নাতের সুসংবাদ
হুনাইনের যুদ্ধের রাতে সাহাবি আনাস ইবনে আবু মারসাদ আল-গানাবি (রা.) একটি গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথ পাহারার দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সারা রাত ঘোড়ার পিঠে থেকে প্রহরা দেন এবং নামাজ ও প্রয়োজন ছাড়া একবারও দায়িত্বস্থল ত্যাগ করেননি। পরদিন রাসুলুল্লাহ (সা.) তাঁকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘তুমি নিজের জন্য জান্নাত অবধারিত করে নিয়েছ।’ (আবু দাউদ, হাদিস : ২৫০১)
এ সুসংবাদ তার নিষ্ঠা, সতর্কতা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দায়িত্ব পালনের ফলস্বরূপ প্রদান করা হয়েছিল।

জান্নাতের সুসংবাদ যাদের জন্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সুসংবাদ ওই বান্দার জন্য, যে আল্লাহর পথে সদা প্রস্তুত থাকে। তাকে পাহারায় নিয়োজিত করলে সে পাহারায় থাকে, আর পেছনে রাখলে পেছনেই থাকে।’ (বুখারি ২৮৮৭)

বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষা
বর্তমান সময়ে সীমান্তরক্ষী বাহিনী, সেনাবাহিনী, কোস্ট গার্ড, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও জনগণের নিরাপত্তা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। যদি তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি, দেশ ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নিয়তে দায়িত্ব পালন করেন, তাহলে তারা কোরআন ও হাদিসে বর্ণিত এসব ফজিলতের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আশা করতে পারেন।

ইসলামের দৃষ্টিতে সীমান্ত পাহারা ও জনপদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি মহান ইবাদত। এক দিনের প্রহরা দুনিয়ার সব সম্পদের চেয়েও মূল্যবান, এক দিন-এক রাতের প্রহরা এক মাসের নফল ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, এমনকি এর সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। যারা দেশ, সমাজ ও মানুষের নিরাপত্তার জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মুখে রেখে দায়িত্ব পালন করেন, তারা নিঃসন্দেহে বিশেষ সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী।

ইসলাম শুধু মসজিদের ভেতরের ইবাদতকে নয়, বরং মানুষের নিরাপত্তা, সমাজের স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রের সুরক্ষার জন্য নিবেদিত দায়িত্বশীল কাজকেও মহান সওয়াবের উৎস হিসেবে গণ্য করেছে। সীমান্ত পাহারা তারই একটি উজ্জ্বল ও অনন্য উদাহরণ। আল্লাহ তাআলা আমাদের দেশের নিরাপত্তা রক্ষাকারী সব সদস্যের খেদমত কবুল করুন, তাদের হেফাজত করুন এবং তাদের দুনিয়া ও আখিরাতে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমিন।