প্রযুক্তির দাপটে আমাদের শিশুদের চিরচেনা শৈশবের রূপটাই আমূল বদলে যাচ্ছে। একসময় শিশুরা বিকেলে খেলার মাঠে ছুটে গেলেও এখন তাদের একটি বড় অংশ ডিজিটাল স্ক্রিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকছে। গবেষণা বলছে, এতে শিশুরা চোখের সমস্যা, স্থূলতা, মানসিক বিকাশে বাধাসহ বিবিধ সমস্যায় ভুগছে। বিষয়টি এতটাই বেড়েছে যে গোটা বিশ্বই এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। ডিজিটাল আসক্তি থেকে শিশুদের সুরক্ষায় দেশে দেশে আইন হচ্ছে। হতাশার ব্যাপার হলো, বাংলাদেশে এ নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য নেই।
কালের কণ্ঠের খবরে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশের কিশোর-কিশোরীদের একটি বড় অংশের রাত জেগে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক বা ইনস্টাগ্রাম স্ক্রল করা নিত্যদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। ঘরে ঘরে একই চিত্র। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেকোনো নেশার মতো ইন্টারনেট আসক্তিও মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে মানুষের মনোযোগ ও স্বাভাবিক স্মৃতিশক্তি নষ্ট করে দেয়।’ ডিজিটাল আসক্তির কারণে কিশোররা নানা অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। গতকালই আরেক খবরে বলা হয়েছে, লক্ষ্মীপুরে স্কুলছাত্র মেহেদী হাসানকে (১৫) পিটিয়ে ও শ্বাস রোধ করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) জানিয়েছে, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল স্ক্রিনে এবং গেমিং ডিভাইসে সময় কাটাচ্ছে। অথচ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদিত সময় হচ্ছে সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা। এতে এক-তৃতীয়াংশের বেশি শিশু চোখের সমস্যায় এবং ৮০ শতাংশ শিশু প্রায়ই মাথা ব্যথায় ভুগছে। এসব কারণে অনেক দেশ ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কঠোর বিধি-নিষেধ আরোপ করেছে। বিশেষজ্ঞরা তাগিদ দিয়েছেন, বাংলাদেশকেও একই পথে হাঁটতে হবে।
অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, ‘শুধু শিশুরা নয়, মধ্যবয়স্করাও সামাজিক মাধ্যমকে এমনভাবে ব্যবহার করছেন, যা ধ্বংসাত্মক পরিণতি ডেকে আনছে। এসব রোধে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে। রাষ্ট্রকেও এখন ভাবতে হবে আমরা কোন ধরনের সমাজ চাচ্ছি।’
আমরা মনে করি, দৈনন্দিন জীবনে প্রযুক্তি অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই একে বর্জন করা সম্ভব নয়, কিন্তু নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব নয়। আগামীর প্রজন্মকে সুস্থ ও সুন্দর পরিবেশ দিতে হলে এখনই শিশুদের জন্য ডিজিটাল নীতিমালা প্রণয়ন করা জরুরি। একই সঙ্গে প্রয়োজন এ বিষয়ে সচেতনতাও।

