আজ দেশান্তরি হয়ে হাজার মাইল দূরে বসে যখন পৃথিবীর মানচিত্রের দিকে তাকাই, তখন অস্তিত্বের কেন্দ্রে এক বিশাল মহীরুহকে অনুভব করি—তিনি আমার বাবা। ৯ মাসের দীর্ঘ বিরতি, শুধু ভিডিও কলে সীমাবদ্ধ আমাদের দেখাদেখি। প্রযুক্তির এই কৃত্রিম আলোতে বাবার মুখটি স্পষ্ট দেখা যায়, কিন্তু তাঁর হাতের সেই উষ্ণতা, যা একসময় সব ভয় দূর করে দিত, তাকে কি আর ভার্চুয়ালজগতে পাওয়া যায়? আমার বাবা বহুল আলোচিত ‘উগ্র মেজাজ’ বা কঠোর শাসনের এক মূর্ত প্রতীক। শৈশব থেকে কৈশোর পর্যন্ত তাঁর সেই শাসনের ছায়ায় বেড়ে ওঠা আমার কাছে কখনো কখনো পাহাড়সম মনে হতো। পরিণত বয়সে এসে বুঝি সেই কড়া মেজাজের আড়ালে ছিল এক বিশাল সমুদ্রসম মমতা, পৃথিবীর সব প্রতিকূলতার বিপরীতে দাঁড়িয়ে আমাকে যিনি অকুতোভয় করে তোলেন। যখন ব্যর্থতার চোরাবালিতে হারিয়ে যাই, তিনি এক ধ্রুবতারার মতো জ্বলে ওঠেন আমার সমর্থনে। আজ বড় হয়েছি, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে পৃথিবী দেখার সাহস অর্জন করেছি। কিন্তু অবাক হয়ে দেখি, আমার এই বেড়ে ওঠাকে তিনি শুধু দেখেননি, লালন করেছেন তাঁর সব স্বপ্ন দিয়ে। তাঁর একমাত্র তৃষ্ণা—তাঁর সন্তান একজন ‘প্রতিষ্ঠিত নারী’ হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে। বাবা জানেন না, আমার এই পথচলার প্রতিটি ধাপে যে আত্মবিশ্বাস কাজ করে, সেই জ্বালানি তাঁরই দেওয়া। ভিডিও কলের ওপাশ থেকে যখন তিনি বলেন, ‘সামনে এগিয়ে যাও, কোনো কিছুতেই থেমো না’, তখন মনে হয় হাজার মাইল দূরত্বেও তিনি ঠিক আমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন। বাবার শাসন আর অনুপ্রেরণা—এই দুইয়ের সমন্বয়ে আমার সত্তা। তিনি আমাকে শিখিয়েছেন—প্রতিষ্ঠা মানে শুধু ক্যারিয়ার নয়, বরং মেরুদণ্ড সোজা রেখে মাথা উঁচু করে বাঁচার নামই হলো প্রকৃত স্বাধীনতা। তাঁর সেই কঠোরতা আজ আমার কাছে এক অনুশাসিত জীবনের পথনির্দেশক। প্রতিদিনের কথোপকথনে তিনি যে স্বপ্ন বুনে দেন, তা আমাকে ক্লান্ত হতে দেয় না। বাবা মানেই সেই আকাশ, যার সীমানা নেই। হাজার মাইল দূরে থেকেও তার ছায়ায় নিরাপত্তা অনুভব করি। সেই ছায়ায়ই আমার বেড়ে ওঠা, স্বপ্ন দেখা। বাবা, তুমি দূরে আছ ঠিকই, কিন্তু আমার প্রতিটি সাফল্যের প্রতিটি কণায় মিশে আছ তুমি।
মুমতাহহিনা খাতুন
তেহরান, ইরান




