মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে চিকিৎসা অন্যতম হলেও আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতের সামগ্রিক চিত্র অত্যন্ত হতাশাজনক। বিশেষ করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ চিকিৎসাসেবা পায় না বললেই চলে। হাসপাতালের ভবন থাকলে চিকিৎসক নেই, আবার চিকিৎসক থাকলে ওষুধ থাকে না। আবার কোথাও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম। এমন বহুবিধ সংকটে জর্জরিত দেশের স্বাস্থ্য খাত।
দেশের বিভিন্ন এলাকার হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা নিয়ে চলতি মাসে কালের কণ্ঠ বেশ কিছু সরেজমিন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে আমাদের স্বাস্থ্য খাতের ভগ্ন দশার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আন্তরিকতার অভাবও সামনে এসেছে। ১৮ জুন প্রকাশিত ভোলা জেনারেল হাসপাতাল নিয়ে প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সেখানকার ছয় বেডের আইসিইউ কক্ষ পাঁচ বছর ধরে তালাবদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। ২০২১ সালে যন্ত্রপাতি সবই কেনা হয়েছে, কিন্তু সেখানে দক্ষ জনবল নেই। ২৩ জুন রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল নিয়ে ‘হাসপাতাল নিজেই রোগী’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ৬০০ শয্যার হাসপাতালটিতে প্রতিদিন গড়ে আড়াই হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকছে। বারান্দা, করিডর, এমনকি সিঁড়ির পাশেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালটির যে অবকাঠামো ও জনবল থাকা প্রয়োজন, তার কোনোটিই নেই। সর্বশেষ গতকাল প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা গেছে, গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার তালিয়া ২০ শয্যার হাসপাতাল ভবনটি পরিত্যক্ত হয়ে সাপ-শিয়ালের আস্তানায় পরিণত হয়েছে। সেখানে যে কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ পেয়েছিলেন, তাঁরাও এলাকা ছেড়েছেন। অথচ ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২০ সালে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শেষ হয়। কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রেজওয়ানা রশীদ বলেন, ‘অর্থনৈতিক কোড না থাকায় এই হাসপাতালটির কার্যক্রম শুরু করা যাচ্ছে না।’ তাই বলে এত দামি ভবন পরিত্যক্ত হয়ে যাবে? এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কারো নেই? দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের চরম অব্যবস্থাপনার কারণে কোটি কোটি টাকা ঠিকই খরচ হচ্ছে, কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রাপ্য সেবা পাচ্ছে না।
এদিকে গত রবিবার স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিত সংসদে বলেছেন, ‘দেশে চিকিৎসা ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীদের পকেট থেকেই পরিশোধ করতে হয়, যেখানে থাইল্যান্ডে এই হার মাত্র ১০ শতাংশ এবং মালদ্বীপে প্রায় ১৮ শতাংশ।’ তিনি যথার্থই বলেছেন। কত মানুষ যে চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে নিঃস্ব হচ্ছে, তার হিসাব নেই।
আমরা মনে করি, দেশের ভঙ্গুর স্বাস্থ্য খাত ঠিক করতে হলে এই খাতের আমূল সংস্কার দরকার। প্রথমত, অর্থের অপচয় বন্ধ করতে হবে। এবার বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, যা অত্যন্ত ইতিবাচক। কিন্তু এর সুফল যেন সাধারণ মানুষ পায় তার জন্য স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি অপরিহার্য।

